রাসূলুল্লাহ ﷺ এতগুলো বিয়ে করেছিলেন কেন?

bohubibaho2

সাধারণ মুসলিমের মনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরপাক খায়, তা হলো – রাসূলুল্লাহ ﷺ এতগুলো বিয়ে করতে গিয়েছিলেন কেন? সাধারণ মুসলিম পুরুষ না ৪টার বেশী বিয়ে করতে পারে না? উনি তাহলে ১১টা বিয়ে করলেন কেন? –বর্তমান সময় যখন অনলাইনে ও অফলাইনে নাস্তিকতা ও ইসলাম-বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে তখন সাধারণ মুসলিমের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে এবং এই লেখায় আমি সেই উত্তর দিব। কিন্তু সেই উত্তরে যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা ভূমিকার অবতারণা করতে হচ্ছে।

উত্তর বুঝার প্রি-রিকুইসিট জ্ঞান:

আমাদের উপমহাদেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে নিয়ে লেখা কিছু বইতে, এবং বিভিন্ন আলেমরা তাদের লেকচারে তাঁকে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি রকমের কথা বলে থাকেন। যেমন – রাসূলুল্লাহ ﷺ  নূরের তৈরী, তাঁকে সৃষ্টি না করা হলে কিছুই সৃষ্টি হত না, তিনি সকল প্রকার মানবিক ও জৈবিক চাহিদার উর্ধ্বে ছিলেন – ইত্যাদি। এই কথাগুলো ভুল। অবশ্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ  সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তিনি নিষ্পাপ, কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে তিনি আমাদের মতই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, যাকে তাঁর ঈমান ও আমলের কারণে আল্লাহ্‌ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।

বলুন, “আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ যার উপর প্রত্যাদেশ হয়েছে যে তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ্‌, তাই তাঁরই পথ অবলম্বন করো এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো (সূরা ফুসসিলাত ৪১:)

আমাদের মধ্যে যেমন আশা-আকাংক্ষা, দু:খ-কষ্ট, অস্থিরতা-রাগ আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মধ্যেও এর সবই উপস্থিত ছিল। তাঁর সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তিনি এগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণের রাখতে পারতেন, আমরা কখনো পারি, কখনো পারি না। আমাদের মধ্যে যেমন কামনা-বাসনা আছে, স্বাভাবিকভাবে মানুষ হিসাবে তাঁর মধ্যেও এগুলো ছিল। আমরা যেমন সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হই, তিনিও সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন। আমাদের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো – আমরা আমাদের বাসনা পূরণের জন্য আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমা লঙ্ঘন করে ফেলি, যার দিকে তাকানো উচিত নয় তার দিকে তাকাই, যার সাথে সম্পর্ক করা আল্লাহর  ﷻ বিধানের বাইরে তার সাথেও সম্পর্ক করি। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চাহিদা পূরণের জন্য কখনোই আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমাকে লঙ্ঘন করেননি, সর্বাবস্থায় আল্লাহর  ﷻ হুকুম মেনে চলেছেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ (বা যে কোন মানুষের) যে কোন কাজ সম্পর্কে আমাদের আপত্তি থাকবে না যদি তা নিচের দুইটা (both) বিষয়কে মেনে চলে –

এক যদি তা আল্লাহর  ﷻ  দেয়া সীমার মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ যদি কোন কিছুকে হালাল করে থাকেন তাহলে সেটা করলে দোষের কিছু নেই।

দুই যদি কাজটি ঐ সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। (নামাজ,রোজা তথা ইবাদতের ক্ষেত্রে এই ২য় শর্তটি পূরণ হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু পার্থিব কাজ যেমন বিয়ে, যুদ্ধ ইত্যাদির (worldly affairs) ক্ষেত্রে এই শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ)

উদাহরণস্বরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বহুবিবাহের কথা ধরা যাক। আমরা জানি – রাসূলুল্লাহ ﷺ বহু বিবাহ করেছেন – এটার অনুমতি আল্লাহর  ﷻ কাছ থেকেও আছে, আবার তৎকালীন সমাজেও এটা গ্রহণযোগ্য প্র্যাক্টিস ছিল – কাজেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বহুবিবাহ নিয়ে কোন মুসলিমের আপত্তি থাকবে না।  আবার বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় সাধারণভাবে বহু বিবাহ গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই কোন মুসলিম যদি সক্ষমতা থাকার পরেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনা করে বহুবিবাহ না করে – তাহলেও আমরা বলব সে ঠিক করেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে সমকামিতা একটি গ্রহণযোগ্য আচরণ, কিন্তু একজন মুসলিম হিসাবে আমরা এই আচরণের পক্ষে নই কারণ এটা আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমার বাইরে।

এখানে বলে রাখা ভাল যে, ইসলামিক আইন যদিও কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা’ (Consensus) ও কিয়াসের (Analogy) উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এর প্রয়োগ আরো কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে যার মধ্যে আছে –  মাসলাহা মুরসালা (Consideration of Public Welfare/জনতার বৃহত্তর স্বার্থ) ও উরফ (Social norm /সামাজিক রীতি)।

উপরের প্রি-রিকুইসিট জ্ঞানকে মাথায় রেখে এবার আসুন সরাসরি প্রশ্নে চলে যাওয়া যাক।

bohubibaho1

প্রশ্ন ইসলামের যেখানে ১জন পুরুষের জন্য ৪জন স্ত্রী রাখার অনুমতি আছে, সেখানে মুহাম্মাদ কিভাবে ১১টা বিয়ে করলেন? তাঁর বৈবাহিক জীবন কি অস্বাভাবিক নয়?

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর  ১১জন স্ত্রী ছিল, যার মধ্যে ৯ জন একসাথে স্ত্রী হিসাবে ছিল (বাকী ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল)।  তাঁর স্ত্রীদেরকে আমরা সম্মানের সাথে উম্মাহাতুল মু’মিনীন (ঈমানদারদের মাতা) বলে থাকি।

যদিও একজন মুসলিমের জন্য চারজনের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আল্লাহ্‌ চার এর বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এই অনুমতি দেয়া হয়েছে নিচের আয়াতের মাধ্যমে।

হে নবী, আমি আপনার জন্য বৈধ করেছি আপনার স্ত্রীদেরকে যাদের আপনি দেনমোহর দিয়েছেনআর কোন ঈমানদার নারী নবীর কাছে নিবেদন করলে আর নবী তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে বৈধ আর শুধু আপনারই জন্য, বাকী মুমিনদের জন্য নয় [সূরা আহযাব ৩৩:৫০]

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সুবিধা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেয়ার কারণ কি? আসুন এর কয়েকটা কারণ দেখা যাক –

রাসূলুল্লাহ এর শারিয়াহ কিছুটা ভিন্ন ছিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারিয়াহর কিছু অংশ সাধারণ মুসলিমদের থেকে ভিন্ন ছিল। এই ভিন্ন শারিয়াহ তাকে সুবিধা কিছু দিয়েছিল, কিন্তু দায়িত্ব দিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশী। যেমন – রাসূলুল্লাহ  ﷺ এর জন্য প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া ওয়াজিব ছিল, একবার যুদ্ধের সরঞ্জাম পড়ে ফেলার পর যুদ্ধে না যাওয়া তাঁর জন্য হারাম ছিল, দান গ্রহণ করা তাঁর জন্য হারাম ছিল, মৃত্যুর সময় পরিবারের জন্য একটা পয়সা সম্পদ রেখে যাওয়াও তাঁর জন্য হারাম ছিল, এমন কি আজ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বংশধরের কেউ যতই দরিদ্র হোক না কেন যাকাত নিতে পারবে না।  এত কঠিন কঠিন নিয়মের বিপরীতে আল্লাহ্‌ তাঁকে খুব অল্প কিছু বিধানে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হলো চারটির বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি।

রাসূলুল্লাহ চাইলে আরো বেশী বিয়ে করতে পারতেন

রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর যৌবনের প্রাইম টাইম একজন মাত্র স্ত্রীর সাথেই কাটিয়েছিলেন – ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর একজন মাত্র স্ত্রী ছিল। অথচ বহুবিবাহ করা আরব সমাজে একটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল এবং তিনি চাইলেই তখন একাধিক বিয়ে করতে পারতেন।  আমাদের সমাজে যেমন বিয়ের সময় ছেলেদের যোগ্যতা দেখা হয় – তার পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার দেখা হয়, তৎকালীন আরব সমাজে বিয়ের সময় একটা ছেলে বা মেয়ের একটা বৈশিষ্ট্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ছিল – তা হলো বংশমর্যাদা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন আরবের সবচাইতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের সবচাইতে সম্মানিত ও লিজেন্ডারি ব্যক্তিত্ব আব্দুল মুত্তালিব এর সবচেয়ে প্রিয় নাতি। তাই তিনি চাইলে যৌবনে ও নবুয়তির আগে ১০-১২টা বিয়ে করা তার জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তা তিনি করেন নি।

সেই সমাজে বিয়ে ছিল ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি অন্যতম উপায়

বর্তমানে আমরা যে সমাজে বাস করি তাতে বিয়ের উদ্দেশ্য একটাই থাকে – সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী একটা ছেলে / মেয়েকে তার জীবনসঙ্গীর সাথে মিলিয়ে দেয়া। কিন্তু, আরব সমাজে “রাষ্ট্র” বলে কিছু ছিল না এবং এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের ঝগড়া-যুদ্ধ লেগেই থাকত। সেকালে সামাজিকভাবে সুরক্ষিত থাকার একমাত্র উপায় ছিল গোত্রবদ্ধ হয়ে চলা, তাই সেই সমাজে বিয়ের আরেকটি অন্যতম কারণ ছিল অন্য পরিবার বা অন্য গোত্রের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করা।  আর রাসূলুল্লাহ ﷺ যেহেতু আরবদের ৩ হাজার বছরের পুরনো রীতি-নীতিকে পরিবর্তন করে মাত্র ২৩ বছরে সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ইসলামের প্রবর্তন করছিলেন, কাজেই এটা তার জন্য খুব জরুরী ছিল যে তিনি বিয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করবেন। এই দিক থেকে চিন্তা করলে, বহুবিবাহের অনুমতি রাসূল্ললাহর ﷺ জন্য কোন সুবিধা ছিল না, বরং ছিল এক মহা দায়িত্ব।

নিচে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীদের তালিকা ও বিয়ের মূল কারণ উল্লেখ করা হল।

 

 

  স্ত্রীর নাম বিয়ের মূল কারণ বিয়ের সাল মন্তব্য
খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা) সাধারণ সামাজিক বিয়ে নবুয়তের ১০ম বছর খাদিজার প্রস্তাবে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। এটা ছিল খাদিজার ৩য় বিয়ে।

খাদিজা জীবিত থাকতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আর কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি। খাদিজার মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ ﷺর বয়স ছিল ৫০ বছর।  তাঁরা দীর্ঘ ২৫ বছর সংসার করেছিলেন।

সাওদা বিনতে জাম’আ (রা) সাধারণ সামাজিক বিয়ে নবুয়তের ১০ম বছর রাসূলুল্লাহ ﷺর খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।
আইশা (রা) বিনতে আবু বকর (রা) সাধারণ সামাজিক বিয়ে ও বন্ধু আবু বকর (রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন।এছাড়াও এতে আল্লাহর  ﷻ  পরোক্ষ নির্দেশ ছিল। (বুখারি) বিয়ের প্রতিশ্রুতি: নবুয়তের ১১ তম বছর।

একসাথে বসবাস শুরু: ১ম হিজরী

 

রাসূলুল্লাহ ﷺর খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।

আইশা জিনিয়াস ছিলেন। তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, প্রাচীন কবিতা ও বংশ-জ্ঞান (Geneology) এ এক্সপার্ট ছিলেন। অন্যতম সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী।  তিনি রাসূলুল্লাহর ﷺ একমাত্র কুমারী স্ত্রী।

হাফসা (রা) বিনতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বন্ধু উমার(রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন ৩য় হিজরী এটা হাফসার দ্বিতীয় বিয়ে।  আগের বিয়ে তিনি ১১ বছর বয়সে করেছিলেন।
যাইনাব বিনতে খুযাইমা (রা) যাইনাবের দানশীলতার পুরষ্কার ও উত্তরের নাজদি অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ৪র্থ হিজরী এটা ছিল তাঁর তৃতীয় বিয়ে। যাইনাব তাঁর দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তাঁর স্বামী শহিদ হওয়ার পর এরকম মহান নারীর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺই ছিলেন একমাত্র যোগ্য স্বামী। বিয়ের ৮ মাস পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
উম্মে সালামা (রা)

অন্য নাম: হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া

উম্মে সালামার ঈমান ও আমলের পুরষ্কার ৫ম হিজরী এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। তাঁর স্বামী উহুদের যুদ্ধের আঘাতে শহীদ হন। মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামী দু’আ করেছিলেন তিনি যেন তার চাইতেও ভালো একজনকে স্বামী হিসাবে পান। আল্লাহ্‌ সেই দু’আ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাধ্যমে কবুল করেন। উম্মে সালামা বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন।
যাইনাব বিনতে জাহশ (রা) আল্লাহর  ﷻ নির্দেশ (সূরা আহযাব:৩৭) ও পালক পুত্র যে নিজের পুত্র নয় এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা ৫ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। যাইনাব কুরাইশি ছিলেন ও রাসূলুল্লাহর ﷺ ফুপাত বোন ছিলেন। আরব সমাজে, কাযিনদের মধ্যে বিয়ে হওয়া খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। আনাস(রা) বলেন – রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি কোরআনের কোন আয়াত লুকাতেন তাহলে যাইনাবের সাথে বিয়ের আয়াতটাকেই লুকাতে চাইতেন (বুখারী)। – শুধু আল্লাহর  ﷻ হুকুম পালনের জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বিয়েটা করেন।
যুয়াইরিয়াহ বিনতে আল-হারিস (রা) বানুল মুস্তালিকের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন ৫ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন বানুল মুস্তালিক গোত্রপ্রধানের মেয়ে। যুয়াইরিয়াকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে মুক্ত করেন এবং বিয়ে করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।  শত শত সাহাবী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি করে দেন।  এই বিয়ের ফলে সম্পূর্ন বানুল মুস্তালিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা)

অন্য নাম: রামলা

কুরাইশদের মধ্য থেকে শত্রুভাব অপসারণ ৭ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তৎকালীন মুশরিক কুরাইশদের অবিসংবাদিত নেতা আবু সুফিয়ানের মেয়ে। কুরাইশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে উম্মে হাবিবা আবিসিনিয়ায় চলে যান যেখানে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়, পরে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে অনেক মুশরিকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ইসলামের প্রতি ভালবাসা তৈরীতে সাহায্য করে।
১০ সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা) ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ৭ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন ইহুদীদের বনু নাদির গোত্রের নেতার মেয়ে। তিনি প্রথম থেকেই বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মকে পছন্দ করতেন। খন্দকের যুদ্ধে তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে মুক্তি দেন ও বিয়ে করেন। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দি মুক্তিতে উৎসাহ দেন ও এটাও প্রমাণ করেন – ইহুদীদের প্রতি মুসলিমদের কোন জাতিগত বিদ্বেষ নেই।
১১ মাইমুনাহ বিনতে আল-হারিস(রা)

ইসলাম-পূর্ব নাম: বাররাহ

চাচা আব্বাসের অনুরোধে ও কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ৮ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন উমরা করতে মক্কা আসেন তখন চাচা আব্বাস (রা) তাঁকে অনুরোধ করেন মাইমুনাকে বিয়ে করতে।  এই বিয়ের পর রাসূল্ললাহ মক্কার কুরাইশদেরকে (যারা তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি) তাঁর ওয়ালিমায়  দাওয়াত দেন ও এভাবে তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের চেষ্টা করেন।

 

উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর বিয়েগুলো যে সব কারণে করেছিলেন তার মধ্যে আছে – স্বাভাবিক সামাজিক কারণ, কোন বন্ধুর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করণ, কোন গোত্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, অথবা যে গুণবতী নারীর স্বামী শহীদ হয়েছে তাঁকে সম্মানিত করার জন্য।  আর এই বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে সেই নারীর সৌন্দর্যও যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আকর্ষণ করে থাকে তাতে দোষের কিছু নেই। একজন পুরুষ তো তাকেই বিয়ে করতে চাইবে যাকে তার সুন্দর লাগে – এটাই তো স্বাভাবিক বায়োলজিকাল ব্যাপার।

রাসূলুল্লাহ জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই

রাসূলুল্লাহ কখনোই জোর করে কাউকে বিয়ে করেননি। তিনি যাদেরকে বিয়ে করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ এর স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। যে তাঁর স্ত্রী হতে চায়নি, তাকে তিনি বিয়ে করেননি।

সাহিহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে আমরা একটি ঘটনা জানি যেখানে উমাইমাহ বিনতে শাহরিল নামক এক মহিলা প্রাথমিকভাবে রাসূলুল্লাহ এর  স্ত্রী হতে সম্মতি জানায়। কিন্তু, বিয়ের রাতে সেই মহিলা তার মত পরিবর্তন করে ও স্ত্রী হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ কে দেখে সে বলে উঠে – “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি”।  জবাবে রাসূলুল্লাহ বলেন – “তুমি সবচাইতে বড়র কাছেই আশ্রয় চেয়েছ। যাও, তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও।”   এভাবে করে বিয়ে কনসুমেট (স্বামী-স্ত্রী হিসাবে একসাথে থাকা) করার আগেই রাসূলুল্লাহ উমাইমাহকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন। অন্য কিছু বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ কে অপদস্থ করার জন্য কাফেররা মহিলাটাকে দিয়ে এরকম করিয়েছিল। ইতিহাসের বইগুলোতে এরকমও পাওয়া যায় যে এই মহিলা তার বাকী জীবন রাসূলুল্লার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আফসোস করতে করতে কাটিয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ জোর করে কোন স্ত্রীকে ধরে রাখেন নাই

রাসূলুল্লাহ ﷺ তো জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই, জোর করে কাউকে বিয়ের পরে ধরেও রাখেন নাই। বরং, তাঁর যে কোন স্ত্রী চাইলেই তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন।

হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, “তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ বিলাসিতা কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদেরকে ভোগবিলাসের ব্যবস্থা করে দেই আর তোমাদেরকে ভদ্রতার সাথে বিদায় দেই আর তোমরা যদি আল্লাহ্‌, তাঁর রাসূল পরকাল চাও, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎ কর্ম করে আল্লাহ্তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন (সূরা আহযাব ৩৩:২৮২৯)

হাদিস থেকে আমরা বরং দেখি, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীরা তাঁর কাছে ডিভোর্স তো চানই নি বরং প্রত্যেকেই যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন প্রশংসা করেছিলেন যে স্বামী হিসাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ কতটা মহৎ ছিলেন।

ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর তিনি আর বিয়ে করেন নাই

আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ৭টি বিয়েই হয়েছে ৩য় থেকে ৮ম হিজরীর সময়। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের সবচেয়ে আন্দোলিত সময়, যখন মুসলিমরা বিভিন্ন গোত্রের সাথে যুদ্ধে যাচ্ছে, আবার বিভিন্ন গোত্রের সাথে শান্তিচুক্তি করছে। কাজেই, এই সময় এই বিয়েগুলো ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের অংশ বিশেষ। তিনি যদি নারীলোভীই হয়ে থাকবেন তাহলে তো এর আগে-পরেও তাঁর অনেক বিয়ে করার কথা ছিল। শুধু তাই না, রাসূলুল্লাহ ﷺ বেঁচেছিলেন ১১ হিজরী পর্যন্ত। কিন্তু, ৭ম হিজরির হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হুনাইনের যুদ্ধে বিজয়ের পরে আরব ভূখন্ডে মুসলিমদের একচ্ছত্র আধিপত্য সময়ের ব্যাপারে হয়ে দাঁড়ায় – আল্লাহ্‌ নিজেই সূরা ফাতহ তে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে “পরিষ্কার বিজয়” হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই আমরা দেখতে পাই, ৯ম-১১তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ গোত্রভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়নে আর কোন বিয়েও করেননি। তিনি যদি আসলেই শুধু নিজের চাহিদায় বিয়ে করে থাকতেন তাহলে তিনি ঐ শেষের ২ বছরেও বিয়ে করা করা থামাতেন না।

তথ্য সূত্র:

১) শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার

২) ড. সাল্লাবির সীরাহ বই

৩) শেইখ সাফিউর রাহমান মুবারাকপুরীর সীরাহ বই

৪) দি কোড অফ স্কলারস – শেইখ ইয়াসির বিরজাস

আল্লাহর হুকুমেই যদি সব কিছু হয় তো আমার দোষ কি?

big question

ভাগ্য বা কদর (predestination) নিয়ে অনেক মুসলিমকে প্রায়ই দ্বিধাদ্বন্দে ভুগতে  দেখা যায়। ভাগ্য সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন হয়তো মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না, এই ওয়েবসাইট দেখছেন, ঐ বই পড়ছেন —আর এই সুযোগে শয়তান এসে মনের মধ্যে অবিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়ে গেল! দ্বন্দ তৈরীকারী এরকম একটা প্রশ্ন হলো—

১) আল্লাহ্‌ যা ভাগ্যে লিখে রেখেছেন তার বাইরে তো নাকি কিছুই হবে না। তাহলে আমার আর চেষ্টা করার দরকার কি?

আসুন এই প্রশ্নটার উত্তর বুঝা যাক একটা গল্পের মাধ্যমে।

একটা ক্লাসের কথা মনে করুন। সেই ক্লাসে একজন শিক্ষক এবং অনেকগুলো ছাত্র আছে। সেমিষ্টারের ক্লাস শেষে এক সময় ফাইনাল পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসলো। শিক্ষক সাহেব যেহেতু তার ছাত্রদের সবাইকেই খুব ভালো করে চিনেন-জানেন, তিনি চ্যালেঞ্জ করে বললেন – আমি এক্স্যাক্টলি জানি কোন্‌ ছাত্র কী  গ্রেড পাবে। শুধু মুখে বলাই নয় – তিনি একটা কাগজে লিখে পর্যন্ত রাখলেন – অমুকে এ+ পাবে, অমুকে এ পাবে, অমুকে ফেইল করবে ইত্যাদি। শিক্ষক কাগজে কী লিখেছেন তা সম্পর্কে ছাত্রদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। তারা প্রত্যেকেই যার যার মতো পরীক্ষা দিল। মার্কিং স্কিম অনুসারে পরীক্ষার খাতাগুলি চেক করা হলো। এরপর দেখা গেল – একি! শিক্ষক সাহেব যে ছাত্র সম্পর্কে যেই গ্রেড কাগজে লিখেছিলেন, হুবুহু ঐ গ্রেডই সে পেয়েছে! ছাত্রের সম্পর্কে শিক্ষকের জ্ঞান এতই নিখুঁত ছিলো যে, তিনি গ্রেডগুলো অনুমান  করতে একবিন্দু ভুল করেননি। ভেবে দেখুন, এই অবস্থায় কোনও ছাত্র এসে বলতে পারবে না – শিক্ষক আগেই গ্রেড লিখে রেখেছিলেন বলে আমি ঐ গ্রেড পেয়েছি। কারণ, শিক্ষক আগে যে গ্রেড লিখে রেখেছিলেন – সেটা কিছুতেই পরীক্ষার রেসাল্টকে প্রভাবিত করেনি। ছাত্ররা তো আর আগে-ভাগে জানতো না কে কী গ্রেড পাবে। কাজেই, যে এ+ পেয়েছে সে নিজের ইচ্ছাতেই পড়াশুনা করে এ+ পেয়েছে, আর যে ফেইল করেছে সে নিজের ইচ্ছাতেই পড়াশুনা না করার জন্য ফেইল করেছে।

যেহেতু আল্লাহ্‌ “আল-আলিম” বা সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জ্ঞানী, তাই তিনি অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের সব কিছুই সম্পূর্ণভাবে জানেন। কবে কী হবে, কে কবে জন্মাবে, কে কবে বিয়ে করবে, কার কত টাকা হবে, কোথায় কোন্‌ দুর্ঘটনা ঘটবে, কার কী অসুখ হবে, কে কিভাবে মারা যাবে, কে জান্নাতে যাবে, কে জাহান্নামে যাবে – এ সবই আল্লাহ্‌ জানেন। আল্লাহর অজানা কিছুই নেই। আল্লাহ্‌ জানেন ভবিষ্যতে কী হবে, কী না হবে, যা না হবে তা হলেই বা কি হতো – তার সব কিছু। আর এই তথ্যগুলোকে তিনি “লাওহে মাহফুজ” নামক এক গ্রন্থে লিখে পর্যন্ত রেখেছেন (http://quran.com/36/12)। কার জন্য লিখেছেন? আমাদের জন্য। আমাদেরকে বুঝানোর  জন্য যে, হে মানবজাতি, চেষ্টা করো, দু’আ করো, কিন্তু টেনশন কোরো না। চারপাশের এই পৃথিবীকে তোমার যতই বিশৃঙ্খল, নিয়ন্ত্রনহীন মনে হোক না কেন – আল্লাহর অগোচরে কোনও কিছুই হচ্ছে না, ভালো-মন্দ যা-ই হচ্ছে তা আল্লাহ্‌ হতে দিচ্ছেন বলেই হতে পারছে।   

২) দাড়ান , আপনি কি তাহলে বলতে চাচ্ছেন পৃথিবীতে এত অনাচার-অত্যাচার সব আল্লাহর ইচ্ছাতেই হচ্ছে? আমি যে পাপগুলি করি তার সবও আল্লাহর ইচ্ছাতেই করি? তাহলে পাপের জন্য পরকালে মানুষকে আর শাস্তি দেয়া হবে কেন? মানুষরা কি সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই করছে না?

এই মহাবিশ্বে যা কিছুই হচ্ছে – হোক সে কোনও প্রাকৃতিক ঘটনা, অন্যায়-অত্যাচার, মন্দ কাজ বা ভালো কাজ – তার সবই আল্লাহর অনুমতিতে হচ্ছে। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া গাছের একটা পাতা পর্যন্ত পড়ে না (http://quran.com/6/59)। আমরা যা করতে চাই, আল্লাহ্ সেটা হতে দেন। কিন্তু আল্লাহ আমাদেরকে কোনও কিছু করার স্বাধীনতা দিয়েছেন বলেই সেটা করে ফেলা উচিত হবে না। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সা) যে কাজগুলোকে ফরজ/ওয়াজিব বলেছেন আমাদের দায়িত্ব হলো সেগুলো অবশ্যই পালন করা, আর তাঁরা যেগুলো হারাম বলেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকা।

পরীক্ষার হলের উদাহরণটা আবার টেনে আনা যাক। ধরুন – শিক্ষক সাহেব এবার এমসিকিউ টাইপের পরীক্ষা নিচ্ছেন। পরীক্ষায় দেয়া হয়েছে ৫০টি প্রশ্ন, প্রতিটা প্রশ্নের সাথে দেয়া আছে ৪টি সম্ভাব্য-উত্তর, যার মধ্যে একটি মাত্র উত্তর হলো সঠিক।  এখন শিক্ষক চাইলে পরীক্ষায় এই ৫০টি প্রশ্ন না দিয়ে সম্পূর্ন ভিন্ন ৫০টি প্রশ্ন করতে পারতেন। অথবা, বর্তমান প্রশ্নপত্রে যে সম্ভাব্য-উত্তরগুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলোকে পরিবর্তন করে ভিন্ন উত্তরও দিতে পারতেন। অর্থাৎ, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে কি দেয়া হবে- তার উপর শিক্ষকের পূর্ন নিয়ন্ত্রণ আছে। একজন ছাত্র যখন উত্তর লিখবে তখন তাকে শিক্ষক যে সম্ভাব্য-উত্তরগুলি দিয়েছিলো তার থেকেই একটাকে উত্তর হিসাবে বেছে নিতে হবে, সে চাইলেও এই সম্ভাব্য উত্তরগুলোর বাইরে যেতে পারবে না – এটাই পরীক্ষার নিয়ম। সুতরাং, ছাত্র কী উত্তর দিতে পারবে তা শিক্ষকের প্রশ্নের উপর নির্ভরশীল। একইভাবে আল্লাহও প্রতিটা মানুষকে জীবনে বিভিন্ন চয়েস দেন। আমরা চাইলেও সেই চয়েসগুলোর বাইরে যেতে পারি না।   

এবার ভাবুন: পরীক্ষার সময় শিক্ষক নিজেই হল পরিদর্শন করে ছাত্রদের অবস্থা দেখছেন। ঘুরতে ঘুরতে এক সময় শিক্ষকের চোখে পড়ল যে, একজন ছাত্র ভুল উত্তর বেছে নিচ্ছে। এখন শিক্ষক চাইলে ঐ ছাত্রকে তখুনি থামিয়ে দিয়ে  বলতে পারেন – “এই ছোড়া! তুমি তো ভুল উত্তর দিচ্ছ!”, এমনকি খাতা পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারেন। কিন্তু তিনি সেরকম কিছু না করে ছাত্রকে ভুল উত্তর বেছে নিতে দিলেন। কেন? কারণ, পরীক্ষার মধ্যে উত্তর বলে দিলে তো পরীক্ষা নেয়ারই মানে হয় না। পরীক্ষা শেষে ছাত্র খাতা জমা দিল। এখন যেটা হওয়ার কথা তা হলো: শিক্ষক মার্কিং স্কিম অনুসারে খাতা চেক করবেন। সঠিক উত্তর হলে পয়েন্ট দিবেন, ভুল উত্তর হলে কোনো পয়েন্ট দিবেন না। কিন্তু, শিক্ষক যদি সিদ্ধান্ত নেন তিনি খুব উদারভাবে খাতা দেখবেন, প্রায় সঠিক উত্তরের জন্যও মার্ক দিবেন, তাহলে কারো কিন্তু কিছু বলার থাকবে না। একইভাবে, আল্লাহ্‌ মানুষকে পৃথিবীতে অন্যায়-অত্যাচার করে যেতে দেন। সব অন্যায় যদি আল্লাহই থামিয়ে দেন তাহলে মানুষের মধ্যে কে ভালো কে মন্দ – এই পরীক্ষা কিভাবে হবে? পৃথিবী রেসাল্ট পাওয়ার জায়গা না, পৃথিবী হলো পরীক্ষার জায়গা, আর এই পরীক্ষার রেসাল্ট পাওয়া যাবে পরকালে।

তাহলে পরীক্ষার হলের উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি – একজন ছাত্রের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সম্পূর্ণ শিক্ষকের নিয়ন্ত্রণে, সে যখন উত্তর লিখছে তখন সে তা আদৌ লিখে শেষ করতে পারবে কিনা, সেটাও শিক্ষকের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। সে পরীক্ষার খাতা জমা দেয়ার পর রেসাল্ট কী হবে তাও শিক্ষকের নিয়ন্ত্রনে। অর্থাৎ, পরীক্ষা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটার উপর শিক্ষক পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন। ছাত্রের স্বাধীনতা শুধু এমসিকিউ এর গোল্লা পূরণে– আর সে কোন্‌ গোল্লা পূরণ করলো সেই অনুসারেই তাকে মার্ক দেয়া হবে। এখন ছাত্র যদি ফেইল করে তাহলে দায়ী কে? উত্তর হবে – ছাত্রই দায়ী। তাকে শিক্ষক ভুল উত্তর বেছে নেয়ার সুযোগ দিয়েছিল পরীক্ষা করার জন্য – কিন্তু শিক্ষক মোটেও চাননি সে ফেইল করুক।

অনুরূপভাবে, মহান আল্লাহ্ জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের কিছু চয়েস দেন, এই চয়েসগুলো কী হবে তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন। আমরা সেই চয়েসগুলো থেকে আমাদের যেটা পছন্দ হয় সেটা বেছে নেই। সেই বেছে নেয়ার ফলাফল কী হবে সেটাও আল্লাহই নিয়ন্ত্রণ করছেন। আগুনে ঝাঁপ দিলে মানুষ পুড়ে মারা যাবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আল্লাহ্ চেয়েছিলেন তাই ইব্রাহিম(আ) আগুনে পুড়েননি। গলায় ছুরি চালালে মানুষ মরে যাবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আল্লাহ্ চাননি তাই ইব্রাহিম(আ) তাঁর সন্তানের গলায় ছুরি চালানোর পরেও তিনি মরেননি। চয়েস এবং তার ফলাফলের জন্য পরকালে আমাদের জবাব দিতে হবে না, ওগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রনে নেই। আমাদের জবাব দিতে হবে আমরা কোন্‌ চয়েসটিকে বেছে নিচ্ছি তার জন্য।

৩) আচ্ছা ভাই সবই বুঝলাম, সব কিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু, উনি যদি সব কিছুর উপর এতই পাওয়ারফুল হয়ে থাকেন তাহলে পৃথিবীতে এত অন্যায়-অত্যাচারে হচ্ছে এগুলি তিনি থামাচ্ছেন না কেন? উনি কি একটা জগত তৈরী করতে পারতেন না যেখানে কোনও অন্যায়-অত্যাচার থাকবে না?

আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে – আপনি যে অন্যায়-অত্যাচারহীন জগতের কথা বলছেন সেরকম জগত মহান আল্লাহ্ বহু আগেই তৈরী করে রেখেছেন – সেটা হলো ফেরেশতাদের জগত। ফেরেশতারা আল্লাহর অবাধ্য হয় না, পাপও করে না, ফলে কোন অন্যায়-অত্যাচারের মধ্যেও পড়ে না। মহান আল্লাহ্‌ মানুষকে ইচ্ছে করেই এমনভাবে তৈরি করেছেন যে, মানুষ পাপ করবে, অন্যায় অত্যাচারে করবে – এটাই মানুষ সৃষ্টির পার্ফেক্ট মডেল।

মানুষ যে খারাপ কাজ করে এটা হচ্ছে মানুষের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের বাই-প্রোডাক্ট। সেই বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো – “বেছে নেয়ার ক্ষমতা”। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোনও অস্তিত্বই যেহেতু ভুলের উর্ধ্বে নয়, কাজেই আল্লাহ্ কোনও অস্তিত্বকে বেছে নেয়ার ক্ষমতা দিলেই সে ভুল করবে। এ জন্যই মহান আল্লাহ্ যখন ফেরেশতাদের বলেছিলেন আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা (মানুষ) পাঠাবো (http://quran.com/2/30) তখন তারা বলে উঠেছিল – “আপনি কি এমন কাউকে পাঠাবেন যারা দুর্নীতি আর খুন-খারাপি করবে?” কেন এমন বলেছিল ফেরেশতারা? কারণ, “খলিফা” শব্দের একটা অর্থ হলো যে অপরের কথায় উঠবস করে না, যে স্বাধীনচেতা, যার নিজের বেছে নেয়ার ক্ষমতা আছে। আর “বেছে নেয়ার ক্ষমতা”-ওয়ালা অস্তিত্বটি যদি ভুলের উর্ধ্বে না হয়, ভুল সে করবেই, যার পরিপ্রেক্ষিতে গন্ডগোল সে বাধাবেই।

মানুষকে পাপ করতে দেয়ার আরেকটা মহান সুফল আছে। ফেরেশতারা পাপ করতে পারে না, ফলে তারা আল্লাহর কাছে মাফও চাইতে পারে না। কিন্তু, মানুষ পাপ করে, পাপ করে বলেই আল্লাহর কাছে মাফ চায়। আর মহান আল্লাহ্ হচ্ছেন গফুর, গাফফার – পরম ক্ষমাশীল। মানুষ যত পাপ করতে পারে তিনি তার চাইতেও বেশী ক্ষমা করতে পারেন। তিনি শুধু ক্ষমাই করেন না, তিনি ক্ষমা করতে ভালবাসেন। আর তাই মানুষের পাপ করা আর ক্ষমা চাওয়ার মধ্যেই মানব সৃষ্টির স্বার্থকতা লুকিয়ে আছে। পাপ আর ক্ষমাপ্রার্থনার মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর ভালবাসা পায়, আল্লাহর কাছে আসে।

৪) যত যাই বলেন ভাই, পৃথিবীতে এত অন্যায়-অত্যাচার হচ্ছে আর আল্লাহ্‌ কিছুই করছেন না, ব্যাপারটা মেনে নেয়া যায় না। ঠিক কিনা?

আমরা মুসলিমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে ঘটা প্রতিটা অন্যায়, প্রতিটা অত্যাচারের শেষ পরিণতিতে ভালো কিছু আছে। সেই ভালো কিছু হয়তো আমরা এই দুনিয়ায় দেখে যেতে পারবো, অথবা পারবো না। কিন্তু, বিচার দিবসে এই পৃথিবীর প্রতিটা ঘটনার পেছনের ঘটনা, পরের ঘটনা আল্লাহ্ আমাদের কাছে পরিষ্কার করে দেবেন। আল্লাহ্ পরকালে সব কিছুর হিসাব কড়ায়-গন্ডায় মিটিয়ে দেবেন। সেদিন কারো মনে বিন্দু পরিমাণ অসন্তোষ থাকবে না – যে জান্নাতে যাবে তার মনে তো কোনো অসন্তোষ থাকবেই না, এমন কি যে জাহান্নামে যাবে সেও নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, জাহান্নামই তার জন্য প্রাপ্য স্থান।

একটা ১০০ পৃষ্ঠার বইকে যেমন ১০ পৃষ্ঠা পড়ে বিচার করা যায় না, ঠিক তেমনি জীবনের কিছু ঘটে যাওয়া অন্যায়-অত্যাচার দেখে পুরো কালের প্রবাহকে বিচার করা যাবে না। আমরা যখন আমাদের শিশু সন্তানকে টীকা দিতে নিয়ে যাই, তখন সে হতবিহবল চোখে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে – আমার মা-বাবার চোখের সামনে এই নিষ্ঠুর ডাক্তারটা আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছে কীভাবে? কিন্তু সেই মুহুর্তে আমরা মা-বাবারা ডাক্তারের প্রতি উল্টো কৃতজ্ঞতা অনুভব করি। কারণ, আমরা জানি এই সাময়িক বেদনাই আমাদের সন্তানকে দীর্ঘস্থায়ী সুস্থতার দিকে নিয়ে যাবে। একইভাবে, একজন মুসলিম ভালো-মন্দ সকল সময়েই মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখে। সে জানে, সাময়িক এই কষ্টের মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ আমাদের আরো বড় কোনো বিপদ হটিয়ে দিচ্ছেন, গুনাহ মাফ করছেন, ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন, ভালো কোনও পুরষ্কারের জন্য প্রস্তুত করছেন অথবা মুনাফিক থেকে মুসলিমদেরকে পৃথক করছেন (http://quran.com/3/154)।

পৃথিবীতে হতাশা-বেদনা, অকস্মাৎ দুর্ঘটনা, প্রাণঘাতী অসুখের হঠাৎ আক্রমণ, যে কোনও মুহুর্তে মরে যাওয়ার আশংকা সত্ত্বেও মানুষ যেভাবে দুনিয়াকে পাওয়ার লোভে অন্ধ হয়ে থাকে, সেই পৃথিবীতে যদি এই সব কষ্ট-সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো না থাকত তাহলে মানুষের লোভ যে কোন্‌ পর্যায়ে যেয়ে ঠেকত তা সহজেই অনুমেয়।      

৫) শেষ প্রশ্ন, আল্লাহ্‌ যদি সবই জানেন তাহলে আর পৃথিবীতে এত পরীক্ষা নেয়ার দরকার কি? সরাসরি মানুষকে জান্নাতে-জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেই তো হয়?

একজন শিক্ষক যদি পরীক্ষার হলে কোনো ছাত্রকে বলে – “আমি জানি তুমি খুব খারাপ ছাত্র, তাই তোমাকে আমি পরীক্ষার প্রশ্ন দিব না, তুমি “এফ” পেয়েছ, এখন তুমি বাসায় যাও”। ছাত্রটি যদি ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রও হয় তবু কি সে এটা মেনে নিবে? না, সে পরীক্ষা দিয়ে চান্স নিতে চাইবে। আল্লাহ্‌ তো জানেনই কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে কিন্তু আমরা তো আর জানি না। তাই আল্লাহ্‌ আমাদের এই দুনিয়ায় পরীক্ষা দিতে পাঠিয়েছেন। আমরা যা করছি তার সবকিছু দুই ফেরেশতা লিখে রাখছে। বিচার দিবসে যখন সেই পরীক্ষার খাতা আমাদের সামনে এনে লাইন ধরে ধরে মার্কিং করা হবে – তখন পাশই করি আর ফেইলই করি, কারোই কমপ্লেইন করার মতো কিছু থাকবে না।

আল্লাহর একটা নাম হলো “আল-খালিক” বা সৃষ্টিকর্তা। তাই তিনি সুন্দর-সুন্দর জিনিস তৈরী করতে ভালবাসেন। এর জন্যই তিনি মানুষ তৈরী করেছেন, মহাবিশ্ব তৈরী করেছেন, ফেরেশতা তৈরী করেছেন, জান্নাত-জাহান্নাম তৈরী করেছেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁর কাজগুলো স্টেপ বাই স্টেপ করেন, তিনি চিন্তাশীলতা পছন্দ করেন, তাড়াহুড়া নয়। তাই তিনি বিশ্বজগতকে এক মুহুর্তে সৃষ্টি না করে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। একইভাবে তিনি মানুষকেও তার পাপের জন্য সাথে সাথেই পাকড়াও না করে, মৃত্যু পর্যন্ত সময় দেন যাতে সে পরকালে যেয়ে বলতে না পারে – “আল্লাহ্‌ আমাকে তো তুমি যথেষ্ট পরিমানে সুযোগ দাওনি”।  

আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন যে, পুনরুত্থানের দিন এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে যে পৃথিবীতে আরাম-আয়েশ এবং প্রাচুর্যতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছিল কিন্তু এখন সে জাহান্নামের বাসিন্দা হবে। এই লোকটিকে একবার মাত্র জাহান্নামের আগুনে ডুবানো হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদমসন্তান! তুমি কি (দুনিয়াতে) কোনও শান্তি বা কোনও সম্পদ পেয়েছিলে? সে উত্তর দিবে: আল্লাহর কসম! না, ও আমার রব!

এবং এরপর এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে যে জান্নাতের বাসিন্দা কিন্তু সে পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছিলো। এই লোকটিকে জান্নাতে একবার মাত্র ডুবানো হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদমসন্তান! তুমি কি (দুনিয়াতে) কোনও কষ্টের মধ্যে ছিলে? সে বলবে: আল্লাহর কসম! না, ও আমার রব! আমি দুনিয়াতে কখনোই কোনো কষ্টের সম্মুখীন হইনি বা কোনো দুর্দশায় পড়িনি। – (সহীহ মুসলিম)

রেফারেন্স সমহূ:

১) Qadr – Nouman Ali Khan on the Deen Show

২) Aspects of Islam – Predestination – Yusuf Estes

৩) Belief in Destiniy – Dr. Bilal Philips

৪) Explanation of Kitab at Tawheed (Chapter 14) – Yasir Qadhi

৫) Why did Allaah create the heavens and the earth in six days? – IslamQA.Info

ইসলাম যে সত্য ধর্ম তার প্রমাণ কি?

download

প্রশ্ন: সব ধর্মের মানুষই তো বলে তার ধর্ম সত্যইসলাম যে সত্য ধর্ম তার প্রমাণ কি?

উত্তর:

আর ওদেরকে যখন বলা হয় ‘আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তোমরা তার অনুসরণ করো,’ তারা বলে, ‘না, না, আমাদের পূর্বপুরুষদের যেমন দেখেছি আমরা তা-ই অনুসরণ করব’। যদি শয়তান তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের দিকে ডাকে, তবুও কি? – সূরা লুক্বমান (৩১:২১)

আপনার কাছে কেউ যদি এসে বলে, ২ আর ২ যোগ করলে ৩ হয়, কেউ যদি এসে বলে ৪ হয় আর কেউ যদি বলে ৫ হয় – তখন আপনি তাদের বিবাদ মিটানোর জন্য কি করবেন? আপনি আপনার যুক্তি ও বুদ্ধি প্রয়োগ করবেন, এবং যেই উত্তরটাকে আপনি প্রমাণ করতে পারবেন সেটাইকেই সত্য বলে গ্রহণ করবেন। পৃথিবীর সব কিছুই যেহেতু আমরা যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে আমরা বিচার করি, তাহলে কোন্‌ ধর্ম সত্য তা বুঝার জন্যও আমরা কেন যুক্তি আর বুদ্ধি ব্যবহার করব না?

বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে প্রমাণ উপস্থাপন করো। – (সূরা বাক্বারাহ্‌ ২:১১১)

আপনি যদি কোন অমুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন – তুমি কিভাবে প্রমাণ করবে যে তোমার ধর্ম সত্য? বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আপনি যে উত্তর পাবেন তা হলো – আমি আমার ঈশ্বরকে ডেকে প্রার্থনা করলে তা কবুল হয়, সুতরাং আমার ধর্মই সত্য ধর্ম। আসলে এটা কোন প্রমান হলো না। যদি প্রার্থনা কবুল হওয়াই কোন ধর্ম সত্য কিনা তা প্রমাণ করতে পারে তাহলে পৃথিবীর সব ধর্মই সত্য, কারণ সব ধর্মের মানুষেরই বিভিন্ন প্রার্থনা কবুল হয়ে থাকে। কিন্তু, বিভিন্ন ধর্মগুলোর মধ্যে কনফ্লিক্টিং ব্যাপার থাকার কারণে সব ধর্মই সত্য হতে পারে না।

কোনো ধর্ম সত্য না মিথ্যা তা প্রমান করার জন্য আমাদেরকে সেই ধর্মের গ্রন্থগুলোর দিকে ফিরে যেতে হবে। যেহেতু সব ধর্মের মানুষই দাবী করে তাদের ধর্মগ্রন্থ তাদের ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে , কাজেই সেই ধর্মের গ্রন্থে সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই এমন কিছু দিয়ে দেবেন যার দ্বারা মানুষ বুঝতে পারবে যে ঐ ধর্মটা সন্দেহাতীতভাবে সত্য।

ইসলামে ধর্মের সত্যতার অসংখ্য প্রমান আছে, যেমন স্রষ্টার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য (তাওহীদ), কোরআনের কাব্যিক, বৈজ্ঞানিক, সংরক্ষণ সহ বিবিধ আশ্চর্য বিষয়, রাসূলুল্লাহ(সা) এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ইত্যাদি। কিন্তু, এই লেখায় আমি শুধু একটি প্রমানের কথাই বলব – সেটা হলো তাওহীদ।

যে কোন ধর্মেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অংশ হচ্ছে স্রষ্টা ও তাঁর বৈশিষ্ট্য। কাজেই, কোন ধর্ম স্রষ্টার সংজ্ঞাই যদি ঠিক মত দিতে না পারে তাহলে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য ধর্ম হতে পারে না। আপনি ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর অন্য যে কোন ধর্ম নিয়েই পড়াশুনা করতে যান, আপনাকে সেই ধর্মের প্রচারকেরা বলবে যে স্রষ্টার অস্তিত্ব একটা আবেগীয় ব্যাপার, এটা প্রমান করা সম্ভব না, এটা তর্ক-বিতর্কের বিষয় না, অথবা তারা স্রষ্টার এমন সব বৈশিষ্ট্যের কথা বলবে – যে আপনি অবশ্যই কনফিউজড হয়ে পড়বেন । স্রষ্টার সংজ্ঞার ব্যাপারে একমাত্র ইসলাম ধর্মই ব্যতিক্রম। সুরা ইখলাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা’আলার বৈশিষ্ট্য এত সুন্দর করে বর্ণনা করে হয়েছে, যে এরপর স্রষ্টা সম্পর্কে আর কোন দ্বিধা-দ্বন্দের অবকাশ থাকে না।

বলুন – তিনিই আল্লাহ্‌, এক ও অদ্বিতীয়। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। এবং কেউই তার সমকক্ষ নয়। – সূরা ইখলাস (১১২:১-৪)

আমার আগের লেখায় যুক্তি দিয়ে আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের যে প্রমান দেয়া হয়েছে, আল্লাহ্‌র যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলা হয়েছে, পৃথিবীর আর কোন ধর্মই আল্লাহ্ সম্পর্কে আপনাকে এত যৌক্তিক ও সরল উত্তর দিতে পারবে না। আল্লাহ্‌ এক, তার সাথে তুলনা করা যায় এরকম আর কিছুই নেই, তিনি সর্বশক্তিমান, তাই সব মাধ্যম ছেড়ে সরাসরি তার ইবাদত করতে হবে – এর চেয়ে সহজ আর কিছু হতে পারে? তাওহিদের বানী এতটাই সরল ও সহজাত যে কোনও মানুষ – সে শিক্ষিতই হোক আর অশিক্ষিতই হোক, তরুনই হোক আর বৃদ্ধই হোক – খুব সহজেই এটা তার হৃদয়ে ক্লিক করে।

আল্লাহ মানুষকে এক স্রষ্টায় বিশ্বাসের সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।  ইসলামের ভাষায় একে ফিতরা বলে। পৃথিবীর ২০টিরো বেশী দেশে অন্য ধর্ম থেকে ইসলামে ফিরে আসা মানুষদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের মুসলিম হওয়ার পেছনে সবচাইতে বেশী যা তাদের প্রভাবিত করেছে তা হলো – আল্লাহ এক (তাওহীদ) [সূত্র: Contemporary Issues – Dr. Bilal Philips]।

আপনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আপনি ফিতরাহ্‌ এর অনুসরণ করুন, যা দিয়ে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্‌র সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন করা না হোক। এটাই সরল ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। -সূরা রুম (৩০:৩০)

আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় এক ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর আর সকল ধর্মে God এর ধারনা বেশ কনফিউজিং।  হিন্দু ধর্মে ঈশ্বরের ধারণা বেশ জটিল। হিন্দুরা এক ব্রাক্ষ্মণ-এ বিশ্বাস করলেও তাদের চারটি সেক্ট (saivism, shaktism, vaishnavism, smartism) এর ভিন্ন ভিন্ন দেবতা আছে [২]। এই চার সেক্ট ঈশ্বরকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে, ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি বানায় এবং তাদের ঈশ্বর সংক্রান্ত ধারণাও ভিন্ন। কিন্তু, সব সেক্টই প্যান্থেইসম-এ বিশ্বাস করে। যার অর্থ হচ্ছে – স্রষ্টা আর সৃষ্টির মধ্যে কোন পার্থক্য নাই, যা কিছু আমরা দেখি তার সবই স্রষ্টা আর সবই সৃষ্টি। এই বিশ্বাসের ফলে হিন্দুরা মূর্তি, পাথর, গাছ, এমনকি কেউ কেউ শিশ্ন আর যোনিকেও পূজা করে, বেশীরভাগ হিন্দু গোমূত্র আর গোবরকে পূজার উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করে।  হিন্দু ধর্মের ঈশ্বর পৃথিবীতে দেবতা রূপে এসে ধর্ষণ, পরকীয়াসহ এমন সব কাজ করে যা কিছুতেই সৃষ্টিকর্তার কাজ হতে পারে না [৩]।

অন্যদিকে, খ্রীষ্টানরা বলবে ঈশ্বর তাঁর ছেলে যীশুকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে স্যাক্রিফাইস পর্যন্ত করেছেন।  কিন্তু মানুষের সন্তান যেমন মাছ হতে পারে না, তেমনি  অসীম ঈশ্বরের সন্তান কিভাবে সসীম মানুষ হতে পারে তা বোধগম্য নয়। নিজে ‘ঈশ্বর’ হওয়া সত্ত্বেও তিনি মানুষের মতই খাওয়া-দাওয়া করতেন, ঘুমাতেন, ঈশ্বরের কাছে সেজদা করতেন, তাঁর সাহায্য চাইতেন, এমনকি সাধারণ মানুষেরা মিলে এই ‘ঈশ্বর’কে হত্যা পর্যন্ত করে ফেলেছে!  শুধু তাই না, খ্রীষ্টানদের ঈশ্বর পুরো মহাবিশ্বের পালনকর্তা হলেও তার ক্ষমতা এতই সীমিত যে স্বর্গে আদম তাকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে [৪]! বাইবেলে ইব্রাহিম(আ) কে নবী বলা হয়েছে, বাইবেলের ইব্রাহিম(আ) কিন্তু ট্রিনিটি (তিন ঈশ্বরের ধারণা) প্রচার করেননি, তিনি এক ঈশ্বরের কাছেই মানুষকে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন অর্থাৎ তিনি ইসলাম ধর্মই প্রচার করেছেন।

অন্যদিকে ইহুদীরা বলে তারা আল্লাহ্‌র Chosen People. ইহুদী হয়ে জন্মাতে হয়, ইহুদীতে ধর্মান্তরিত হওয়া যায় না [১]। ইহুদীরা বলে ঈশ্বর নিষ্ঠুর, তারা ঈশ্বরকে অভিশাপ দেয় কারণ তাদের উপর একের পর এক গজব নেমে এসেছিল। আর, বৌদ্ধ ধর্ম তো স্রষ্টা সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছ ধারণাই দেয় না।

মোদ্দা কথা, পৃথিবীর বাকী সব ধর্মে সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞা এত কনফিউজিং, কোন চিন্তাশীল মানুষ সহজেই বুঝতে পারবে যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম সত্য ধর্ম হতে পারে না।

তবে কি ওরা কোরআন সম্বন্ধে মন দিয়ে চিন্তা করে না? নাকি ওদের অন্তরে তালা লেগেছে? – সূরা মুহাম্মাদ (সা) (৪৭:২৪)

রেফারেন্স:

১। Islam: The Religion Of Truth by Abdur Raheem Green

২। Concept of God in Hinduism – Hindu Students Association

৩। Krishna on Hinduism, Lot in Bible – Dr. Zakir Naik

৪। How the Bible led me to Islam – Yusha Evans

কোরআন কি শুধু চ্যালেঞ্জ দিয়েই খালাস?

FirstCopyOfQuran_23

প্রশ্ন: কোরআনের মত কোনো বই নাকি লেখা সম্ভব না? কোরআন তো চ্যালেন্জ দিয়াই খালাস, এই চ্যালেঞ্জ জাস্টিফাই করবে কে? রবীন্দ্রনাথ এর কবিতাগুলো কি কম সুন্দর?

উত্তর: কোরআন চ্যালেঞ্জ দিয়ে খালাস এই কারণে যে যার ঘটে বিন্দু পরিমানও বুদ্ধি আছে তার নিজেরই বুঝা উচিত কিভাবে একটা মাস্টারপিস লেখার সাথে অন্য লেখার তুলনা করতে হবে। আমি যদি আপনাকে বলি, আপনি পারলে ‘সোনার তরী’র মত একটা কবিতা লিখে দেখান তখন আপনাকে কিন্তু ঐ কবিতা বাংলাতেই লিখতে হবে। আপনি, ইংরেজীতে কবিতা লিখে ‘সোনার তরী’ এর সাথে তুলনা করলে ব্যাপারটা ঠিক হবে না, যে কারণে আপেলের সাথে কমলার তুলনা করা যায় না । কাজেই, কেউ কোরআনের চ্যালেঞ্জ নিতে চাইলে তাকে আরবীতেই লিখতে হবে।

আর এই তুলনা করার মতো বুদ্ধি যার আছে সে অনায়াসে বুঝতে পারবে যে কোরআনের সমতুল্য কোন বই এই পৃথিবীতে নাই । কোরআনের মিরাকলের শেষ নাই  – কোরআনের বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিভিন্ন আয়াত, কোরআনের বিভিন্ন ভবিষ্যৎবানী, কোরআনের শব্দবিন্যাস, আরবী ভাষার উপর কোরআনের প্রভাব, কোরআন যেভাবে সংরক্ষিত হয়ে আসছে – এই প্রত্যেকটা ব্যাপারই এত ইউনিক যে পৃথিবীর আরো কোন বইতে এই বৈশিষ্ট্যগুলো নাই।

আমি অত কঠিন কঠিন চ্যালেঞ্জে যাবো না, খুব সহজ একটা চ্যালঞ্জে যাবো:

আয়াতের দিক থেকে কোরআনের অন্যতম ছোট সূরা হলো সূরা ইখলাস। বর্তমান পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এই সূরাটি মুখস্থ করেছে, প্রত্যেকদিন কয়েক কোটি বার এটি পড়া হচ্ছে – নামাজের ভিতরে পড়া হচ্ছে, বাইরে পড়া হচ্ছে, আপনি যখন এই লেখাটি পড়ছেন তখনো অগণিত মানুষ (হয়তো বা কয়েক লক্ষ মানুষ!) এই মূহুর্তে এই সূরাটি পড়ছে, যার বয়স ৯ সে যেমন পড়ছে, যার বয়স ৯০ সে-ও পড়ছে। কেবল পড়ছে বললেও আন্ডার এস্টিমেট করা হবে – এই মানুষগুলো একাগ্রতার সাথে পড়ছে, ভয়ের সাথে পড়ছে, পবিত্রতার সাথে পড়ছে।  এমনকি শুধু বর্তমান যুগেই নয়, যেই দিন ৪ বাক্যের এই সূরাটি পৃথিবী এসেছে, প্রায় ১৪০০ বছর আগের সেই দিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ এই সূরাটি পড়েছে, পড়ছে, মুখস্থ করেছে, করছে, ঠিক সেই উচ্চারণে যেই উচ্চারণে এটি প্রথমবার মানুষ শুনেছিলো – এখন আপনি পারলে এরকম চারটি লাইন অন্য কোনো বই থেকে এনে দেখান যেটা হাজার বছর ধরে মানুষ এত গুরুত্বের সাথে আমল করছে।  আগে এই চ্যালেঞ্জটা পাস করেন এর পর বাকী চ্যালেঞ্জগুলোতে আসা যাবে!

তারা কি বলে, সে (মুহাম্মদ(সা)) এ রচনা করেছে? বলো, ‘তবে তোমরা এর মতো এক সূরা আনো, আর যদি তোমরা সত্য কথা বলো তবে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য যাকে পারো ডাকো’। – সূরা ইউনুস (১০:৩৮)  

ধর্মের কি দরকার? মানবতাবাদীতাই কি শ্রেষ্ঠ ধর্ম না?

huddleCLR

প্রশ্ন ১: আচ্ছা ধর্মের দরকার কি আমি এটাই বুঝি না। সেই প্রাচীন যুগ তো এখন আর নাই। এখন আমরা সভ্য, বুদ্ধিমান প্রানী। মানবতাবাদীতাই কি শ্রেষ্ঠ ধর্ম না?

উত্তর: মানবতাবাদীতে কেন শ্রেষ্ঠ ধর্ম না তার অনেকগুলো কারণ আছে, নিচের তার কয়েকটি উল্লেখ করছি।

এক – মানবতাবাদীতার সমস্যা হলো যে মানবতাবাদীতার কোন স্ট্যান্ডার্ড নাই। যেমন, আমরা সবাই জানি যে আমাদের উচিত বাবা-মার সাথে ভালো ব্যবহার করা। কিন্তু, কতটুকু ভালো ব্যবহারকে ভালো ব্যবহার বলবো? কে এটার স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিবে? অথচ, ইসলাম বলে, বাবা-মার সাথে এমনভাবে ভালো ব্যবহার করো যে তাদের প্রতি কখনো উহ্‌ শব্দ পর্যন্ত করবে না। এমনিভাবে, মানুষের জীবনের প্রতিটা কাজের স্ট্যান্ডার্ড ধর্ম (বিশেষ করে ইসলাম) নির্ধারিত করে দেয়, ফলে পথহারা মানুষ পথ খুঁজে পায়।

দুই – মানুষ এমন একটা প্রাণী যার ব্রেইন ওয়াশ করা খুব সহজ, আর একবার ব্রেন ওয়াশ হয়ে গেলে সে মানুষ হত্যার মত ঘোরতর খারাপ কাজকেও সে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মেনে নিতে পারে (যেটা আসলে অমানবিক!)। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার জার্মানদের এমনভাবে ব্রেইন ওয়াশ করেছিল যে তারা অনায়াসে গণহত্যা সমর্থন করেছিলো। আবার, প্রিয়নবী মুহাম্মদ(সা) এর আগমনের আগে আরবের রীতি ছিল মেয়েদের জ্যান্ত কবর দেয়া, এটাকে তারা খুব স্বাভাবিক মনে করত! কারণ, তাদের ব্রেইন এভাবেই ওয়াশ হয়ে গিয়েছিল। এক সময় আমেরিকায় সমকামীদের ঘৃণার চোখ্যে দেখা হতো, অথচ এখন দেখা হয় সম্মানের চোখে! আজকের সমাজে ভাই-বোন বিছানায় শোয়াকে (Incest) ঘৃণার চোখে দেখা হয়, কিন্তু সেইদিন খুব বেশী দূরে নাই যেইদিন এই নোংরা কাজটাকেও মানবতার চোখে ‘হালাল’ হবে!

সত্যি কথা হলো, স্ট্যান্ডার্ড ঠিক না করে দিলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, ক্রমশ:ই পশু হয়ে যায় আর ভালো-মন্দের এই স্ট্যান্ডার্ড মানুষ দিতে পারবে না, কারণ সে সব সময়ই সুবিধাবাদী, সব সময়ই কিছু না কিছু দ্বারা ব্রেইন ওয়াশড।  এই স্ট্যান্ডার্ড আসতে হবে উপরের লেভেল থেকে। এই প্রসঙ্গে এমন একজনের উক্তি দিচ্ছি যাকে কোন ‘মানবতাবাদী’ উপেক্ষা করতে পারবে না!

We cannot solve our problems with the same thinking we used when we created them. – Albert Einstein

একটু চিন্তা করলে বুঝবেন উপরের কথাটায় একটা অসীম পুনরাবৃত্তির চক্র রয়েছে। আপনাকে যে কোন সমস্যার সমাধান করতে হলে যে লেভেলে তা তৈরী করা হয়েছিলো তার উপরের লেভেলে যেয়ে চিন্তা করতে হবে, কিন্তু ঐ লেভেলে চিন্তা করতে যেয়ে আপনি আবার কিছু সমস্যা তৈরী করবেন, যার সমাধান করতে হলে যেতে হবে আরো উপরে, তারপর আরো, তারপর আরো … শেষমেশ আপনি আসলে সমস্যার সমাধানই করতে পারবেন না। সুতরাং, মানবজীবনের সমস্যার সমাধান আসতে পারে শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছ থেকে।

তোমরা কি বেশী জানো, না আল্লাহ্‌? তার চেয়ে বড় জুলুমকারী কে যে আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া প্রমাণ গোপন করে? – (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৪০)

তিন – মানুষকে সোজা রাখার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো Carrot and Stick পদ্ধতিধর্মকে বাদ দিলে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতা বাদ দেয়া হয়, বাকী থাকে শুধু মানুষের কাছে জবাবদিহিতা। কাজেই, যার স্রষ্টাভীতি (ইসলামী পরিভাষায় তাকওয়া) নাই সে যখন মানুষের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তার লোভ-লালসা পূরণের কোন উপায় পেয়ে যায়, তখন সেই কাজটা খারাপ হলেও খুব সহজেই সেই পাপগুলো সে করে ফেলে বা ভালো কাজ করা থেকে বিরত থাকে।

উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন আপনার এক প্রতিবেশী আপনার কাছে একদিন সাহায্য চাইলো, আপনি তাকে সাহায্য করলেন, কিন্তু বিনিময়ে সে আপনাকে ধন্যবাদ জানালো না, আপনি কিন্তু মন:ক্ষুণ্ন হবেন। দ্বিতীয় একদিন সে সাহায্য চাইলো, আপনি সেদিনো তাকে সাহায্য করলেন, এবারো সে আপনাকে ধন্যবাদ জানালো না, আপনি কিন্তু আসলেই মন:ক্ষুন্ন হবেন এবার, এবং খুব সম্ভবত: তৃতীয়দিন সে যখন সাহায্য চাইবে আপনি তাকে সাহায্য করবেন না। কারণ, মানুষ জন্মগতভাবে প্রতিদান প্রিয় (এরজন্যই বছর শেষে বেতন না বাড়লে আপনার মন খারাপ হয়ে যায়!), সে একদিন ফ্রি ফ্রি কাজ করে দিবে, ২ দিন করে দিবে, কিন্তু তৃতীয় দিন আর করবে না। অথচ, আপনি যদি একজন প্রকৃত ধার্মিক হয়ে থাকেন, আপনি কিন্তু তা-ও ঐ মানুষটির উপকার করে যাবেন, ধন্যবাদে তোয়াক্কা করবেন না কারণ, যে আল্লাহয় বিশ্বাস করে, সে পরকালে বিশ্বাস করে। একজন প্রকৃত ধার্মিক মানুষ এই দুনিয়ায় মানুষের কাছ থেকে প্রতিদান পাবার আশায় কাজ করে না, সে কাজ করে করে আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবার আশায়। একজন মু’মিন গীবত করবে না, অশ্লীল কথা বলবে না – যদিও সে  জানে এই কাজের জন্য তাকে পুলিশ ধরবে না, যদিও জানে কেউ তাকে দেখছে না, কিন্তু সে জানে আল্লাহর কাছে তাকে একদিন জবাবদিহি করতেই হবে, আর তাই সে সর্বাবস্থায় সকল খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে চেষ্টা করবে। কাজেই ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থা অবশ্যই ধর্মহীন জীবন ব্যবস্থা থেকে শ্রেষ্ঠ।

গবেষনায় দেখা গেছে যে ধার্মিক মানুষেরা ধর্মহীনদের চেয়ে দান বেশী করে এবং ভলান্টিয়ার কাজেও বেশী অংশগ্রহণ করে। বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আর্থুর সি ব্রুকস স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত তার গবেষনাপত্র Religious Faith and Charitable Giving এ তথ্য-উপাত্তসহ এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কোন্‌ কোন্‌ ফ্যাক্টর মানুষের civic behavior (যেমন – দানশীলতা এবং ভলান্টিয়ার কাজ) কে প্রভাবিত করে তা জানার জন্য ২০০০ সালে আমেরিকার কিছু রিসার্চার ৫০টি কমিউনিটির থেকে ৩০ হাজার অবজারভেশন সংগ্রহ করে। তাদের গবেষনায় প্রাপ্ত ফল দেখে তারা বিস্মিত হয়ে যায় – নাস্তিকেরা মুখে যত বড় বড় কথাই বলুক না কেন, ভালো কাজের হিসাব নিলে দেখা যায় যে ধার্মিকেরা ভালো কাজে অংশগ্রহণে সেক্যুলারদের থেকে বহুগুণে এগিয়ে আছে। আমি আর্থুর সি ক্লার্কের লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি:

  • The differences in charity between secular and religious people are dramatic. Religious people are 25 percentage points more likely than secularists to donate money (91 percent to 66 percent) and 23 points more likely to volunteer time (67 percent to 44 percent).    
  • The data show that if two people — one religious and the other secular — are identical in every other way, the secular person is 23 percentage points less likely to give than the religious person and 26 points less likely to volunteer.

চার- মানবতাবাদীরা প্রায়শ:ই হয়ে দাঁড়ায় সুবিধাবাদী। একজন মানবতাবাদী যে শাস্তি সবার জন্য অমানবিক মনে করে, সেই একই শাস্তি তার চরম শত্রুর জন্য সঠিক বলে মনে করতে পারে। উদাহরণ দিচ্ছি। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় মানবতাবাদীরা কিন্তু এইসব অপরাধীদের ফাঁসীর জন্য গলা ফাটিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু, এরাই আবার অন্য আলোচনায় বলবেন মানুষের ফাঁসী দেয়া ঘোরতর অপরাধ, যেহেতু আমরা প্রাণ দিতে পারি না, কাজেই প্রাণ নেয়ার অধিকারো আমাদের নেই। [আপনি আবার ভেবে বসবেন না আমি ৭১ এর খুনীদের মৃত্যুদন্ড বিরোধী! আমি শুধু ৭১ কেন, সকল প্রকার খুনীরই মৃত্যুদন্ডের পক্ষে, কারণ আল্লাহর আইন সকল অপরাধীর জন্য সমান]।

পাঁচ – শেষ কথা হলো ধর্মকে বাদ দিলে আপনি সৃষ্টিকর্তাকে বাদ দিচ্ছেন। অথচ সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব যুক্তি প্রমাণিত দিয়ে (আমার এই লেখাটি পড়ুন), সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করা মানুষের মানসিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ্‌ মানুষকে উপাসনা করার need দিয়ে তৈরী করেছেন, আর তাই বিপদে পড়লে বা আটকে গেলে ঘোর নাস্তিকও স্রষ্টাকে ডাকে (এই ভিডিওতে উদাহরণ দেখুন)। কাজেই, স্রষ্টাকে উপাসনা না করে মানুষ কখনোই মানসিক প্রশান্তি পাবে না।  

 

প্রশ্ন ২। ধর্ম ছাড়া পৃথিবীটা কত সুন্দর হতো! এই ধর্মের কারণে মানুষে মানুষে কত বিভেদ, হানাহানি, যুদ্ধ! ধর্মের ব্যাপারটা বাদ দিলে হয় না?

উত্তর: আপনি উপরের বক্তব্যে বিশ্বাসী হলে বুঝে নিতে হবে হয় আপনি জ্ঞান রাখেন না, নতুবা আপনার ব্রেইন শয়তান ভালো মতই ওয়াশ করে রেখেছে। পৃথিবীতে হানাহানি আর যুদ্ধ বরং তখনই হয় যখন মানুষ ধর্ম মানে না। পৃথিবীর বেশীরভাগ যুদ্ধেরই কারণ হলো অর্থ আর ক্ষমতা – ধর্ম না।

বিংশ শতাব্দী ছিল  ধর্ম-নিরপেক্ষতা এবং ধর্মহীনতার উত্থান এর শতক। আসুন দেখি এই শতকের মানবতার কিছু অর্জন! (তথ্যসূত্র: How Do You Kill 11 Million People – Andy Andrews)

 

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কীর নবগঠিত সেক্যুলার সরকার তাদের দেশের জ্ঞানী-গুনী, ধর্মীয় নেতা, নারী, গর্ভবতী মা, আর শিশুসহ ২ মিলিয়ন মানুষ
  • ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত হিটলার পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে ১১ মিলিয়ন মানুষ।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আরো মারা যায় ৫ মিলিয়ন জার্মান বেসামরিক ও সামরিক মানুষ, ২.৮ মিলিয়ন ইউরোপীয়ান
  • কম্বোডিয়ার সরকার ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত মেরেছে তার দেশের তিন মিলিয়ন মানুষ – যে দেশের মোট জনসংখ্যা ছিলো ৮ মিলিয়ন
  • ১৯১৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘মানবতাবাদী’ কমিউনিষ্ট সরকার হত্যা করেছে তাদের দেশের ৫৫ মিলিয়ন (জ্বী ঠিক পড়ছেন, সাড়ে পাঁচ কোটি) পুরুষ, নারী এবং শিশুদের!! (গত শতাব্দীর বৃহত্তম গণহত্যা!)
  • ৩রা নভেম্বর ২০০২ থেকে শুরু করে পরের ১০ বছরে মার্কিন দ্রোন হামলায় মারা গেছে ৪৭০০ মানুষ যাদের মধ্যে আছে স্কুলগামী শিশু, বিয়েতে যোগ দিতে যাওয়া বরযাত্রীসহ অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ (সূত্র: Josh Begle’s DroneStream)

আপনার কাছে আমার প্রশ্ন: এই হত্যাকান্ডের কোন্‌টি ধার্মিকেরা করেছে? আর স্পেসিফিকভাবে বললে, কোন্‌টা মুসলমানেরা করেছে? বরং, যে জাতি যত ধর্মবিরোধী ছিল, সেই জাতি ছিল ততো নিষ্ঠুর।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মতপার্থক্য, শত্রুতা, জোটবদ্ধতা, সামরিকবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও জাতীয়বাদ। ধর্ম এখানে সম্পূর্ন অনুপস্থিত!

The main causes of World War I, which began in central Europe in late July 1914, included many factors, such as the conflicts and hostility between the great European powers of the four decades leading up to the war. Militarism, alliances, imperialism, and nationalism played major roles in the conflict as well. – Wikipedia

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ছিলো হিটলারের ক্ষমতার লোভ , অর্থের লোভ। আর মানুষকে motivate  করার জন্য হিটলার ব্যবহার করেছিলেন মিথ্যা কথা আর ঘৃণাকে। কাজেই, এই যুদ্ধের জন্যও ধর্মকে দোষ দেয়ার কোন কারণ নেই!

The main cause of World War II was the desire and ability of Adolf Hitler, in control of Nazi Germany, to dominate Europe and gain control especially of the agrarian resources to the east of Germany.– Wikipedia

৭১ সালে পাকিস্তান আর্মির গণহত্যা, মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আগ্রাসন, এমনকি সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের হত্যাযজ্ঞ – এই প্রত্যেকটি নৃশংসতার পিছনের কারণ হলো অর্থ আর ক্ষমতার লোভ । সুতরাং, সত্য হলো পৃথিবীর হত্যা, হানা-হানির মূলে আছে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করতে হবে এই সত্য উপেক্ষা করে মানুষের কাছের জবাবদিহিতা কৌশলে এড়িয়ে যেয়ে অন্ধভাবে ক্ষমতা আর অর্থের পিছনে ছুটা!

আমেরিকার বিখ্যাত আইন বিশেষজ্ঞ Stephen Carter বলেন যে বিংশ শতাব্দী হলো মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত শতক। আর এই বিশাল হত্যাযজ্ঞের পিছনে কারণ ধর্ম না, ছিলো ক্ষমতালোভী চিন্তা-ভাবনা! বিশ্বনন্দিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Zbigniew Brzezinski তার Out of Control: Global Turmoil on the Eve of the Twenty-First Century (1993) লেখায় এই হত্যাকান্ডের যে কারণ উল্লেখ করেছেন তা উদ্ধৃত করে Shaikh Hamza Tzortzis  বলেন:

Lives had been deliberately extinguished, by politically motivated carnage via state backed entities. The war dead alone for politically motivated reasons is eighty seven and a half million people. State terrorism is the real terrorism.

 

সুতরাং, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাস হলো ক্ষমতালিপ্সু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস! গত শতাব্দীতে ৮ কোটি ৭৫ লক্ষ মানুষ মারা গেছে সেক্যুলার চিন্তা-ভাবনার রাস্ট্রগুলোর সন্ত্রাসের কারনে আর এই রাষ্ট্রগুলোই কিনা দোষ দেয় ধর্মকে! ধর্ম মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে না, ধর্ম মানুষকে একত্রিত করে, কমন লক্ষ্য দেয়ার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করে, অন্য মতের প্রতি সহিষ্ণু হতে শেখায়। অন্যদিকে মানুষকে বিভক্ত করে মুনাফালোভী ধর্মবিদ্বেষী চিন্তা-ভাবনা। প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা থেকে মানুষ যত বেশী দূরে সরে যাবে, ততই সে দূরে সরে যাবে মনুষ্যত্ব থেকে।

… যে ব্যক্তি নরহত্যা বা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী কাজের শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর যে কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রানরক্ষা করল।  – সূরা মায়িদাহ্‌ ৫:৩২

ইসলামের ইতিহাস যদি ঘাটেন তো দেখবেন মুসলিমরা কখনোই জোর করে তাদের ধর্ম অন্য মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়নি। ইসলামী রাষ্ট্রে অন্য ধর্মাবলম্বীদের নির্বিঘ্নে ধর্ম-চর্চার অধিকারের ইতিহাস নিয়ে মুসলিমরাই শুধু নয়, অমুসলিমেরাও শত শত গবেষণামূলক লেখা লিখেছেন (পড়ুন Alexander Knysh এর লেখা Islam in Historical Perspective)।  ইসলামের সহমর্মিতার আমি শুধু কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি:

  • মদীনায় রাসূলুল্লাহ(সা) নিশ্চিত করেছিলেন যাতে  ইহুদীরা নির্বিঘ্নে তাদের ধর্ম পালন করতে পারে।
  • উমার(রা) জেরুজালেম এর চাবি হিরাক্লিয়াস এর কাছ থেকে বুঝে নেয়ার পর পাদ্রীর অনুরোধের পরেও গীর্জায় যোহরের নামাজ পড়েননি শুধুমাত্র এই কারণে যে ভবিষ্যতের মুসলিমরা এই গীর্জাকে হয়তো আমিরুল মু’মিনীন এর মসজিদ বলে দাবী করবে।
  • খালিদ বিন ওয়ালিদ(রা) এর নেতৃত্বে ৬৩৪ খ্রীষ্টাব্দে সিরিয়ার দামাস্কাস বিজয় করার পর মুসলিমরা সেন্ট জন দি ব্যাপ্টিস্ট গির্জাতে শুক্রবারে জুমুআর নামাজ পড়ত, একই সপ্তাহের রবিবারে খ্রীষ্টানেরা সেই একই গির্জায় তাদের সাপ্তাহিক উপাসনা করত। মুসলিমরা দামাস্কাসে এসে খ্রিস্টানদের গির্জা ভেঙ্গে দেই নাই। বরং মুসলিমদের ব্যবহার আর চারিত্রিক গুনাবলিতে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
  • ক্রুসেডারেরা ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই জেরুজালেম দখল করে মুসলমানদের রক্তে পুরো শহরকে হাঁটু পর্যন্ত রক্তে ডুবিয়ে দেয়, কিন্তু এর প্রায় ১শ বছর পর ১১৮৭ সালে সালাহ-আদ-দীন আইউবী (রহিমাহুল্লাহ) যখন জেরুজালেম পুনরূদ্ধার করেন তখন তিনি কোনও প্রতিশোধ তো নেনই নি বরং খ্রীষ্টানসহ সকল বিধর্মীদের ক্ষমা করে দেন, তাদেরকে তাদের মতো করে ধর্ম পালন করতে দেন, এমনকি তাদের কে তাদের সকল সম্পদ নিয়ে অন্য দেশে (ইউরোপে) চলে যাওয়ারও স্বাধীনতা দেন।

[বিস্তারিত জানতে দেখুন: PBS Documentary – Islam: Empire of Faith.]

সকল ধর্মের মানুষের প্রতি ইসলাম সহনশীলতার কথা বলে, সহমর্মিতার আর ন্যায়বিচারের কথা বলে। কারণ এটা মানুষের তৈরী ধর্ম না, এটা এসেছে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছ থেকে, যিনি সবচেয়ে বেশী ন্যায়বিচারক। একজন মু’মীনের কাছে একজন মুসলমান যতটুকু নিরাপদ, একজন অমুসলিমও ততটুকুই নিরাপদ – যেরকম রাসূলুল্লাহ(সা) শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: সাবধান! যে ব্যক্তি কোনও মুয়াহিদের (মুয়াহিদ: মুসলিম রাষ্ট্রে ন্যায়সঙ্গতভাবে বসবাসরত অমুসলিম) উপর অত্যাচার করবে অথবা তার কোন অধিকার ছিনিয়ে নিবে অথবা তাকে অসহনীয় যন্ত্রণা দিবে অথবা তার অনুমতি ছাড়া তার কোনও কিছু নিবে, সে জেনে রাখুক যে বিচার দিবসে আমি তার (অত্যাচারী ব্যক্তির) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।  – (সুনান আবু দাউদ)

আল্লাহ্‌ থাকতে পৃথিবীতে এত দু:খ-কষ্ট কেন?

suffering of a child

প্রশ্ন ১আল্লাহ যদি সর্বশক্তিমান এবং পরম করুনাময় হন, তাহলে পৃথিবীতে এত দু:খ-কষ্ট কেন?

উত্তর: প্রথম কথা হলো, পৃথিবীতে দুঃখ-কষ্ট থাকলেও পৃথিবীতে অনেক আনন্দও আছে। বরং, পৃথিবীতে আনন্দই বেশী, নাহলে অধিকাংশ মানুষ বেঁচে থাকতে চাইত না।

বলুন, আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সব সুশোভন বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে নিষিদ্ধ করেছে? বলুন, এসব তো ঈমানদারদের জন্য পার্থিব জীবনে এবং বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে। – সূরা আরাফ(৭:৩২)

দ্বিতীয়ত: অনেক সময় এমন কিছু হয় যা আপনার কাছে আপাতঃদৃষ্টিতে কষ্টদায়ক বলে মনে হয়, কিন্তু পরে যেয়ে দেখা যায় ঐ কষ্টের ঘটনাটার জন্যই আপনার জীবনে এমন কোন পরিবর্তন এসেছে যা আপনার জন্য অনেক বেশী উপকারী। আমাদের সবার জীবনেই কম-বেশী এরকম অভিজ্ঞতা আছে। এভাবে, আল্লাহ্‌ আমাদের বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেন, যাতে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি এবং কঠিনতর পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারি।

তিনি (আল্লাহ্) বললেন: আমি যা জানি তোমরা তা জান না।  (সূরা বাক্বারাহ্‌ ২:৩০)।

তৃতীয়ত: এই পৃথিবীটা হলো একটা পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ্‌ বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করছেন। এই পরীক্ষা আনন্দদায়ক হতে পারে, আবার কষ্টেরও হতে পারে। যেমন, আপনার যদি অনেক টাকা-পয়সা থাকে তাহলে আল্লাহ্‌ আপনাকে সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করছেন, যে আপনি সেই সম্পদ কিভাবে ব্যয় করবেন। আপনার যদি অনেক মেধা থাকে, তো আল্লাহ্‌ আপনাকে পরীক্ষা করছেন আপনি কিভাবে সেই মেধাকে ব্যবহার করেন।  অন্যদিকে, আপনার বা আপনার সন্তানের যখন কোন অসুখ হয় তখন আল্লাহ্‌ আপনার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেন। আপনার ভাই-বোন বা পরিচিত কেউ যখন কোন বিপদে পড়ে তখনও আপনার পরীক্ষা হয় আপনি তাকে কিভাবে কতটুকু সাহায্য করছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোরআন-উল-কারীমে বলেন:

নিশ্চয়ই আমি তোমাদের (কাউকে) ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে, আর (কাউকে) ধনেপ্রাণে বা ফলফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করব। আর যারা ধৈর্য ধরে তাদের তুমি সুখবর দাও। (তারাই ধৈর্যশীল) যাদের ওপর কোন বিপদ এলে বলে, ‘(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি’উন, অর্থাৎ) নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তারই দিকে ফিরে যাব’। এদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে শান্তি ও করুণা বর্ষিত হয় এবং এরাই সুপথগামী।  -সূরা বাক্বারাহ্‌  (২:১৫৫-১৫৭)

আপনি যখন কোন পরীক্ষা দিতে বসেন, আপনার শিক্ষক যেমন কিছু সহজ প্রশ্ন দেন, আবার কিছু কঠিন প্রশ্নও দেন, আল্লাহ্‌ও তেমনি মানুষকে পরীক্ষা করেন বিভিন্ন আনন্দদায়ক ও দু:খজনক ঘটনার মাধ্যমে। এই জীবন শুধুই একটা পরীক্ষাকেন্দ্র, পরকালের জীবনই আসল জীবন।

আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়াকৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়; আর সাবধানীদের জন্য পরকালের আবাসই ভালো; তোমরা কি বোঝ না? – (সূরা আন’আম  ৬:৩২)

চতুর্থত: আল্লাহ্‌ তাঁর করুণার মাত্র ১ ভাগ পৃথিবী আর তার সমস্ত কিছুর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাকী ৯৯ ভাগ তিনি তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন যা দিয়ে তিনি কিয়ামতের দিন তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে করুণা করবেন (সহীহ্‌ বুখারী)।

আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের প্রতি কি পরিমান ক্ষমাশীল ও করুণাময় নিচের হাদিস থেকে তার কিছু নমুনা পাওয়া যায়।

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর নিযুক্ত ফেরেশতাদের নির্দেশ করলেন তোমাদের ভাল ও মন্দ কাজ লিখে রাখতে, আর এরপর তিনি শিখিয়ে দিলেন কিভাবে লিখতে হবে। কেউ যদি কোন ভাল কাজ করার নিয়ত করে এবং এরপর কাজটি না করে, আল্লাহ্‌র তার জন্য একটি পূর্ণ ভাল কাজের নেকী লিখে রাখেন। কেউ যদি কোন ভাল কাজ করার নিয়ত করে এবং এরপর কাজটি বাস্তবায়িত করে, আল্লাহ্‌র তার জন্য ঐ কাজটির যা নেকী তা ১০ থেকে ৭০০ গুণ, এমন কি এর চেয়েও বহু গুণে বৃদ্ধি করে লিখে রাখেন। অন্যদিকে, কেউ যদি কোন খারাপ কাজ করার নিয়ত করে এবং এরপর কাজটি না করে, আল্লাহ্‌র তার জন্য একটা পূর্ণ ভাল কাজের নেকী লিখে রাখেন। আর কেউ যদি কোন খারাপ কাজ করার নিয়ত করে এবং এরপর কাজটি বাস্তবায়িত করে, আল্লাহ্‌র তার জন্য একটি মাত্র গুনাহ্‌ লিখে রাখেন। (সহীহ্‌ বুখারী)

প্রশ্ন ২। তারপরো আমি কিছু ব্যাপার মেনে নিতে পারছি না। এই যেমন, কত ছোট্ট শিশুর ক্যান্সার হয়, অথবা বিল্ডিং ধসে অনেক নিরীহ মানুষ মারা যায়, কিংবা সুনামিতে কত নিষ্পাপ শিশু মারা যায় – আল্লাহ্‌ থাকতে এগুলো হয় কিভাবে? আল্লাহ্‌ কেন ওদেরকে বাঁচান না?

উত্তর: এরকম কেন ঘটে তা তিনটি কারণ/উদাহরন দিয়ে বুঝাচ্ছি।

এক –  আমরা মনে করি মারাত্মক কোনও অসুখ বা মৃত্যু মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি – এই ধারণা ঠিক না। মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো জাহান্নামে নিক্ষেপিত হওয়া, আর তাই আল্লাহ্‌ আমাদের বিভিন্ন কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে সামগ্রিকভাবে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ করে দেন। আল্লাহ্‌ হয়ত কারো শিশু সন্তানকে ক্যান্সার এই কারণে দিয়েছেন যে এই সন্তানটি বড় হলে খুব খারাপ মানুষ হয়ে নিজের বাবা-মা সহ অনেক মানুষের ক্ষতি করতো। সূরা কাহফে মুসা(আ) ও খিজির(আ) এর কাহিনীতে আল্লাহ্‌ এইরকম একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

ঠিক যেমন আপনি যখন আপনার বাচ্চাটিকে টীকা দিতে নিয়ে যান সে কিন্তু অনেক কাঁদতে থাকে, তাও আপনি তাকে জোর করে টীকা দেওয়ান, এমনকি তার জ্বর হতে পারে এটা জানার পরেও আপনি ডাক্তারকে টীকা দিতে বলেন। কেন বলেন? কারণ, আপনি জানেন এই সাময়িক যন্ত্রনা তাকে সারাজীবনের জন্য রোগমুক্ত করবে। একই কারণে, আল্লাহ্‌ আমাদের উপর বিভিন্ন বিপদ দেন, বিপদের মাধ্যমে তিনি আমাদের গুনাহ মাফ করেন এবং চিরস্থায়ী জান্নাতের জন্য উপযুক্ত করেন।

দুই – আল্লাহ্‌ অনেক সময় সুনামী, বন্যাসহ নানা দুর্যোগ পাঠিয়ে থাকেন মানুষের অর্জিত পাপের শাস্তি প্রদান করার জন্য এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ্‌ পাপী জাতিকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করেন, যেমন করেছেন নূহ(আ), লুত(আ) এর সম্প্রদায়কে, আদ জাতিকে, সামুদ জাতিকে। (বিস্তারিত পড়ুন আমার এই লেখায়)

তিন –  আমরা শুধু ব্যক্তিগত মঙ্গলের কথা চিন্তা করি, আল্লাহ্‌ চিন্তা করেন সামগ্রিক মঙ্গলের কথা। আগেই বলেছি আল্লাহ্‌ ভবিষ্যৎ জানেন, আমরা জানি না (সূরা বাক্বারাহ্‌ ২:৩০)। আমার কাছে সাময়িক ভাবে যেটা বেদনাদায়ক মনে হয়, সেটা হয়তো আল্লাহ্‌ সামগ্রিকভাবে মানবজাতির মঙ্গলের জন্য করছেন।

যখন কোথাও সুনামী হয়, অনেক মানুষ মারা যায়, তখন যাদের মধ্যে ঈমানের ছিটে ফোঁটাও আছে তার অনুধাবন করতে পারে যে এই জীবন ক্ষণস্থায়ী, এর পেছনে ছুটা নিরর্থক, পাথেয় সঞ্চয় করতে হবে পরকালের। এভাবে এক এলাকার মানুষকে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ অন্য এলাকার মানুষদের শিক্ষাও দিতে পারেন। আবার, যে শিশুটি বড় হয়ে পাপ কাজ করে জাহান্নামে যেতো, শিশু বয়সেই সুনামীতে তার মৃত্যু দিয়ে আল্লাহ্‌ হয়ত তাকে জান্নাতের জন্য উপযুক্ত করেছেন!  জান্নাত পেলে আমরা পৃথিবীর সব কষ্ট ভুলে যেয়ে শুধুই আল্লাহর প্রশংসা করব, অন্যদিকে যে জাহান্নামী হবে তার কাছে পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ-উল্লাসই তুচ্ছ মনে হবে!

আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন যে, পুনরুত্থানের দিন এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে যে পৃথিবীতে আরাম-আয়েশ এবং প্রাচুর্যতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছিল কিন্তু এখন সে জাহান্নামের বাসিন্দা হবে। এই লোকটিকে একবার মাত্র জাহান্নামের আগুনে ডুবানো হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদমসন্তান! তুমি কি (দুনিয়াতে) কোনও শান্তি বা কোনও সম্পদ পেয়েছিলে? সে উত্তর দিবে: আল্লাহর কসম! না, ও আমার রব!

এবং এরপর এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে যে জান্নাতের বাসিন্দা কিন্তু সে পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছিলো। এই লোকটিকে জান্নাতে একবার মাত্র ডুবানো হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদমসন্তান! তুমি কি (দুনিয়াতে) কোনও কষ্টের মধ্যে ছিলে? সে বলবে: আল্লাহর কসম! না, ও আমার রব! আমি দুনিয়াতে কখনোই কোনো কষ্টের সম্মুখীন হইনি বা কোনো দুর্দশায় পড়িনি। – (সহীহ মুসলিম)

References:

1. Why does God permit suffering on earth – Abdur Raheem Green

2. Understanding Tragedies and Calamities – Dr. Yasir Qadhi

সবকিছুই যদি আল্লাহ্‌ তৈরী করে থাকেন তো আল্লাহ্‌কে কে তৈরী করলো?

universe-image

[Note: এই লেখায় আল্লাহ্‌ / ঈশ্বর / সৃষ্টিকর্তা / God সমার্থকরূপে ব্যবহার করা হয়েছে ]
প্রশ্ন ১। বিভিন্ন সময় নাস্তিকদের বলতে শুনেছি যে আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করা অন্ধবিশ্বাস মাত্র।  ঈশ্বর বিশ্বাস কি আসলেই একটা আবেগীয় ব্যাপার,  নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের যৌক্তিক প্রমান আছে?

উত্তর: নাস্তিকেরা বলে থাকে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস একটি অন্ধবিশ্বাস। তারা বলে, যেহেতু আল্লাহকে দেখা যায়না, ধরা যায় না, শুনা যায় না, লজিক দিয়ে প্রমাণ করে যায় না – কাজেই আল্লাহ্‌ বলে কিছু নেই। কিন্তু, বাস্তব হলো সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস এবং সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করা মানুষের জন্মগত স্বভাব। আর যদিও নাস্তিকেরা নিজেদেরকে যুক্তিবাদী বলে দাবী করে, কিন্তু সত্য হলো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব  যুক্তি বা লজিক দিয়ে প্রাচীণ কাল থেকেই প্রমাণিত হয়ে এসেছে।

বর্তমানে আমরা যে লজিক বা যুক্তিবিদ্যা পড়ি, তার আবিষ্কারক হলো প্রাচীণ গ্রীকের পন্ডিতগণ। গ্রীকের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত লজিশিয়ান বা যুক্তিবিজ্ঞানী ছিলেন প্লেটো এবং তার ছাত্র এরিস্টোটল, যারা লজিককে formal discipline হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। আপনি জানেন কি এরা দুজনেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব (তাদের ভাষায় ‘unmoved mover’) বিশ্বাস করতেন? এরা দু’জনেই যুক্তি দিয়েই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে গেছেন। এর মাধ্যমে এটুকু বোঝা গেল, যুক্তিবাদী(?) নাস্তিকেরা যুক্তিবিদ্যার পিতা / পিতাতুল্যদেরকে নিজেরাই বিশ্বাস করে না।

এবার আসুন দেখি প্লেটোর যুক্তি কি ছিল। প্লেটো যে যুক্তিটি ব্যবহার করেছিলেন সেটা হলো, Design Indicates Designer, অর্থাৎ – প্রতিটি নকশারই নকশাকারী আছে। মহাগ্রন্থ কোরআনে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই একই যুক্তি দিয়ে বার বার অবিশ্বাসীদের নিকট স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন (যেমনঃ সূরা আন’আম ৬:৯৯, সূরা রুম ৩০:২০-২৭)। উদাহরন দিয়ে বুঝানো যাক। আপনি যদি সমুদ্র পারে একটা বালির ঘর দেখেন, আপনি কি চিন্তা করবেন – বাহ কি সুন্দর একটা ঢেউ এসেছিল যেটা একটা বালির ঘর তৈরি করে চলে গেছে? নাকি এটি চিন্তা করবেন, নিশ্চয়ই এখানে কোন মানুষ এসে এটা বানিয়েছিল? কাকে আপনার যুক্তিবাদী মনে হয়? এটা সম্পূর্ণই অযৌক্তিক হবে যদি কেউ বলে, যে ঐ বালির ঘর ভাগ্যক্রমে বা হাজার হাজার ঢেঊ এর মিশ্রনে হয়েছে। বরং সাধারণ বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন যেকোন মানুষই বলবে যে ঐ বালির ঘরটি নিশ্চয়ই কেউ না কেউ তৈরী করেছে। কারন, প্রতিটা সৃষ্টির পেছনেই স্রষ্টা থাকে। ঠিক একইভাবে, এই মহাবিশ্ব এবং এর ভিতরের সবকিছুর অবশ্যই একজন স্রষ্টা আছে।

একটা কলম নিজে নিজে তৈরি হতে পারে না, ফেইসবুক নিজে নিজে তৈরী হতে পারে না, আইফেল টাওয়ার থেকে মোনালিসা কোন কিছুই নিজে নিজে তৈরী হতে পারে না, তাহলে এত নিয়মতান্ত্রিক, নিঁখুত মহাবিশ্ব ও মানবজাতি কিভাবে নিজে নিজে তৈরী হতে পারে? একটা অণুর ভিতর তাকান, আপনি ডিজাইন দেখতে পাবেন, মহাকাশের দিকে তাকান আপনি ডিজাইন দেখতে পাবেন। সূর্য যদি পৃথিবীর আরো কাছে থাকতো তাহলে পৃথিবী অনেক বেশী গরম হয়ে যেতো, পৃথিবী থেকে সূর্য আরো দূরে থাকলে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যেতো, সূর্য পৃথিবী থেকে ঠিক ততটুকুই দূরে আছে যতটুকু দূরে থাকলে পৃথিবীটা প্রাণের টিকে থাকার উপযুক্ত হবে, সৃষ্টিজগতের এই নিঁখুত স্থাপত্য এটা প্রমান করে যে এই সৃষ্টি জগত র‍্যান্ডমলি সৃষ্টি হতে পারে না, এর পেছনে অবশ্যই একজন প্রবল পরাক্রমশালী, অসীম ক্ষমতাধর, প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা আছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোরআন মাজিদে প্রশ্ন করেন:

তারা কি স্রষ্টাহীন সৃষ্টি? না তারা নিজেরা নিজেদের সৃষ্টি করেছে? না তারা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে না । – সূরা তুর (৫২:৩৫-৩৬)

প্রত্যেকটি মানুষই এক আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের স্বাভাবিক অনুভূতি নিয়ে জন্মায়, জন্ম থেকেই মানুষ জানে যে আল্লাহ্‌ এক এবং আল্লাহ্‌ চান আমি তার ইবাদত করি –  ইসলামের ভাষায় এই অনুভূতিকে ‘ফিতরাহ’ বলে।

কি, ‘ফিতরাহ’ এর ব্যাপারটা বিশ্বাস হচ্ছে না? বৈজ্ঞানিক প্রমান লাগবে? তাহলে শুনুন। University of Oxford এর Centre for Anthropology and Mind বিভাগের সিনিয়র রিসার্চার Dr. Justin Berrett দীর্ঘ ১০ বছর শিশুদের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষনা করে বলেছেন:

“Young people have a predisposition to believe in a supreme being because they assume that everything in the world was created with a purpose.”

 “If we threw a handful (of babies) on an island and they raised themselves I think they would believe in God.”

 

প্রশ্ন ২। আচ্ছা বুঝলাম এই সৃষ্টিজগত একজন স্রষ্টা তৈরী করেছেন, কিন্তু তাহলে সেই স্রষ্টার স্রষ্টা কে?

উত্তর:  স্রষ্টা কে কেউ সৃষ্টি করতে পারে কিনা – আসুন ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখি।

কখনো ডমিনোর খেলা দেখেছেন? ডমিনোগুলোকে একটার পর একটা সাজিয়ে বাইরে থেকে ধাক্কা দেয়া হয় আর তার effect শুরু হয়, একটার পর একটা ডমিনো পড়তে থাকে। সৃষ্টির ব্যাপারটাও একইরকম। একটা সৃষ্টি আরেকটা সৃষ্টির কারণ ঘটায়। এখন, আমি যদি আপনাকে বলি, কোন বাতাস ছিল না, কেউ ধাক্কা দেই নাই, অনেকগুলো ডমিনো সাজানো ছিল এবং কোন বাহ্যিক বল ছাড়া এমনি এমনি ডমিনো একটার উপর আরেকটা পড়তে শুরু করল, আপনি কি বিশ্বাস করবেন? করবেন না (নিউটনের ১ম সূত্র) । এবং যে এই বাহ্যিক বল প্রয়োগ করবে সে অবশ্যই ডমিনো হতে পারে না। কারণ সে ডমিনো হলে, অর্থাৎ সে process of creation এর অন্তর্ভুক্ত হলে তাকে push করার জন্য, অন্য কথায় তাকে সৃষ্টি করার জন্য অন্য কাউকে লাগবে। অর্থাৎ, এই বাহ্যিক বল প্রয়োগকারী স্রষ্টাকে সৃষ্টি থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হতে হবে। সৃষ্টি যদি সসীম হয়, স্রষ্টা হবেন অসীম; সৃষ্টি যদি অন্য সৃষ্টির প্রয়োজন অনুভব করে, স্রষ্টা হবেন চাহিদার উর্দ্ধে; সৃষ্টি যদি ভুল প্রবণ হয়, স্রষ্টা হবেন ভুলের উর্দ্ধে; সৃষ্টি যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, স্রষ্টা হবেন চিরস্থায়ী। আর এই স্রষ্টা যেহেতু অসীম ক্ষমতাশীল, অনাদি, অনন্ত, কাজেই এই রকম স্রষ্টা মাত্র একজনই থাকবেন। কারণ, একাধিক অসীম ক্ষমতাশীল, অনাদি, অনন্ত স্রষ্টার সহাবস্থান অসম্ভব।

বলুন – তিনিই আল্লাহ্‌, এক ও অদ্বিতীয়। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। এবং কেউই তার সমকক্ষ নয়। – সূরা ইখলাস (১১২:১-৪)

সুতরাং, মহাবিশ্বের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে স্রষ্টাকে কেউ সৃষ্টি করে নাই। কারণ, মহাবিশ্বকে যে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন সেই স্রষ্টাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে, তাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে, তাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে – এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে এবং  কোনদিনই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হত না। এই ধাঁধার একমাত্র সমাধান হলঃ স্রষ্টাকে কেউ সৃষ্টি করেন নাই, এবং তিনি সবসময়ই ছিলেন। এই কথাই বলে মহাগ্রন্থ কোরআন:

 

আল্লাহ্‌ – তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নাই। তিনি চিরঞ্জীব, অনাদি। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের (মানুষের) সামনে ও পেছনে যা-কিছু আছে তিনি তা জানেন। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। আকাশ ও পৃথিবীব্যাপী তাঁর আসন, আর তাদের রক্ষণাবেক্ষণে তিনি ক্লান্ত হন না। তিনি অত্যুচ্চ মহামহিম। – সূরা বাক্বারাহ্‌ (২:২৫৫ – আয়াতুল কুরসী)

প্রশ্ন ৩। আমার কাছে মহাবিশ্ব নিজেই স্রষ্টা। এতে কোনও সমস্যা আছে?

উত্তর: আপনি নিশ্চয়ই বিগ ব্যাং থিউরী তে বিশ্বাস করেন। বিগ ব্যাং থিউরী মতে এই মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে। পৃথিবীর অন্যতম বড় পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং নিজেও তার ওয়েবসাইটে এই সম্পর্কে লিখেছেন:

The conclusion of this lecture is that the universe has not existed forever. Rather, the universe, and time itself, had a beginning in the Big Bang, about 15 billion years ago.  The Beginning of Time, Stephen Hawking

যার শুরু থাকে তার সৃষ্টি হওয়ারও একটা কাল থাকে, আর যে সৃষ্টি হয় – তার অবশ্যই একজন স্রষ্টা থাকে। কাজেই মহাবিশ্ব নিজে কখনই স্রষ্টা হতে পারে না। মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করার জন্য একজন অনন্ত-অসীম, পরম ক্ষমতাশীল স্রষ্টা লাগবে – আর সেই পরম ক্ষমতাশীল স্রষ্টাই হলেন আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা।

অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশ ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল? তারপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি ওরা বিশ্বাস করবে না? – সূরা আম্বিয়া (২১:৩০)

References:

1. Does God exist? – Abdur Raheem Green

2. Who is your Lord? – Dr. Bilal Philips

3. Fundamentals of Faith – Dr. Yasir Qadhi