আপনি কি মাজহাবী না সালাফী?

rope of allah

২০১৪ সালের কথা। প্রায় ২ বছর পর কানাডা থেকে বাংলাদেশ গিয়েছি। মসজিদে জুম’আর নামাজ পড়তে যেয়ে অবাক হয়ে গেলাম। ইমাম সাহেব তাঁর খুতবার একটা বিশেষ অংশ জুড়ে অত্যন্ত অপ্রাসংগিকভাবে বলতে লাগলেন – “মাজহাব কেন মানতেই হবে?” যারা মাজহাব মানে না তাদের সম্পর্কে তিনি আপত্তিকর ও আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলা শুরু করলেন। আর বক্তব্য শেষ করলেন এই বলে যে – নামাজ শেষে বাসায় যাওয়ার আগে মসজিদের গেটের সামনে থেকে (ইমাম সাহেব বা তাঁর কোনো উস্তাদের লেখা) “মাজহাব কেন মানতেই হবে ?” বইটা অবশ্যই কিনে নিয়ে যাবেন।

ঘটনা এখানেই শেষ না। এই জুম’আয় “মাজহাবী” ইমামের বক্তব্যে বিরক্ত হয়ে পরের জুম’আয় “সালাফী” মসজিদে গেলাম নামাজ পড়তে। এই ইমাম সাহেব খুব সুন্দর কথা বলে খুতবা শুরু করলেন। কিন্তু, একটু পরে যখন অজুর নিয়মাবলী বর্ণনা শুরু করলেন তখন বলে উঠলেন – “আরে হানাফীদের নবী তো মুহাম্মাদ(ﷺ) না, ওদের নবী হচ্ছে আবু হানিফা!” তারপর মাজহাবী আলেমদের খুব করে ঝাড়লেন! “মাজহাবী” ইমামের মতো “সালাফী” ইমাম সাহেবও আমাকে ব্যথিত করলেন।

আমি প্রায় ৫ বছর ধরে কানাডায় আছি। এখানে আমরা যখন নামাজ পড়ি তখন হানাফী, মালিকি, শাফেঈ, হাম্বালী, সালাফী এমনকি শিয়ারা পর্যন্ত একসাথে নামাজ পড়ি – কোনদিন ঝগড়া-ঝাঁটি করি না। ইসলাম তো ঐক্যের কথা বলে, ভ্রাতৃত্বের কথা বলে, মধ্যপন্থী হওয়ার কথা বলে। আমার মনে প্রশ্ন এলো – এই তথাকথিত মাজহাবী/সালাফী বিতর্কের মধ্যম পথটা কোথায়? হাজার বছরের ঐতিহ্য “মাজহাব” বাদ দিয়ে সহীহ হাদিস অনুসরণের পক্ষে সালাফীদের যুক্তি কি? আর মাজহাবীরাই বা কেন সহীহ হাদিস এর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও তাদের ইমামের মত অনুসারে আমল করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হলো এই লেখা।

এই লেখায় আমি দুই পক্ষেরই যুক্তিগুলো তুলে ধরব, অন্য পক্ষের হয়ে সেই যুক্তিকে খন্ডন করব, এবং একটা ঐক্যে আসার চেষ্টা করব। লেখাটি আমি শুরু করব এমন কিছু শর্ত দিয়ে (Common Conditions) যাতে মাজহাবী-সালাফী দুই পক্ষই একমত। এরপর সালাফীদের বিভিন্ন যুক্তি ও সেগুলোর প্রতি-যুক্তি তুলে ধরব। তারপর, মাজহাবীদের বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরব এবং সেগুলিরও প্রতি-যুক্তি দিব। মাজহাবী-সালাফীর এই বিতর্কে একজন মুসলিম হিসাবে আমাদের কি করণীয় – সেই দিকনির্দেশনা দিয়ে লেখাটি শেষ করব।

 

সালাফী-মাজহাবী যেখানে একমত

“মাজহাব” শব্দের অর্থ হলো পথ বা মত। ইসলামী আইনের পরিভাষায়, মাজহাব (School of Thought) হলো এমন কিছু “উসুল” (Set of Principles) যা অনুসরণ করে কোনও কাজের শারঈ’ বিধান (অর্থাৎ হালাল, হারাম, ফরজ, নফল ইত্যাদি) নির্ধারণ করা হয় [৭]।  ইসলামের ইতিহাসে ২০টিরও বেশী মাজহাব এর সন্ধান পাওয়া যার। তার মধ্যে ৪ টি মাজহাব প্রসিদ্ধ। এগুলো হলো – ইমাম আবু হানিফার (মৃত্যু  ১৪৮ হিজরী) দেয়া উসুল অনুসারে হানাফী মাজহাব, ইমাম মালিকের (মৃত্যু ১৭৯ হিজরী) দেয়া উসুল অনুসারে মালিকি মাজহাব, ইমাম শাফেঈর (মৃত্যু ২০৪ হিজরী) দেয়া উসুল অনুসারে শাফেঈ’ মাজহাব ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (মৃত্যু ২৪১ হিজরী)  এর উসুল অনুসারে হাম্বালী মাজহাব। যারা এই মাজহাবগুলোর অনুসরণ করেন তাদেরকে “মাজহাবী” বলা হয়।

“সালাফ” শব্দের অর্থ হলো পূর্বসূরী। ইসলামী পরিভাষায় “সালাফ” বলতে ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মের মানুষকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ, সাহাবারা, তাঁদের পরের প্রজন্ম (তাবিঈ’ন) ও তাঁদের পরের প্রজন্মের (তাবা’ আত-তাবিঈ’ন) সবাই হলেন সালাফ [১৩,১৪]। বর্তমান সময়ে যে সব ইমাম প্রচলিত চার মাজহাবের একটিকে নির্দিষ্টভাবে অনুসরণ না করে, চার মাজহাবের মতামত ও অন্যান্য প্রখ্যাত ইমামের মতামতগুলোকে তুলনা করে যে মতামতটিকে কুরআন  ও সহীহ হাদিসের সাথে সবচেয়ে বেশী সংগতীপূর্ণ মনে করে থাকেন – সেটাকে অনুসরণ করেন তাঁরা নিজেদেরকে “সালাফী” হিসাবে পরিচয় দেন। কারণ, তাঁরা মনে করেন তাঁরা সালাফদের পদ্ধতিতে ইসলাম পালন করেন।

এক মাজহাব থেকে অন্য মাজহাব স্বকীয় হয় তার উসুল (“Set of Principles”) এর কারণে। আবার, “মাজহাব” থেকে “সালাফী তত্ত্ব” স্বকীয়ও হয় তার উসুল (“Set of Principles”) এর কারণে।  মাজহাবী/সালাফীদের মধ্যে আজকে আমরা যতই বিরোধীতা দেখি না কেন, উসুল (“Set of Principles”) সংক্রান্ত নিচের বিষয়গুলোতে দুই পক্ষই কিন্তু একমত:

  1. সর্বোচ্চ মর্যাদা পাবে কুরআন ও সহীহ হাদিস (এদেরকে একত্রে আন-নাস বলে)
  2. এর পর মর্যাদা পাবে ইজমা’ (সাহাবা বা কোনও যুগের সকল আলেমের ঐক্যমত)
  3. উপরের তথ্যগুলির সাহায্যে কোনো বিষয়ের ফিকহ (Islamic Ruling / Understanding) নির্ধারণ না করা গেলে কিয়াস (Analogy) ব্যবহার করা যাবে।
  4. কুরআন ও হাদিসকে সেভাবে বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবী ও সালাফরা বুঝেছিলেন। কারণ, তাঁরা যেহেতু রাসূলুল্লাহ(সা) এর সরাসরি ছাত্র ছিলেন তাই তাঁদের চাইতে ভালো আর কেউ এই বিষয়গুলো বুঝতে পারবে না।  (এই চতুর্থ পয়েন্টটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটা মনের মধ্যে গেঁথে ফেলুন, এই ব্যাপারটা বারে বারে আসবে।)

 

সালাফী-মাজহাবী যেখানে দ্বিমত

মাজহাব এর সাথে সালাফি তত্ত্বের একটা অন্যতম পার্থক্য হলো মাজহাবীদের কাছে তাদের ইমামের মতামতও একটি দলীল [৪]। এর যুক্তি হলো – যেহেতু ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফারা তাবেঈ’দের সরাসরি ছাত্র ছিলেন, কাজেই তাঁরা যদি কোনো মতামত দিয়ে থাকেন সেটা অবশ্যই তাবেঈ’ ও সাহাবাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। কাজেই তাঁদের মতের সমর্থনে শুদ্ধ হাদিস না পাওয়া গেলেও খুব সহজেই তাদের মতামত বাদ দেয়া যাবে না (এ বিষয়ে পরে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)। বরং, তাঁদের মতামতকে বাদ দেয়ার জন্য সেই মত-বিরোধী শক্ত কোনো হাদিস বা অন্য প্রমাণ থাকতে হবে। অন্যদিকে, সালাফীরা সাধারনত শুদ্ধ সনদ (বর্ণনাকারীর ধারা) ছাড়া কোনো হাদিস গ্রহণ করে না।

মাজহাব এর সাথে সালাফি তত্ত্বের আরেকটা পার্থক্য হলো – প্রত্যেক মাজহাবের পক্ষেই গত ১১০০ বছরের হাজার হাজার ইমাম আছেন। শরীয়তের কোনও আদেশ পালনের ক্ষেত্রে কোনও মাজহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের ঐক্যমতকে ঐ মাজহাবের ফিকহ (Understanding) বলা হয়। অন্যদিকে সালাফী মতবাদ শুরু হয়েছে মাত্র দুই-আড়াইশ বছর আগে। ফলে, সালাফী মতবাদের ইমামদের মধ্যে সেরকমভাবে কোনো ঐক্যমত এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি [৭]। যেমন – শাইখুল হাদিস নাসিরুদ্দীন আলবানী মনে করেন একজন মুসলিম নিজেকে “সালাফী” পরিচয় দিতে পারবে, কিন্তু শেইখ উথাইমিন মনে করেন একজন মুসলিম নিজেকে “মুসলিম” হিসাবেই পরিচয় দিবে [২১]। কাজেই, একজন সালাফী ঐতিহাসিক ইমাম-গোষ্ঠির ফিকহ (Understanding) অনুসরণ করে না, সে আধুনিক সময়ের একজন ব্যক্তি-ইমামের ফিকহ অনুসরণ করে। তাই আপনি একজন সালাফীকে বলতে শুনবেন – “আমি নাসিরুদ্দীন আলবানির বই/ফিকহ অনুসারে নামাজ পড়ি”। অন্যদিকে একজন মাজহাবী হয়তো বলবে – “আমি মালিকি মাজহাব অনুসারে নামাজ পড়ি”।

এই দুই মতবাদের আরো পার্থক্য জানার জন্য এই [৭] লেকচারটি শুনতে পারেন।

hold to quran and sunnah

সালাফীদের যুক্তি ও প্রতি-উত্তর

লেখার এই অংশে আমরা সালাফীদের বিভিন্ন যুক্তি [১,২,৩] সম্পর্কে জানবো – কেন তাঁরা মনে করেন মাজহাব বাদ দিয়ে কুরআন আর সহীহ হাদিসের অনুসরণ করতে হবে? একই সাথে আমি সালাফীদের যুক্তিগুলোকে খন্ডন করারও চেষ্টা করব। যুক্তি-খন্ডন করতে যেয়ে আমি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মালিকি মাজহাবের উসুল (“Set of Principles”) কে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করব। কারণ, যুক্তি-খন্ডনের কথাগুলো আমি মূলত: শেইখ হামযা ইউসুফের লেকচার [৪] থেকে নিয়েছি যিনি একজন মালিকি ইমাম।

সালাফী যুক্তি ১: সকল বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে আমাদের কুরআন ও সহীহ হাদিস মানতে হবে। কিন্তু, প্রচলিত মাজহাবগুলোতে আমরা এমন অনেক বিধান দেখি, যেগুলো সহীহ হাদিস বিরোধী। কাজেই মাজহাবের অনুসরণ করা যাবে না।

যুক্তি-খন্ডন: এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের সব ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মানতে হবে। কিন্তু এমন অনেক সুন্নাহ আছে, যা হাদিস আকারে লিপিবদ্ধ হয়নি কিন্তু মদীনার সাহাবাদের মধ্যে সেই সুন্নাহগুলোর প্রচলন ছিল। ইমাম মালিক এই ক্ষেত্রে সহীহ হাদিসের বিপরীতে সাহাবাদের আমলকে প্রাধান্য দিয়েছেন।  যেমন – শুক্রবারে নফল রোযা রাখা যাবে না, এটা সহীহ হাদিস। কিন্তু, ইমাম মালিক মদীনায় তাবেঈ’নদের মধ্যে শুক্রবারে নফল রোযা রাখার প্রচলন দেখেছেন। এই তাবেঈ’নরা সরাসরি সাহাবাদের থেকেই এই আমল শিখেছেন। ইমাম মালিকের মতে, হয়তো পরবর্তীতে “শুক্রবারে নফল রোজা রাখা যাবে না” হাদিসের বিপরীতে “শুক্রবারে নফল রোজা রাখা উচিত” এর হুকুম রাসূলুল্লাহ(সা) দিয়েছিলেন, ফলে আগের হুকুমটি বাতিল (Abrogate) হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ঐ হুকুমটি হাদিস আকারে আমাদের কাছে পৌঁছায়নি, পৌঁছেছে সাহাবাদের আমলের (Practise) মাধ্যমে।  কাজেই, মালিকি মাজহাব অনুসারে শুক্রবারে নফল রোযা রাখা সুন্নাত, যদিও এর বিপরীতে সহিহ হাদিস আছে [৪]! সুতরাং,  চতুর্থ পয়েন্টের  “কুরআন ও হাদিসকে সেভাবে বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবী ও সালাফরা বুঝেছিলেন” – মাজহাবীরা মনে করে এই মূলনীতি সালাফীরা যতটা অনুসরণ করে, তারা তার চেয়েও বেশী অনুসরন করে।

সালাফী যুক্তি ২: মাজহাবগুলো যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন ইমাম বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) ও ইমাম মুসলিমের (মৃত্যু ২৬১ হিজরী) মতো সহীহ হাদিস গ্রন্থগুলো লেখা হয়নি। ফলে, মাজহাবের ইমামরা অনেক সহীহ হাদিস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। অথবা, কোনো হাদিসকে উনারা হয়তো দুর্বল বলে বাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু ঐ হাদিসটি অন্য কোনো সনদে সহীহ ছিল, যা জানা গিয়েছিলো পরবর্তী সময়ে। এই কারণে মাজহাবগুলোতে এমন অনেক মতামত দেখা যায়, যা সহীহ হাদিস বিরোধী।

যুক্তি-খন্ডন: এই যুক্তিটা বিভিন্ন কারণে [৪] দুর্বল। যেমন –

প্রথমত:  হাদিস সংকলন শুরু হয়েছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবিতকালেই। একথা সুপ্রসিদ্ধ যে, আবু হুরাইরা(রা), ইবনে আব্বাস(রা), আমর ইবনুল আস(রা) সহ প্রচুর সাহাবী লিখিত আকারে হাদিস সংরক্ষণ করেছিলেন [১৫]। এই সব কিতাবের হাদিসগুলি পরবর্তী যুগের হাদিসগ্রন্থগুলোর (যেমন – বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ইত্যাদি) মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। তাই, মদীনার সাহাবারা-তাবেঈনরা বুখারী-মুসলিমের হাদিসগুলো জানতেন না, এ কথা অমূলক।

দ্বিতীয়ত: বেশীরভাগ হাদিসের উৎস মূলত মদীনা শহর, আর ইমাম মালিক তাঁর সারাটা জীবন মদীনায় কাটিয়েছেন তাবেঈনদের কাছে পড়াশুনা করে। ইমাম মালিক সরাসরি ৬০০ তাবেঈনের কাছ থেকে হাদিস ও ফিকহ শিখেছেন, আর এই ৬০০ তাবেঈন শিখেছেন সরাসরি সাহাবীদের কাছ থেকে, মদীনায় তখন ১০ হাজার সাহাবী ছিল।  ইমাম মালিক হাদিস শিখেছেন ঐ যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিশাম ইবনে ‘উরওয়া, ইবনে শিহাব আল-যুহরীর মতো বাঘা মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে আহকাম (হালাল-হারাম) সংক্রান্ত হাদিসের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশী নয়। কাজেই, ইমাম মালিক কোনো বিষয়ের আহকাম সংক্রান্ত সহীহ হাদিসগুলো জানতেন না এই সম্ভাবনা খুবই কম।

তৃতীয়ত: যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে ইমাম মালিক ১০%-১৫% সহীহ হাদিস জানতেন না, তবুও আপনি বলতে পারবেন না যে, মালিকি মাজহাব সহীহ হাদিস এর উপর আমল করে না। এর কারণ হলো, আমরা আগেই বলেছি “মাজহাব” বলতে বুঝায় “উসুল” বা Set of Principles, মাজহাব বলতে কোনো নির্দিষ্ট শারঈ’ বিধানকে বুঝায় না। ইমাম মালিকের মৃত্যুর পর থেকে যখনই নতুন কোনো হাদিস পাওয়া গেছে তখনই মালিকি মাজহাবের আলেমরা সেই নতুন হাদিসের আলোকে তাঁদের বিধানে পরিবর্তন এনেছেন, কিন্তু ইমাম মালিকের দেয়া “উসুল” অনুসরণ করেছেন। একই ব্যাপার অন্য মাজহাবগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন – ইমাম আবু হানিফার ছাত্র শাইবানী (মৃত্যু ১৮৯ হিজরী) বহু ক্ষেত্রে নতুন হাদিসের আলোকে ইমাম আবু হানিফার মতের বিরোধী মতামত দিয়েছেন। কিন্তু, তারপরেও ইমাম শাইবানী হানাফী মাজহাবের অনুসারী, কারণ তিনি ইমাম আবু হানিফার “উসুল” অনুসরণ করেছেন। গত ১১০০ বছর ধরে বিভিন্ন মাজহাবের আলেমরা এভাবে করেই নতুন পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে তাঁদের মতামতে পরিবর্তন এনেছেন।

উল্লেখ্য যে, হানাফী মাজহাবের উসুল অনেক অংশেই নেয়া হয়েছে কুফার সাহাবাদের কাছ থেকে [২৮]। আলী(রা) তাঁর খিলাফত মদীনা থেকে কুফায় সরিয়ে নেয়ার পর, বহু সংখ্যক সাহাবী কুফায় চলে আসেন। আলী (রা) সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদকে কুফার কাজী নিযুক্ত করেন। আর কুফার সাহাবীদের উসুলই হানাফী মাজহাবের উসুল।

সালাফী যুক্তি ৩: মাজহাবগুলি তাদের ইমামের মতামত এর বিপরীতে সহীহ হাদিস পাওয়া যাওয়ার পরেও সহীহ হাদিসের অনুসরণ না করে তাদের ইমামের মতামতকে অনুসরণ করে। কিন্তু, সকল মাজহাবের ইমামই কি বলেননি “সহীহ হাদিসই আমার মাজহাব”?

উত্তর: প্রত্যেক ইমামই যথাসাধ্য সহীহ হাদিস অনুসরণ করেছেন এবং সেই মাজহাবের আলেমরাও সবসময় সহীহ হাদিসের ভিত্তিতেই বিধান দিয়েছেন। কিন্তু, আমাদের মনে রাখতে হবে যে সহীহ হাদিসকে সেভাবেই বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছিলেন (৪ নং পয়েন্ট)। এমন বহু সহীহ হাদিস আছে যেগুলো অন্য সহীহ হাদিস বা কুরআনের আয়াত দ্বারা অবলুপ্ত (Abrogate) হয়ে গেছে, আবার এমনও সহীহ হাদিস আছে যেগুলো ১০০% সত্য হওয়ার পরেও সাহাবারা সেগুলির উপর আমল করতেন না, কেন করতেন না সেটা আমাদের অনেক ক্ষেত্রে জানা আছে, অনেক ক্ষেত্রে জানা নেই।

আসুন মালিকি মাজহাব থেকে একটা উদাহরণ দেখা যাক। ইমাম মালিক তার মুওয়াত্তায় নামাজে দাড়িয়ে হাত বুকে রাখতে হবে এই সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু, ইমাম মালিকই তাঁর মাজহাবে হাত ছেড়ে নামাজ পড়তে বলেছেন। কেন? কারণ, ঐ যে – “হাদিস বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা তা বুঝেছিলেন”। ইমাম মালিক মদীনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ তাবেঈ’নদের হাত ছেড়ে নামাজ পড়তে দেখেছেন, তাবেঈনরা এটা দেখেছেন মদীনার সাহাবাদের কাছ থেকে। ইমাম মালিকের এই মতের পক্ষের হাদিসও কিন্তু বুখারী শরীফেই আছে [২৩,২৪,২৫]। বর্ণিত হাদিসটিতে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) একজন সাহাবীকে শিখিয়েছেন কিভাবে নামাজ পড়তে হবে, কিন্তু তিনি তাকে হাত বাঁধার কথা বলেননি।  মালিকি মাজহাবের মতে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কখনো কখনো হাত বেঁধে নামাজ পড়েছেন এটা দেখানোর জন্য যে, ইচ্ছা করলে এভাবেও নামাজ পড়া যায়। উল্লেখ্য, অনেকে বলে থাকে যে, ইমাম মালিক মৃত্যুর আগের শেষ কয়দিন “হাতে ব্যথা থাকার কারণে” হাত না বেঁধে নামাজ পড়তেন – এই কথার কোনও ভিত্তি নেই [৪]।

আবার অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে যে, অনেক সুন্নাহ/হাদিস আছে যা সালাফদের জানা ছিল, কিন্তু সেই সুন্নাহটি সহীহ হাদিস আকারে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে নাই। কারণ, ইমাম বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) বা ইমাম মুসলিম (মৃত্যু ২৬১ হিজরী) যেহেতু মাজহাবের ইমামদের প্রায় ৫০/৬০ বছর পর হাদিস সংগ্রহ শুরু করেছেন, এমন হতেই পারে – যে হাদিসটি ইমাম মালিক বা ইমাম আবু হানিফার কাছে সহীহ ছিল, তা বুখারী-মুসলিমের যুগে আসতে আসতে যইফ (দুর্বল) হয়ে গেছে। কিন্তু, মাজহাবের ইমামরা সেই সুন্নাহ সম্পর্কে সহীহ সনদে অবগত ছিলেন এবং সেই অনুসারে তাদের মাস’আলা দিয়েছেন।

“হাদিসের এ সকল গ্রন্থ সংকলিত হওয়ার পূর্বে যে সব ইমাম অতিক্রান্ত হয়ে গেছেন তাঁরা পরবর্তীদের চেয়ে অনেক বেশী হাদিসের জ্ঞান রাখতেন। কারণ, তাঁদের নিকটে এমন বহু হাদিস ছিল যা আমাদের পর্যন্ত মাজহুল (অজ্ঞাত) বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন) সনদে পৌঁছেছে কিংবা আদৌ পৌঁছেনি”।  (রাফউল মালাম আনিল আয়িম্মাতিল আ’লাম – ইবনে তাইমিয়াহ – পৃষ্ঠা ১৮। [১৯]

সালাফী যুক্তি ৪: সাহাবাদের তো কোনো মাজহাব ছিল না, আপনারা মাজহাব পেলেন কোত্থেকে?

যুক্তি-খন্ডন: আমরা আগেই বলেছি কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে বিধান দেয়ার “উসুল” (Set of Principles) কেই মাজহাব বলে। সাহাবীরাও কিছু “উসুল” অনুসরণ করেই বিধান দিতেন। একথা সুবিদিত যে মদীনার সাহাবাদের “উসুল” (Set of Principles) , কুফার সাহাবাদের “উসুল” (Set of Principles)  থেকে আলাদা ছিল [৪,৭]।

আর আপনি যদি সাহাবাদের পদ্ধতিই অনুসরণ করতে চান তাহলে আমি বলব সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে ইমাম মালিকের মাজহাব অনুসরণ করা। কারণ, ইমাম মালিকের জীবদ্দশায় এই মাজহাবের নাম কিন্তু মালিকি মাজহাব ছিল না, এর নাম ছিল “মাদানী মাজহাব”, কারণ মদীনার সাহাবী ও তাবেঈনরা এই “উসুল” অনুসরণ করতেন। ইমাম মালিক শুধু সেই “উসুল” কে একটা সিস্টেম এর মধ্যে এনে লিপিবদ্ধ করে একে মাজহাব এর রূপ দিয়েছেন।

সালাফী যুক্তি ৫: সব মাজহাব যদি একই কুরআন আর সুন্নাহ এর অনুসরণ করে থাকে, তাহলে এদের বিধানগুলো এত আলাদা কেন?

যুক্তি-খন্ডন: একই কুরআন – সুন্নাহ অনুসরণ করার পরেও বিধান আলাদা হয় আলাদা “উসুল” [৪,৬,১৯] এর কারণে। “উসুল” এর এই পার্থক্যের কিছু উদাহরণ দেখুন –

  • ইমাম মালিক মুরসাল হাদিস (যে হাদিস সাহাবা নয় বরং তাবেঈ’ থেকে বর্ণিত হয়েছে) গ্রহণ করেছেন, আর ইমাম শাফেঈ’ শুধু নির্দিষ্ট কিছু তাবেঈ’র মুরসাল হাদিস নিয়েছেন।
  • ইমাম মালিক মদীনার তাবেঈ’দের আমলকে সহীহ হাদিসের বিপরীতে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি হলো – যে মদীনার মাটিতে ১০ হাজার সাহাবা শুয়ে আছেন, সেই মদীনার সাহাবা ও তাবেঈ’দের আমল সহীহ হাদিসের চাইতেও শক্ত দলীল (আবার সেই ৪ নং পয়েন্ট)। কারণ, হাদিস বুঝার ক্ষেত্রে আমাদের চাইতে তাঁদের জ্ঞান নি:সন্দেহে বেশী ছিল।
  • কিছু মুতাওয়াতির হাদিস (যে হাদিস তার সনদের প্রত্যেক স্তরে বহু মানুষ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে) আছে যেগুলি কুরআনের আয়াতের সাথে আপাত: দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক (Apparently Conflicting)। এই ক্ষেত্রে কি কুরআনের আয়াত নেয়া হবে নাকি হাদিসকে নেয়া হবে – তা নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একেক মাজহাব এক্ষেত্রে একেকটাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
  • যদি কোনও আহাদ হাদিস (যে হাদিসের সনদের  প্রতিটা স্তরে তিনজনের বেশী বর্ণনাকারী পাওয়া যায় না) কুরআনের কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে হানাফী মাজহাব হাদিস সহীহ হওয়া সত্ত্বেও, সেটা না নিয়ে কিয়াস ব্যবহার করে। এটা একটা কারণ যার ফলে আমরা হানাফী মাজহাবে সহীহ হাদিস বিরোধী এত আহকাম (Islamic Ruling) দেখতে পাই।
  • কোন্‌ হাদিসগুলো ‘আম (General), আর কোন্‌ হাদিসগুলো খাস (Specific/Exception) – এই বিষয়ে ইমামদের মতপার্থক্যের কারণেও ফিকহী পার্থক্য হয়।
  • অন্যদিকে হাম্বালী ও সালাফীরা হাদিসকে আক্ষরিক ভাবে মেনে চলেন, ফলে আমরা হাদিসের কিতাবগুলিতে যে হাদিসগুলি পাই, সেগুলোর সাথে এই মাজহাবগুলোর সরাসরি মিল সবচেয়ে বেশী।

আবু-বকর(রা) ও উমার(রা) এর মতপার্থক্য [২৯]: “উসুল” এর এই ধরনের পার্থক্য সাহাবাদের সময় থেকেই ছিল, আর তাবেঈনদের মধ্যে তো ছিলই। দুইজন সম্পূর্ন ভিন্ন বিধান এর অনুসারী হয়েও দুইজনেই সঠিক হতে পারে, যদি তাদের নিয়ত হয় আল্লাহর ﷻ হুকুমকে মনে চলা। শ্রেষ্ঠ দুই সাহাবী আবু বকর(রা) ও উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) অসংখ্য বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করতেন, তারপরেও তারা দুইজনেই রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে নিঁখুতভাবে অনুসরণ করেছেন [২৭]। যেমন – আবু বকর(রা) এর খিলাফতকালে সাহাবীদের যে ভাতা দেয়া হতো, তা সকল সাহাবার জন্য সমান অংকের ছিল। আবু বকর(রা) এর যুক্তি ছিল – মহান আল্লাহ ﷻ কুরআনে বলেছেন যে তিনি সকল সাহাবার উপরই সন্তুষ্ট (http://quran.com/9/100) , তাই তাঁরা সবাই সমান ভাতা পাবেন।

অন্যদিকে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) খলীফা হওয়ার পরেই এই নিয়মের পরিবর্তন করলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যারা ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে তা গ্রহন করেছে, তারা যে কষ্ট সহ্য করেছে সেই তুলনায় যারা পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তারা অনেক কম কষ্ট সহ্য করেছে, ফলে তাদের মর্যাদাও কম। কে কত আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে এর ভিত্তিতে তিনি ভাতার স্কেল নির্ধারণ করেন। এখানে আবু বকর(রা) ও উমার(রা) এর মতামত সম্পুর্ণ বিপরীত – কিন্তু তাঁরা দুইজনেরই নিয়ত ছিল রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে  নিঁখুতভাবে অনুসরণ করা। সাহাবাদের জীবন ঘাঁটলে এরকম অগুনতি পরষ্পর-বিরোধী মতামত পাওয়া যায় [২৭]। কিন্তু, যেহেতু তাঁদের প্রত্যেকেরই নিয়ত শুদ্ধ ছিল, কাজেই যিনি যে বিধান অনুসরণ করেছেন, তাঁর জন্য সেটাই শুদ্ধ ছিল।

সালাফী যুক্তি ৬: শাফেঈ’ মাজহাব বলে অজু করে স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকে না, হানাফী মাজহাব বলে অজু থাকে। কিন্তু, দুইটা তো একই সাথে সঠিক হতে পারে না। তার চাইতে যে মতামতটা অধিকতর সঠিক সেটা অনুসরণ করাই কি উচিত না?

যুক্তি-খন্ডন: প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক মাজহাব তাদের “উসুল” (Set of Principles) অনুসারে যেটা সবচেয়ে সঠিক সেটাই বেছে নিয়েছে। “স্ত্রীকে স্পর্শ করলেও অজু থাকে” – হানাফী মাজহাবে এটাই সঠিক। কারণ, আবু দাউদের সহীহ হাদিসে আছে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) অজু করার পর আয়েশা(রা) কে স্পর্শ করা সত্ত্বেও আবার অজু না করেই নামাজ পড়েছেন। অন্যদিকে, শাফেঈ’ মাজহাব এর মতে  “স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকে না ” –  এটাই সঠিক (এই বিষয়ে শাফেঈ মাজহাবের বিস্তারিত প্রমাণের জন্য এই লেখাটি পড়ুন)। কারণ, তাদের মতে সূরা মায়িদার ৬ নং আয়াতে আল্লাহ ﷻ বলেছেন – “স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকবে না” এবং এই আয়াতটি আবু দাউদের হাদিসের উপর প্রাধান্য পাবে, ফলে আবু দাউদের হাদিসের বিধানটি অবলুপ্ত (Abrogate) হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। কাজেই, আপনি যদি বলে থাকেন ইমাম আবু হানিফা এর মতামত এক্ষেত্রে ইমাম শাফেঈ’র মতামতের চেয়ে বেশী সঠিক, তাহলে আপনি আসলে বলছেন যে সেটা আপনার “উসুল” অনুসারে বেশী সঠিক।

সালাফী যুক্তি ৭: আব্বাসীয় শাসন আমলে এরকম ফতোয়া ছিল যে, হানাফীরা শাফেঈদের বিয়ে করতে পারবে না। শুধু তাই না, দামেস্ক ও মক্কায় চার মাজহাবের জন্য চারটি পৃথক মিহরাব ছিল এবং তারা ভিন্ন ভিন্ন জামাতে নামাজ পড়ত। কাজেই, এভাবে করে মাজহাব কি মুসলিম উম্মাহ এর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে নাই?

উত্তর: মাজহাব নিয়ে এ ধরনের বাড়াবাড়ি অতীতে হয়েছে একথা সত্য এবং মাজহাবের নামে মুসলিম উম্মাহর এইরকম বিভক্তি মোটেও কাম্য নয় [৪]। কিন্তু, আপনি যখন জানবেন কেন এরকম করা হয়েছিল, তখন পুরো বিষয়টাকে ভিন্ন দৃষ্টিভংগীতে দেখতে পারবেন।

হানাফী আর শাফেঈ’রা একে অপরকে বিয়ে করতে পারবে না —এই ফতোয়া এই জন্য দেয়া হয়েছিল যে, দুইটি ভিন্ন মাজহাবের বিয়ে সংক্রান্ত বিধি-বিধানগুলো ভিন্ন হওয়ায়, একজন মুফতীর পক্ষে কিছু কিছু ব্যাপারে মতামত (Islamic Ruling) দেয়া কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেমন – এক মাজহাব মনে করে ডিভোর্সের জন্য একবার তালাক বলতে হবে, আর আরেক মাজহাব মনে করে ডিভোর্সের জন্য তিনবার তালাক বলতে হবে।  স্বামী-স্ত্রী দুইজন যদি দুই ভিন্ন মাজহাবের মানুষ হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, কোন্ মাজহাব অনুসারে তাদের মামলা পরিচালনা করা হবে? এই ধরনের ঝামেলা এড়ানোর জন্য তখনকার মুফতিরা “এক মাজহাবের মানুষ অন্য মাজহাবের মানুষকে বিয়ে করতে পারবে না” – জাতীয় উদ্ভট ফতোয়া দিয়েছিল, যেটা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। তাদের উচিত ছিল কিভাবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখা যায় তা নিয়ে চিন্তা করা [৪]।

মক্কায় আর দামেস্কে চার মাজহাবের জন্য চার মিহরাব স্থাপন হলো মাজহাব-সন্ত্রাসের এক চরম উদাহরণ, যা অস্বীকার করার উপায় নাই [৪]। কিন্তু এর দোষ আপনি মাজহাবকে দিতে পারেন না, এর জন্য দোষ দিতে হবে মানুষের চরমপন্থী চিন্তাভাবনাকে। চরমপন্থী চিন্তা-ভাবনা সব সময়ই খারাপ, তা সে মাজহাব নিয়েই হোক, সালাফীবাদ নিয়েই হোক আর নাস্তিকতা নিয়েই হোক। মাজহাবী চরমপন্থার যে উদাহরণ আপনি দিচ্ছেন, সেই একইরকম উদাহরণ নাস্তিকেরা ব্যবহার করে এটা প্রমাণ করার জন্য যে “ধর্ম খারাপ”। কারণ, ধর্মের কারণে আগের শতাব্দীগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। কিন্তু, ভেবে দেখুন আগের শতাব্দীর সেই গণহত্যাগুলোর জন্য কি ধর্ম দায়ী নাকি মানুষের চরমপন্থী চিন্তা-ভাবনা আর অন্য মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা দায়ী?

সালাফী যুক্তি ৮: রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন সেভাবে নামাজ পড় যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখ, তারপরেও মাজহাবীরা সহীহ হাদিসের বিপরীতে নামাজ পড়ে  কেন?

উত্তর: লক্ষ্য করুন – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখ” (বুখারী)। মাজহাবীদের মতে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর মতো করে নামাজ পড়ার দাবী যতটা ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফা করতে পারেন, শাইখুল হাদিস আলবানী ততটুকু করতে পারেন না [৪]। কারণ, ইমাম আবু হানিফা নামাজের মাস’আলা নিয়েছেন মূলত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ এর ছাত্রদের থেকে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ মক্কার প্রথম ১০ জন ইসলাম গ্রহনকারীদের একজন যিনি দীর্ঘ ২০ বছর রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়েছেন। সাহাবারা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে নামাজ পড়তে “দেখেছেন”, আবার তাবেঈ’রা সাহাবাদের নামাজ পড়তে “দেখেছেন”। আপনাকে স্বীকার করতে হবে – কোন কিছু “পড়ে শেখার” চেয়ে উস্তাদের কাছ থেকে সরাসরি “দেখে শিখলে” ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

অন্যদিকে, ইমাম মালিক তাঁর নামাজের মাস’আলাগুলো নিয়েছেন [৪] প্রধানত: আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার(রা) এর ছাত্র ও মুক্তিকৃত দাস নাফি’ (মৃত্যু ১১৭ হিজরী) থেকে, আর নাফি’ নিয়েছেন আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার(রা) থেকে, যিনি সব সাহাবীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে সবচেয়ে অনুকরণ বেশী করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) সেই ধরনের জুতা পড়তেন যা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন, ঠিক একই কাপড় পড়তেন যা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন। তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব যে উনি নামাজ পড়তেন যেভাবে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন না? ইমাম বুখারী নিজে “ইমাম মালিক -> নাফি’ -> আব্দুল্লাহ ইবনে উমার -> রাসূলুল্লাহ(ﷺ)” এর সনদ কে “স্বর্ণালী সনদ” (সিলসিলাতুল যাহাব / The Golden Chain of Narrators) বলে আখ্যায়িত করেছেন।     এখন আপনিই বলেন – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কিভাবে নামাজ পড়েছেন, সেই নামাজ কি ইমাম মালিক বেশী বলতে পারবেন, না ১৪০০ বছর পরের কোনও আলেম সঠিকভাবে বলতে পারবে?

আমাদের মনে রাখতে হবে, কিছু কিছু সুন্নাহ আছে যেগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়নি। সাহাবারা, তাবেঈ’রা  অনেক সুন্নাহই সংরক্ষণ করেছেন তাদের কাজের (Practise) মাধ্যমে। আর মাজহাবের ইমামরা অনেক ক্ষেত্রেই সহীহ হাদিসকে বাদ দিয়ে সালাফদের কাজকে (Practise) প্রাধান্য দিয়েছেন। এর কারণ হলো সেই ৪ নং পয়েন্ট – “হাদিস বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছিলেন”। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় – মালিকি মাজহাবে “রাফ’উল ইয়াদাইন” করা হয় না। যদিও ইমাম মালিক রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস সম্পর্কে জানতেন। ইমাম মালিকের মতামত হচ্ছে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) মাঝে মধ্যে রাফ’উল ইয়াদাইন করে দেখিয়েছেন যে, নামাজের যে কোনো আল্লাহু আকবারের সাথে চাইলে হাত তোলা যায়, এটা মাকরুহ নয়। এই মতামতের পিছনে যুক্তি কি? এর যুক্তি হলো – রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবা আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) নিজেই নামাজে রাফ’উল ইয়াদাইন করতেন না, কাজেই এর থেকে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ(ﷺ)ও সাধারণত রাফ’উল ইয়াদাইন করতেন না। তাই, ইমাম মালিক রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস জানা সত্ত্বেও তার পক্ষে মত দেননি।

আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয় যে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কিন্তু বলেছেন – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে পড়তে দেখ” (বুখারী), তিনি বলেননি – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নিয়ে লেখা হয়েছে”।  উপরে বর্ণিত কারণে – এই “দেখার” ব্যাপারটা কেউ যদি দাবী করতে পারে তবে সেটা ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফারা যতটুকু করতে পারেন, ১৪০০ বছর পরের কেউ ততটুকু করতে পারবে না।

 the four imams

মাজহাবীদের যুক্তি ও প্রতি-উত্তর

মাজহাবী যুক্তি ১: কেউ যদি নির্দিষ্ট কোনো মাজহাব অনুসরণ না করে, তাহলে সে বিভিন্ন মতামত থেকে তার যেটা পছন্দ হবে শুধু সেটা বেছে নিবে। ফলে ধর্মীয় বিধানগুলি সে তার খেয়ালখুশী মতো পালন করবে। কাজেই, একজন মুসলিমকে সবসময় নির্দিষ্ট একটি মাজহাবই অনুসরণ করতে হবে।

যুক্তি-খন্ডন: কেউ যদি তার ইচ্ছা মতো চলার জন্য সব ক্ষেত্রে প্রত্যেক মাজহাবের সবচাইতে সহজ বিধানটা নেয়া শুরু করে, তাহলে সে অবশ্যই ভুল করবে কারণ, “মুসলিম” সে-ই যে আল্লাহর ﷻ ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এই ব্যক্তি চাচ্ছে ইমামদের মত পার্থক্যকে নিজের বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার মাধ্যমে কার্যত নিজের দ্বীনকে ধ্বংস করতে।

তবে এর মানে এটাও নয় যে, তাকে চার মাজহাবের একটিকে বেছে নিতেই হবে এবং সবসময় সেটাকেই মানতে হবে। কোনও বিষয়ে বিভিন্ন মতামত সম্পর্কে জানার পর কোনো ব্যক্তির কাছে যদি নির্দিষ্ট একটি মতামতকে অন্য মতামতের চাইতে বেশী সঠিক মনে হয়, তাহলে তার জন্য ঐ নির্দিষ্ট মতামতকে মানার মধ্যে দোষের কিছু নেই। মালিকি মাজহাবের ইমাম শাতিবী বহু ক্ষেত্রে শাফেঈ’ মাজহাব এর মতামতকে অনুসরণ করতেন এবং শিক্ষা দিতেন [৪]। হানাফী মাজহাবের  উসুলের একটি পয়েন্টই হলো যে, যদি কোনো বিষয়ে তাদের মাজহাবের ভিতর কোনো গ্রহণযোগ্য মতামত না পাওয়া যায়, তাহলে মালিকি মাজহাবের মতামত অনুসরণ করা।

এমন কি অনেক ক্ষেত্রে যদি এমন হয় যে, কোনো বিষয়ে আপনার দুইটি মতামত জানা আছে যার দুইটিই কুরআন- সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত,  কিন্তু একটি মতামত সহজ আর আরেকটি কঠিন, এবং পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আপনার পক্ষে কঠিন মতামতটি পালন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে, এই ক্ষেত্রেও আপনি সহজ মতামতটি অনুসরণ করতে পারেন (একে “তালফিক” বলে) [১১] । কারণ – আয়েশা(রা) বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ(ﷺ)কে দুইটা হালাল কাজের মধ্যে বেছে নিতে হলে তিনি সহজটাকে বেছে নিতেন”।  একথা সুবিদিত যে – তাবেঈ’রা কঠিন ফতোয়ার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) এর কাছে যেতেন আর সহজ ফতোয়ার জন্য যেতেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এর কাছে [৪,৭]।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কঠিন মতামতের বিপরীতে সহজ মতামত গ্রহণ করার প্রচলন সাহাবা ও তাবেঈ’দের মধ্য থেকেই প্রচলিত। কাজেই কোনও বিষয়ে কোনও ব্যক্তি নিতান্ত অপরাগ হয়ে থাকলে, সহজ মতামত অনুসরণ করা যেতে পারে।

মাজহাবী যুক্তি ২: আমরা যদি ইসলামের গত ১১০০ বছরের ইতিহাস দেখি তাহলে এমন কোনো আলেম পাবো না, যিনি মাজহাব অনুসরণ করেননি। কাজেই, আমাদেরকেও চার মাজহাবের এক মাজহাব অনুসরণ করতেই হবে।

যুক্তি-খন্ডন: একথা সত্য যে, গত ১১০০ বছরের যত বিখ্যাত আলেম ছিলেন তাদের সবাই কোনো না কোনো মাজহাবের অনুসারী ছিলেন।  যেমন –

হানাফী মাজহাব – শায়বানী, আবু ইউসুফ, তাহাউই, মোল্লা আলি কারি

মালিকি মাজহাব – ইবন রুশদ, কাদি ইবনুল ‘আরাবী, ইবনে আব্দুল বার, কুরতুবী, শাতিবি

শাফেঈ মাজহাব – ইবনে সালাহ, ইমাম নাবাউই, ইবনে হাজার আসকালানী, ইবনে কাথির, আস-সুয়ূতি, গাজ্জালি

হাম্বালী মাজহাব – ইবনে তাইমিয়াহ, ইবনে কুদামা, ইবনে রজব, ইবনুল কাইয়ূম, ইবনে জাউযি

কিন্তু, লক্ষনীয় যে, এই সব ইমামরা প্রত্যেকেই বহু ক্ষেত্রে তাদের মাজহাব যে মতামত বলে সেই মতামতের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।  শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ, ইমাম শাতিবি সহ অনেক ইমাম অনেক ক্ষেত্রে নিজের মাজহাবের “উসুল” এর বিপরীতে এমন কি অন্য মাজহাবের উসুল পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন [৪,৭]। কাজেই, একজন মানুষকে সব সময় সব বিষয়ে একটা মাজহাবেরই সব বিধান মেনে চলতে হবে তা ঠিক না।

তবে আলেমরা বলেন – কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে (Domain) একই মাজহাবের/ইমামের বিধি-বিধান মেনে চলা উচিত [৪,৭,১১,২৬]। যেমন – আপনি যদি সিদ্ধান্ত নেন: আপনি শাইখুল হাদিস নাসিরুদ্দীন আলবানীর ফিকহ অনুসারে নামাজ পড়বেন, তাহলে পুরো নামাজ উনার ফিকহ অনুসারেই পড়ুন। কিছু অংশ আলবানী এর ফিকহ অনুসারে আর কিছু অংশ হানাফী মাজহাব অনুসারে পড়বেন এটা ঠিক নয়। আবার যদি সিদ্ধান্ত নেন, আপনি রোজা রাখার ক্ষেত্রে হানাফী মাজহাব অনুসরণ করবেন, তাহলে রোজার সব বিধি-বিধান হানাফী মাজহাব অনুসারেই পালন করুন, এর সাথে অন্য কোনো মাজহাবকে মেলাবেন না।  কেন? কারণ, একই বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবের সংমিশ্রণ ঘটলে দ্বীন নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উদারহরণস্বরুপ [৪,১১] বলা যায় – হানাফী মাজহাবে বিয়ের জন্য ওয়ালী লাগে না, মালিকি মাজহাবে সাক্ষী লাগে না, আর কোনো কোনো ইমামের মতে মোহর এর পরিবর্তে ‘ইলম শিক্ষা দিলেও চলে। কাজেই, কেউ যদি তার বিয়েতে সব মাজহাবের সবচেয়ে সহজ বিধানটি বেছে নেয়, তাহলে কার্যত সে কোনো শর্ত ছাড়াই, অর্থাৎ কোনো ওয়ালী, সাক্ষী, সম্পদের মোহর ছাড়াই বিয়ের নাম করে ব্যভিচার করতে পারবে। এর জন্য, আলেমরা এই বিষয়ে একমত যে, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবের সংমিশ্রন করা যাবে না।

মাজহাবী যুক্তি ৩: কেউ যখন মাজহাব অনুসরণ করে, তখন সে ঐ মাজহাবের হাজার হাজার ইমাম যে ব্যাপারে ঐক্যমত প্রকাশ করেছে তা অনুসরণ করে। অন্যদিকে, কেউ যখন ঐ মাজহাবগুলোর বাইরে যেয়ে কোনো সালাফী ইমামের মতামত (Islamic Ruling) গ্রহণ করে তখন সে হাজার ইমামের বিপরীতে একজন ব্যক্তি ইমামকে অনুসরণ করে। হাজার হাজার ইমামের মতামতের বিপরীতে একজন ইমামের মতামত গ্রহণ করা সঠিক হতে পারে না। এ কারণে, চার মাজহাবের অনুসরণ না করে কোনো সালাফী ইমামের অনুসরণ করা ঠিক নয়।

যুক্তি-খন্ডন:  এই চিন্তাটা আসলে নতুন কিছু না। শুনতে আশ্চর্য মনে হলেও ইসলামের ইতিহাসের বেশ কিছু বাঘা-বাঘা আলেম এই মত দিয়েছেন যে চার মাজহাবের বাইরে অন্য কোনো মাজহাব অনুসরণ করা যাবে না [৭,২৬]। তাদের যুক্তি হলো – এই চার মাজহাবের মতামতগুলি যেভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই মাজহাবগুলোর হাজার-হাজার আলেম মিলে বিশ্লেষণ (Analysis) করেছেন, এই চার মাজহাবের বাইরের মতামতগুলো নিয়ে সেভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। যেহেতু এগুলোকে নিয়েই সবচেয়ে বেশী সংখ্যক বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং প্রত্যেক মাজহাবের হাজার হাজার ইমাম সেই মাজহাবের ফিকহ (Islamic Ruling) গুলোকে সমর্থন করেছেন, কাজেই এই মাজহাবগুলোর বাইরে অন্য মত অনুসরণ করা ঠিক হবে না। ইমাম নাবাউই ও ইবনে সালাহ এরকম মনে করতেন। আর ইবনে রজব তো এই বিষয়ে একটি পুস্তিকা পর্যন্ত লিখেছেন। কিন্তু, ইবনে তাইমিয়াহ সহ বহু আলেম এই মতের বিরোধীতা করেছেন। তাদের মতে, বহু সংখ্যক আলেমের বিপরীতে কম সংখ্যক আলেমের মতামত কখনো কখনো শুদ্ধ হতে পারে [৭]।

বহু সাহাবার মতের বিপরীতে একজন সাহাবীর মত: রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর সিরাহ থেকে আমরা এরকম উদাহরণ পাই যেখানে অনেক সাহাবার ঐক্যমতের বিপরীতে একজন সাহাবীর মতামত শুদ্ধ ছিল। মক্কা বিজয়ের ঠিক আগে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) “যাতুস সালাসিল” [২৯] অভিযানে সবাই কে অবাক করে দিয়ে ‘আমর বিন ‘আসকে নেতৃত্বে দেন, যিনি মাত্র ২ মাস আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অভিযানের কোনো এক রাতে ঘুমের মধ্যে ‘আমর ইবনে ‘আস এমন স্বপ্ন দেখেন যার ফলে তাঁর ফরজ গোসল করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু, তিনি ফজরের নামাজের সময় তিনি প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করেন। তাঁর যুক্তি ছিল – এত ঠান্ডার মধ্যে গোসল করলে তিনি ভয়াবহ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন, এমনকি মারাও যেতে পারেন। আর আল্লাহ কোরআনে মানুষকে বলেছেন – নিজেকে হত্যা কোরো না (http://quran.com/4/29)।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে বাকী সাহাবারা ‘আমর এর ইমামতিতে নামাজ পড়তে অস্বীকৃতি জানাতে শুরু করেন (পরে অবশ্য ঐক্যের কথা বিবেচনা করে তাঁরা ‘আমর এর পিছনেই নামাজ পড়েন)। কারণ তাদের কথা হলো – ঠান্ডার অজুহাতে তায়াম্মুম করা যাবে না, তায়াম্মুম শুধু তখনই করা যায় যখন পানি পাওয়া যায় না। নতুন সাহাবী ‘আমর এর বিপরীত ক্যাম্পে কারা ছিলেন জানেন? ছিলেন – আবু বকর(রা), উমার (রা) এবং আবু উবাইদাহ বিন জাররাহ এর মতো সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবারা।  কিন্তু, অভিযান শেষে যখন সাহাবারা ফিরলেন তখন রাসূলুল্লাহ(ﷺ) জানালেন – কেউ যদি এমন ভয় করে যে পানি স্পর্শ করলে তার মৃত্যু হবে বা ভয়াবহ অসুখ হবে তাহলে সে ফরজ গোসল না করে তায়াম্মুম করতে পারে! সুতরাং, দেখা যাচ্ছে শত শত সর্বোচ্চ মর্যাদার সাহাবার বিপরীতে একজন মাত্র সাহাবার মতামতও সঠিক হতে পারে।

মাজহাবী যুক্তি ৪: সালাফী মতবাদ শুরু হয়েছে মাত্র ২০০-২৫০ বছর আগে। এর আগের হাজার বছর ধরে মাজহাবীরাই ইসলামকে সংরক্ষণ করে এসেছে। কাজেই, নতুন করে আর সালাফী মতবাদ প্রচারের দরকার কি? তার চেয়ে তো আগের চার মাজহাবই ভালো ছিল।

যুক্তি-খন্ডন: বর্তমানে আমরা যে সালাফী মুভমেন্ট দেখি, যেখানে মাজহাব অনুসরণ না করে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহকে অনুসরণ করতে বলা হয়, আমরা যদি এর ইতিহাসের দিকে তাকেই তাহলেই এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারব [৯]। বর্তমানে আমরা যদিও সালাফী বলতে মূলত সৌদি-আরব/মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় এর আলেমদের বুঝি। কিন্তু, যে তিনজন ব্যক্তির হাত ধরে “সালাফী” শব্দটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তারা কিন্তু মিশরী/আফগানী ছিলেন। এরা হলেন –

  • জামালউদ্দীন আফগানী (মৃত্যু ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দ)
  • মুহাম্মাদ আব্দুহ (মৃত্যু ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ)
  • রশীদ রিদা (মৃত্যু ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ)

উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন বিশ্বজুড়ে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করে তখন আফগানী, আব্দুহ, রিদারা চিন্তা করা শুরু করেন – কেন আমরা মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে এত পিছিয়ে আছি? আমাদের মুসলিমদের উচিত ছিল দুনিয়ার নেতৃত্বে থাকা, কিন্তু কেন আজ ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এর নেতৃত্বে আছে? আব্দুহ চিন্তা-ভাবনা করে বের করলন – এর পেছনে আছে মুসলিমদের গোঁড়া মন-মানসিকতা। মাজহাবগুলো  প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো যখন মুসলিমদের খিলাফত ছিল, জীবন যাত্রা ভিন্ন মাত্রার ছিল। পরিবর্তিত এই বিশ্বের সাথে মাজহাবি বিধানগুলো তাল মেলাতে পারছে না, কারণ মাজহাব তো আল্লাহর ﷻ দেয়া না, মাজহাব মানুষের তৈরী। কাজেই, আব্দুহ বললেন, আমাদের ফিরে যেতে হবে কুরআন – সুন্নাহর কাছে। যেহেতু ওগুলো আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে এসেছে, তাই শুধু আগের যুগেরই নয়, আধুনিক যুগের সব সমস্যার সমাধানও কুরআন-হাদিসের মধ্যেই পাওয়া যাবে।  বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব যেখানে মুসলিমদের খিলাফত নেই (বা থাকলেও নামে মাত্র আছে), যেখানে নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করতে চায়,  যেখানে নিত্য-নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়ে চলেছে – এগুলোর আলোকে কুরআন–সুন্নাহকে আমাদের নতুন করে পড়তে হবে।   আব্দুই সর্বপ্রথম এই চিন্তা-ভাবনাকে “সালাফী” নাম দেন। কারণ, সালাফদের সময় প্রচলিত চার মাজহাবের কোনটিই প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়নি, সালাফরা কুরআন–সুন্নাহ থেকে সরাসরি বিধান নিতেন। কিন্তু, বর্তমান সময়ে আব্দু এর আন্দোলনকে সালাফী বলা হয় না, এটা হয়ে গেছে “মডার্নিষ্ট ইসলাম” বা “প্রগেসিভ ইসলাম”।

আব্দুহ ব্যবহৃত “সালাফী” শব্দটা নাসিরুদ্দীন নামক এক তরুন আলবেনীয় জিনিয়াস খুব পছন্দ করে ফেলেন।  এই তরুন পরবর্তীকালে হয়ে উঠেন শাইখুল হাদিস নাসিরুদ্দীন আলবানী, যার সারা জীবনের গবেষনা ছিল সহীহ হাদিসের ভিত্তিতে ফিকহী সিদ্ধান্ত দেয়া। নাসিরুদ্দীন আলবানী তাঁর কর্মপন্থাকে “সালাফী” নামে প্রচার করেন, যা আগে “নাজদি দাওয়া” নামে পরিচিত ছিল। “নাজদি দাওয়া” শুরু হয়েছিল শেইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (মৃত্যু ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দ) এর মাধ্যমে । কিন্তু, বর্তমান সময়ে “সালাফী” বলতে আব্দুহ কে বুঝানো হয় না, বুঝানো হয় নাসিরুদ্দীন আলবানি, মুহাম্মাদ ‘ইবনুল উথাইমিন, ‘আব্দুল ‘আযীয বিন বাজ  ও তাঁদের সমমনাদেরকে। উল্লেখ্য, সালাফী ইমামদের প্রায় প্রত্যেকেই ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (মৃত্যু ১৩২৮ খ্রীষ্টাব্দ) এর মতামতকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

সুতরাং ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই যে, আধুনিক যুগের সাথে মাজহাবগুলো তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত সংকীর্ণমনতার কারণে যুগের সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছিল। কবর পূজার বিরুদ্ধে নমনীয় অবস্থান, যইফ (দুর্বল) হাদিসের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেয়া, ইউরোপিয়ানদের ভাষা-খাদ্য-কাপড়-প্রযুক্তি ইত্যাদি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি – এই জাতীয় উদ্ভট সব ফতোয়া মুসলিম জাতিকে ক্রমেই পেছনের দিকে টেনে ধরছিল। এই ধরনের ব্যর্থতাগুলোই সালাফী আন্দোলনকে বেগবান করে, যা ছিল সময়ের দাবী। সাথে সাথে, একথাও স্বীকার করতেই হবে যে সালাফী আন্দোলন মানুষকে সরাসরি কুরআন – সুন্নাহ পড়তে, তাদের অর্থ বুঝতে উৎসাহী করেছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মুসলিম তরুনদের মধ্যে ইসলামী জ্ঞান চর্চার যে জোয়ার আমরা দেখতে পাই, তার পেছনে সালাফী আন্দোলনের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নাই।

আমাদের কি করণীয় [৭,৮,৯,১০,১১]:

১। মাজহাব অথবা কোনো সালাফী ইমাম – যাকে আপনার কাছে কুরআন-সুন্নাহর বেশী কাছাকাছি মনে হয় তাকেই অনুসরণ করুন [৪,৭,৮,২৬]। এমন মাজহাব / ইমামকে অনুসরণ করুন যার থেকে ভাঙ্গা ভাঙ্গা নয়, একটি ইবাদতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো জ্ঞান নিতে পারবেন। ইসলামের মৌলিক ইবাদত ও দৈনন্দিন লেন-দেন, চলাফেরার জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিধান আপনার পছন্দের মাজহাব / ইমাম থেকে ভালোভাবে জানুন এবং পালন করুন।

২। কোনো একটি নির্দিষ্ট ইবাদতের ক্ষেত্রে (যেমন – নামাজ) একটি নির্দিষ্ট মাজহাব বা একজন নির্দিষ্ট ইমামকে অনুসরণ করুন [৪,১১,২৬]। একই ইবাদতের মধ্যে একাধিক মাজহাব বা একাধিক ইমামের ফিকহ (Understanding) কে মেলাবেন না।

৩। যদি পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে আপনি যে মাজহাব বা ইমামের অনুসরণ করেন তার কোনও নির্দিষ্ট হুকুম পালন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে যে মাজহাব / ইমামের ফিকহ আপনার কাছে সহজ মনে হয় সেটাকে অনুসরণ করতে পারবেন [৪,১১]। এর উদাহরণ হিসেবে আলেমরা বলে থাকেন – যারা আমেরিকা / ইউরোপে অফিসে চাকুরী করে, তারা যদি অজুর সময় জুতা খুলে পা ধুতে অসুবিধা বোধ করে, তাহলে তারা হাম্বালী মাজহাবের ফিকহ অনুসারে কেবল মোজা নয়, জুতার উপর দিয়েও মাসাহ করতে পারবে (শর্ত হলো – যখন শেষবার জুতা পরা হয়েছিলো তখন তার অজু ছিল ও পায়ের টাখনু সহ ঢাকা থাকতে হবে) [বিস্তারিত এখানে]।

সহজ মতামত গ্রহণের আরেকটা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো – জুম’আর নামাজের ওয়াক্ত নির্ধারণ। হাম্বালী মাজহাবের মতে জুম’আর নামাজের ওয়াক্ত যুহরের নামাজের ওয়াক্তের চেয়ে ব্যাপক। তারা মনে করে- জুম’আর নামাজের ওয়াক্ত যুহরের নামাজের আরো আগেই শুরু হয়ে যায় (এক্ষেত্রে তাদের দলীল হলো  – উহুদের যুদ্ধের প্রস্তুতির দিনের হাদিস, যা থেকে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ(সা) সেদিন যুহরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই জুম’আর নামাজ পড়িয়েছিলেন ) ।  অন্য মাজহাবগুলো হাম্বালী মাজহাবের এই মতের সাথে একমত পোষণ না করলেও উত্তর আমেরিকার মসজিদগুলোতে (এমনকি যে মসজিদের ইমাম হাম্বালী নন) দেখা যায় তারা সবসময় দুপুর ১টার সময় জুম’আর নামাজ শুরু করে, যদিও দেখা যাচ্ছে সেদিন যুহরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু দেড়টার সময়। উত্তর আমেরিকার মসজিদের ইমামরা এমন করেন কারণ – দেড়টার সময় নামাজ শুরু করলে অধিকাংশ মুসলিমের পক্ষে লাঞ্চ-ব্রেকে বের হয়ে নামাজ আদায় করা সম্ভব  হবে না।  কাজেই, এই ক্ষেত্রে সহজ মতামতটি অনুসরণ করা হচ্ছে সমস্ত মুসলিম উম্মাহর মঙ্গলের কথা চিন্তা করে।

৪। আপনার এলাকার ভালো আলেমের সাথে যোগাযোগ রাখুন। যেসব বিষয়ের শারঈ’ বিধান আপনি যেখানে বাস করেন তার পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত সেগুলো ব্যাপারে আপনার এলাকার ইমামই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন [৯]। যেমন – দেশে কোনও ব্যাপারে আন্দোলন চলতে থাকলে আপনার তাতে অংশগ্রহণ করা উচিত হবে কিনা তা সৌদি আরব বা আমেরিকার আলেমের চেয়ে বাংলাদেশের আলেমই ভালো বলতে পারবেন।

৫। অন্য মাজহাব / ইমামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। আপনি আপনার মাজহাব / ইমাম সম্পর্কে যতটা নিশ্চিত, অন্য ব্যক্তিও তার মাজহাব / ইমাম সম্পর্কে ততটাই নিশ্চিত। জেনে রাখুন যে, শরীয়তের মাত্র ২০% বিষয়ে ইমামদের মধ্যে ইজমা’ (ঐক্যমত) রয়েছে, আর বাকী ৮০% বিষয়েই তাদের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত মতপার্থক্য রয়েছে [১০]।  এই ধরনের মতপার্থক্য আবু বকর (রা), উমার (রা) এর সময় থেকেই চলে আসছে। কাজেই মতপার্থক্যের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিন। অন্য কাউকে ফিকহি বিষয়ে জ্ঞান দেয়া থেকে বিরত থাকুন, যদি না বিষয়টি সেই অবশিষ্ট ২০% এর মধ্যে পড়ে, যে ব্যাপারে ইমামদের ইজমা’ (ঐক্যমত) রয়েছে।

শেষ কথা:

আসুন, কিছুক্ষণের জন্য উল্টোভাবে ভেবে দেখি – ফিকহ নিয়ে ইমামদের মধ্যে যদি মতপার্থক্য না থাকতো তো কি হতো? আল্লাহ ﷻ কি চাইলে তার দ্বীনকে এমন করতে পারতেন না যে কোনও বিধান নিয়েই কোনও মতপার্থক্য হতো না? সত্যিই যদি এমন হতো – তাহলে নাজিলের ১৪০০ বছর পরেও এসে মানুষ এখনও কুরআন-হাদিস নিয়ে যত আগ্রহ সহকারে গবেষনা করছে, সেই আগ্রহে ভাটা পড়তো। আবার, যে ব্যক্তি কঠিন নিয়ম পালন করতে পারছেন না তিনি দ্বীনের কঠোরতার কারণে হয়ত ধর্মই ত্যাগ করে ফেলতেন। মতপার্থক্য থাকার কারণে বিরূপ পরিস্থিতি পড়ে অপেক্ষাকৃত সহজ মতামতটি অনুসরণ করে অন্তত তিনি তার দ্বীন তো রক্ষা করতে পারছেন।

ইসলামের বিভিন্ন হুকুম নিয়ে মতপার্থক্য করার সুযোগ থাকার কারণেই কিন্তু এই দ্বীন এর ফিকহগুলো মৃত নয়, জীবিত। আর ইসলাম জীবিত ধর্ম বলেই – সভ্যতা যতই এগিয়ে যাক, মানব সমাজ যতই বদলে যাক – সকল পরিস্থিতিতেই ইসলাম সমান ভাবে কার্যকর।

আসুন আমরা মাজহাবী-সালাফী পার্থক্য ভুলে যেয়ে একে অপরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখি, একে অপরের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে চেষ্টা করি। আমরা মুসলিমরা যেদিন অন্য মাজহাব ও অন্য মতের ইমামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারবো, শুধু সেই দিনই সত্যিকারের ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।

তোমরা আল্লাহর দড়িকে (কুরআন) শক্ত করে আঁকড়ে ধরো, আর দলে দলে ভাগ হয়ে যেয়ো না … (সূরা আলে-ইমরান:১০৩)     

শেইখ উথাইমিন, সালিহ আল ফাউযান এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ সালাফী ইমামরা সর্বদাই মাজহাবী ইমামদের শ্রদ্ধা করেছেন। তাঁরা বলেছেন – “আমি সালাফী তাই আমিই সহীহ, আর বাকী সবাই জাহান্নামী” জাতীয় ধারণা পোষন না করতে [২০,২১,২২]। । আবার, আমাদের সময়ের জনপ্রিয় মাজহাবী বক্তা হামযা ইউসুফ [৪], আব্দুর রহমান বিন ইউসুফেরাও [২৬] বলেছেন: কেউ যদি মনে করে মাযহাবের চেয়ে সালাফী ইমামের মতামত অধিক সঠিক, তাহলে সেই ইমামকেই সে অনুসরণ করুক – এতে সমস্যার কিছু নেই। অনুকরণীয় এই সব ইমামরা বুঝতে পেরেছেন –নিজেকে হানাফী বা সালাফী হিসেবে চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ কোনও বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো মহান আল্লাহর ﷻ কাছে ভালো মুসলিম হিসাবে কবুল হওয়া।

References:

  1. The Prophet’s (ﷺ) Prayer from the Beginning to the End as Though You See it – Shaykul Hadith Muhammad Naasir-ud-Deen Al-Albaani
  2. Unity of the Muslim Ummah – Dr. Zakir Naik
  3. The Madhab of Rasool Allah (ﷺ) – Dr .Bilal Philips
  4. Maliki Fiqh – Hamza Yusuf
  5. Why follow a Madhab Instead of Sahih Hadith – Mufti Abdur Rahman ibn Yusuf
  6. The Madhab of Imam Ahmad Ibn Hanbal – Shatibi Center of Islamic Sciences
  7. The Issue of the Madhab and Taqleed – Shatibi Center of Islamic Sciences
  8. Which Madhab to Follow? – Dr. Yasir Qadhi
  9. Towards an Ecumenical Conception of Salafiyyah – Dr. Yasir Qadhi
  10. “We follow only the Quran and Sunnah” – Muhammad Haq (Virtual Mosque Blog)
  11. Choosing Opinions that Suit Your Desires – Yahya Ederer (Virtual Mosque Blog)
  12. Who and What is a Salafi – Nuh Ha Mim Keller (http://www.sunnah.org/aqida/aqida11.htm)
  13. Meaning of the word Salaf http://wayofthesalaf.tumblr.com/TheWordSalaf
  14. What does the word Salaf means in Arabic.
  15. Foundations of Islamic Studies – Dr. Bilal Philips
  16. Tolerance of Fiqh Issues – Ismail Kamdar (Muslim Matters Blog)
  17. Article about Imam Malik on http://en.wikipedia.org/wiki/Malik_ibn_AnasWikipedia
  18. Article about Imam Malik on IslamicEncyclopedia.org
  19. আদিল্লাতুল হানাফিয়া – আব্দুল্লাহ ইবনে মুসলিম বাহলাবি , পৃষ্ঠা ২২
  20. The Difference Between Salafiyyah and the Neo-Salafis – Dr. Bilal Philips
  21. Ibn al-Uthaymeen – “The Salafi Sect” Vs. The Way of the Salaf
  22. Advice to the (Neo) Salafis – Abu Mussab Wajdi Akkari
  23. The Maliki Argument for not Clasping the Hands During Prayer – Abdullah Bin Hamid Ali
  24. Why Do the Malikis Pray With Their Hands to The Sides? – Suhaib Webb
  25. The Risala – A treatise on Maliki Fiqh – Imam Al-Qayrawani Al-Maliki
  26. Following a Madhab – Mufti Abdur Rahman bin Yusuf 
  27. Difference of Opinion in Islam – Anwar Al-Awlaki
  28. Hanafi Usool Al Fiqh – Muhammad ibn Adam Al-Kawthari
  29. Seerah Part 14 (Torture and Prosecution of the Weak) – Yasir Qadhi
  30. Seerah Part 74 (Incidents Before the Conquest of Makkah) – Yasir Qadhi

ফিতনার সময় করণীয় কি?

fitna

আলিফ লাম মীম। মানুষ কি মনে করে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই ওদের ফিতনা (পরীক্ষা)  ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হবে? ওদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করা হয়েছিলো। অবশ্যই আল্লাহ্‌ স্পষ্ট করে দেবেন কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। – (সূরা আনকাবুত ২৯:১-৩)

নিচের ঘটনাগুলোর কথা ভেবে দেখুন:

  • হঠাৎ করেই বিশাল এক বিল্ডিং ধ্বসে পড়েছে আপনার শহরে। ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়া মুখগুলোর ছবি দেখে আপনি ঘুমাতে পারছেন না। মনের ভিতরের ছটফটানিটা যেন কিছুতেই থামছে না। নিজেকে বার বার প্রশ্ন করছেন – এদের জন্য আমি কি করতে পারি?
  • দেশজুড়ে ‘অমুক’ ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম হয়ে গেছে। আপনার বন্ধুরা, পাড়ার বড় ভাইয়েরা দলে দলে যোগ দিচ্ছেন ‘তমুক চত্বরে’। আপনিও ভাবছেন – আমিও ওদের সাথে যাবো নাকি? আবার ভাবছেন – এদের সাথে গেলে তো আমার অন্য সার্কেলের বন্ধুরা আমাকে খারাপ বলবে। কি যে করি, কি যে করি, ফেইসবুকে একটা রক্তগরম স্ট্যাটাস দিয়ে দিবো নাকি? কিছুতেই আপনি বুঝে উঠতে পারছেন না কি করবেন!
  • শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। গত কয়েক বছরে ক্রিকেটে  আপনার দেশ ভালো খেলায় এটাই এখন জাতীয় সিম্বল। আড্ডায়, টিভিতে, সংবাদপত্রে, ফেইসবুকে – যেখানেই যান শুধু ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা। ক্রিকেটের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে পুরো জাতি। আর এর মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলাটা পড়েছে কিনা ঠিক জুম’আর সময়! খেলা দেখলে জুম’আ মিস, জুম’আ পড়তে গেলে খেলা দেখা মিস। বড় মুসিবতে পড়া গেলো! কি যে করি!
  • এসেছে রামাদান মাস। আপনি ভাবলেন রামাদান উপলক্ষে ফেসবুকের ইসলামী লেখাগুলি একটু পড়ে দেখি। পড়তে যেয়ে দেখলেন – আপনার “ইসলামী মাইন্ডেড” বন্ধুরা যতটা রামাদানের করনীয়-বর্জনীয় আর ফজীলত সম্পর্কে লিখছে, তার চেয়ে ঢের বেশী মারামারি করছে তারাবীর নামাজ ৮ রাকআত না ২০ রাকআত নিয়ে। এই পক্ষ ইট মারে তো অন্য পক্ষ হাতবোমা মারে। এই লেখাগুলি পড়তে যা মজা! কিসের কি রামাদানের ফজিলত, আপনি মজে গেলেন মাজহাবী বিতর্কে।

উপরে যে ঘটনাগুলো বলা হলো তার সবগুলিতে একটা ব্যাপার কমন – এগুলো সবই “ফিতনা”-র উদাহরণ। ফিতনা (trials and tribulations) মানব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষত: আমরা এখন যে সময়ে বাস করছি তাতে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ফিতনা প্রায়শ:ই চরম আকার ধারণ করে। দেশে বলুন, দেশের বাইরে বলুন সর্বত্র মানুষের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য যা হঠাৎ করেই রূপ নেয় ঝগড়ায়, ঘৃণায়, খুনাখুনিতে।  ফিতনা যখন চরম আকার ধারণ করে তখন ভালো-মন্দের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে, আর এই সময়ে অনেকেই কনফিউজড হয়ে পড়ে যে, আমার কি করনীয়? ফিতনার সময় একজন প্রকৃত মুসলিমের দায়িত্ব কি  – এই সমন্ধে কোরআন আর হাদিস কি বলে – এই লেখায় আমি তার একটা জেনারেল গাইডলাইন খোঁজার চেষ্টা করেছি।

লেখাটি পড়ার সময় অবশ্যই মনে রাখতে হবে: এটা শুধুই একটা জেনারেল গাইডলাইন। কোনো সমাজ বা দেশ ফিতনাগ্রস্ত হলে সেখানকার মুসলিমদের স্পেসিফিক দায়িত্ব কি হবে – তা শুধু সেই সমাজের/দেশের যোগ্যতাসম্পন্ন ইসলামি স্কলারেরাই বলতে পারবেন।

ফিতনা কাকে বলে?

ফিতনা শব্দের অর্থ হলো ‘পরিশুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করা’ (to examine with the intent of purifying)। এই পরীক্ষা আমাদের প্রিয় কোনও কিছু (যেমন অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, পুরুষের জন্য নারী / নারীর জন্য পুরুষ) দিয়ে হতে পারে, আবার হতে পারে আমাদের অপছন্দনীয় কিছু দিয়ে (যেমন অকস্মাৎ বিপদ, গৃহযুদ্ধ, বিশৃংখলা, অত্যাচারী শাসক ইত্যাদি)। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ফিতনার মাধ্যমে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে অকৃতজ্ঞ মানুষ থেকে পৃথক করেন।

সাধারণ মানুষের ধারণা ফিতনা মানেই বুঝি খারাপ কিছু। ধারণাটা ঠিক না। আল্লাহ্‌ তা’লা কুরআনে সন্তান ও সম্পদকে ফিতনা বলেছেন (http://quran.com/8/28), অথচ আমরা এগুলোকে ভালো কিছু বলেই জানি। কাজেই, কোন কিছু ফিতনা কিনা তা নির্ধারন করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।  চলমান কোন ঘটনা ফিতনা কিনা তা ভালো বলতে পারবেন ঐ সময়ের ও ঐ এলাকার ইসলামী স্কলারেরা। কিন্তু, যে কোনও ফিতনারই দুইটি কমন বৈশিষ্ট্য থাকে [১,১০]। এগুলো হলো –

১) ফিতনা প্রচন্ড আকর্ষণের সৃষ্টি করে: যে কোন ফিতনাই মানুষকে চুম্বকের মতো টানে। যে লোক কোনদিন খবরের কাগজ পড়ে না, ফিতনার সময় সেও সবাইকে জিজ্ঞেস করে – আচ্ছা এর পর কি হয়েছিলো? বর্তমান যুগে ফিতনা চেনার একটা সহজ উপায় হলো ফেইসবুক। যখন যে ফিতনা শুরু হয়, ফেইসবুকের হোম পেইজ আর প্রোফাইল পিকচার ভরে যায় ঐ ফিতনায়।

) ফিতনা মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়: কিছু কিছু ফিতনা আছে যেগুলোর উপস্থিতিতে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মানুষের পক্ষে আল্লাহর ইবাদত করা কঠিন হয়ে পড়ে (যেমন – যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ )। অন্যদিকে কিছু কিছু ফিতনা আছে (যেমন – বিশ্বকাপ খেলা) যেগুলোতে মানুষ এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে যায় যে, সে ভুলে যায় তার উপর তার প্রতিপালকের দেয়া দায়িত্ব। নামাজী ব্যক্তি ফিতনার আকর্ষণে সময় মতো নামাজ পড়তে পারে না, মা-বাবা ও পরিবারের উপর দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ফিতনার আপডেট জানার জন্য। ফিতনার সময় গিবত বেড়ে যায়, বেড়ে যায় মিথ্যাবাদীতা, চোগলখুরী আর কাঁদা ছোড়াছুড়ি।

ফিতনার জবাবে করণীয় কাজগুলোকে আমি দুইভাগে ভাগ করেছি: আত্মিক (spiritual) ও পার্থিব (worldly)। আত্মিক কাজগুলো পার্থিব কাজগুলোর ভিত্তি, যদিও দুই ভাগের কাজগুলোই গুরুত্বপূর্ন।

আত্মিক / Spiritual যে কাজগুলো করতে হবে: 

attik

১ – বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য কষ্ট অনুভব করা: ফিতনা তার সাথে করে নিয়ে আসে বিপদ আর কষ্ট, সর্বনিম্ন আমরা যা করতে পারি তা হলো ফিতনায় পড়া মানুষের জন্য কষ্ট অনুভব করা। ফিতনায় পড়া কষ্ট পড়া মানুষগুলো যদি মুসলিম হয়, তাহলে তাদের জন্য কষ্ট অনুভব করা আমাদের ঈমানের অংশ। যখন বাংলাদেশ, ফিলিস্তিন, গুয়ানতানামো, সিরিয়া, মিশর, ইরাক, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান বা বার্মার মুসলিমরা ফিতনায় পড়ে, তখন যদি আমরা বিন্দুমাত্র কষ্ট অনুভব না করে নিজের স্বাভাবিক জীবনকার্য চালিয়ে যেতে পারি, তাহলে বুঝে নিতে হবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার সময় এসেছে – আমরা কি আসলেই মুসলিম?

সকল ঈমানদারেরা তো পরষ্পর ভাই ভাই। (সূরা হুজুরাত ৪৯:১০ আয়াতাংশ)

তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা যদি ঈমানদার না হও, তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যদি একজন আরেকজনকে ভালো না বাসো। (মুসলিম)

তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমার ভায়ের জন্য তা-ই ভালোবাসো যা তুমি তোমার নিজের জন্য ভালোবাসো। – (বুখারী)

২ –  দু’আ করা: বর্তমান সময়ে দু’আ করাকে আমরা খুব তুচ্ছ একটা ব্যাপারে মনে করি। আমরা মনে করি, ধূর! দু’আ করে কি হবে? আসলে এর মাধ্যমে আমরা আমাদের ঈমানী দৈন্যতাই প্রকাশ করি। আমরা যে আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতায় বিশ্বাস করি না তা-ই প্রমাণ করি। অথচ, দু’আ হচ্ছে মু’মিনের অস্ত্র।  একজন মুসলিম বিশ্বাস করে যে আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ সর্ব সময় শুধু তাঁর কাছেই আছে। তাই একজন মুসলিম বড় বড় ব্যাপার থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপারেও আল্লাহর কাছে দু’আ করে – একগ্লাস পানি খাওয়ার জন্য হাতটা যেমনি আগে বাড়ায়, তেমনি বিসমিল্লাহ বলে আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতাকেও স্বীকার করে। সে ফিতনার আগে দু’আ করে, ফিতনার সময় দু’আ করে, ফিতনার পরেও দু’আ করে। আমরা দু’আ করবো ফিতনায় না পড়ার জন্য, আর দু’আ করবো ফিতনার সময় যাতে মনোযোগ না হারিয়ে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করতে পারি। আমরা দু’আ করবো অত্যাচারীতের জন্য যেন সে অত্যাচার থেকে মুক্তি পায়, এমনকি দু’আ করবো অত্যাচারীর জন্য যাতে সে অত্যাচারের পথ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

তোমার রব বলেন: আমাকে ডাকো, আমি উত্তর দিবো। – (সূরা গাফির ৪০:৬০ আয়াতাংশ)

আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং আমি জানি তার মন তাকে কি কুমন্ত্রণা দেয়। আমি (আমার জ্ঞানের মাধ্যমে) তার গ্রীবাস্থিত ধমনীর চেয়েও নিকটতর । – সূরা কফ ৫০:১৬

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: তোমরা আল্লাহর কাছে প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো। – (সহীহ মুসলিম)

৩ –  ইসলামের উপর অবিচল থাকা: ফিতনার সময় শয়তান এসে মানুষকে বলে – ‘দেখো, আজ ইসলাম ধর্মের কারণেই পৃথিবীতে এত সমস্যা। ধর্মের কারণেই এত বিভেদ, মানুষে মানুষে এত মারামারি। আর আল্লাহ্‌ যদি সত্যিই থেকে থাকেন তাহলে এখন তিনি মুসলমানদেরকে সাহায্য করছেন না কেন?’ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাহায্য আসবেই। কিন্তু তার আগে আল্লাহ্‌ ফিতনার মাধ্যমে মানুষের ঈমান পরীক্ষা করবেন, যেভাবে তিনি অত্যাচারী ফেরাউনের মাধ্যমে বনী ইসরাইলের ঈমান পরীক্ষা করেছিলেন, অত্যাচারী কুরাইশবাসীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ(সা) আর সাহাবীদের ঈমান পরীক্ষা করেছিলেন। ফিতনার সময় যারা মু’মিন তারা ইসলাম থেকে দূরে সরে যায় না, বরং পরীক্ষা যত কঠিন হতে থাকে ইসলামের রজ্জুকে সে তত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, অন্যদিকে মুনাফিকেরা এই সময় মুসলিমদের থেকে পৃথক হয়ে যেয়ে কাফেরদের সাথে হাত মিলায়।

ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিচের এই দু’আটি রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের শিখিয়ে গেছেন:

dua

উচ্চারন: ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব সাব্বিত ক্বালবি ‘আলা দিইনিক

অর্থ: হে হৃদয় পরিবর্তনকারী, আমাদের হৃদয়কে তোমার দ্বীনের উপর সুদৃঢ় করে দাও। – (আহমদ)

৪ –  ইবাদত বৃদ্ধি করা: ফিতনার সময় মানুষের মন বিক্ষিপ্ত থাকে, টেনশন করে, এটা-সেটা চিন্তা করে সে সময় পার করে দেয়। মনের এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার ঔষধ হলো আল্লাহর ইবাদত বৃদ্ধি করা – ধীরে ধীরে সময় নিয়ে নামাজ পড়া, নফল রোজা রাখা, বুঝে বুঝে কোরআন পড়া, স্কলারদের লেকচার শুনা, কোরআনের অর্থ নিয়ে চিন্তা করা।

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: ফিতনার সময় ইবাদত করা, হিজরত করে আমার কাছে আসার সমতুল্য। (সহীহ মুসলিম)

সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল সাহাবীরা হলেন যারা রাসূলুল্লাহ(সা) এর সাথে হিজরত করেছিলেন। আপনার মনে আফসোস আপনি কেন সাহাবা হয়ে জন্মালেন না? সাহাবাদের সমান নেকী অর্জনের সুযোগ আল্লাহ্‌ আপনাকে দিয়েছেন – ফিতনার সময় ধৈর্য্য ধরে আল্লাহর ইবাদত করুন, ইবাদত বৃদ্ধি করুন।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: তোমরা অন্ধকার রাতের টুকরোগুলোর মত (যা ক্রমশই গভীর হতে থাকে) ফিতনা আসার পূর্বে নেকীর কাজ দ্রুত করে ফেল। সেই সময়ে মানুষ সকালে মু’মিন হয়ে ঘুম থেকে উঠবে এবং রাত শুরু করবে কাফের হয়ে, অথবা সে রাত শুরু করবে মু’মিন হয়ে এবং সকালে ঘুম থেকে উঠবে কাফের হয়ে । তখন সে নিজের দ্বীনকে দুনিয়ার সম্পদের বিনিময়ে বিক্রয় করবে। – ( মুসলিম, তিরমিযী, আহমাদ – আবূ হুরাইরাহ(রা) থেকে বর্ণিত)

৫ – ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করা: মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের শিক্ষা যত কম থাকবে তত সহজেই তারা ইসলামের শত্রু এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রদানকারী ইসলামিষ্ট – এই দুই গ্রুপের লোকদের দ্বারা সহজেই মোটিভেটেড হয়ে যাবে। ফলে, ইসলামী শিক্ষায় স্বল্পশিক্ষিত মুসলমানেরা তখন হয় ইসলামের শত্রুদের পক্ষ নিবে, অথবা বিভ্রান্তিকর ইসলামিষ্টদের কথায় আবেগ-তাড়িত হয়ে এমন কিছু করে বসবে যার ফলে সমাজে ফিতনা তো কমবেই না, বরং অস্থিতিশীলতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: কিয়ামত যখন কাছে চলে আসবে তখন এমন দিন আসবে যখন (দ্বীনি) জ্ঞান হারিয়ে যাবে, মূর্খতার আবির্ভাব হবে, এবং প্রচুর পরিমাণে মানুষ হত্যা হবে। (ইবনে মাজাহ, বুখারী, মুসলিম, আব্দুল্লাহ(রা) হতে বর্ণিত)

লক্ষ্য করুন, রাসূলুল্লাহ(সা) মানুষ হত্যা বেড়ে যাওয়ার সাথে জ্ঞানের অভাবকে কিভাবে রিলেট করেছেন। মানুষ যত বেশী জ্ঞানবিমুখ হবে, ইসলাম ও দুনিয়া সম্বন্ধে যত কম জানবে, তত সহজেই সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তাদের ব্রেইনওয়াশ করে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারবে। কাজেই, ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের মনোযোগী হতে হবে সিরিয়াস ইসলামী জ্ঞান অর্জনের প্রতি, আলেমদের লেকচার শুনতে হবে, সান্নিধ্যে যেতে হবে, প্রচুর বই পড়তে হবে সাধনা করতে হবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। আমাদের দেশে যখনই ইসলাম-বিষয়ক কিছু নিয়ে গন্ডগোল বাধে তখনই দেখা যায় কিছু লোক একটা কোরআন শরীফ হাতে নিয়ে বিভিন্ন আয়াতের নিজের ইচ্ছামতো ব্যাখা দেয়া শুরু করেছে, এদের ইসলাম-বিষয়ক কথা-বার্তা থেকে ১০০ হাত দূরে থাকতে হবে। এই জাতীয় লোকরা নিজেরাও বিপথে চলে, আর মানুষকেও বিপথে পরিচালিত করে।

৬ – অন্যদের মাঝে ইসলামী জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়া: শুধু নিজে দ্বীন শিখলেই চলবে না, আমাদের পরিবারের সদস্যদের ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, আমাদের পরিচিতদের মধ্যে যারা ইসলামী জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে সরে গেছে তাদেরকেও ইসলামের আলোর সন্ধান দিতে হবে। কারন, আমরা যদি মানুষকে আল্লাহর পথে না ডাকি, অন্যরা আমাদেরকে শয়তানের দিকে ডাকবে। একজন মুসলিমের জন্য অন্যদের কাছে ইসলামী জ্ঞান তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে যেয়ে সহীহ বুখারীতে নুমান ইবনে বশীর থেকে বর্ণিত চমৎকার একটা হাদিস আছে।

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন, কিছু মানুষ একটা জাহাজে উঠেছিলো, যার কেউ ছিলো উপরের তলায়, কেউ ছিলো নিচের তলায়। উপরের তলার লোকদের কাছেই শুধু পানির ব্যবস্থা ছিলো, তাই নিচের লোকদের পানির দরকার পড়লে তাদের উপরের তলায় যাওয়া লাগতো। নিচতলার লোকেরা মনে করলো, আমরা তো বারবার উপরে যেয়ে উপর তলার লোকদেরকে ডিসটার্ব করছি, কেননা আমরা জাহাজে একটা ফুটো করে ফেলি, তাহলে আমরা নিচে বসেই পানি পাবো আর উপরের তলার মানুষগুলোকেও বিরক্ত করবো না। এখন উপরের তলার মানুষগুলো যদি নিচের মানুষগুলোর ব্যাপারে তোয়াক্কা না করে তাহলে দুই দলই ডুবে মরবে, আর উপরের মানুষগুলো যদি নিচের মানুষগুলোকে বাধা দেয় তো দুই দলই বাচঁবে।

একইভাবে, যার মধ্যে ইসলামী জ্ঞান নাই সে অন্য মুসলিমের উপকার করতে যেয়ে ক্ষতি করে বসতে পারে। যে ইসলাম সম্বন্ধে জানেনা সে শুধু নিজেই পানিতে ডুবে মরে না, নিজের অজান্তেই  আশে পাশের লোকগুলোকেও পানিতে ডুবায়। আর তাই আমাদের নিজেকে ইসলাম শিখলে আর পালন করলেই চলবে না, যার যতটুকু সাধ্য আছে তার সাহায্যে আমাদের পরিচিতদেরকেও ইসলাম সম্বন্ধে জানাতে হবে।

৭ – ধৈর্য্যধারণ করা: ফিতনার সময় আমরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকি, ফলে ছোটখাটো ঘটনাতেও নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। তাই, এই সময় আমাদের ধীর স্থির থাকতে হবে, ধৈর্য্য ধরতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি (সূরা ইনশিরাহ ৯৪:৫-৬)।

সা’দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: অনতি বিলম্বেই এমন এক বিপর্যয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটবে যখন বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে ভালো (নিরাপদ) থাকবে, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি হেঁটে চলা ব্যক্তির চেয়ে ভালো থাকবে, আর হেঁটে চলা ব্যক্তি দৌড়ে চলা ব্যক্তির চেয়ে ভালো থাকবে। সাদ(রা) জিজ্ঞেস করলেন: আপনি এ ব্যাপারে কি মনে করেন যদি ফিতনাবাজ কোনো লোক আমার ঘরে প্রবেশ করে এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়? রাসূলুল্লাহ(সা) উত্তর দিলেন: তুমি আদমের ছেলে (হাবিলের) মতো হয়ে যাও। [কাবিল যখন হাবিলকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলো তখন হাবিল বলেছিলো: ‘আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি আমার প্রতি হাত তুললেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি তোমার প্রতি হাত তুলবো না, আমি তো বিশ্বজগতের রবকে ভয় করি’। (সূরা মায়িদাহ ৫:২৮)] (সহীহ আত-তিরমিযী ২১৯৪)

পার্থিব / Worldly যে কাজগুলো করতে হবে:

parthib

১ – ফিতনাগ্রস্ত মানুষকে যতদূর সম্ভব সাহায্য করা: অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অকস্মাৎ দুর্ঘটনা, অত্যাচারী শাসক ইত্যাদী কারণে মানুষ ফিতনার কবলে পড়ে। এসময় ফিতনায় পড়া মানুষগুলোকে  সামর্থ্যমতো সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব। এই সাহায্য হতে পারে অর্থ দিয়ে, খাবার দিয়ে, বস্ত্র দিয়ে, আবার এটা পারে ফিতনাগ্রস্ত মানুষের সম্পর্কে (সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে) সঠিক তথ্য ফেইসবুক, টুইটার ও বিভিন্ন আলোচনায় তুলে ধরে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে।

 আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনুল ‘আস হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনুল ‘আস হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: (কেয়ামত যখন কাছে আসবে) তখন একের পর এক ভয়াবহ ফিতনা আসবে, যেটা নতুন আসবে সেটার তুলনায় আগেরটাকে নগণ্য মনে হবে। যখন একটা ফিতনা আসবে তখন ঈমানদার বলবে, এবারই মনে হয় ধ্বংস হয়ে যাবো। কিন্তু এই ফিতনা পার হয়ে যাবে, এরপর নতুন আরেকটা ফিতনা আসবে, আর ঈমানদার বলবে: এবার নিশ্চিত ধ্বংস হয়ে যাবো। সে সময়  যে কেউ জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পেতে চায় এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়, সে যেন আল্লাহ্ এবং শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে, আর অন্য মানুষের সাথে সেইরকম ব্যবহার করে যেরকম ব্যবহার সে চায় অন্যেরা তার সাথে করুক। – (সহীহ মুসলিম ২০/৪৫৪৬ এর অংশবিশেষ)

২ – আইন না ভেঙে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা: অন্যায়কে ঘৃণা করা আমাদের ঈমানের অংশ। কিন্তু, তাই বলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যেয়ে এমন কিছু করা যাবে না যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সকল আইনসিদ্ধ উপায়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবে না। আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিবো, কিন্তু এগুলো করবো শুধুই আইনসিদ্ধ উপায়ে

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: যদি তোমাদের মধ্যে কোনো লোক কোনো অন্যায় সংঘটিত হতে দেখে তাহলে সে যেন তার হাত দ্বারা (অর্থাৎ ক্ষমতা প্রয়োগে) তা প্রতিহত করে, যদি এই যোগ্যতা তার না থাকে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। আর এই যোগ্যতাও তার না থাকে তাহলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (অর্থাৎ অন্যায়কে ঘৃণা করে) – আর এটা হলো দুর্বলতম ঈমান। – (মুসলিম, ইবনু মাজাহ, সহীহ আত-তিরমিযী ২১৭২)

এই হাদিসের ব্যাখায় স্কলারেরা [১১] বলেন: হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিহত করা সরকার ও তার প্রশাসনের কাজ। সিভিলিয়ানরা হাত দিয়ে অন্যায় প্রতিরোধ তখনই করতে পারবে যখন সেটা তার আওতায় পড়বে। যেমন, কেউ আপনার বাসায় চুরি করতে ঢুকলো আর আপনি তাকে প্রতিহত করলেন। কিন্তু, অন্যায় প্রতিহত করার মানে এইটা না যে সরকারের কোন কাজ পছন্দ হলো না আর রাস্তায় যেয়ে ভাংচুর, হরতাল শুরু করে দিলাম। আর, মুখ দিয়ে প্রতিবাদ সেই ব্যক্তিই করবে যার ইসলাম সম্বন্ধে এবং ঐ ফিতনা সম্বন্ধে জ্ঞান আছে, কারণ নাহলে ভুল কথা বলে সে উপকারের বদলে ক্ষতি করে ফেলবে। যখন কোনও সমাজে কোনো অত্যাচারী আঘাত হানে তখন ঐ দেশের আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো মৌখিকভাবে তার প্রতিবাদ করা এবং মানুষকে গাইডলাইন দেয়া। আর যে ব্যক্তির ক্ষমতাও নেই, জ্ঞানও নেই সে চুপচাপ থাকবে, কিন্তু অন্যায়কে ঘৃণা করবে। অন্যায়কে ঘৃণা করা ঈমানের অংশ।

৩ – শাসক অত্যাচারী হলেও তার বিরুদ্ধে অস্ত্র না ধরা: স্কলারদের এ ব্যাপারে ইজমা’ (ঐক্যমত) রয়েছে যে শাসক অত্যাচারী হলেও তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা যাবে না (ব্যতিক্রম ও বিস্তারিত জানতে পড়ুন:,,)। অত্যাচারী শাসকের বিরদ্ধে অস্ত্র ধরলে শাসক আরো হিংস্র হয়ে উঠে, ফলে ক্ষয়-ক্ষতি আরো বেড়ে যায়। বরং, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে ধৈর্য ধরতে হবে, যেভাবে ইসরাইলবাসী ফেরাউনের অত্যাচারের সময় ধৈর্য্য ধরেছিলো। রাসূলুল্লাহ(সা) এর মাক্কী জীবনে সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত সহ অন্যান্য সাহাবীদের কুরাইশবাসীরা অত্যাচার করতে করতে মেরে ফেলেছিলো, রাসূলুল্লাহ(সা) এর মাথায় উটের নাড়ি-ভূড়ি ঢেলে দিয়েছিলো – কিন্তু তাই বলে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ(সা) কুরাইশবাসীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে বলেননি, ধৈর্য ধরতে বলেছিলেন। তাবে-তাবেঈনদের যুগে ইরাকের অত্যাচারী গভর্ণর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ১ লক্ষ ২০ হাজার মুসলিমকে হত্যা করেছিলো, যার মধ্যে বহু তাবেঈন/ তাবে-তাবেঈন ছিলো, সে যুগের শ্রেষ্ঠ স্কলার হাসান আল বসরী তারপরেও হাজ্জাজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার জন্য মুসলিমদের অনুমতি দেন নাই

হুদাইফা বিন আল-ইয়ামান(রা) রাসূলুল্লাহ(সা) কে জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে রাসূলুল্লাহ, আমরা তো অনেক মন্দের মধ্যে ছিলাম, আল্লাহর আমাদের (ইসলামের মাধ্যমে) ভালো  করলেন এবং আমরা এখন এই ভালোর মধ্যেই আছি। এই ভালো সময়ের পর কি আবার মন্দ সময় আসবে?’ রাসূলুল্লাহ(সা) বললেন: হ্যাঁ।হুদাইফা বিন আল-ইয়ামান(রা) জিজ্ঞেস করলেন: আর সেই মন্দের পর কি আবার ভালো আসবে? রাসূলুল্লাহ(সা) বললেন: হ্যাঁ।

হুদাইফা বিন আল-ইয়ামান(রা) জিজ্ঞেস করলেন: আর সেই ভালোর পর কি আবার মন্দ আসবে? তিনি(সা) বললেন: হ্যাঁ।

হুদাইফা জিজ্ঞেস করলেন: এটা কিভাবে হবে? তিনি (সা) বললেন: আমার পরে এমন শাসক আসবে যারা আমার দিকনির্দেশনা ও সুন্নত মেনে চলবে না। তাদের কিছু লোকের মানুষের শরীরে শয়তানের হৃদয় থাকবে।

হুদাইফা জিজ্ঞেস করলেন: আমি যদি সে সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকি তো কি করব হে রাসূলুল্লাহ(সা)? রাসূলুল্লাহ(সা) উত্তর দিলেন: তুমি তাদের কথা শুনবে এবং আদেশ মেনে চলবে, এমনকি তোমার শাসক যদি তোমার পিঠে আঘাত করে এবং তোমার সম্পদ কেড়ে নেয় তবুও । (বুখারী ও মুসলিম)

আব্দুল্লাহ(রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন: তোমরা শীঘ্রই আমার পরে স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব ও তোমাদের অপছন্দনীয় অনেক বিষয় দেখতে পাবে। সাহাবীরা বললেন: হে রাসূলুল্লাহ(সা)! ঐ সময় কি করার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দেন? তিনি(সা) বললেন: তোমাদের উপর তাদের যে অধিকার রয়েছে তোমরা তা পূরণ করবে এবং তোমাদের (প্রাপ্য) অধিকার নিয়ে আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করবে। (বুখারী, সহীহ আত-তিরমিযী ২১৯০)

হাসান আল বসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলতেন:
অত্যাচারী শাসকের ফিতনায় পড়লে মানুষ যদি আল্লাহকে ডাকতো, আল্লাহ তাদেরকে ফিতনা থেকে মুক্তি দিতেন। কিন্তু, সেটা না করে মানুষ তরবারীর শরণাপন্ন হয়, আর তাই তারা একটা দিনের জন্যও মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না, ফিতনার মধ্যেই পড়ে থাকে।

এর পর তিনি নিচের আয়াতটি উদ্ধৃত করতেন:
এবং যে (বনী ইসরাইল) সম্প্রদায়কে দুর্বল মনে করা হতো তাদেরকে আমি আমার বরকতময় রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের উত্তরাধিকারী করলাম এবং বনী-ইসরাইল সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালকের শুভবাণী সত্যে পরিণত হলো, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিলো। আর ফেরাউন আর তার সম্প্রদায়ের নির্মিত শিল্পকর্ম ও প্রাসাদসমূহ আমি ধ্বংস করে দিলাম।
– (আল কোরআন ৭:১৩৭) [তাফসীর ইবনে আবি হাতিম ৮৮৯৭]

শাসকের বিরুদ্ধে কখন অস্ত্র ধরা যাবে?

ইসলামের জেনারেল রুল হলো খারাপ কোন কিছুকে সরানোর জন্য তার চেয়েও বেশী খারাপ কিছু করা যাবে না। শাইখ উসাইমিন শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ২টি মূল শর্ত দিয়েছেন:

  • এক – যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে সে স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত থাকতে হবে।
  • দুই – বিদ্রোহকারীদের যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মতো সামর্থ্য থাকতে হবে।

 শাইখ বিন বাজ আরো কিছু শর্ত যোগ করেছেন:

  • তিন – যুদ্ধে জিতলে যে ব্যক্তিকে নেতা করা হবে সে একজন প্রকৃত সৎলোক এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে হবে।  
  • চার – বিদ্রোহের ফলে যদি পরিস্থিতির অবনতি হয় বা সিভিলিয়ানদের জান-মালের ক্ষতির আশংকা থাকে তাহলে বিদ্রোহ বা যুদ্ধ করা যাবে না।

[বিস্তারিত এখানে: http://ahlusunnahwaljamaah.com/2012/02/20/disbelieving-ruler/]

উল্লেখ্য, শাইখ ইয়াসির কাদি মনে করেন  যে হাদিসগুলোর উপর ভিত্তি করে এই ফতোয়াগুলি দেয়া হয়েছে সেই হাদিসগুলোতে এমন শাসকের কথা বলা হয়েছে যারা ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে। কিন্তু, যে সকল রাষ্ট্র ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী চলে না (গণতন্ত্র বা অন্য কোনো তন্ত্র অনুযায়ী চলে), তাদের ক্ষেত্রে এই ফতোয়া ঢালাওভাবে প্রযোজ্য নয়। সেই সব দেশের অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদ করতে হবে তা সেই দেশের আলেমরাই সঠিকভাবে বলতে পারবেন [9]।

৪ – মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ থাকা: মুসলিম জাতির উপর যখন কোনো ফিতনা আসবে তখন মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, সূরা কাহফে বর্ণিত গুহাবাসীর ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই। অত্যাচারী রাজা যখন মুসলিমদের ইসলাম পালনে বাধা দিচ্ছিল এবং চরম অন্যায়-অত্যাচার করছিলো তখন মুসলিমেরা সকলে মিলে এক হয়ে গুহায় যেয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। তাই, যখন ফিতনা আসবে তখন আমাদের মুসলিম ইমামের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, এমন ইমাম যিনি কোরআন ও সুন্নাহকে অনুসরণ করে চলেন। আর এরকম ইমাম না পেলে সকল দলমত পরিত্যাগ করে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে।

হুযায়ফা ইবনু ইয়ামান (র)) হতে বর্ণিত। প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ(সা) কে ফিতনার যুগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ(সা) বললেনঃ (ফিতনার সময়) জাহান্নামের প্রতি আহবানকারী এক সম্প্রদায় থাকবে। যে ব্যক্তি ঐ সম্প্রদায়ের আহবানে সাড়া দেবে, তাকে তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে ছাড়বে।

হুযায়ফা বললেন: হে রাসূলুল্লাহ(সা)! তাদের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা আমাদের বর্ণনা করুন।   তিনি (সা) বললেনঃ তারা আমাদেরই লোক এবং আমাদেরই ভাষায় কথা বলবে।

হুযায়ফা জিজ্ঞেস করলেন: যদি এরুপ পরিস্থিতি আমাকে পেয়ে বসে, তাহলে কি করতে নির্দেশ দেন? তিনি (সা) বললেনঃ মুসলিমদের জামাআত ও ইমামকে আকড়ে থাকবে।

হুযায়ফা জিজ্ঞেস করলেন: যদি তখন মুসলিমদের কোন (সঙ্ঘবদ্ধ) জামাআত বা ইমাম না থাকে? তিনি (সা) বললেন: তখন সকল দলমত পরিত্যাগ করে সম্ভব হলে কোন গাছের শিকড় কামড়িয়ে পড়ে থাকবে, যতক্ষন না সে অবস্হায় তোমার মৃত্যু উপস্থিত হয়। (বুখারী ৬৬০৫ এর অংশবিশেষ)

৫ – শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা: বর্তমান যুগে ফিতনার অন্যতম উৎস হলো টিভি, অনলাইন-অফলাইন সংবাদপত্র, ফেইসবুক, ইউটিউব, টুইটার ইত্যাদি। বর্তমান সময়ের মিডিয়াগুলিযে সংবাদ প্রকাশ করলে তাদের স্বার্থ উদ্ধার হবে শুধু সেগুলো প্রকাশ করে, সত্যকে-মিথ্যার সাথে মিলিয়ে-মিশিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করে যে তাতে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার পরিবর্তে তারা সূক্ষ্মভাবে তাদের দৃষ্টিভংগী তুলে ধরে। এসব সংবাদ মাধ্যমগুলোর বানানো খবরগুলো সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে ফেইসবুকে, অনলাইনে শেয়ার করার মাধ্যমে আমরা অনেক সময় নিজের অজান্তেই ভয়ানক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কলহের সূত্রপাত করি।

আমাদের মনে রাখতে হবে প্রত্যেক ফেইসবুক লাইক, কমেন্ট আর প্রত্যেক শেয়ারের জন্য আমাদের জবাব দিতে হবে। কিন্তু, একথাও সত্য যে আমাদের পক্ষে প্রত্যেকটি তথ্য ব্যক্তিগতভাবে ভেরিফাই করা সম্ভব না। কাজেই এই ক্ষেত্রে, আমরা যদি এমন কোন ব্যক্তি বা মিডিয়ার থেকে কোন তথ্য পাই যাকে আমরা অতীতে একাধিক সময়ে ভেরিফাই করে সত্যবাদী রূপে পেয়েছি, শুধু তার থেকে পাওয়া তথ্যই শেয়ার করা উচিত হবে। 

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: কোন মানুষের মিথ্যুক হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যেটা শুনে সেটাই বলে। – (মুসলিম)

হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন বার্তা নিয়ে আসে তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞাতবশত: তোমরা কোনও সম্প্রদায়কে আঘাত না করো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। (সূরা হুজুরাত ৪৯:৬)

৬ – বিভ্রান্তিকর সকল কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা: যে মানুষ যে লেখা পড়ে, যার সাথে চলে সে তার মতো হয়ে যায়। ফিতনার সময় যেহেতু বেশীরভাগ মানুষই দিকনির্দেশনাহীন ভাবে চলে, কোরান-সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যায়, তাই একজন মুসলিম এই সময় সঠিকপথে থাকতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, দরকার পড়লে নিজেকে সকল বিভ্রান্তিকর সংবাদমাধ্যম ও মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। রাসূলুল্লাহ(সা) বুখারীতে বলেছেন, ফিতনার সময় ফিতনার দিকে (প্রয়োজনের অতিরিক্ত) তাকানো পর্যন্ত যাবে না, যে ফিতনার দিকে তাকাবে তাকেই ফিতনায় পেয়ে বসবে।

আবু মুসা(রা) হতে বর্ণিত। ফিতনা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন: এ সময় তোমরা ধনুক ভেঙ্গে ফেলো, ধনুকের ছিলা কেটে ফেলো, তোমরা ঘরের কোণে অবস্থান করো এবং আদমের ছেলে (হাবিল) এর মত হয়ে যাও (যে তার ভাই তাকে খুন করতে উদ্যত হলে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলো)। (ইবনে মাজাহ, সহীহ আত-তিরমিযী ২২০৪)

উপসংহারঃ     

এই লেখায় আমি ফিতনার সময়ে একজন মুসলিমের কি করা উচিত তার একটা জেনারেল গাইডলাইন তৈরী করার চেষ্টা করেছি। লেখাটির মূল উদ্দেশ্য আমার নিজেকে গাইড করা, আর পাঠক যদি এর দ্বারা উপকৃত হয়ে থাকেন তো আলহামদুলিল্লাহ। মনে রাখবেন এটা শুধুই একটা জেনারেল গাইডলাইন, কোনও সমাজের মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ফিতনার সম্মুখীন হলে ঐ সমাজের মুসলিমদের স্পেসিকভাবে কি করতে হবে তা ঐ দেশের সম্মানিত ইসলামিক স্কলারেরা বলতে পারবেন।

References:

  1. Trials, tribulations and solutions – Dr. Yasir Qadhi
  2. Sanctity & value of life – Egypt, Syria, Burma – Dr. Yasir Qadhi
  3. Attitude towards fitnah – Shaykh Saalih Al-Munajjid (IslamQA)
  4. Ahlu sunnah wal jamaah on Rebelling Against The Ruler
  5. Islam Today on Rebelling Against The Ruler
  6. IslamQA.info on Rebelling Against The Ruler
  7. বাংলাদেশ এর বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় – মতিউর রহমান মাদানী
  8. How to react when Prophet Muhammad (PBHU) is insulted? – Dr. Zakir Naik
  9. Seerah Pt. 73 – Battle of Mu’ta Pt. 2 – Yasir Qadhi
  10. Devil’s Trap – Hamza Yusuf
  11. Explanation of hadith no. 34 from Imam An-Nawawi’s 40 hadith – Islamic Online University’s free diploma course