৫ – মহানবীর ﷺ বিছানা

bed

bed-jeddah

মসজিদে নববীর ভিতরে মহানবীর ﷺ ছোট একটা কামরা ছিল। কখনো-সখনো তিনি ঐ কামরায় বিশ্রাম নিতেন। এই ঘরে আসবাব-পত্র বলতে কিছুই ছিল না। শুধু ছিল একটা পানির কলস আর একটা বিছানা। একে বিছানাই বা কিভাবে বলা যায়? এটা ছিল খেজুরের ডালের কিছু চাটাই মাত্র।

একদিন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) মহানবীর ﷺ সেই কামরায় প্রবেশ করলেন। মহানবী ﷺ শুয়ে ছিলেন। উমার (রা) আসায় উঠে বসলেন, সালাম বিনিময় করলেন। উমার (রা) দেখলেন খেজুরের চাটাই এ শোয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পিঠে লাল-লাল দাগ হয়ে গেছে। রাসূলের ﷺ পিঠের এই অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন উমার (রা) – “ও রাসূলুল্লাহ! দুনিয়ার বাদশা কাইসার ও কিসরা বিলাসবহুল আয়েশী জীবন যাপন করছে, আর আপনি আল্লাহর রাসূল দোজাহানের সরদার হয়েও সামান্য খেজুরের ছালের বিছানায় শুয়ে আছেন!”

এ সময় মুসলিমদের অর্থনৈতিক অবস্থা কি খারাপ ছিল? না, মোটেও না। এই ঘটনাটি ৭ম / ৮ম হিজরীর দিকে হয়েছে – যখন কিনা মুসলিমরা ইতোমধ্যেই আরব ভূখন্ডের একটা বিশাল অংশে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে – যার নেতৃত্বে আছেন রাসূলুল্লাহ ﷺ । এ কারণেই, উমার (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ কে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে পরাক্রমশালী দুই বাদশা – রোমান বাদশা হিরাক্লিয়াস (কাইসার) ও পারস্যের বাদশা কিসরা এর বিলাসী জীবনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলতে চাইছিলেন – ঐসব বাদশাহরা যেখানে এত আরাম-আয়েশে প্রাসাদ নিয়ে থাকতে পারে – সেখানে আপনি একটু আরামদায়ক বিছানায় ঘুমালে ক্ষতি কি?

ভেবে দেখুন – আপনি যদি খুব কষ্টদায়ক কোন বিছানায় শুয়ে থাকেন, আর আপনার বন্ধু তখন আপনার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলে – “আহা এই বিছানায় তোমার বড় কষ্ট হচ্ছে বন্ধু!” – তাহলে আপনি এর জবাবে কি বলবেন? আমরা হয়তো বলব – “হ্যাঁ বন্ধু, ঠিকই বলেছ। আসলেই অনেক কষ্ট হচ্ছে, এটা বদলে ফেলা দরকার”।

রাসূলুল্লাহ ﷺ কি এরকম কিছু বলেছিলেন? তিনি ﷺ কি উমার (রা) এর এই সমবেদনা প্রকাশে খুশী হয়েছিলেন? মোটেই না! কারণ, তিনি আমাদের মত সাধারণ মানুষ না, তিনি ছিলেন অসাধারণ, তিনি ﷺ আল্লাহর রাসূল। তিনি লক্ষ্য রাখতেন – পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ যাতে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে না যায়, অতিরিক্ত আরামদায়ক বিছানা যেন তাহাজ্জুদের নামাজে উঠার বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। উমার (রা) এর কথায় রাসূলুল্লাহ ﷺ বরং কিছুটা বিরক্তই হলেন। তিনি ﷺ বললেন – “উমার। তুমি কি এতে খুশী নও তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখিরাত?”

এ তো গেল মসজিদের কামরার বিছানা। মহানবীর ﷺ নিজের বাসার বিছানা কেমন ছিল? তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা) বলেন – “আল্লাহর রাসূল যে বিছানায় ঘুমাতেন তা চামড়ার ছিল, এর ভেতরে খেজুর গাছের পাতা ভরা হত”।

লক্ষ্যনীয় যে, চামড়া কিন্তু ম্যাট্রেস তৈরির উপাদান না, চামড়ার বিছানা আরামদায়কও না। আরবরা চামড়া ব্যবহার করত উট বা ঘোড়ার জিন তৈরীতে। চামড়ার সেই শক্ত বিছানাকে কিছুটা সহনীয় করার জন্য সাহাবীরা এর ভেতর খেজুর পাতা ভরে দিতেন।

আরেক স্ত্রী হাফসার (রা) ঘরে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিছানা বলতে ছিল পাতলা এক চট। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এই কষ্টদায়ক বিছানা লক্ষ্য করে হাফসা (রা) একবার এক কাজ করে বসলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঘুমানোর চট – যেটাকে সচরাচর দুই ভাঁজ করা হতো, সেটাকে এক রাতে চার ভাঁজ করে দিলেন। হাফসা (রা) ভেবেছিলেন এতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঘুমের কিছুটা আরাম হবে। অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক বিছানার কারণে সেই রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটু বেশী ঘুমালেন। সকালে তিনি ﷺ যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখন জিজ্ঞেস করলেন – বিছানার বিষয়টা কি? হাফসা (রা) তখন তাঁকে ﷺ অতিরিক্ত ভাঁজের ব্যাপারটা বললেন। এতে তিনি ﷺ মোটেও খুশী হলেন না। বরং নির্দেশ দিলেন – “একে আগের মতই করে দিও, এটা গতকাল আমাকে তাহাজ্জুদ পড়া থেকে বিরত রেখেছে।”

সুতরাং, আমরা বুঝতে পারি যে – রাসূলুল্লাহ (সা) এর আরামদায়ক বিছানায় না ঘুমানোর অন্যতম কারণ ছিল, বিছানার অতিরিক্ত উষ্ণতা তাঁকে (সা) যেন তাহাজ্জুদ সালাত পড়া থেকে বিরত রাখতে না পারে।

একবার কয়েকজন সাহাবী মিলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে তাঁর ﷺ জন্য আরামদায়ক বিছানার ব্যবস্থা করে দিবেন বলে আর্জি পেশ করলেন। জবাবে তিনি ﷺ বললেন – “দুনিয়ার আরাম আয়েশের কি প্রয়োজন? আমি তো একজন পথিকের মত, যে বিরামহীনভাবে চলতে থাকে। চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে একটু আরামের জন্য গাছের ছায়ায় বসে। কিছুক্ষণ আরাম করে আবার সে চলতে থাকে।”

রেফারেন্স ও টীকা: 

  • সিরাহ সংক্রান্ত ড. ইয়াসির কাযির লেকচার – পর্ব ২
  • ৪৬তম অনুচ্ছেদ, শামায়েলে তিরমিযী – মাহমুদিয়া লাইব্রেরী
  • ১ম ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন মদিনা জাদুঘরে সংরক্ষিত মহানবী ﷺ  এর বিছানার মডেল
  • ২য় ছবিতে দেখতে পাচ্ছে জেদ্দাহ এর কিছু আলেমের গবেষণা অনুসারে মহানবী ﷺ  এর বিছানার মডেল। ২য় ছবিতে দুই ধরনের বিছানাই রাখা হয়েছে – ফ্রেমসহ ও ফ্রেম ছাড়া। ফ্রেমের ব্যাপারে সরাসরি কোন সাহিহ হাদিস পাওয়া না গেলেও কোন কোন আলেম অন্য হাদিসের ব্যাখা থেকে এরকম ফ্রেম থাকতে পারে বলে ধারণা করেছেন।

৪ – দেখতে তিনি (সা) কেমন ছিলেন?

dessert-moon

যে সৌন্দর্য বর্ণনা করা যায় না

মানুষ যখন কোন কিছুকে চরম পর্যায়ের সুন্দর বলে মনে করে, ভাষায় যখন আর সে কোন কিছুকে বর্ণনা করতে পারে না, তখন সে অসম্ভবের আশ্রয় নেয়। আপনি যদি একজন মা কে জিজ্ঞেস করেন – তোমার সন্তান দেখতে কেমন? সে বলবে – আমার ছোট্ট সোনামনিটা চাঁদের মত সুন্দর। আবার আপনি যখন কোন তরুনকে তার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্বের কথা জিজ্ঞেস করবেন, সে হয়ত বলবে – তাঁর ব্যক্তিত্ব সূর্যের মত তেজদীপ্ত। সৌন্দর্য বর্ণনা করতে যেয়ে অসম্ভবের আশ্রয় নেয়া শুধু আমাদের মধ্যে আছে তা নয়, সাহাবীদের মধ্যেও ছিল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ  এর ইন্তেকালের পরে সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করত, আর তরুন তাবেঈরা দলে দলে এসে মুগ্ধ হয়ে সেই ঘটনাগুলোকে গিলে খেত। রুবাইয়া বিনতে মুয়াই-উইত (রা) নামক মহিলা সাহাবী যখন অনেক বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন তার ছেলে একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল  – “আচ্ছা মা, আল্লাহর রাসূল দেখতে কেমন ছিলেন?” জবাবে রুবাইয়া বলেছিল – “বাবা তুমি যদি তাকে দেখতে পেতে, তাহলে মনে করতে এই বুঝি সুর্য উঠেছে! ” (কাবির আত-তাবারানি, মানাকিব আল-বুখারী)

আবার অন্যদিকে কা’ব ইবনে মালিক (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে বলেছে –“আল্লাহর রাসূল যখন খুশী হতেন তখন তাঁর চেহারা এমন জ্বল-জ্বল করত যেন পূর্ণিমার চাঁদ!”

সবচাইতে শেষের দিকে যেসব কুরাইশ নেতা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল আমর ইবনে আস (রা)। সে কুরাইশদের অন্যতম নেতা ছিল এবং পরবর্তীতে মুয়াউইয়ার (রা) উজির ছিল। এই আমর ইবনে আস তার বৃদ্ধ বয়সে বলেছিল – “আমার কাছে আল্লাহর রাসূলের চেহারার দিকে তাকানোর চেয়ে মিষ্টি আর কোন কিছুই ছিল না। আমি যতই তাকে দেখতাম আমার মন ভরত না। অথচ তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করতে – উনি দেখতে কেমন ছিলেন? আমি বর্ণনা করত পারতাম না। কারণ, যদিও আমার চরমভাবে ইচ্ছা করত শুধুই তাঁকে দেখি, কিন্তু সম্মানের কারণে তাঁর দিকে আমি চোখ তুলে তাকাতাম না। ”

নবী ইউসুফ(আ) এর সৌন্দর্যের কথা আমরা সবাই জানি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে – “নবী ইউসুফ (আ) কে সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল” (মুসলিম ও আহমাদ)। কোন কোন আলেমের মতে এই অর্ধেক হলো সমস্ত মানবজাতির কাছে যে সৌন্দর্য আছে তার অর্ধেক; আর অন্য আলেমদের মতে এখানে বুঝানো হয়েছে – ইউসুফ (আ) এর সৌন্দর্য রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সৌন্দর্যের অর্ধেক ছিল, কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেয়ে সুন্দর আর কোন মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি।

মহান আল্লাহর সুন্নাহ (অনুসরণকৃত নিয়ম) হলো যে তিনি নবী ও রাসূলদেরকে পাঠিয়েছেন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ গুনাবলির আধার স্বরুপ – এই গুনাবলিগুলো যেমন বাহ্যিক, তেমনই আত্মিক। এর কারণ হলো – মানুষ যাতে মনের ভেতর থেকেই এই নবী/রাসূলদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, তাদের অনুসরণ করতে আগ্রহ বোধ করে। প্রত্যেক নবী ও রাসূলই সকল রকম মানবীয় গুনাবলীতে গুণান্বিত ছিলেন, প্রত্যেকেই বাহ্যিক সৌন্দর্যে অলংকৃত ছিলেন। কিন্তু, এই সবার মধ্যেও সবচেয়ে বেশী সুন্দর, সবচেয়ে বেশী মানবীয় গুনের অধিকারি ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখতে কেমন ছিলেন?

আমরা যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারীরিক গঠন সংক্রান্ত হাদিসগুলোর দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব এই হাদিসগুলোর বেশীরভাগই এসেছে অল্প-বয়সী সাহাবীদের কাছ থেকে। বয়স্ক সাহাবীরা সম্মান ও শ্রদ্ধার কারণে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেহারার দিকে সরাসরি খুব বেশী তাকাতেন না, অন্যদিকে ‘বাচ্চা’ সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খুব কাছে চলে আসত, তাঁর সাথে খেলত, তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখত। এই যেমন আনাস বিন মালিক (রা) এর কথাই ধরা যাক। আনাস (রা) এর বয়স যখন মাত্র ৭ বছর ছিল তখন তার মা তাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে গিফট করেছিলেন।  বালক আনাস ﷺ সারাদিন রাসূল ﷺ এর সাথে থাকত, তাকে এটা-ওটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করত, আর রাতের বেলা মায়ের কাছে ফিরে যেত।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারীরিক গঠন সম্পর্কে সুন্দর এক হাদিস পাওয়া যায় আনাস(রা) থেকে। তিনি বলেছেন – “নবী ﷺ এমন লম্বা ছিলেন না যে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যেতেন, অথবা তিনি এত ছোট ছিলেন না যে তাঁকে চোখে পড়ত না। তিনি অনেক বেশী ফর্সা ছিলেন না, না তিনি ছিলেন তামাটে বর্ণের। তাঁর চুল না ছিল কোকড়া, না ছিল সরল”। এই হাদিসের ব্যাখায় স্কলারেরা বলেন আল্লাহ্‌র রাসূলের সব কিছুই মাঝামাঝি প্রকৃতির ছিল – তিনি মধ্যম উচ্চতার ছিলেন, তাঁর গায়ের রঙ ছিল উজ্জ্বল বাদামী। লক্ষ্যণীয় যে, সাহাবীরা রাসূলুল্লাহর ﷺ শারীরিক গঠনের বর্ণনায় খুবই সতর্ক ছিলেন।  আর তাই তিনি দেখতে কেমন ছিলেন জিজ্ঞেস করা হলে অনেক সময় তারা – তিনি  ﷺ কেমন ছিলেন তা সরাসরি না বলে তিনি ﷺ কেমন ছিলেন না তা বর্ণনা করতেন। আনাস (রা) আরো বলেন –  “আমি কখনো এমন কোন ভেলভেট বা সিল্ক স্পর্শ করিনি যা আল্লার রাসূলের ﷺ হাতের চাইতে নরম।  আর আমি কখনো এমন কোন সুগন্ধীর ঘ্রাণ নেইনি যার সুবাস আল্লাহর রাসূলের ﷺ ঘামের চেয়ে মিষ্টি। ” অন্য হাদিস থেকে আমরা জানি রাসূলুল্লাহﷺ এর স্ত্রী উম্মে সালামা ও অন্য সাহাবীরা বোতলে করে তাঁর ﷺ ঘাম জমিয়ে রাখতেন এবং পরে তা সুগন্ধী ও ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করতেন।

আল-বারা ইবনে আযিব (রা) বলেন: “আল্লাহর রাসূল ﷺ ছিলেন মাঝারি গঠনের। তাঁর ﷺ প্রশস্ত কাঁধ ছিল। তাঁর ﷺ চুল ছিল মোটা (অর্থাৎ পাতলা না), তাঁর ﷺ দাড়ি ছিল ঘন। ” অন্য হাদিস থেকে আমরা জানি রাসূলুল্লাহ ﷺ কানের লতি পর্যন্ত তাঁর চুল বড় করতেন। আর উমরা/হজ্ব বা অন্য সময় যখন চুল কাটতেন তখন পুরো চেঁছে ফেলতেন। জীবনের শেষের দিকেও তাঁর খুব বেশী পাকা চুল ছিল না। আনাস(রা) বলেছেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মোট ১৭টি পাকা চুল-দাড়ি ছিল।

আল-বারা ইবনে আযিব (রা) আরো বলেন: “রাসূলুল্লাহকে ﷺ আমি একবার লাল রঙের হুল্লা পরা অবস্থায় দেখেছিলাম (হুল্লা = ওভারকোটের মত এক ধরনের আরবীয় পোশাক)।  এর চেয়ে সুন্দর কোন কিছু আমি আমার জীবনে দেখিনি!”

আলী (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চাচাত ভাই। ছোটবেলা থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঘরেই তিনি বড় হয়েছেন, আর তাই তাঁকে ﷺ অনেক কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তার। আলী(রা) বলেন: “নবী ﷺ এর মুখে অনেক বেশী মাংস ছিল না। তাঁর মুখ গোলাকৃতির ছিল না, বরং কিছুটা ওভাল আকৃতির ছিল। তাঁর গায়ের রঙ ছিল লালচে ফর্সা / উজ্জ্বল বাদামী। তাঁর ডাগর চোখ ছিল, চোখের মণি ছিল নিকষ কালো, পাপড়ি ছিল লম্বা। তাঁর হাড়ের গাঁটগুলো উন্নত (স্পষ্ট) ছিল, কাঁধের পেছনটা ছিল প্রশস্ত। তাঁর সারা শরীরে পশম ছিল না, কিন্তু তাঁর বুক থেকে নাভী পর্যন্ত পশমের একটা পাতলা লম্বা রেখা ছিল।

হাঁটার সময় তিনি ﷺ দ্রুত হাঁটতেন, মনে হত যেন তিনি কোন ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নামছেন। কারো দিকে তাকানোর সময় তিনি (আড়চোখে না তাকিয়ে) শরীর সহ মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতেন।  তাঁর দুই কাঁধের মাঝে নবুওয়তের ‘খাতম’ ছিল, আর তিনি নিজেও ছিলেন নবুওয়তের খাতম (খাতম = চিহ্ন বা সীল। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুই কাঁধের মাঝখানে ভিন্ন রঙের কিছু চুল ছিল এবং এটা ওভাল আকৃতির ছিল – এটাই ছিল তাঁর ﷺ নবুওয়তের খাতম)।

কারো চোখ যদি অনভিপ্রেতভাবে (unexpectedly) রাসূলুল্লাহর ﷺ উপর পড়ে যেত, সে সমীহ করে থমকে যেত। তাঁর ﷺ সাথে যে সাক্ষাত করত, তাঁকে যে জানত, সে-ই তাঁকে ভালবাসত। তাঁর সম্পর্কে যে-ই কথা বলবে সে-ই বলবে যে, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেখার আগে বা পরে তাঁর মত আর কাউকে দেখিনি”। (শামায়েলে তিরমিযী)

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেহারার মধ্যে আল্লাহ্‌ এক ধরনের মায়া, এক ধরনের আকর্ষণ দিয়েছিলেন। জাবির বিন সামুরা (রা) পূর্ণিমার এক রাতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে তার দেখা হয়ে গেল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেদিন তাঁর লাল হুল্লাটি পরে ছিলেন (হুল্লা = ওভারকোটের মত এক ধরনের আরবীয় পোশাক)। জাবির (রা) বলেন: “আমি একবার আল্লাহর রাসূলের চেহারার দিকে তাকাচ্ছিলাম আরেকবার পূর্ণিমার চাঁদের দিকে দেখছিলাম। শেষে আমি এই উপসংহারে আসলাম যে, আল্লাহর রাসূল পূর্ণিমার চাঁদের চাইতেও বেশী আকর্ষণীয়, সুন্দর, উজ্জ্বল। ”

বহু মানুষ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শুধু চেহারা দেখেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম ছিল মদীনার ইহুদীদের প্রধান র‍্যাবাই (ইহুদীদের ধর্মযাজক)। রাসূলুল্লাহ ﷺ যেদিন মক্কা থেকে মদীনায় আসলেন তখন আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেখতে গিয়েছিল – তার মনে রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে কৌতুহল ছিল – কে এই ব্যক্তি যে নিজেকে নবী বলে দাবী করছে? রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেখামাত্র বিমোহিত হয়ে পড়ল আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা), তাঁর নিজের ভাষায় : “যেই মাত্র আমি তাঁকে ﷺ দেখেছি তখনই আমি বুঝেছি যে এটা কোন মিথ্যুকের মুখমন্ডল নয়। (বুখারী)” রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে মাত্র একবার কথোপকথনের পরেই আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

রেফারেন্স টীকা:

  • সিরাহ সংক্রান্ত ড. ইয়াসির কাযির লেকচার – পর্ব ২
  • শামায়েলে তিরমিযী – মাহমুদিয়া লাইব্রেরী
  • জাবির বিন সামুরার (রা) হাদিস http://ahadith.co.uk/hadithbynarrator.php?n=Jabir&bid=12&let=J

৩ – মহানবীর ﷺ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য

Beautiful-Quran-1153x768

প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ কে আল্লাহ্‌ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছিলেন যা তিনি সৃষ্টিজগতের আর কোন মানুষকে এমনকি অন্য কোন নবী-রাসূলকেও দেননি। ইসলামী পরিভাষায় এগুলোকে আল্লাহর রাসূলের “খাসাইস” (অনন্য বৈশিষ্ট্য) বলে। কোন কোন স্কলার কুরআন-হাদিস ঘেঁটে প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ  এর প্রায় ৫০টি অনন্য বৈশিষ্ট্য বের করেছেন। এরকম কিছু বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:

১) প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ হলেন সর্বশেষ নবী।

আল্লাহ্‌ বলেন: “মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী। আল্লাহ্‌ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আহযাব ৩৩:৪০)

২) আল্লাহ্‌  আদি পিতা আদম (আ) এর দেহে রুহ ফুঁকে দেয়ারও আগে মুহাম্মাদ ﷺ এর নবুওয়তের বিষয়টি নির্ধারণ করেছিলেন।

এক সাহাবী একবার জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহর রাসূল? আপনি যে নবী হবেন সেটা আল্লাহ্‌ কবে নির্ধারণ করেছিলেন? রাসূলুল্লাহ ﷺ জবাবে বলেছিলেন – যখন আদম মাটি (ত্বীন) ও রুহ এর মধ্যবর্তী ছিলেন (অর্থাৎ, আদমের মাটির দেহে তখনও রুহ ঢুকানো হয়নি)।

৩) পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবীকে পাঠানো হয়েছিল তাঁর যুগের ও তাঁর জাতির মানুষের জন্য। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ।  তিনি একমাত্র নবী যাকে সমস্ত মহাবিশ্বের সকল জাতির জন্য, কেয়ামত অবধি সকল যুগের জন্য নবী হিসাবে পাঠানো হয়েছে। শুধু তাই না – তিনি একমাত্র নবী যাকে কেবল মানবজাতিরই নয়, বরং সমস্ত জ্বীন জাতির জন্যেও নবী করে পাঠানো হয়েছে।

৪) প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ কে আল্লাহ্‌ দিয়েছিলেন রু’উব। আল্লাহর রাসূল বলেন – “আল্লাহ্‌ আমাকে রু’উব দিয়ে সাহায্য করেছেন। রু’উব এমন এক রকম ভয় যার ফলে আমি আমার শত্রুদের কাছে পৌঁছানোর আগেই তারা আমার ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। এমনকি আমি তাদের থেকে এক মাস ভ্রমণ পরিমাণ দূরত্বে অবস্থান করলেও তারা আমার ভয়ে ভীত থাকে।”

৫) তাঁকে দেয়া হয়েছে সর্ববৃহৎ উম্মাহ। সাহিহ বুখারীতে বর্ণিত এক হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন – আল্লাহ্‌ আমাকে বিভিন্ন নবীর উম্মাতদেরকে দেখালেন। তার মধ্যে এক নবীর উম্মাহ বিশাল বড় ছিল। আমি বললাম – এরা বোধহয় আমার উম্মাহ। আমাকে বলা হল – না, এরা মুসা (আ) এর উম্মাহ। এরপর আমার চোখে পড়ল তার চাইতেও বড় এক উম্মাহ – যা কিনা দিগন্ত পর্যন্ত ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমাকে বলা হলো – এরাই আপনার উম্মাহ ।

আরেক হাদিসে বলা হয়েছে – একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের প্রশ্ন করলেন – “তোমরা কি চাও জান্নাতের এক-তৃতীয়াংশ তোমাদের মানুষেরা হবে?”

তারা খুশীতে বলে উঠল – “আল্লাহু আকবার!”

“তোমরা কি একথা শুনে খুশী হবে যে জান্নাতের অর্ধেকটা তোমাদের মানুষেরা হবে?”

“আল্লাহু আকবার!”

“আল্লাহর কসম – আমি আশা করি জান্নাতবাসীর দুই-তৃতীয়াংশ হবে আমার উম্মাহ”।

লক্ষণীয় যে, আজকে আমাদের কাছে এই হাদিসটাকে নিতান্ত সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু তৎকালীন সাহাবীদের জন্য এটা ছিল এক বিরাট ঈমান-উদ্দীপক বাণী। সে সময় দুনিয়ার মোট মুসলিমের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে দেড়-দু’হাজার ছিল, আর সেখানে খ্রিষ্টান ছিল কয়েক মিলিয়ন, ইহুদী ছিল কয়েক লক্ষ। মুসলিমদের সংখ্যা এক সময় সব জাতিকে ছাড়িয়ে যাবে, এটা চিন্তা করে সাহাবীরা তখন কতটা অনুপ্রানিত হয়েছিলেন তা এখন আমাদের কল্পনারও বাইরে।

৬) আল্লাহ ﷻ প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ কে দিয়েছেন সকল মু’জিযার (miracle) শ্রেষ্ঠ মু’জিযা – “আল-কুরআন”।  আমরা জানি – মুসা(আ) লাঠির আঘাতে লোহিত সাগর দ্বিখন্ডিত করেছিলেন, ঈসা(আ) মৃতকে পুনরজ্জিবীতে করেছিলেন, নূহ(আ) তাঁর বিশাল কিস্তিতে ভেসে তাঁর অনুসারীদের রক্ষা করেছিলেন – কিন্তু ভেবে দেখুন এই মু’জিযাগুলো সবই ঐতিহাসিক ব্যাপার। আমরা কেউই মুসা(আ) কে লোহিত সাগর দ্বিখন্ডিত করতে দেখিনি, কেউই ঈসা(আ) কে দেখিনি মৃতকে পুনরজ্জীবিত করতে বা নূহ(আ) কে তাঁর বিশাল কিস্তি পানিতে ভাসিয়ে দিতে; কিন্তু আমরা সবাই কুরআন দেখেছি, যার ইচ্ছা হয় পড়েছি। কুরআন এমন এক মু’জিযা যা নাজিলের ১৪শত বছর পরেও আমরা নিজের চোখে দেখতে পারি, হাত দিয়ে ছুঁতে পারি, নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারি এটা কত আশ্চর্য এক গ্রন্থ!

– আরবী ভাষার যে কোন পন্ডিত স্বীকার করবেন যে আরবী সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হলো কুরআন। এত উচ্চ মার্গীয় ব্যাকরণ ও কাব্যিকতা আরবী ভাষার আর কোন গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যায় না। আরবী ভাষার মূল ব্যাকরণই কুরআন থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

– কুরআন মানবজাতির ইতিহাসকে যেভাবে পরিবর্তিত করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোন একক গ্রন্থ এ কাজ করে দেখাতে পারেনি। কুরআনকে অনুসরণের কারণে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতায় পৃথিবীতে সবচেয়ে অন্ধকারে থাকা আরব জাতি আজ থেকে ১৪ শত বছর আগে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছিল। কুরআনের প্রভাব এমনকি ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন অনারব ভূখন্ডেও, আর এর প্রভাবে দলে দলে বিভিন্ন জাতি ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এক কুরআনের প্রভাবে নগ্ন-পদের বেদূঈনরা তৎকালীন সুপার-পাওয়ার রোমানদেরকে পরাজিত করেছিল, ছেড়া কাগজের মত টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল মহাপরাক্রমশালী ফার্সী বাদশা খসরুর সাম্রাজ্য। ইসলামের স্বর্ণযুগে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ ছিল মুসলিমদের শাসনে। পদার্থ বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, অর্থনীতি সহ জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিমরা সে সময় নেতৃত্ব দিয়েছে। আর এ সবই হয়েছিল একটি মাত্র গ্রন্থ – আল-কুরআনকে অনুসরণের কারণে। আর বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা মার খাচ্ছে ঠিক তার বিপরীত কারণে – কুরআনকে জীবন নির্দেশিকা হিসাবে গ্রহণ না করার কারণে।

– পৃথিবীতে কুরআন যত বইয়ের জন্ম দিয়েছে, যত স্কুলের জন্ম (মাদ্রাসা শব্দের ইংরেজী হলো স্কুল) দিয়েছে, আর কোন একক বই তা দেয়নি। আজ বিশ্ব জুড়ে যে লক্ষ লক্ষ হাদিস গ্রন্থ, তাফসির গ্রন্থ, সীরাহ গ্রন্থ, ফিকহী গ্রন্থ – আমরা দেখতে পাই, এই সমগ্র ইসলামী সাহিত্যের উৎস হলো একটি মাত্র বই – আল-কুরআন।

– কুরআন এমন এক গ্রন্থ যাতে আছে ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলনীতি (theology), ইবাদত করার পদ্ধতি, নৈতিকতা শিক্ষা ,অতীতের ইতিহাস, ভবিষ্যতে কি হবে তার বর্ণনা, পারিবারিক/সামাজিক/রাষ্ট্রীয় আইন, বিভিন্ন রকম বৈজ্ঞানিক নিদর্শনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, এমনকি একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবন কিভাবে পরিচালিত করবে, কিভাবে নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবে তা-ও। অবতীর্ণ হওয়ার ১৪শত বছর পরেও এই পৃথিবীর ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম এই গ্রন্থের প্রতিটা অক্ষরকে যেভাবে বিশ্বাস করে, যেভাবে সম্মান প্রদর্শন করে, এই বইয়ে যেভাবে লেখা আছে সেভাবে অযু করে নিজেকে পবিত্র করে, সালাত আদায় করে, রমজানে রোজা রাখে, যাকাত আদায় করে, হজ্জ্ব পালন করে – তা সত্যিই এই বিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা, কিন্তু প্রতিদিন আমরা এটা ঘটতে দেখি বলে এটা আমাদের চোখে পড়ে না।

– পৃথিবীতে যত বেশী মানুষ কুরআন পড়েছে, আর অন্য কোন গ্রন্থকে মানবজাতি সেভাবে পড়েনি। প্রতিবছর শুধু রমজান মাসে যে পরিমাণ কুরআন পড়া হয়, ৫০ বছরেও পৃথিবীর আর কোন গ্রন্থ এতবার পড়া হয় না। পৃথিবীতে কুরআনকে প্রথম থেকে শেষ অক্ষর পর্যন্ত যতবার, যত মানুষ মুখস্থ করেছে – আর কোন গ্রন্থকেই এভাবে করা হয়নি, করা হয় না।

সুতরাং, একথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে – যদিও প্রত্যেক নবীর প্রত্যেক মু’জিযাই আল্লাহর ﷻ অসামান্য ক্ষমতার বহি:প্রকাশ, কিন্তু কুরআনের সাথে অন্য মু’জিযাগুলোর কোন তুলনা হয় না।

৭) প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ কে সম্মানিত করা হয়েছে ইসরা ও মি’রাজ এর মাধ্যমে – যখন তাঁকে একেবারে আল্লাহর ﷻ আরশের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্য কোন মানুষ, এমনকি কোন ফেরেশতাকেও কখনো আল্লাহর ﷻ এত কাছে যেতে দেয়া হয়নি। এই যাত্রার একটা সময় জিব্রিল(আ) প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে  বলেছিলেন – “হে আল্লাহর রাসূল বাকী পথ আপনাকে একা যেতে হবে, কারণ এর উপরে যাওয়ার অনুমতি আমার নেই”।

৮) প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ হলেন সমগ্র মানবজাতির নেতা। এক হাদিসে তিনি বলেছেন – “আমি হলাম সমস্ত আদম-সন্তানের সাইয়েদ (নেতা, রোল-মডেল)”।

৯) শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুতকারের পর সর্বপ্রথম যিনি কবর থেকে পুনরুত্থিত হবেন তিনি আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ (বুখারী)। পুনরুত্থান দিবসে সব মানুষ নগ্ন অবস্থায় উত্থিত হবে। এদের মধ্যে সর্বপ্রথম কাপড় পড়ানো হবে প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে।

১০) পুনরুত্থান দিবসে প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে দেয়া হবে সর্ববৃহৎ হাউস “আল-কাউসার”, যা আমরা সূরা আল-কাউসার এর তাফসীর থেকে জানি। আল-কাউসার হলো বর্গাকৃতির একটি হাউস (Pool), যার একেকটি বাহুর দৈর্ঘ্য হবে মক্কা থেকে ইয়েমেনের সান’আ  পর্যন্ত – যা কিনা প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ। আবার, আল-কাউসার বলতে জান্নাতের মূল নদীটাকেও বুঝায়, জান্নাতের অন্য সকল নদী হলো এই আল-কাউসার নদীর শাখা-প্রশাখা। এর ব্যাখায় স্কলারেরা বলেছেন – প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ্‌ যে আল-কাউসার উপহার দিয়েছেন, তার বরকতে যেন সকল জান্নাতবাসীর তৃষ্ণা মিটবে।

১১) সর্বপ্রথম পুলসিরাত পার হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ । সর্বপ্রথম মানুষ হিসাবে জান্নাতে প্রবেশের সম্মানও দেয়া হবে প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে। যখন তিনি জান্নাতের দরজায় এসে কড়া নাড়বেন তখন ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করবে – “কে আপনি?” তিনি বলবেন – “আমি মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ”। সে উত্তর দিবে –“শুধু আপনি আসলেই আমাকে জান্নাতের দরজা খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে!”। একথার পর নিজের ডান পা রাখার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ রাসূল ﷺ সর্বপ্রথম মানুষ যিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাঁর পিছু পিছু প্রবেশ করবে তাঁর উম্মতেরা – যারা যুগের হিসাবে সর্বশেষ, কিন্তু জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম উম্মত হবে।

১২) প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ্‌ জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বশিখরে বসবাস করার একক সম্মান দিবেন। জান্নাতের লোকসংখ্যার বন্টন হলো পিরামিডের মত – লেভেল যত নিচের দিকে হবে, মানুষদের সংখ্যা তত বেশী হবে, আর লেভেল যত উপরে হবে মানুষের সংখ্যাও তত কম হবে। এই লেভেল উপরে উঠতে উঠতে সর্বোচ্চ যে লেভেলটা থাকবে – সেই লেভেলে যাওয়ার মত মর্যাদা কেবল একজন মানুষেরই থাকবে – আর তিনি হলেন আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ । এই লেভেলটি আল্লাহর ﷻ আরশের ঠিক নিচে অবস্থিত আর এর নাম হলো “আল-ফাদিলাহ”। প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ বলেছেন – “আল-ফাদিলাহ হলো জান্নাতের একটি লেভেল যা কিনা আল্লাহ্‌ কেবল তাঁর একজন মাত্র বান্দাকে দিবেন “, এরপর তিনি ﷺ স্বভাবসুলত বিনয়ের সাথে বলেছেন, “আর আমি আশা রাখি যে আমি-ই সেই বান্দাহ” – যদিও তিনি নিশ্চিত জানতেন যে তিনি নিজেই হলেন আল-ফাদিলাহ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত একমাত্র ব্যক্তি।

প্রত্যেকবার আযানের পর আমরা যে দু’আ করি তাতেও কিন্তু আমরা বলি – “আ-তি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলাহ” –  হে আল্লাহ আপনি মুহাম্মাদ ﷺ কে আল-ওয়াসিলাহ ও আল-ফাদিলাহ দিন।

(সিরাহ সংক্রান্ত ড. ইয়াসির কাযির লেকচার – পর্ব ১ অনুসারে)

২- মহানবীর ﷺ কিছু নাম

মহানবীর ﷺ বিশেষ বৈশিষ্ট্য – পর্ব ২: মহানবীর ﷺ  কিছু নাম

muhammad logo

আরবী ভাষায় কোন কিছুর গুরুত্ব বোঝাতে ও কোন কিছুর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করার অন্যতম একটা উপায় হচ্ছে তাকে বিভিন্ন নামে ডাকা। এই কারণেই, মহান আল্লাহ্‌ ﷻ কে আমরা বিভিন্ন নামে ডাকি – আর তার মধ্যে ৯৯টি নাম প্রসিদ্ধ। একইভাবে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এরও বহু নাম আছে – যার কিছু দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ্‌ ﷻ, কিছু দিয়েছেন সাহাবীরা, আর কিছু দিয়েছেন তাঁর প্রতি ভালবাসার প্রকাশ-স্বরূপ তাবে’ইরা ও পরবর্তী যুগের স্কলারেরা।  কোন কোন স্কলারের মতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ২৫০টিরও বেশী গুণবাচক নাম আছে। এখানে আমরা তাঁর এমন কিছু নাম নিয়ে আলোচনা করব যেগুলো স্বয়ং মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে দিয়েছেন।

কুরআন মাজিদে বর্ণিত রাসূলের ﷺ নাম: 

কুরআন মাজিদে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে অনেকগুলো বিশেষণে (Adjective) ভূষিত করা হয়ে থাকলেও তাঁর জন্য দুইটি মাত্র বিশেষ্য (Noun) ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুইটি হলো –মুহাম্মাদ ও আহমাদ। মুহাম্মাদ নামটা কুরআনে মোট চারবার আছে, আর আহমাদ নামটা আছে একবার।

মুহাম্মাদ ও আহমাদ দুইটি নামই এসেছে “হামিদা” শব্দমূল থেকে। “হামদ” শব্দের অর্থ হলো প্রশংসা করা – এ প্রশংসা যেন-তেন রকমের প্রশংসা নয়, সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশংসা, স্থান-কালের উর্দ্ধের প্রশংসা, যে প্রশংসা ধন্যবাদ জানানোর জন্য নয়, বরং গুণের কারণে করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামের মূলে “হামদ” ব্যবহারের অর্থ হলো – তিনি এমন একজন মানুষ যিনি সর্বসময়, সর্বাবস্থায় প্রশংসনীয়, তিনি যা তিনি তারই জন্য প্রশংসনীয়, তিনি তাঁর কর্মের কারণে প্রশংনীয়, আবার তিনি কিছু যদি না-ও করে থাকতেন তবুও শুধু সৃষ্টিগত কারণেই তিনি প্রশংসনীয়। তিনি বেঁচে থাকতে প্রশংসনীয়, মৃত্যুর পরেও প্রশংসনীয়, দুনিয়াতে প্রশংসনীয়, হাশরের মাঠে প্রশংসনীয়, এমনকি জান্নাতে প্রবেশের পরেও প্রশংসনীয় ।

এতো গেল সর্বসময়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর  প্রশংসিত হবার কথা। এবার আসুন দেখি কে কে তাঁর প্রশংসা করে? রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন একজন মানুষ যার প্রশংসা স্বয়ং আল্লাহ্‌ ﷻ করেছেন, নবীরা করেছে, ফেরেশতারা করেছে, সমস্ত মানবজাতি করেছে – মুসলিমরা করেছে এমনকি অমুসলিমরাও করেছে।  মুসলিমরা তাঁর প্রশংসা করে তাঁর বাণীকে অনুসরণ করে। আর অমুসলিমরাও তাঁর প্রশংসা করে, যদিও তা সরাসরি নয়। অমুসলিমরা কিভাবে তাঁর প্রশংসা করে? তাঁর যে মানবীয় গুনাবলী – সত্যবাদীতা, দানশীলতা, দয়া, মায়া, ভালোবাসা, স্নেহ, ন্যায়বিচার, কঠোর সংগ্রাম, মানব প্রেম, সেন্স অফ হিউমার – সেগুলো সকল যুগের সকল মানুষের কাছে গ্রহনীয়, প্রশংসনীয় – আর এই গুনগুলোর প্রশংসা করার মাধ্যমে অমুসলিমেরা ইনডাইরেক্ট ভাবে তাঁর প্রশংসা করে। মানব ইতিহাসে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর চেয়ে বেশী প্রশংসিত মানুষ আর একটিও আসে নাই, আর একটিও আসবে না।

মুহাম্মাদ আর আহমাদ নাম দুইটার পার্থক্য কি? মুহাম্মাদ শব্দের অর্থ হচ্ছে যাকে অনবরত, একের পর এক প্রশংসা করে যাওয়া হয়। কাজেই, মুহাম্মাদ নামের মাধ্যমে আমাদের প্রিয়নবীর প্রশংসার সংখ্যাধিক্য কে বুঝানো হয়েছে (Quantity of praise)। আর আহমাদ বলতে বুঝায় সবচেয়ে ভালো উপায়ে যাকে প্রশংসা করা হয় (Quality of praise)। কাজেই, আহমাদ নামের মাধ্যমে আমাদের প্রিয়নবীর প্রশংসার গুনগত মানকে বুঝানো হয়েছে।  সকল ভালো গুণের সমারোহ , আর সকল ভালো গুনের আধিক্য – এই দুইয়ের সমন্বয়ই হলেন আমাদের প্রিয়নবী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ মুহাম্মাদ ﷺ ইবনে আব্দুল্লাহ।

আমরা যদি কুরআনে  রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামগুলো কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে  সেদিকে তাকাই তাহলে দেখব – যখনই নবী মুসা (আ) এর মুখ দিয়ে রাসূলের ﷺ নাম উচ্চারিত হয়েছে তখনই ‘মুহাম্মাদ’ ব্যবহৃত হয়েছে; অন্যদিকে যখনই নবী ঈসা (আ) এর মুখ দিয়ে রাসূলের ﷺ নাম উচ্চারিত হয়েছে তখনই ‘আহমাদ’ ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনে রাসূলের ﷺ নামের ব্যবহারের এই পার্থক্য নিয়ে খুব চমৎকার একটা ব্যাখা দিয়েছেন ইবনুল কাইয়ূম (মৃত্যু ৭৫১ হিজরী)।

ইবনুল কাইয়ূম বলেন – আমরা জানি ‘মুহাম্মাদ’ নামের অর্থ হলো যাকে অনেক অনেক মানুষ প্রশংসা করে (Quantity of praise) আর ‘আহমাদ’ নামের অর্থ হলো যাকে সবচেয়ে ভালো গুণের মাধ্যমে প্রশংসা করা হয় (Quality of praise)। আমরা যদি নবী মুসা (আ) এর উম্মতের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব আমাদের নবী মুহাম্মাদের ﷺ পরে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক উম্মত ছিল মুসা (আ) এর। যেহেতু মুসা (আ) এর উম্মতেরা তাদের নিজেদের সংখ্যার কারণে গর্বিত, তাই মুসা (আ) তাঁর উম্মতদের জানিয়ে দিচ্ছেন যে, আমার পরে এমন এক নবী আসবে যে হবে কিনা ‘মুহাম্মাদ’ তথা তার উম্মতের সংখ্যা হবে তোমাদের চাইতেও বেশী। অন্যদিকে, নবী ঈসা (আ) এর হাওয়ারিদের (শিষ্য/Disciple) সংখ্যা ছিল কম, কিন্তু তাদের ইমান ছিলো খুবই মজবুত – শত অপবাদ, নিপীড়ন, অত্যাচারের মুখেও তারা নবী ঈসা (আ) কে দৃঢ়তার সাথে অনুসরণ করে গেছে। নবী ঈসা তার পরবর্তী নবীকে ‘আহমাদ’ নামে তাঁর উম্মতদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে – তিনি বলছেন – শোন, আমার পরে এমন এক নবী আসবে যে কিনা হবে আমার চেয়েও বেশী গুণে গুণান্বিত, ফলে তাঁর যারা হবে ছাত্র – সেই সাহাবা ও তাঁর উম্মতেরাও তোমরা হাওয়ারিদের চাইতেও বেশী গুণান্বিত হবে।

হাদিসে বর্ণিত রাসূলের ﷺ কিছু নাম:

“যুবাইর ইবনে মুত’ইম থেকে বর্ণিত। মহানবী ﷺ বলেছেন – আমার অনেকগুলো নাম আছে। আমি মুহাম্মাদ; আর আমি আহমাদ; আর আমি আল-মাহি, অর্থাৎ যার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ কুফরী কে দূরীভূত করবেন; আর আমি আল-হাশির, কারণ আমার পদ অনুসরণ করে (অর্থাৎ আমার পরে) মানুষকে হাশর (উত্থান) করা হবে; আর আমি আল-‘আকিব, অর্থাৎ যার পরে আর কোন নবী আসবে না, আর আমি রহমতের নবী, আমি তাওবার নবী (অর্থাৎ আমাকে অনুসরণ করলে মানুষ ক্ষমা পাবে), আর আমি আল-মুকাফফা (একটা বৃহৎ চেইন এর সর্বশেষে এসে যে কোন কিছুকে পূর্নতা দেয়); আর আমি মালাহিমের নবী” । – (সাহিহ মুসলিম ও অন্যান্য) 

মালাহিম শব্দের অর্থ হলো – যিনি অনেক ফিতনার (trials and tribulations) বার্তা নিয়ে আসেন। রাসূল ﷺ নিজেকে মালাহিমের নবী বলেছেন কারণ – মানুষ সৃষ্টির পর থেকে সবচেয়ে বড় ফিতনা হলো দাজ্জাল, আর এই দাজ্জাল আসবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উম্মাতের উপর। এছাড়া কেয়ামতের ছোট ও বড় যত আলামত আছে – সবই আসবে এই উম্মাতের উপর। নিজেকে মালাহিমের নবী বলার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে – তাঁর মৃত্যুর পর আমরা অনেক বেশী ফিতনা দেখতে পাব।

[ আগের পর্ব: মহানবীর ﷺ বিশেষ বৈশিষ্ট্য – পর্ব ১: অতুলনীয় মর্যাদা প্রাপ্ত একজন মানুষ ]

[মহানবীর ﷺ মহাজীবন সিরিজের লেখাগুলো মূলত: ১) শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার ও ২) ড. সাল্লাবীর সিরাহ বইকে ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।]

প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স:

৩) http://corpus.quran.com/

৪) Meaning of Muhammad and Ahmad – http://en.islamtoday.net/quesshow-14-738.htm

 

১- অতুলনীয় মর্যাদা প্রাপ্ত একজন মানুষ

mohanobir mohajibon cut

মহানবীর ﷺ বিশেষ বৈশিষ্ট্য – পর্ব ১: অতুলনীয় মর্যাদা প্রাপ্ত একজন মানুষ

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সলাতু ওয়াস সালামু ‘আলা রসুলিল্লাহ ওয়া ‘আলা আলিহি ওয়াসাহবিহি আজমা’ইন আম্মা বা’দ

মহানবীর মহাজীবন ﷺ আমাদের প্রিয় মানুষটির গল্প, তাঁর ভালবাসার গল্প, তাঁর জীবনের গল্প – সহজ ভাষায় – ড. ইয়াসির কাযির লেকচার ও ড. সাল্লাবির বই অনুসারে।   এই সিরিজে ইনশা আল্লাহ্‌ ধারাবাহিকভাবে আমরা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর জীবনি ধীরে-ধীরে, ছোট-ছোট পোষ্টের মাধ্যমে তুলে ধরব।

কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায় – কি বলব রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে? কিভাবে বলব রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে? আমাদের জ্ঞানই বা কতটুকু আর আমাদের সামর্থ্যই বা কতটুকু? সেই ব্যক্তি সম্পর্কে কতটুকুই বা বলা যায় যার খ্যাতিকে সমুন্নত করার মহান দায়িত্ব আল্লাহ্ ﷻ নিজেই নিয়েছেন –

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ (সূরা ইনশিরাহ ৯৪:৪)
উচ্চারণ: ওয়া রফা’না লাকা যিক্‌রক
অর্থ: আর আমি আপনার খ্যাতিকে সমুচ্চ করেছি

এই আয়াতের ব্যাখায় ইবনে আব্বাস(রা) বলেন – মহান আল্লাহ্ ﷻ তাঁর রাসূলের ﷺ খ্যাতিকে এমনই সমুন্নত করেছেন যে যখনই আমরা তাঁর ﷻ নাম উচ্চারণ করি, তার প্রায় সাথে সাথেই তাঁর ﷻ রাসূলের ﷺ নামও উচ্চারণ করি। আমাদের শাহাদায় আমরা বলি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, ঠিক তারপরেই পড়ি “মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ”; আযানে যেই পড়ি “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, ঠিক এর পরেই পড়ি “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ”, নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ﷻ প্রশংসা করি, আর বসে তাঁর রাসূলের ﷺ প্রশংসা করি; নামাজ শেষে আমরা যেমনি আল্লাহর ﷻ যিকর করি, ঠিক তেমনি তাঁর রাসূলের ﷺ উপর দরূদ পাঠ করি।

আল্লাহ্ ﷻ তাঁর নবীর ﷺ মর্যাদা এতটাই সমুচ্চ করেছেন এমন একটা সেকেন্ড নাই যেখানে পৃথিবীর কোন প্রান্তে কেউ না কেউ বলছে “সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম”; আল্লাহ্ ﷻ তাঁর নবীর মর্যাদা এতটাই সমুচ্চ করেছেন তাঁকে ব্যঙ্গ করে একটা কার্টুন ছাপালে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়; আল্লাহ্ ﷻ তাঁর নবীর ﷺ মর্যাদা এতটাই সমুচ্চ করেছেন যে তাঁর ﷺ মৃত্যুর প্রায় ১৫০০ বছর পরেও তাঁকে নিয়েই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী বক্তব্য দেয়া হয়, তাঁকে নিয়েই সবচেয়ে বেশী বই লেখা হয়।

আল্লাহ ﷻ তাঁর রাসূল ﷺ সম্পর্কে আরো বলেছেন –

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৭)
উচ্চারণ: ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রহমাতাল্লিল ‘আলামিন
অর্থ: আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি শুধু রহমত (দয়া) রূপেই পাঠিয়েছি

রাসূল ﷺ নিজে ছিলেন রাহমাহ, আল্লাহ্‌ ﷻ তাঁকে যে বাণী দিয়েছেন তা আমাদের জন্য রাহমাহ, তাঁর ﷺ শিক্ষা আমাদের জন্য রাহমাহ। কিভাবে বুঝব আমি তাঁকে ﷺ ঠিকভাবে অনুসরণ করছি? যখন আমি আমার চারপাশের মানুষের জন্য রাহমাহ হবো বুঝতে হবে শুধু তখনই আমি তাঁকে ﷺ ঠিকমতো অনুসরণ করছি।


(পোষ্ট তারিখ: ১ মে ২০১৬)

[পরের পর্ব: মহানবীর ﷺ বিশেষ বৈশিষ্ট্য – পর্ব ২: মহানবীর ﷺ কিছু নাম]

[মহানবীর ﷺ মহাজীবন সিরিজের লেখাগুলো মূলত: শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার ও ড. সাল্লাবীর সিরাহ বইকে ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।]