ইসলামের এক তৃতীয়াংশ জ্ঞান আছে যে হাদিসটাতে

hijraah

আমীরুল মুমিনীন আবু হাফস্ উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন

আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে বলতে শুনেছি

সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়্যতের উপর, আর প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়্যত করেছে, তাই পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে হয়েছে, আর যার হিজরত দুনিয়া (পার্থিব বস্তু) আহরণ করার জন্য অথবা মহিলাকে বিয়ে করার জন্য তার হিজরত সে জন্য বিবেচিত হবে যে জন্য সে হিজরত করেছে।

(সহীহ্ আল-বুখারী: ১/১, সহীহ্ মুসলিম: ২০/৪৬৯২)

 

প্রেক্ষাপটঃ রাসূলুল্লাহ(সা) এই কথাটি বলেছিলেন, যখন জানা গিয়েছিল যে এক ব্যক্তি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত(migrate) করেছে এক নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ্‌ ও রাসূলুল্লাহ(সা) এর নির্দেশ মেনে চলার জন্য নয়।

 

ব্যাখাঃ এটি বুখারী শরীফের সর্বপ্রথম হাদিস। ইমাম নাওয়াবীও এই হাদিসটি দিয়েই তাঁর ‘৪০ হাদিস’ গ্রন্থ শুরু করেছেন – এর অন্যতম কারণ হলো ইমাম নাওয়াবী এই গ্রন্থটি পড়ার আগে পাঠককে তার নিয়ত বা উদ্দেশ্য ঠিক করে নেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।

 

ইমাম শাফীঈ এর মতে ইসলামের এক তৃতীয়াংশ জ্ঞান রয়েছে এই হাদিসে, ফিকাহশাস্ত্রের ৭০টি বিষয় এই হাদিস এর সাথে জড়িত। আপাতদৃষ্টিতে হাদিসটিকে খুব সাধারণ মনে হলেও এর অর্থ ও তাৎপর্য অনেক গভীর। এই হাদিসটির অন্যতম তাৎপর্য হলো – শাহাদাহ বা কালিমা তাইয়েবা একজন মুসলমানের জীবনে কি ধরণের প্রভাব ফেলবে এই হাদিসটি তা বর্ণনা করে।

 

শাহাদাহ এর দুইটি অংশের সাথে এই হাদিসের সম্পর্কঃ

১ম অংশঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ্‌ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কোন উপাস্য নাই)। অন্যভাবে বললে, একজন  প্রকৃত মুসলমান এর প্রত্যেকটি কাজের উদ্দেশ্য বা নিয়ত হবে আল্লাহ্‌ কে খুশী করা এবং আল্লাহ্‌র নির্দেশ মেনে চলা, কারণ তিনি ছাড়া মেনে চলার যোগ্য, উপাসনার যোগ্য আর কেউই নাই। ইবাদতের একমাত্র যোগ্য সত্তা যেহেতু আল্লাহ্‌, কাজেই আল্লাহ্‌র আবেদী তথা হুকুম-আহকাম মেনে চলাই হবে একজন মুসলমানের জীবনের উদ্দেশ্য। একজন মু’মীন পড়াশুনা করবে এই উদ্দেশ্যে যে আল্লাহ্‌ জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন, সে চাকরী করবে, ব্যবসা করবে এই উদ্দেশ্যে যে আল্লাহ্‌ তাকে পরিবারের দেখাশুনা ও ভরণ-পোষনের দায়িত্ব দিয়েছেন, সে অপচয় করবে না কারণ আল্লাহ্‌ অপচয়কারীকে ভালবাসেন না – এভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার উপাস্য ও সন্তুষ্টির লক্ষ্য হবে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা।

 

আল্লাহ্‌ মহাগ্রন্থ কোরআনে বলেনঃ

“আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য আর কোন উদ্দেশ্যেই আমি জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টি করি নাই” – সূরা জারিয়াত(৫১:৫৬)

 

কারো কোন ভাল কাজের যদি নিয়ত থাকে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা, কেবল তখনই তা ইবাদত বলে গণ্য হতে পারে এবং সে তার জন্য সাওয়াব পেতে পারে। যদি কেউ কোন ভাল কাজ কোন পার্থিব প্রাপ্তি বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে করে, তার প্রতিদান সে দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়মে দুনিয়াতেই পাবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সাওয়াব বা আখিরাতে কোন প্রতিদান পাবে না।

একটা উদাহরন দিচ্ছি। আমি যদি সুন্দর কাপড় পড়ে জুমু’আর নামাজ পড়তে যাই এই কারণে যে আমার বন্ধুরা আমাকে সুন্দর বলবে, আমি আল্লাহর কাছ থেকে আর কোন প্রতিদান পাবো না, কারণ আমার নিয়ত ছিল আমাকে যেন বন্ধুদের চোখে সুন্দর দেখায়, এবং তাদের চোখে আমাকে সুন্দর দেখিয়েছে, অর্থাৎ আমি এর প্রতিদান দুনিয়ায় পেয়ে গেছি। অন্যদিকে, আমি যদি সুন্দর কাপড় পড়ে জুমু’আর নামাজ পড়তে যাই আল্লাহকে খুশী করার উদ্দেশ্যে, এটা মনে রেখে যে রাসূলুল্লাহ(সা) সুন্দর কাপড় পড়ে জুমুআর নামাজ পড়তে যেতেন, তাহলে আমি আখিরাতে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ্‌র কাছ থেকে এর প্রতিবান পাবো। আমার বন্ধুদের চোখে যদি আমাকে ভালো লাগে বা তারা যদি আমার প্রশংসা করে, তবে সেটা হবে বোনাস। আমার বন্ধুরা যদি আমার প্রশংসা না-ও করে তবুও আমি পরের সপ্তাহে সুন্দর কাপড় পড়ে জুমু’আর নামাজে যাওয়ার চেষ্টা করবো । কারণ, আমার লক্ষ্য আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন, বন্ধুদের প্রশংসা পাওয়া নয়।

 

২য় অংশঃ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (মুহাম্মদ(সা) আল্লাহর রাসূল)। শাহাদাহ এর প্রথম অংশ বলে আমরা সব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করব, কিন্তু কিভাবে করব তা বলে শাহাদাহ এর দ্বিতীয় এই অংশটি। এই বাক্যাংশটি মেনে নেয়া অর্থ হচ্ছে, মুহাম্মদ(সা) দ্বীন ইসলাম পালনের যে পথ দেখিয়ে গেছেন, যেভাবে আল্লাহর ইবাদত করা শিখিয়ে গেছেন, যেভাবে তাঁর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালিত করেছেন, আমরা ঠিক সেভাবেই তা করব। কারণ তিনি আল্লাহর রাসূল ছিলেন, কাজেই তিনি দ্বীন আমাদের কাছে পূর্নরূপে পৌঁছিয়েছেন এবং কোন ত্রুটি করেন নাই।

 

আল্লাহ্‌ কোরআনে বলেনঃ

যে রাসূলের আনুগত্য করে সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাদের ওপর আমি আপনাকে পাহারাদার হিসাবে পাঠাইনি। – সূরা নিসা (৪:৮০)

 

উল্লেখিত হাদিসে এই কথাটি এভাবে বলা হয়েছে যে, হিজরত সহ অন্য সকল কাজেই যে রাসূলুল্লাহ(সা) কে অনুসরণ করবে এবং তাঁর আদেশ-নিষেধসমূহ পালন করে চলবে, সে আল্লাহকেই মেনে চলবে এবং সঠিকভাবে ইসলামের পথে থাকবে।

 

উল্লেখ্য, এই হাদিসটি জনপ্রিয় একটি প্রশ্নঃ অমুসলিম ভাল মানুষেরা কেন পরকালে বেহেশতে যাবে না – এই জিজ্ঞাসার উত্তর দেয়। অমুসলিমরা কখনোই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তে কিছু করে নাই, কাজেই আল্লাহ্‌ আখেরাতে তাদেরকে কোন প্রতিদান দিবেন না। তারা যে উদ্দেশ্যে ভাল কাজ করেছিল, যেমন লোকে তাদেরকে ভাল বলবে, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে – সেই উদ্দেশ্য দুনিয়াতেই সফল হয়েছিল। আল্লাহ্‌ ন্যায়বিচারক, তিনি ন্যায়বিচারই করেছেন। ঐ লোকটি দুনিয়া চেয়েছিল, আল্লাহ্‌ তাকে দুনিয়া দিয়েছিলেন, সে আখিরাত চায়নি, তাই আল্লাহ্‌ তাকে আখিরাত দিবেন না। লক্ষ্য করুন, আমাদের পৃথিবীটাও কিন্তু এই নিয়মেই চলে। আপনি কোন কিছু পেতে চাইলে আপনাকে সেই উদ্দেশ্যে কাজ করতে হবে, এমনি এমনি কেউ আপনাকে সেটা দিয়ে যাবে না। আপনি ডাক্তারি পড়তে চাইলে, আপনাকে ভর্তি ফরম কিনে ডাক্তারী পড়ার জন্য আবেদন করতে হবে। আপনি যত মেধাবী ছাত্রই হোন না কেন, আপনি যদি ঘরে বসে থাকেন, অথবা আপনি যদি কোন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভর্তি ফরম কিনে জমা দেন, আপনি আশা করতে পারেন না যে আপনি ডাক্তারী পড়তে পারবেন।

 

কাজেই এই হাদিস থেকে আমরা যে প্র্যাক্টিকাল শিক্ষা গ্রহণ করবো তার সারমর্ম হল এইঃ

১) আমরা সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে কাজ করব। আল্লাহ্‌ যা করতে বলেছেন (ঈমান, নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ্জ ও অন্যান্য ভালো কাজ) তা করে এবং যা হতে বিরত থাকতে বলেছেন (শিরক, কারণবিহীন হত্যা, ব্যভিচার, চুরি, গীবত, অহংকার ইত্যাদি) তা হতে বিরত থাকলেই কেবল আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারব।

আর, অন্য মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলা থেকে শুরু করে সততার সাথে লেন-দেন করা, এরকম যেকোন ভাল কাজের প্রতিদান যদি আমরা আখিরাতে পেতে চাই, তাহলে ভাল কাজ গুলো করার সময় মনে মনে এই নিয়ত রাখতে হবে যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কাজটি করছি। পৃথিবীর কারো কাছে প্রতিদান আমি চাই না, ইনশাআল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ই আমাকে প্রতিদান দিবেন যখন সময় হবে।

 

২) আমরা রাসূলের (সা) দেখানো পথে কাজ করব। রাসূলুল্লাহ(সা) যেভাবে নামাজ পড়তে বলেছেন সেভাবে নামাজ পড়ব, যেভাবে দু’আ করতে বলেছেন সেভাবে দু’আ করব, যেভাবে ইসলামের প্রচার করতে বলেছেন সেই ভাবে প্রচার করব, যেভাবে পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ও মানুষের সাথে ব্যবহার করতে বলেছেন ঠিক সেভাবেই করব। নিয়ত ঠিক করার পর, শুধুমাত্র রাসূলের(সা) দেখানো পথ অনুসরনে ভাল কাজ করলেই আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাওয়া যাবে। অন্য কাজ, তা আপাতদৃষ্টিতে যত ভালই হোক না কেন, যদি রাসূলুল্লাহ(সা) না করে থাকেন এবং তাঁর সঠিকপথে পরিচালিত সাহাবীরা না করে থাকেন, তো আমরা সেটা করা থেকে বিরত থাকব। যেমন: আমরা শবে বরাত বা ঈদ-ঈ-মিলাদুন্নবী পালন করব না, কারণ রাসূলুল্লাহ(সা) বা তাঁর সঠিকপথে পরিচালিত সাহাবীরা এই কাজগুলি করেন নাই। কেউ হয়ত বলতে পারেন, এগুলো তো ভাল কাজ, ঐ দিনগুলি পালনের উসিলায় কিছু ইবাদত করা হয়। কিন্তু, এই যুক্তি ঠিক নয়। নামাজ বেশী পড়াও তো ভাল কাজ। আপনি মাগরিব এর নামাজ ৩ রাকাত না পড়ে ৪ রাকাত পড়েন না কেন? পড়েন না কারণ রাসূলুল্লাহ(সা) এভাবে শিখিয়ে যাননি। এমনিভাবে, নামাজের মত বাকী সকল ইবাদত ও কাজেই রাসূলুল্লাহ(সা) কে অনুসরণ করতে হবে, কেবল তখনই আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে। কারণ, দ্বীনে নতুন আবিস্কৃত প্রথাসমূহ নিকৃষ্টতম কাজ (বিদআত) এবং প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা (মুসলিম, আবু দাউদ, আহমাদ)।

 

আশা করি উপরে আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়েছে কেন এই হাদিসটিকে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন হাদিস বলে গণ্য করা হয়। আরও জানতে চাইলে রেফারেন্সের বইগুলি দেখতে পারেন।

 

রেফারেন্সঃ

১) আন-নাওয়াবীর ৪০ হাদিস। অনুবাদঃ নিজামুদ্দীন মোল্লা।

২) Commentary of forty hadiths of An-Nawawi –  Dr. Jamal Ahmed Badi

৩) Sacred Scrolls: 40 Hadeeth Nawawi – based on the lectures of Shaykh Yasir Qadhi and Imam Suhaib Webb.

৪) ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি এর ৪০ হাদিস সংক্রান্ত কোর্স

বারসিসার কাহিনী – যেভাবে শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয়

barsisa

বনী ইসরাইলের সময় এক ছোট্ট গ্রামে বারসিসা নামে অত্যন্ত ধার্মিক এক ব্যক্তি ছিল। তাকে সন্ন্যাসী বলা যেতে পারে। সে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করত এবং বিশ্বাস করত যে ঈসা আলাহিসসালাম আল্লাহর একজন রাসুল।

সেই গ্রামে তিন ভাই ও এক বোন থাকতো । সেই ভাইদের জিহাদের জন্য ডাকা হল । কিন্তু তারা বোনকে একা রেখে যেতে চাইল না। কার কাছে রাখবে চিন্তা করতে লাগলো। গ্রামবাসি বারসিসার কথা বলল। কারণ গ্রামের সবাই বারসিসাকে উত্তম চরিত্রবান হিসাবে জানতো । তো তারা বারসিসার কেছে গেল, যখন তার কাছে তাদের বোনকে রাখতে চাইলে সে রাজি হল না এবং বলল ‘আমি অভিশপ্ত শয়তানের কাছ থেকে পানাহ চাই।’

কারণ সে ভয় করছিল যে সে গুনাহে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। তখন শয়তান বারসিসার মনে কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) দিতে আসল। চালাক শয়তান জানতো যে বারসিসার মন খুবই নরম। সে কানে কানে বারসিসাকে বলল – “তারা যদি ভাল কাউকে তাদের বোনের জন্য খুঁজে না পায় এবং খারাপ কারো কাছে মেয়েটিকে রেখে যায় তখন কি হবে ! এই পরিণতি কি তোমার ভুলের জন্য নয়?”

বারসিসা বুঝতে পারেনি যে এটা শয়তানের কুমন্ত্রণা। মানুষের প্রতি দরদের কারনে মেয়েটিকে সে সাহায্য করতে রাজি হল।

সে মেয়েটিকে গির্জার বিপরীতে একটি ঘরে থাকতে দিল। গির্জার সামনে মেয়েটির জন্য খাবার রেখে আসত, মেয়েটি নিজে এসে খাবার নিয়ে যেত। বারসিসার সাথে তার দেখা হত না।

শয়তান বারসিসার কাছে আবার আসল এবং বলল, “তুমি কেন মেয়েটির খাবার তার ঘরের সামনে রেখে আসো না? এর ফলে মেয়েটাকে ঘর থেকে কেউ এতটা পথ একা একা হেঁটে বের হতে বা ফিরে যেতে দেখবে না!”

বারসিসা রাজি হল এবং মেয়েটির ঘরের সামনে খাবার রেখে আসতে শুরু করল। শয়তান এতেও খুশি হল না, সে আবার আসলো এবং কানে কানে বলল – ‘কেন তুমি তার ঘরে ভিতরে খাবার দিয়ে আসো না? ফলে মানুষ তাকে ঘর থেকে একা একা বের হতে আর ঢুকতে দেখত না!’ এবার বারসিসা তার ঘরের মধ্যে খাবার দিয়ে আসতে শুরু করল। শয়তান আবার আসলো এবং বলল – ‘মেয়েটার সাথে তোমার কথা বলা উচিত ,এভাবে একা থাকলে তো সে পাগল হয়ে যাবে’। বারসিসা মেয়েটির কথা চিন্তা করে তার সাথে রুমের আড়ালে কথা বলতে শুরু করল ।

শয়তানের কুমন্ত্রণায় এক সময় তারা একই রুমে কথা বলতে লাগল।

এভাবে শয়তান তার কাজের কঠিন অংশ বাস্তবায়ন করল। এই পর্যায়ে বারসিসা এবং মেয়েটা একে অপরের প্রতি দুর্বল হল এবং এক সময় ব্যভিচারে লিপ্ত হল। মেয়েটি গর্ভবতী হল , একটি বাচ্চা জন্ম দিল। বাচ্চা জন্মের সময় শয়তান বারসিসার কাছে আবার আসল এবং বলল, “এটা তুমি কি করলে? তোমার পাপের প্রমাণ সরিয়ে ফেল, না হলে মেয়েটির ভাইরা ফিরে আসলে তোমাকে খুন করবে!”

বারসিসা বাচ্চাটিকে খুন করল এবং ঐ ঘরের মেঝেতে পুতে ফেলল।
শয়তান এবার বলল , “তুমি এক নারীর সন্তান হত্যা করেছ এবং আশা করছ যে সে এটা কাউকে বলবে না?”

তখন বারসিসা মেয়েটিকেও খুন করল এবং তাকেও ঐ ঘরের মেঝেতে পুতে রাখল। মেয়েটির ভাইরা ফিরে আসলে তাদেরকে একটা মিথ্যা কবর দেখিয়ে বলল “তোমাদের বোন অসুখে মারা গিয়েছে এবং ঐ কবরে দাফন করা হয়েছে”। তারা বারসিসার কথা বিশ্বাস করল।

সেই রাতে শয়তান তিন ভাইকে একই স্বপ্ন দেখাল যে “বারসিসা তোমাদের বোনকে হত্যা করেছে, প্রমান হিসাবে তোমাদের বোন যে ঘরে থাকত তার মেঝে খুঁড়ে দেখতে পারো”। ঘুম ভাঙ্গলে তারা একে অপরকে স্বপ্নের কথা বলল এবং বুঝতে পারল তারা তিনজন একই স্বপ্ন দেখেছে।
যাচাই করার জন্য তারা বারসিসার এলাকায় যেয়ে প্রথমে বারসিসার দেখানো কবর খুঁড়ল, দেখল কিছু নেই, এর পর যে ঘরে তাদের বোন থাকত তারা ঐ ঘরের মেঝে খুঁড়ে তাদের বোনের এবং বাচ্চার লাশ পেল। তারা বারসিসাকে ধরল এবং বলতে বাধ্য করলো আসলে কি হয়েছিল।

তারপর তারা তাকে রাজার কাছে নিয়ে গেলে রাজা তাকে শিরচ্ছেদ করতে আদেশ দিল। যখন বারসিসাকে শিরচ্ছেদ করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন শয়তান কাছে আবার আসল। এবার ওয়াসওয়াসা না, মানুষের রূপ নিয়ে সে আসল। এসে বলল, “শুনো বারসিসা, আমি হলাম শয়তান, তোমার এই অবস্থা তোমার নিজের চিন্তায় হয়নি, আমিই করেছি আর একমাত্র আমিই তোমাকে বাঁচাতে পারি যদি তুমি আমার কথা মেনে চল।” বারসিসা বলল, “আমাকে কি করতে হবে?”

শয়তান বলল” আমাকে সেজদা কর আমি তোমাকে রক্ষা করবো” তো বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে বারসিসা শয়তানকে সিজদা করল এবং কাফের হয়ে গেল। সিজদা করার সাথে সাথে শয়তান তাকে বলল – ‘আমি এখন তোমার থেকে মুক্ত। আমি আল্লাহকে ভয় করি যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক’। এই বলে শয়তান সেখান থেকে পালালো , এবং বারসিসার শিরচ্ছেদ করা হল। কেয়ামতের দিন বারসিসাকে যখন জীবিত করা হবে তখন সে শয়তানকে সিজদা করতে করতে উঠে দাঁড়াবে!

দেখুন শয়তান কিভাবে বারসিসাকে ফাঁদে ফেলেছিল। সে এসেছিল বন্ধুর বেশে, ভালো ভালো কথা বলতে আর আপাত:দৃষ্টিতে ভালো কাজে উৎসাহ দিতে, কিন্তু আসলে সে ছিলো সবচেয়ে বড় শত্রু!

আল্লাহ বলেন ,
তাদের দৃষ্টান্ত শয়তান যে মানুষকে বলে কুফরি করো। অতঃপর যখন সে কুফরি করে , তখন শয়তান বলে: আমি তোমার থেকে মুক্ত। আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।
[সুরা হাশর ৫৯:১৬]

ঘটনা থেকে শিক্ষা: 
১) শয়তান কখনোই আপনাকে সরাসরি এসে শিরক করতে বলবে না। সে সব সময়ই আপনাকে ভালো ভালো কারণ দেখিয়ে ধোঁকায় ফেলবে, এবং শয়তান আমাদের যে কারো চাইতেই বেশী ধৈর্য্যশীল, তাই সে বার বার ফিরে আসবে। কাজেই আমরা সবসময়ই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবো শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।
২) কখনোই ভাববেন না যে আপনার অনেক জ্ঞান আছে, বিচার-বুদ্ধি আছে, শয়তান কিছুতেই আপনাকে ধোঁকায় ফেলতে পারবে না। বরং, প্রকৃত জ্ঞানীরা শয়তানের ফাঁদে পড়ার ভয় সবচাইতে বেশী করে। এই কারণেই আপনি দেখবেন আলেমদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি) সবচাইতে বেশী।
৩) কাহিনীটা নিয়ে চিন্তা করুন। শয়তান যদি প্রথমেই এসে বারসিসাকে বলত – ‘আমাকে সিজদা কর’ – বারসিসা কখনোই তা করতো না। কিন্তু শয়তান তার পরিকল্পনা মাফিক ধীরে ধীরে একটার পর একটা ছোট ছোট ধাপে বারসিসাকে দিয়ে ভুল করিয়ে অবশেষে তাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যে জীবন রক্ষার তাগিদে সে অবশেষে শিরক করে ফেলে, যে পাপ আল্লাহ কিছুতেই ক্ষমা করবেন না।
৪) শেষ কথা, আল্লাহ যা করতে আমাদের নিষেধ করেছেন, তা থেকে আমরা বিরত থাকবো। নিজে থেকে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করব না যে – এটা করলে কি হয়? এ আর এমন কি? আল্লাহ নিষেধ করলে কি হবে দেখতে তো মনে হয় এটা একটা ভালো কাজ! এটা তো ছোট্ট একটা পাপ! না, আল্লাহর যে কোন অবাধ্যতাই পাপের পথে নিয়ে যায়, আপাত:দৃষ্টিতে পাপটা যত ছোটই হোক না কেন, ছোট পাপই বড় পাপের দিকে টানে, বড় পাপ টানে কুফরীর দিকে।

রেফারেন্স:
১। ইমাম আন্‌ওয়ার আল আওলাকির লেকচার – The story of Barsisa
২। Story of Barsisa, the worshipper 
৩। অনুবাদের একটা বৃহৎ অংশ ইসলামের নূর ফেইসবুক পেইজ থেকে নেয়া হয়েছে।

একজন জান্নাতী মানুষের কাহিনী

Image

একদিন রাসূলুল্লাহ(সা) কিছু সাহাবার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। তখন তিনি বললেন, ‘এখন এমন একজন আসবে যে কিনা জান্নাতবাসীদের একজন’, এবং এরপর একজন অপরিচিত সাহাবা মসজিদে প্রবেশ করলেন। (এই সাহাবা তেমন বিখ্যাত কেউ একজন ছিলেন না, হাদিসে তার নামও উল্লেখ করা হয় নাই)। পরদিন রাসূলুল্লাহ(সা) একই কথা বললেন, তারপর একই সাহাবা মসজিদে প্রবেশ করলেন। তার পরের দিন রাসূলুল্লাহ(সা) আবার বললেন, ‘এমন একজন এখন আসবে যে কিনা জান্নাতবাসীদের একজন’, এবং সেই একই অপরিচিত সাহাবা এই দিনও আসলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস(রা) নামক সাহাবার মনে প্রশ্ন আসলো – কি এমন বিশেষত্ব ঐ সাহাবার যে পর পর তিনদিন তাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে জান্নাতী বলা হলো? তাই আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস(রা) ঐ সাহাবাকে যেয়ে একটা অজুহাত দিয়ে অনুমতি চাইলেন যে তিনি ঐ সাহাবার বাসায় ৩ রাত থাকতে পারবেন কিনা। অপরিচিত সাহাবাটি তাকে থাকার অনুমতি দিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস(রা) তার বাসায় যেয়ে লক্ষ্য করলেন যে, এই সাহাবার জীবনযাত্রা খুবই সাধারণ – ইনি সব দিন (নফল) রোজা রাখেন না, রাতভর তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েন না, ঘুমান। শুধু ফজর নামাজের কিছুক্ষণ আগে অল্প কয় রাক’আত নফল নামাজ পড়েন (যেটা আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস(রা) এর মতো সাহাবাদের স্ট্যান্ডার্ডে কম নামাজ ছিল)।

তিনদিন পার হয়ে যাওয়ার পর আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা) অপরিচিত সাহাবাকে তার এই বাসায় থাকার আসল কারণ বললেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই, আপনি কোন্‌ কাজটা করেন যার কারণে রাসূলুল্লাহ(সা)আপনাকে জান্নাতীদের একজন বলেছেন? আমি আপনার কাছে সেই কাজটা জানতে চাই’। কিন্তু এই সাহাবা চিন্তা করে কিছু বের করতে পারলেন না, বিনয়ের সাথে বললেন, ‘সাধারণ কাজকর্মের বাইরে আমি কোনও কিছু করি বলে তো মনে করতে পারছি না!’

যখন আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা) বাসা থেকে প্রায় বেরিয়ে আসতে নিয়েছেন তখন অপরিচিত সাহাবাটি বলে উঠলেন, ‘প্রত্যেক রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যারা যারা আমার সাথে খারাপ আচরণ করেছে তাদের সবাইকে আমি ক্ষমা করে দেই। আমি আমার মন থেকে সমস্ত মানুষের ব্যাপারে সকল খারাপ অনুভূতিগুলি ঝেড়ে ফেলে দেই’।

সঙ্গে সঙ্গে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস(রা) বলে উঠলেন, ‘এটাই সেই কারণ!’

(মুসনাদ আহমদ) – ইমাম আন্‌ওয়ার আল আওলাকীর A man from Jannah হতে