নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে

light_at_the_end_of_the_tunnel_by_juhan.jpg

আল্লাহ ﷻ সূরা ইনশিরাহ-তে বলেছেন:
“ফা ইন্না মা’আল ‘উসরি ইউসরান, ইন্না মা’আল ‘উসরি ইউসরা”
অর্থ: অবশ্যই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে, অবশ্যই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।
(আল-কুরআন ৯৪:৫-৬)

এখানে কয়েকটা ব্যাপার লক্ষণীয়:
১। আল্লাহ ﷻ কিন্তু বলেননি কষ্টের পরে স্বস্তি আছে, আল্লাহ ﷻ বলেছেন কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। প্রতিটা কষ্টই আসলে আমাদের জন্য স্বস্তি, কষ্টের মূহুর্তটা ইটসেলফ আমাদের জন্য স্বস্তি। কারণ, কষ্টের ঐ মুহুর্তগুলিতে যদি ধৈর্য্য ধরতে পারি, তাহলে সেই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ ﷻ আমাদের গুনাহ মাফ করে দিবেন।
২। কষ্টটাই স্বস্তি, কারণ আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভালো পরিবর্তনগুলো, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলি আমরা শিখি কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তাই, কষ্ট আর স্বস্তি যেন একে অপরের সমার্থক।
৩। কষ্টটা স্বস্তি হওয়া মানে এই না যে কষ্টের মূহুর্ত কখনো শেষ হবে না, বরং তা শেষ হবে এবং তখন আমরা রিলিভড্ (স্বস্তি) ফিল করব। ৫ নং আয়াতের স্বস্তি যদি হয় কষ্টের সময়কার স্বস্তি, ৬ নং আয়াতের স্বস্তি হলো কষ্ট মুক্তির পরের স্বস্তি।
৪। ৬ নং আয়াতে আল্লাহ কষ্টের পরে (বা’দ) স্বস্তি আছে না বলে কষ্টের সাথে (মা’আ) স্বস্তি আছে বললেন কেন? কারণ, পরকালের অনন্ত-অসীম জীবনের কাছে ইহকালের কষ্টের দিনগুলি এতই ক্ষণিকের যে, তখন চিন্তা করলে মনে হবে – পৃথিবীতে যতদিন ছিলাম, কষ্টের সাথে সাথেই তো স্বস্তি ছিল!

কদর এর রাত কি?

রামাদানের শেষ দশক মর্যাদাশীল “লাইলাতুল ক্বদর” এর কারণে। তাই, আমাদের সবারই উচিত এই সময়ে “সূরা ক্বদর”-কে বুঝে বুঝে পড়া। “সূরা ক্বদর” বুঝলে কদর এর রাতের গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব হবে। নিচে সহজ ভাষায় “সূরা ক্বদর” নিয়ে আলোচনা করা হলো।

সূরা ক্বদর

sura qadr in arabic

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম (প্রচন্ড দয়ালু, প্রতিনিয়ত দয়ালু আল্লাহর নামে)

১) ইন্না- আনযালনাহু ফি লাইলাতিল ক্বদর

অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা একে (অর্থাৎ, কুরআনকে) কদর এর রাতে অবতীর্ণ করেছি

  • লক্ষ্য করুন, আল্লাহ্‌ ﷻ এই বাক্যে “কুরআন” শব্দটিকে উহ্য রেখেছেন। কিন্তু কেন? কারণ এর মাধ্যমে আল্লাহ ﷻ যেন মানুষকে বলতে চাইছেন, কদর এর রাত “বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত” টাইটেল পাওয়ার জন্য আল্লাহ্‌ ﷻ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থকে (কুরআন) এ রাতে অবতীর্ণ করবেন, এটা খুব অবভিয়াস একটা ব্যাপার। পাঠকের তো এটা এমনিতেই বুঝা উচিত, এটা আবার বলার কি আছে? এভাবে, কুরআন শব্দটি উহ্য রেখে আল্লাহ্‌ ﷻ আমাদেরকে কুরআনের মর্যাদা বুঝিয়ে দিয়েছেন।

২) ওয়ামা- আদ্‌রোকামা লাইলাতুল ক্বদর

অর্থ: কিভাবেই বা তুমি বুঝবে কদর এর রাত কি?

  • আল্লাহ্‌ ﷻ আমাদের প্রশ্নের আড়ালে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, “লাইলাতুল ক্বদর” এর মর্যাদা এতই বেশী যে এটা ঠিকমতো অনুধাবন করার মত পূর্ণ সামর্থ্য পর্যন্ত আমাদের নাই। আরবীতে – “লাইলা” শব্দের অর্থ রাত। আর, “ক্বদর” শব্দটির অনেকগুলো অর্থ আছে, এমনকি এই অর্থগুলোর ব্যবহার বাংলা ভাষাতেও দেখা যায়। যেমন –
    • কদর অর্থ ভাগ্য। আমরা অনেক সময় বলে থাকি: “আরে ভাই ঐটা আমার তকদীর এ নাই।” এই বাক্যের তকদীর শব্দটি এসেছে কদর থেকে।
    • কদর অর্থ শক্তি। যেমন – বাংলায় একটা প্রচলিত ধাঁধা আছে: “আল্লাহর কি কুদরত, লাঠির ভিতর শরবত”, এখানে কুদরত শব্দটি কদর থেকে এসেছে।
    • কদর অর্থ মর্যাদা। যেমন আমরা বলে থাকি – “যে দেশে গুণের কদর নাই সে দেশে গুণী জন্মায় না”।
    • কদর অর্থ চাপাচাপি করে থাকা। কারণ, এই রাতে আসমানের সব ফেরেশতা দলে দলে পৃথিবী চলে আসে; এত বেশী ফেরেশতা আসে যে তাদের মধ্যে ধাক্কা-ধাক্কি শুরু হয়ে যায়। এই ফেরেশতারা নিয়ে আসে শান্তি, আর তাদের চেতনায় থাকে রাজ্যের বিস্ময়। এই ফেরেশতারা বিস্মিত হয়ে মানুষ দেখে, বিমুগ্ধ ভাবে চেয়ে দেখে কিভাবে কিছু মানুষ না ঘুমিয়ে, না জিরিয়ে, প্রবৃত্তির কু-তাড়নার বিরুদ্ধে লড়াই করে শুধু আল্লাহর ﷻ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদতে মগ্ন হয়ে আছে।

৩) লাইলাতুল কদরী খইরুম মিন আলফি শাহর

অর্থ: কদর এর রাত তো হাজার মাস থেকেও উত্তম

  • আগের আয়াতে আল্লাহ্‌ ﷻ বলেছিলেন যে, আমাদের পক্ষে লাইলাতুল কদর কি তা ঠিক মতো বুঝা সম্ভব না, কারণ এ রাতের মহত্ব অনুধাবন করা মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু ভেবে দেখুন, দৈনন্দিন জীবনে কেউ যখন কিছু না বুঝে তখন আমরা তাকে এমন কিছু উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করি যাতে সে কিছুটা হলেও তা অনুধাবন করতে পারে। আল্লাহও ﷻ তাই করলেন এখানে। আমরা যদিও কদর এর রাতের মর্যাদা ঠিকমতো বুঝবো না – তবু আল্লাহ ﷻ উদাহরণ দিয়ে আমাদের সাহায্য করলেন: এই রাতের ইবাদত হাজার মাস তথা ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদত করার চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ, এই রাতে আপনি ১ টাকা দান করা মানে আপনি কমপক্ষে ৮৩ বছর ধরে প্রতি রাতে ১ টাকা দান করেছেন, এই রাতে ২ রাকআত নফল নামাজ পড়া মানে আপনি কমপক্ষে ৮৩ বছর ধরে প্রতি রাতে ২ রাকআত নফল নামাজ পড়লেন, এই রাতে কুরআনের ১ আয়াত মুখস্থ করলে আপনি যেন কমপক্ষে ৮৩ বছর প্রতিরাতে কুরআনের ১টি আয়াত মুখস্থ করলেন।

৪) তানাযযালুল মালা-ঈকাতু ওয়ার রুহু ফিহা বি ইযনি রব্বিহিম মিন কুল্লি আমর

অর্থ: এই রাতে প্রত্যেক কাজে দলে দলে ফেরেশতারা নেমে আসে, আর আসে রুহ (জিব্রিল), কারণ তাদের প্রতিপালক অনুমতি দেয়

  • এই রাত মর্যাদাবান হওয়ার অন্যতম কারণ হলো আসমানের বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ফেরেশতা সব সেদিন পৃথিবীতে চলে আসে, এমনকি যে জিব্রিল(আ) শুধুই নবী-রাসূলদের কাছে আসতেন তিনিও চলে আসেন এই ধরায়। কেন? তারা আসেন সেলিব্রিটি ইবাদতকারীদের দেখতে! বিশ্বকাপ ক্রিকেট বা ফুটবল শুরুর আগে আমরা যেমন উত্তেজনায় ভুগি, বার-বার ক্যালেন্ডার চেক করি কবে আমার ফেভারিট প্লেয়ারকে দেখব, তার চেয়েও বহুগুন অধীর আগ্রহ আর উত্তেজনা নিয়ে ফেরেশতারা অপেক্ষা করে লাইলাতুল কদর এর জন্য। কারণ, এই এক রাতের জন্য আল্লাহ্‌ ﷻ ফেরেশতাদের অনুমতি দেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের ইবাদতরত অবস্থায় দেখে আসার জন্য, তাদেরকে সালাম দেয়ার জন্য। ভেবে দেখুন – ফেরেশতাদের মধ্যে সে কি উত্তেজনা বিরাজ করে এই রাতের জন্য! কোনও ফেরেশতা হয়তো দেখতে আসবে – সেই ব্যক্তিকে যে সবচেয়ে বেশী খুশু’ এর সাথে নামাজ পড়েছে, কেউ হয়তো দেখতে আসবে সেই ব্যক্তিকে যে ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহর ﷻ সন্তুষ্টি অর্জন করেছে, আবার অন্য ফেরেশতা দেখবে আসে তাকে যে বিপদে পড়া মানুষকে নিজের সামর্থ্যমতো সাহায্য করেছে, ধাক্কাধাক্কি লেগে যাবে সেই বান্দাকে দেখতে যে শুধু আল্লাহর ﷻ শাস্তির ভয়ে নিজের পাপের কথা চিন্তা করে একাকী চোখের পানি ফেলেছে। একটি অস্তিত্ব সম্পূর্ন নিজের ইচ্ছায় মহান আল্লাহর ﷻ ইবাদত করছে – এটা যেন ফেরেশতাদের কাছে আসমান-জমিনের সবচাইতে সুন্দর দৃশ্য!

কে জানে – আমি, আপনি হয়তো আজ এই কদর এর রাতকে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিব, কিন্তু আমাদের বাসার দারোয়ান চাচা, বা পাশের বস্তির রিকশাওয়ালা আজ সারারাত জেগে ইবাদত করবে। ফেরেশতাদের সালাম, ফেরেশতাদের দু’আ আমি-আপনি হয়তো মিস করব, কিন্তু আমাদের বাসার দারোয়ানকে হয়তো তারা ঠিকই সালাম দিয়ে যাবে। আমি-আপনি আজ রাতে নিজের অজান্তেই হয়তো হয়তো দরিদ্র হয়ে গেছি, হেরে গেছি, আল্লাহর ﷻ হিসাবে আজ হয়তো জিতে গেছে পাশের বস্তির রিকশাওয়ালা।

৫) সালামুন হিয়া হাত্তা মাত লাঈল ফাজর

অর্থ: শান্তি, এ রাতের ফজর পর্যন্ত

  • শেষে এসে আল্লাহ্‌ ﷻ মনে করিয়ে দিচ্ছেন – জলদি ইবাদতের দিকে আসো, জলদি! এই রাত তো অতি সংক্ষিপ্ত, মাত্র কয়েক ঘন্টা, মাত্র চার-পাঁচশ’ মিনিট। ফজরের আজান হয়ে গেলেই সব শেষ! অল্প এই সময়টুকু কোনও মতেই হাত ছাড়া হতে দিও না হে বোকা মানুষ! আজ রাতে বেশী বেশী করে দু’আ করে নাও, আজ রাতেই নির্ধারিত হয়ে যাবে আগামী এক বছর তুমি মরবে না বাঁচবে, তুমি নামাজী হবে না বেনামাজী হবে, তোমার সন্তান হবে কি হবে না, আজ নির্ধারিত হবে তুমি কবে কি খাবে, কবে কোথায় যাবে, চাকুরী হারাবে না ব্যবসায় লাভ করবে, তোমার কোন্‌ আত্মীয় অসুস্থ হবে, কে মারা যাবে – সব কিছু নির্ধারণ হয়ে যাচ্ছে এই রাতে। আজ রাতের মতো আর সুযোগ পাবে না শান্তি কিনে নেয়ার। বিরাট সেইল, বিরাট সুযোগ – কিনে নাও এই রাতে শান্তি, দুনিয়ার ও আখেরাতের শান্তি।

শেষ করব ইন্টারেস্টিং দুইটা তথ্য দিয়ে।

এক: সূরা কদর হলো মাক্কী সূরা। মাক্কী সূরাগুলোর অডিয়েন্স ছিল মূলত মক্কার মুশরিকরা। প্রশ্ন দাঁড়ায় – মুশরিকরা যেখানে কুরআনেই বিশ্বাস করে না সেখানে তাদেরকে লাইলাতুল কদর এর মহত্ব সম্পর্কে বলে লাভ কি? লাভ হলো – আল্লাহ্‌ ﷻ মুশরিকদের বুঝিয়ে দিলেন, তোমরা তোমাদের সম্পদ, ক্ষমতা, টাকা-পয়সা নিজে যতই বড়াই করো না কেন, বিলাল(রা) আর আম্মার বিন ইয়াসির(রা) এর মতো দাসদের একটি মাত্র রাতের মর্যাদা তোমাদের ৭০-৮০ বছরের জীবনের চাইতে বেশী। জমিনের বাসিন্দাদের হাতে মুসলিমরা হয়তো নির্যাতিত, কিন্তু আসমানের বাসিন্দাদের কাছে তারা ঠিকই সম্মানিত।

দুই: লাইলাতুল কদর এর রাত রমজানের শেষ দশকের যে কোন রাতেই হতে পারে, বেজোড় রাতে হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশী। তাই শেষ ১০ রাতের প্রত্যেই রাতেই নিয়মিতভাবে কিছু ভালো কাজ করুন, আর বেজোড় রাতগুলিতে আরো বেশী এফোর্ট দিয়ে পুরো রাত জেগে ইবাদত করার চেষ্টা করুন। আচ্ছা – আল্লাহ্‌ ﷻ এই রাতকে নির্দিষ্ট না করে দিয়ে এরকম ভ্যারিয়েবল করলেন কেন? এর একটা কারণ আমাদের সবার জানা। সেটা হলো – মানুষ যাতে অলস হয়ে শুধু এক রাতের পেছনে পড়ে না থাকে, বরং বিভিন্ন রাতে চেষ্টার মাধ্যমে তার নিজের মর্যাদার উন্নয়ন করতে পারে। কিন্তু আলেমরা এর আরেকটা গূঢ় কারণও বের করেছেন। তারা বলেন – বান্দাকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ্‌ ﷻ ইচ্ছা করে একে লুকিয়ে রেখেছেন। সেটা কিভাবে? ভেবে দেখুন, এই রাত যদি নির্দিষ্ট করা হয়ে যেতো আর কোনো বান্দা যদি তারপরেও এই রাত জেগে ইবাদত না করে ঘুমিয়ে থাকত, তারপর ফেরেশতারা যদি এসে দেখত লোকটা ইবাদত না করে ঘুমিয়ে আছে, তাহলে ফেরেশতাদের দৃষ্টিতে সেই মানুষটা কি পরিমাণ ছোট হয়ে যেত! বান্দাহকে এই লজ্জা থেকে রক্ষা করার জন্য মহান আল্লাহ্‌ ﷻ এই রাতকে লুকিয়ে রেখেছেন, সুবহানআল্লাহ্‌।

মহান আল্লাহ্‌ ﷻ আমাদেরকে লজ্জার হাত থেকে যতটা বাঁচাতে চান, আমরা নিজেরাও কি নিজেকে ততটা বাঁচাতে চাই?

(কৃতজ্ঞতা: নুমান আলী খান ও ইয়াসির কাযীর “সূরা কদর” সংক্রান্ত লেকচারগুলো)

সফলতার চার ধাপ – সূরা আল-‘আসর এর আলোকে

103

বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহি-ম

এই জীবনে আমরা সবাই কিছু না কিছু পাওয়ার পিছনে ছুটি। সেই কিছু কে পাওয়ার জন্য জীবনে চারটি মাত্র বিষয়ে মনোযোগী হতে হয়। এই চারটি বিষয় আয়ত্ত করতে পারলে যে কোন মানুষই সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারবে – ইহকালে এবং পরকালেও। সূরা ‘আসরের দ্বিতীয় আর তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ ﷻ এই চারটি বিষয় আমাদের বলে দিয়েছেন। আসুন সেই চারটি ব্যাপার দেখা নেয়া যাক:

১) বিশ্বাস রাখো:  “ঈমান” শব্দের অর্থ হলো বিশ্বাস। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে সফলতা চাইলে এক আল্লাহ ﷻ, তাঁর রাসূল ﷺ এবং রাসূল ﷺ এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিশ্বাস রাখতে হবে। আর এই জীবনে সাফল্য অর্জন করতে হলে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে – “আমি পারবই ইনশা’ আল্লাহ”। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

ওয়াল ‘আসর ইন্নাল ইনসা-না লাফিই খুসর। ইল্লাল্লাযিনা আ-মানু … (সূরা ‘আসর ১-২)

অর্থ: সময়ের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তারা ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে …

২)  যা করা দরকার তা করে যাও: অনেক সময় আমাদের এমন হয় যে – নামাজ পড়তে ইচ্ছা করে না, যিকর করতে মন চায় না, কোরআন মজিদ পড়ারও আগ্রহ পাওয়া যায় না – তবু যেহেতু আল্লাহ ﷻ  ও তাঁর রাসূল ﷺ  এই রিচুয়ালগুলো আমাদের করতে বলেছেন – তাই এগুলো করে যেতে হবে। একইভাবে, দুনিয়াতে সাফল্য পাওয়ার জন্যও কিছু রুটিন ওয়ার্ক আছে, সেগুলি আমাদের করে যেতে হবে। যেদিন ভালো লাগবে সেদিনও একজন ছাত্রকে পড়তে বসতে হবে, যেদিন ভালো লাগবে না সেদিনও তাকে পড়তে বসতে হবে; একজন চাকুরিজীবির যেদিন কাজে মন বসবে সেদিন অফিসের কাজ করতে হবে, আবার কাজে মনোযোগ না বসলেও জোর করে অফিসের কাজ করে যেতে হবে। যা করা উচিত তা করতে থাকতে হবে, আজ বা আগামীকাল এর ফল চোখে না দেখা গেলেও, পরশু এর ফল ঠিকই পাওয়া যাবে।

ওয়া ‘আমিলুস স্বয়ালিহ্বা-তি  … (সূরা ‘আসর ৩)

অর্থ: যারা ভালো কাজ করে

৩)  নতুন কিছু শেখো: আল্লাহ ﷻ কোরআন মাজিদের সূরা ফাতির এর ২৮ নং আয়াতে বলেছেন “আল্লাহর ﷻ বান্দাদের মধ্যে  শুধু তারাই তাঁকে ভয় করে যাদের জ্ঞান আছে”। ইসলাম সম্পর্কে আপনি যত জানবেন ততই রুটিন ইবাদতগুলো আপনার কাছে অর্থবহ হয়ে উঠবে। নামাজ-রোজাকে আপনার কাছে রবোটিক কোন ব্যাপার বলে মনে হবে না, বরং তখন আপনি এই ইবাদতগুলোর মধ্যে ঈমানের মিষ্টি স্বাদ আস্বাদন করতে পারবেন।

পার্থিব জীবনেও সেই ব্যক্তি তত সফল, যে অন্য মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশী অবদান রাখতে পারে।  আর অন্যের উপকারে আসতে চাইলে, আগে নিজের উন্নয়ন করতে হবে।  ভালো কথা অন্যকে বলতে হলে আগে নিজেকে ভালো কথা শিখতে হবে।

ওয়াতা ওয়া- সাওবিল হাক্কি … (সূরা ‘আসর ৩)

অর্থ: একে অপরকে সঠিক উপদেশ দেয়

৪) মানুষের উপকারে আসো: নবী হওয়ারও আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর পরোপকারী মানুষ। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর সমস্ত জীবন ব্যয় করেছেন অন্য মানুষদের ভাগ্য উন্নয়নে। আমরাও যত অল্প টাকাই পারি না কেন তা দিয়ে মানুষকে সাহায্য করব, যত অল্প শ্রমই হোক না কেন তা দিয়ে মানুষের উপকার করব, যত অল্পই শিখি না কেন, তা অন্যদের সাথে শেয়ার করব। পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশীদের সহ সমস্ত মানুষকে উপকারের চেষ্টা করব। কারো কাছ থেকে প্রতিদান চাইবো না, প্রতিদান চাইবো শুধুই আল্লাহর কাছে।

মানুষকে উপকার করার এই পথ মধুর না, বন্ধুর। অনেক সমালোচনা-গালমন্দ শুনব, অনেক অকৃতজ্ঞ মানুষের দেখা পাবো, অনেক সময় আর্থিক বা সামাজিক সংকটে পর্যন্ত পড়ে যেতে পারি – তবু ধৈর্য্য ধরব। যত অল্পই হোক না কেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কন্ট্রিবিউট করব। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন – খেজুরের অর্ধেকটা দান করে হলেও নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও (বুখারী)।

ওয়াতা ওয়া- সাওবিস সবর। (সূরা ‘আসর ৩)

অর্থ: একে অপরকে ধৈর্য্যের উপদেশ দেয়।  

দ্বিতীয়-তৃতীয় আয়াতে বর্ণিত এই চারটি কাজ যদি আমরা না করি তাহলে আমরা মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে ডুবে যাবো।  এই ক্ষতির ভয়াবহতা যে কতটা চরম তা বুঝাতে আল্লাহ ﷻ এই কাজগুলোর উপর চারভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

এক: প্রথম আয়াতে আল্লাহ ﷻ সময়ের কসম নিয়েছেন। আল্লাহ ﷻ কোন কিছু কসম নেয়ার অর্থ হচ্ছে তার পরের কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ন।

দুই: আল্লাহ ﷻ “ইন্না” দিয়ে বাক্য শুরু করে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। “ইন্না” শব্দের অর্থ হলো “নিশ্চয়ই”।

তিন: আল্লাহ ﷻ “ইন্নাল ইনসানা ফি খুসর” (নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে), না বলে “ফি” এর আগে “লা” যুক্ত করেছেন। এই “লা” এর অর্থ হলো “অবশ্যই”। সুতরাং আল্লাহ ﷻ যখন বললেন “ইন্নাল ইনসানা লাফি খুসর”, এর অর্থ দাঁড়ায় “নিশ্চয়ই অবশ্যই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে”।

চার: আল্লাহ ﷻ তৃতীয় বাক্য শুরু করলেন “ইল্লা” (“শুধু তারা বাদে” বা Except) দিয়ে। ইল্লা দিয়ে কোন বাক্য শুরু করা হলে সেটা পূর্ববর্তী বাক্যের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। যেমন – কোন ক্লাসের ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে যদি ৯৫ জন ফেইল করে তাহলে টিচার বলবেন – “এই ক্লাসের ছাত্ররা ফেল করেছে, শুধু কয়েকজন বাদে”, অর্থাৎ ফেল করাটাই যেন স্বাভাবিক ঘটনা, পাশ করাটা হলো ব্যতিক্রম। একইভাবে, আল্লাহও ﷻ বলতে চাইছেন যে, অধিকাংশ মানুষই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, শুধু গুটিকয় আছে যারা সঠিক পথে আছে।

আমাদের অফিসের কোন বিশ্বস্ত কলিগ যদি এক বা দুইবার নয়, চার চারবার ফোন করে বলে – “বন্ধু, মহাখালীর রাস্তায় এক্সিডেণ্ট হয়েছে, বিরাট জ্যাম, ভুলেও ঐ পথে যেও না, ঘুরে যাও” – তাহলে আমরা বাসায় ফিরতে নিশ্চিত মহাখালীর রাস্তা নিব না। আর, আমাদের পালনকর্তা প্রভু যখন আমাদের একই আয়াতে চারবার সতর্ক করে কোন কিছু করতে আদেশ করেন তখন আমরা কত অনায়াসে সেই আদেশ অমান্য করে দিনাতিপাত করতে থাকি!

ইমাম শাফেঈ’ বলেছেন – লোকে যদি শুধু এই সূরা (সূরা ‘আসর) নিয়ে চিন্তা করত, সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হত।

রেফারেন্স:

  1. Khutbah- The Role of a Muslim in a Non-Muslim Society (Based on Sura ‘Asr) ~ Dr. Yasir Qadhi
  2. Meaning of Surat Al-‘Asr – Understand Quran Academy

সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি লাইফ লেসন – ৪র্থ ও শেষ পর্ব – চূড়ান্ত সাফল্য

[সূরা ইউসুফের পর্ব ১, এবং -এ আমরা ১১টি লাইফ লেসন সম্পর্কে জেনেছিলাম। পর্ব-৩ এর শেষে আমরা দেখেছিলাম যে কানআনে জন্ম নেয়া ইউসুফ এখন মিশরের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশীল আর সম্মানিত ব্যক্তি। বাবা আর ভাইদেরকেও সম্মানের সাথে মিশরে নিয়ে এসেছেন ইউসুফ। একজন মানুষ জীবনে যা চায় তার সবই তো তিনি পেয়ে গেছেন, এবার কিসের জন্য দু’আ করবেন ইউসুফ? ৪র্থ ও শেষ পর্বে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর পাবো।]

১২) সফলতার সংজ্ঞা জানুন (Know the definition of success)

12. success

জীবনের বড় কোনো সফলতার কথা মনে করে দেখুন তো। আপনি হয়তো অনেক দু’আ করছিলেন – হে আল্লাহ আমি যাতে ‘এত’ সিজিপিএ নিয়ে গ্রাজুয়েশন করতে পারি, তারপর আপনি সেটা অর্জন করেছিলেন। অথবা মনে করুন, আপনার সেই স্মরণীয় চাকুরী প্রাপ্তির দিনটি। আল্লাহর কাছে অনেক অনেক দু’আ করছিলেন – হে আল্লাহ আমাকে এই চাকরিটি মিলিয়ে দাও, এই চাকরিটি পেলে আমার জীবনের সব কিছু সেটল হয়ে যাবে! তারপর চাকরিটি হয়তো আপনি পেয়েও গিয়েছিলেন। কিংবা পছন্দের মানুষকে বিয়ে করার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করেছিলেন – হে আল্লাহ আমি যাতে অমুককে বিয়ে করতে পারি। লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর আপনার আচরণ কেমন হয়েছিলো তা মনে আছে? নতুন এই অর্জন আপনাকে আল্লাহর ইবাদতে আরো মনোযোগী করে তুলেছিলো, নাকি এই অর্জন আপনাকে নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে অহংকারী করে তুলেছিলো?  আসুন দেখা যাক অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের পর নবী ইউসুফ(আ) এর আচরণ কেমন ছিলো।

কিসের এখন আর অভাব আছে নবী ইউসুফ(আ) এর জীবনে? পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন।মিশরের ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে কোষাধ্যক্ষ হিসাবে প্রবল প্রজ্ঞা আর বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি – দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষও কাবু করতে পারেনি মিশরের খাদ্যভান্ডারকে।চতুর্দিকে তাঁর প্রশংসা আর প্রশংসা। শুধু তাই নয় – নিজের মা-বাবা আর ভাইদেরকে কানআন থেকে নিয়ে এসে সম্মানের সাথে প্রাচূর্যময় দেশ মিশরের নাগরিকত্ব পাইয়ে দিয়েছেন। ক্ষমতা, টাকা, সম্মান, জনপ্রিয়তা, সুখী পরিবার – কোনো কিছুরই অভাব নেই নবী ইউসুফ(আ) এর জীবনে।কিন্তু চোখ-ধাঁধানো এই সাফল্য আর ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তাও চূড়ান্ত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারলো না নবী ইউসুফ(আ) কে;  মহান আল্লাহর কাছে তিনি দু’আ করলেন চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য:

‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করেছো ও স্বপ্নের ব্যাখা শিক্ষা দিয়েছ। হে আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমি ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে আত্মসমর্পণকারীর (মুসলিমের) মৃত্যু দাও ও আমাকে সৎ কর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করো’। (১২:১০১)

পশ্চিমা সাহিত্যে সফলতার সবচেয়ে বিখ্যাত সংজ্ঞাটি দিয়েছেন আর্ল নাইটিংগেল: ‘Success is the progressive realization of a worthy ideal’[৭]।আর ইসলাম বলে মানুষের একমাত্র worthy ideal হলো মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে আত্মসমর্পণ করা। আল্লাহর ইচ্ছার কাছে যে ব্যক্তি আত্মসমর্পণ করে তার ধর্ম হলো ইসলাম, আর সেই ব্যক্তি হলো মুসলিম।

ইসলামিক জীবন-ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের মধ্যে ২টি প্রচলিত দুইটি ভুল ধারণা আছে:

  • এক গ্রুপের ধারণা – ইসলামিক জীবন যাপন মানে সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া। ইসলাম পালন করতে চাইলে চাকরী-বাকরী ছেড়ে ছুড়ে মসজিদে মসজিদে ঘুরতে হবে। হাসি-ঠাট্টা করা যাবে না, সব সময় মুখ গোমড়া করে রাখতে হবে, বেড়াতে যাওয়া যাবে না – ইত্যাদি।
  • আরেক গ্রুপের ধারণা – ‘আল্লাহ এক’ বলে স্বীকার করার পর যা ইচ্ছা তা করলেই হয়, ইচ্ছা হলো তো নামাজ পড়লাম ইচ্ছা হলো তো পড়লাম না, সুদ-ঘুষ সহ যে কাজটাকে আমার কাছে সঠিক বলে মনে হবে সেটা করলেই চলবে, কালেমা যখন পড়েছি একদিন না একদিন কোনো এক চিপা দিয়ে তো বেহেশতে যাবই যাব।

এই দুইটি ধারণাই ভুল, কারণ ইসলাম একটি মধ্যপন্থী ধর্ম [১২]। ইসলাম পালন করা মানে এই নয় যে সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে সারাদিন মসজিদে পড়ে থাকতে হবে। আবার ইসলাম মানে এইও নয় যে ৫ ওয়াক্ত নামাজ ছেড়ে দিয়ে দিন-রাত চাকরী বা ব্যবসা নিয়ে পড়ে থাকলেও ঠিক আছে। ইসলাম মানে হলো:

  • আল্লাহ যেভাবে ইবাদত করতে বলেছেন সেইভাবে নিয়মিত তাঁর ইবাদত করা (http://quran.com/51/56), এবং
  • পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, আচার-ব্যবহার থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য চেষ্টা করা (http://quran.com/67/2)

তবে অবশ্যই ইহকালের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে পরকালের সাফল্যের উপর। আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদত করার আত্মিক চাহিদা (Spiritual need) দিয়ে তৈরী করেছেন। মানুষ যখন এই আত্মিক চাহিদাকে উপেক্ষা করে তখন সে বিভিন্ন পার্থিব বস্তু (যেমন – সম্পদ, টাকা, গান-বাজনা, নতুন নতুন গ্যাজেট, নিত্য নতুন হুজুগ) দিয়ে নিজের সেই চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে। সে কখনোই এভাবে সফল হয় না, বরং তার হৃদয়ের ব্যধি আরো বাড়তেই থাকে।

হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন – ‘হে আদম সন্তান! তুমি আমার ইবাদতে নিজেকে ব্যস্ত রাখো, আমি তোমার হৃদয় প্রাপ্তি দ্বারা পূর্ণ করে দিব এবং দারিদ্র্যতা থেকে তোমাকে দূরে রাখব। আর তুমি যদি তা না করো, তোমার দুই হাতই পূর্ণ থাকবে, কিন্তু তবুও তোমার দারিদ্র্যতা আমি দূর করব না (তথা চাহিদা পূরণ করব না)’। – (তিরমিযী, আহমাদ, ইবনে মাজাহ)

ইসলামিক জীবন ব্যবস্থায় সফলতার সাথে ওতপ্রোতভাবে যে বিষয়টি জড়িত তা হলো – নিয়ত বা উদ্দেশ্য (intention)। যে কোনো লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রেই একজন মুসলিমের উদ্দেশ্য যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা না হয়ে অন্য কিছু হয়ে থাকে, তাহলে সে পরকালে এই কাজের জন্য কোন পুরষ্কার পাবে না।আমাদের নিয়ত যদি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, তখন আমরা যে কোন হালাল কাজ সম্পাদন করলেই আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরষ্কার পাবো। এমনকি আমরা যখন অফিসে বসে কাজ করি, তখন যদি এই উদ্দেশ্যে কাজ করি যে আমি যে টাকা আয় করছি তা দিয়ে আমি সংসার চালিয়ে আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালন করবো, তাহলে আমরা আল্লাহর থেকে পুরষ্কার পাবো, কিন্তু আমরা যদি শুধু জীবনটাকে ‘এনজয়’ করবো এই উদ্দেশ্য নিয়ে চাকরি করি তাহলে আল্লাহর থেকে কোনো পুরষ্কার পাবো না। আমরা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করবো তখন অফিসে জবাবদিহিতার ভয় না থাকলেও আমরা ঘুষ খাবো না, কাজে ফাঁকি দিবো না। কারণ, আমরা তখন এই বিশ্বাস নিয়ে কাজ করবো যে আমার বস্‌ এর চোখকে আমি ফাঁকি দিতে পারলেও আল্লাহকে কখনোই আমি ফাঁকি দিতে পারবো না।

শেষ কথা:

শৃঙ্খলা (Discipline) আসলে কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়। শৃঙ্খলা এর একমাত্র বিকল্প হলো অনুশোচনা। আমরা যদি আজ নিজেকে নিয়মতান্ত্রিক না করি, কাল আমরা অনুশোচনা করবো। আজ পড়াশুনা না করলে, কালকে এমন চাকরী করতে হবে যা আমাদের ভালো লাগবে না; আজ পরিশ্রম না করলে কাল থাকতে হবে কম বেতনের চাকুরি নিয়ে; একইভাবে এই দুনিয়ায় আমরা যদি আল্লাহর আহবানের প্রতি যদি সাড়া না দেই, আল্লাহও পরকালে আমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না যখন আমরা জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে থাকবো।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে অতীত আর ভবিষ্যৎ সমান নয়। বর্তমানের দুর্দশাই ভবিষ্যতের সাফল্যের পথ খুলে দেয়। শিশু ইউসুফকে অন্ধকার কূপে ফেলে দেয়া হয়েছিলো বলেই প্রাচুর্যতা আর আপ্যায়নে তাঁর কৈশোর কেটেছে মন্ত্রীর বাসায়; আবার বছরের পর বছর জেলে বন্দি ছিলেন বলেই পরে রাজার সান্নিধ্যে ইউসুফ আসতে পেরেছিলেন; সাত বছর দুর্ভিক্ষের সাথে লড়াইয়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পেরেছিলেন বলেই তিনি হতে পেরেছিলেন মিশরের আজিজ (বাদশাহ)। কাজেই, অতীতের ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করুন, ধৈর্য আর পরিশ্রম নিয়ে লেগে থাকুন, আল্লাহ চাইলে অন্ধকার কূপের আপনিও একদিন সম্মানিত বাদশাহ হতে পারবেন। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।

যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার মুক্তির পথ করে দেবেন। আর তাকে ধারণাতীত উৎস থেকে জীবনের উপকরণ দান করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন; আল্লাহ তার ইচ্ছা অবশ্যই পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্য নির্দিষ্ট মাত্রা স্থির করেছেন।  (সূরা তালাক ৬৫:২-৩)

জীবন আগেও কেটেছে, জীবন পরেও কাটবে। আমাদের বাবা-দাদা, তাদের বাবা-দাদা, আবার তাদেরও বাবা-দাদা সবাই কিন্তু ততটুকু আনন্দ-উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা আর আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন ঠিক যতটুকু নিয়ে আজ আমরা করছি। তারা মরে যাওয়ার পর কয়দিন তাদের কথা ভেবে আমরা বেলা কাটিয়েছি? প্রত্যেক রাজার কোনো এক পূর্বপুরুষ দাস ছিলো, আর প্রত্যেক দাসের কোন এক পূর্বপুরুষ রাজা ছিলো – আমরা কে কাকে মনে রেখেছি? একজন কিন্তু সব ঠিকই মনে রেখেছেন, আর তিনি কড়ায়-গন্ডায় সব হিসেবও মিলিয়ে দেবেন। আসুন আমরা তাঁর ইচ্ছার কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে অগ্রসর হই।

নিচে এই সিরিজের লাইফ লেসনগুলি একসাথে তুলে ধরা হলো:

  1. অসাধারণ লক্ষ্য স্থির করুন (Set extraordinary goal)
  2. আপনার লক্ষ্যকে ভিজুয়ালাইজ করুন (Visualize your goal)
  3. অসাধারণ তাওয়াক্কুল রাখুন (Have extraordinary faith)
  4. সঠিক বিষয়ে ফোকাস করুন (Focus on the right thing)
  5. গুরুত্বের ক্রমানুসারে কাজ করুন (Prioritize your tasks)
  6. তাড়াহুড়া করবেন না (Do not hasten)
  7. গাজর ও লাঠিকে মনে রাখুন (Remember the carrot and the stick)
  8. এক ভুল দুই বার করবেন না (Don’t repeat your mistake)
  9. চুপ হয়ে থাকা শিখুন (Learn to be quiet)
  10. সম্পর্ক তৈরী করুন (Connect!)
  11. ক্ষমা একটি শিল্প, একে শিখুন (Learn the art of forgiveness)
  12. সফলতার সংজ্ঞা জানুন (Know the definition of success)

summary-clock

 

রেফারেন্স:

  1. Pearls from Surat Yusuf – Dr. Yasir Qadhi http://muslimmatters.org/2011/04/22/the-best-of-stories-pearls-from-surah-yusuf-part-1/
  2. Leadership Lessons from the Life of Rasoolullah (SAW) – Mirza Yawar Baig
  3. তাফসীর ইবনে কাথির
  4. আহসানুল বায়ান – হাফিয সালাহ উদ্দীন ইউসুফ
  5. Anger Management – Dr. Yasir Qadhi
  6. Notes from a Friend  – Anthony Robbins
  7. The Strangest Secret – Earl Nightingale
  8. Focal Point – Brian Tracy
  9. Description of Prophet Muhammad (Peace Be Upon Him) – Shaykh Hamza Yusuf http://sheikhhamza.com/transcript/Description-of-the-Prophet(SAW)
  10. 10 Rules of  #TwitterFiqh – Shaykh Yahya Ibrahim http://muslimmatters.org/2014/01/06/10-rules-twitterfiqh/
  11. Ties of Kinship, Al-Adab Al-Mufrad – Imam Bukhari http://www.sunnipath.com/library/Hadith/H0003P0002.aspx
  12. In Pursuit of the Middle Path – Dr. Yasir Qadhi http://youtu.be/S1Yrq5JqdhU

সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি লাইফ লেসন – পর্ব ৩ – সম্পর্ক উন্নয়ন

[ সূরা ইউসুফ শুধু নবী ইউসুফ(আ) এর এক্সাইটিং লাইফ স্টোরিই নয়, অসংখ্য শিক্ষনীয় বিষয় আছে এই সূরাতে। চার পর্বের এই লেখায় আমি সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া অসংখ্য লাইফ লেসনের মধ্য থেকে ১২টা লাইফ লেসন শেয়ার করবো। আপনি ইসলাম প্র্যাকটিস করুন আর না-ই করুন, আশা করি লেখাটি আপনার কাজে আসবে।

পর্ব-১  আর পর্ব-২ এ আমি ৮টি লাইফ লেসন শেয়ার করেছিলাম। পর্ব-২ এর শেষে আমরা দেখেছিলাম যে মিশর থেকে ফিরে এসে ইউসুফ(আ) এর বড় ১০ ভাই তাদের বাবা ইয়াকুব(আ) কে অনুরোধ করে যাচ্ছিলো তিনি যেন পরের যাত্রায় বিনি ইয়ামিনকে তাদের সাথে নিয়ে যেতে দেন। ইয়াকুব আপত্তি জানাতে থাকলেও তারাও ক্রমাগত অনুরোধ করে যাচ্ছিল।]

৯) চুপ হয়ে থাকা শিখুন (Learn to be quiet)

9. Silence

ভেবে দেখুন তো এরকম কিছু আপনার জীবনে ঘটেছে কিনা – আপনি ফেইসবুকে আপনার মতামত জানিয়ে নিজের টাইমলাইনে কিছু লিখেছেন। সাথে সাথেই আপনার সাথে অমত পোষণ করে একজন ঝাঁপিয়ে পড়লো আপনার উপর। আপনি উত্তর দিলেন, তো সে আপনাকে আরো খেপিয়ে দিয়ে কিছু লিখলো, আপনি আবার উত্তর দিলেন, সে আরো বেশী খেপিয়ে দিয়ে মন্তব্য করলো। ফেইসবুকের এক সামান্য স্ট্যাটাস মেসেজ নিয়ে মহাবিরক্তিতে দিন কাটা শুরু হলো আপনার। কোনো কাজেই মনোযোগ দিতে পারছেন না, ঘুরে ফিরে তীর্যক কথাগুলো আপনার মনের দেয়ালে শুধু ধাক্কা দিতে থাকলো। কি করবেন এই রকম পরিস্থিতিতে? এর ইসলামিক উত্তর খুব সহজ – মানুষটির মঙ্গল কামনা করে কেটে পড়ুন (http://quran.com/25/63, http://quran.com/28/55)  । উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) বলেছেন, ‘চুপ থাকার জন্য আমি কখনোই অনুতপ্ত হইনি, কিন্তু আমি বহুবার অনুতপ্ত হয়েছি আমার বক্তব্যের জন্য’।

আমরা যদি একটু ভালো করে চিন্তা করি তাহলে দেখব, খুব সম্ভবত আমরা নিজেরাও অতীতে কখনো না কখনো কোনো বন্ধুর উপর একই ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম – হয় অফলাইনে, নতুবা অনলাইনে। অন্যের ভুল ধরার ক্ষেত্রে আমরা একেকজন শার্লক হোমস হয়ে যাই, আর নিজের ভুল স্বীকার করার ক্ষেত্রে হয়ে যাই ইবলিশ [উল্লেখ্য, ইবলিশের বিশ্বাস হলো সে আদমকে সম্মান না করে কোনো ভুল করেনি, বরং মহান আল্লাহ আদমকে তার উপর স্থান দিয়ে ভুল করেছেন ]।

অন্যের কোনো আচরণ পছন্দ না হলে আমরা চুপ করে যাব, আর আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখব। কেউ আমাদের সাথে যতই বিরক্তিকর কথা বলুক না কেন,  খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে না উঠে আমরা তাদের ছোট খাটো ভুলকে না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাব। যদি তার ভুলটি এমন কিছু হয় যার ফলে বৃহত্তর ক্ষতির আশংকা থাকে তখন তাকে সুন্দর ব্যবহারের সাথে সম্ভব হলে ব্যক্তিগতভাবে (প্রাইভেটলি) শুধরে দিব [৯][১০]। ভেবে দেখুন কতবার এমন হয়েছে যে কাউকে সবার সামনে শুধরে দিতে যেয়ে আমরা অন্য মানুষের মন ভেঙ্গেছি? ফলে সে শুধরে না যেয়ে বরং আরো বেঁকে বসেছে!

আমাদের আরেক প্রবণতা হলো পর্যাপ্ত পড়াশুনা না করেই ইসলাম নিয়ে মন্তব্য করা। আমাদের কেউ জিজ্ঞেস করার আগেই আমরা ফতোয়া দেয়া শুরু করি – এটা হালাল, ওটা হারাম, এই ব্যাটা নাস্তিক, ঐ ব্যাটা মুনাফিক, আরে এতো বেহেশতে যাবে, ঐ লোক নির্ঘাত দোজখে যাবে ইত্যাদি। ইসলামের সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হলো ফতোয়া দেয়া, কারণ একজন মুফতিকে কোরআন, হাদিস, উসুল, ফিকহ সহ ইসলামের প্রত্যেকটা বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতে হয়। এমন কি আবু বকর(রা) কে কোরআনের আয়াতের ব্যাখা জিজ্ঞেস করা হলে উনি বলেছিলেন, ‘কোন্‌ জমিন আমাকে জায়গা দিবে আর কোন্‌ আসমান আমাকে রক্ষা করবে, যদি আমি আল্লাহর কিতাব সম্বন্ধে না জেনে কোনও কথা বলি?’

এবার আসুন ফিরে যাই ইউসুফ(আ) এর ঘটনায়। ছেলেদের ক্রমাগত অনুরোধে বিনি ইয়ামিনকে মিশরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন বাবা ইয়াকুব। ইউসুফ যখন তার ১০ সৎ ভাইয়ের সাথে বিনি ইয়ামিনকে দেখলেন তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন যেভাবেই হোক ছোট ভাইকে আমার সাথে রেখে দিতে হবে। এ সময় আল্লাহ ইউসুফকে খুব অদ্ভূত একটা কাজ করতে হুকুম করলেন, যার মাধ্যমে বাবা ইয়াকুব এর ধৈর্যও চরমভাবে পরীক্ষিত হবে – ইউসুফ এক ফাঁকে বিনি ইয়ামিনের ব্যাগে রাজার কাপ (যেটা খুব দামী এবং তাদের ন্যাশনাল সিম্বল ছিলো) রেখে দিলেন। হৈ হৈ রৈ রৈ করতে করতে খবর রটে গেলো রাজার কাপ হারানো গেছে। তল্লাশী করতে করতে সেই কাপ পাওয়া গেলো বিনি ইয়ামিনের ব্যাগে (উল্লেখ্য, ইসলাম মিথ্যা বলা ও ওয়াদা ভংগের অনুমতি দেয় না, কিন্তু বড় কোনও ক্ষতি এড়ানোর জন্য ট্রিক করা ইসলাম সমর্থন করে)[১]। চুরির আইন অনুসারে ইউসুফ বিনি ইয়ামিনকে তার কাছে রেখে দিলেন । বিনি ইয়ামিনের বিরুদ্ধে যখন চুরির বিচার চলছে তখন তাকে রক্ষা না করে ১০ সৎ ভাই বরং এটা প্রমাণ করতে লেগে গেলো যে তারা বিনি ইয়ামিন এর মতো চোর নয়। তারা ১০ ভাই যে মায়ের সন্তান তারা সবাই খুব ভালো। অন্যদিকে, বিনি ইয়ামিন ও তার হারিয়ে যাওয়া ভাই ইউসুফ অন্য মায়ের সন্তান। তারা ইউসুফের ছোট বেলার একটা ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে বলল যে বিনি ইয়ামিনের ভাই ইউসুফও চুরি করেছিলো, কাজেই বিনি ইয়ামিনও যে চুরি করবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। চোখের সামনে নিজের ব্যাপারে এরকম ডাহা মিথ্যা শুনেও ইউসুফ কোনো জবাব দিলেন না, শুধু মনে মনে তাদের এই কথাকে ঘৃণা করলেন।

ওরা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে, তার আপন ভাই (ইউসুফ) ও তো পূর্বে চুরি করেছিলো’। কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখল ও ওদের কাছে প্রকাশ করলো না। সে মনে মনে বলল, ‘তোমাদের অবস্থা তো এর চেয়েও খারাপ, আর তোমরা যা বলছ সে-সম্বন্ধে আল্লাহ ভালো করেই জানেন’। (১২:৭৭)

রাগ-নিয়ন্ত্রণ:  

আমরা যে সব মুভি-নাটক দেখি, বই পড়ি – এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের শিখায় রাগ করতে পারাটা হলো ‘গাটস’ এর ব্যাপার, যে রাগ করতে না পারে তার কোনো পার্সোনালিটি নাই। আর ইসলাম বলে ঠিক উলটো কথা – যে রেগে যায় তার কোনো পার্সোনালিটি নাই। কারণ, রেগে যাওয়া মানুষ তার নিজের নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে সমর্পণ করে। আপনি যা করেননি তার জন্য কেউ হয়তো আপনাকে দোষ দিচ্ছে, বা আপনি যে কাজ অপছন্দ করেন ইচ্ছে করে সেই কাজই সে বার বার করে যাচ্ছে, অথবা অন্যদের কাছে আপনার বদনাম করে বেড়াচ্ছে – এরকম পরিস্থিতিতে পড়লে আমাদের করণীয় কি? কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা জানতে পারি:

  • নিজের কন্ঠকে গাধার মধ্যে উচ্চ না করে বরং নামিয়ে ফেলুন (http://quran.com/31/19)
  • যে আপনাকে রাগিয়েছে তাকে ক্ষমা করে দিন (http://quran.com/42/37)
  • ধৈর্য ধরুন এবং সৌজন্য সহকারে এড়িয়ে চলুন (http://quran.com/73/10)
  • তার দোষের কথা ভুলে গিয়ে গুণের কথা মনে করুন (মুসলিম)
  • রাগ আসে শয়তানের তরফ থেকে। সুতরাং, ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ বলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। [৫]
  • আমরা রেগে গেলে শয়তান দ্রুত বেগে আমাদের রক্তে ছুটাছুটি করে আমাদের আরো রাগিয়ে দেয়। আগুনের তৈরী শয়তানকে জব্দ করার জন্য তাই অজু করুন। [৫]
  • দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ুন, বসে থাকলে শুয়ে পড়ুন। সোজা কথা, এক্কেবারে ইন্যাক্টিভ হয়ে যান। নচেৎ রাগের মাথায় আপনি হয়তো এমন কিছু বলে ফেলবেন বা করে ফেলবেন যার জন্য সারাজীবন আফসোস করতে হবে। [৫]
  • আপনার ধৈর্য্যের জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা রাখুন।

মনে রাখবেন, আপনার সাথে যে ভালো ব্যবহার করে তার সাথে ভালো ব্যবহার করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই, কৃতিত্ব হলো যে খারাপ ব্যবহার করে তার সাথে ভালো ব্যবহারে।

১০) সম্পর্ক তৈরী করুন (Connect!)

10.Connect

কাজ-শেষে বাসায় ফিরে কম্পিউটার, মোবাইল আর টিভিতে বুঁদ হয়ে না থেকে মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরী করুন। আল্লাহর পরেই আমাদের উপর সবচাইতে বেশী অধিকার আমাদের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী আর সন্তান-সন্তুতির – বাসায় ফিরে তাদেরকে সময় দিন। ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশীদের – বাসায় গিয়ে, ফোন করে, ইমেইল করে, যেভাবেই পারুন যোগাযোগ রক্ষা করুন, যে আপনার সাথে যোগাযোগ রাখে না তার সাথে আরো বেশী করে যোগাযোগ করুন। কোথাও গেলে মটকা মেরে বসে না থাকে আমাদের অন্য মানুষদের সাথে সম্পর্ক তৈরী করতে হবে। মহান আল্লাহ একেক মানুষকে একেক রকম শারিরীক গঠন, চিন্তা-ভাবনা, দক্ষতা দিয়ে তৈরী করেছেন যাতে আমরা একে অন্যকে জানার জন্য প্রয়োজনীয়তা বোধ করি (http://quran.com/49/13)।

সব সময় মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করতে হবে। ইউসুফ(আ) এর জীবনের পিছনের একটা ঘটনা থেকে আমরা মানুষকে সাহায্য করার আদব শিখতে পারি। ইউসুফ (আ) যখন জেলে ছিলেন তখন ইউসুফের কাছে রাজার দূত রাজার দেখা স্বপ্নের অর্থ জানতে চেয়েছিলো। উত্তরে ইউসুফ শুধু স্বপ্নের অর্থ বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং নিজ উদ্যোগে বলে দিয়েছিলেন আসন্ন দুর্ভিক্ষ থেকে মিশর রাজ্যকে বাঁচাতে চাইলে রাজার করণীয় কি। অথচ, এই সেই দূত যে অনেক বছর আগে ইউসুফ(আ) কে কথা দিয়েছিলো, সে রাজার কাছে গিয়ে এটা বলবে যে ইউসুফ বিনা দোষে জেলে বন্দী আছে। এরকম অকৃতজ্ঞ বন্ধু যদি আমাদের কাছে সাহায্য চাইতো তাহলে আমরা কি তাকে সাহায্য করতাম? ইউসুফ(আ) কিন্তু একবারও সেই অকৃতজ্ঞতার কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন না, বরং সে যা সাহায্য চেয়েছিলো তার চেয়ে বেশী সাহায্য করলেন।

সে বলল, ‘হে ইউসুফ, হে মহাসত্যবাদী! সাতটি শুঁটকো গাই সাতটি মোটাসোটা গাইকে খেয়ে ফেলছে, আর সাতটি সবুজ শিষ ও অপর সাতটি শুকনো শিষ সম্বন্ধে তুমি আমাদেরকে ব্যাখা করো, যাতে আমি লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারি এবং ওরা জানতে পারে’। ইউসুফ বলল, ‘তোমরা সাত বছর একটানা চাষ করবে, এ সময় যে শস্য সংগ্রহ করবে ওর মধ্যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে, আর বাকী সব শিষ সহ রেখে দিবে। তারপর আসবে সাতটি কঠিন বছর যখন তোমরা পূর্বে সঞ্চিত খাবার খাবে, আর অল্প কিছু সংরক্ষণ করবে (পুনরায় চাষ করার জন্য)। এবং এরপর আসবে এক বছর সে-বছর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে, এবং সে-বছর মানুষ ফলের রস নিঙরাবে (অনেক আনন্দ করবে)।  (১২:৪৬-৪৯)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ ইউসুফ(আ) এর মাধ্যমে আমাদের শেখালেন –

কিভাবে মানুষকে সাহায্য করতে হয়:

  • আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাহায্য করা
  • কেউ কৃতজ্ঞতা জানাক আর না-ই জানাক তবু তাকে সাহায্য করা
  • নিজ থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া
  • সাহায্যপ্রার্থী যতটুকু চাচ্ছে তার চেয়ে বেশী দিয়ে সাহায্য করা
  • নিজেকে সুপিরিয়র মনে না করে সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়া
  • ‘আমি সাহায্য না করলে তুমি এটা পারতে না’ – এই জাতীয় ভাব না নেয়া

একইভাবে, কোনো সমস্যায় পড়লে সুন্দর কথার মাধ্যমে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হবে। অনেক সময় আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা একটা কিছু বুঝার চেষ্টা করে হয়তো পারি না, কিন্তু আমার পাশের চেয়ারে বসা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেই সে এক মিনিটেই আমাকে এটা বুঝিয়ে দিতে পারতো। আমি পারি না বলার মধ্যে লজ্জার কিছু নাই, সাহায্য চাওয়ার মধ্যে লজ্জার কিছু নাই – যদি এই সাহায্য চাওয়ার উদ্দেশ্য হয় নিজেকে ইম্প্রুভ করা।

ইউসুফ(আ) এর ঘটনায় ফিরে যাওয়া যাক। ইউসুফের সৎ ভাইয়েরা কানআন ফিরে গেলে বাবা ইয়াকুব আরো ভেঙ্গে পড়লেন যখন শুনলেন বিনি ইয়ামিন মিশরেই রয়ে গেছে। তিনি ছেলেদেরকে বললেন, ‘তোমরা ইউসুফ আর বিনি ইয়ামিনকে খুঁজে এনে দাও’। সৎ ভাইয়েরা বুঝলো তাদেরকে আবার মিশরে যেতে হবে, মিশরে যেয়ে মিশরের মন্ত্রীর কাছে অনুনয়-বিনয় করে বিনি ইয়ামিনকে ফেরত চাইতে হবে। এই সময় এই সৎ ভাইদের মধ্যে অনুশোচনা বোধও শুরু হয়। তারা বুঝতে পারে ছোট ভাই ইউসুফ আর বিনি ইয়ামিনের সাথে তারা যে আচরণ করেছিলো তা ঠিক ছিলো না। তারা মিশরে ফিরে যেয়ে কোষাধ্যক্ষ ইউসুফের কাছে তাঁর সাহায্য চাইলো।

যখন ওরা তার কাছে উপস্থিত হল তখন বলল, ‘হে আযীয (বাদশাহ)! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপদে পড়েছি, আর আমরা অল্প মাল এনেছি। আপনি তো আমাদের রসদ দেন পুরো মাত্রায়, আর আমাদের কিছু দানও করেন। আল্লাহ তো দাতাদের পুরষ্কার দিয়ে থাকেন’। (১২:৮৮)

এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের শেখালেন –

কিভাবে কারো সাহায্য চাইতে হয়:

  • যার সাহায্য চাইছেন তাকে সম্মানের সাথে সম্বোধন করা
  • নিজের করুন অবস্থা স্বীকার করে নেয়া
  • সাহায্যকারীর প্রশংসা করা
  • সাহায্যকারীর মঙ্গল কামনা করা

এই চারটি কন্ডিশন মেনে আমরা যদি কারো সাহায্য চাই, আল্লাহ চাইলে আমরা সাহায্য পাবোই।

১১) ক্ষমা একটি শিল্প, একে শিখুন (Learn the art of forgiveness)

11. forgive

ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমা করা – এই দুইটি কাজই মানুষ হিসাবে আমাদেরকে মর্যাদাকে উন্নত করে। আমরা যদি ক্ষমার শিল্পকে আয়ত্ত না করতে পারি, আমরা মনের মধ্যে বাসা বাঁধবে ঘৃনা আর অহংকার। ক্ষমা শিল্প শিখতে না পারলে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, ভয়াবহ কঠিন হবে পরকালের হিসাব।

ইউসুফ যখন তার সৎ ভাইদের কাছে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে দিলো, তারা সাথে সাথে তাদের ভুল স্বীকার করে নিলো এবং ক্ষমা চাইলো।

ওরা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন আর আমরা নিশ্চয়ই অপরাধী ছিলাম’। (১২:৯১)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ আমাদের শেখালেন-

কিভাবে ক্ষমা চাইতে হয়:

  • ‘আমি অমুক কারণে ঐ কাজটা করেছিলাম’ জাতীয় একটা শব্দও না বলা
  • ক্ষমাকারীর প্রশংসা করা
  • অনুশোচনা সহ নিজের দোষ স্বীকার করে নেয়া

পরবর্তীতে আপনার বাবা-মা, স্বামী/স্ত্রী বা বসের কাছে যখনই কোনো ব্যাপারে ক্ষমা চাইতে যাবেন, নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে কোনো যুক্তি দিবেন না, নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়ে মন থেকে ক্ষমা চান। আজ হয়তো আপনি বুঝতে পারছেন না, কিন্তু একদিন ঠিকই বুঝতে পারবেন যে এই ভুল বুঝাবুঝির পিছনে আপনার দোষই বেশী ছিলো।

এবার ইউসুফের পালা ভাইদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার। নিজেকে ইউসুফের জায়গায় কল্পনা করে দেখুন – কেউ যদি আপনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে পরিত্যক্ত কোনো কূয়ায় ফেলে দিত আপনি কি তাকে ক্ষমা করতে পারতেন? কেউ যদি প্রায় ৪০ বছর আপনার বাবা-মাকে আপনার থেকে আলাদা করে রাখতো আপনি কি তাকে ক্ষমা করতে পারতেন? শেষবার যখন দেখা হয়েছিলো সেইবারও যে আপনাকে ‘চোর’ বলে অপবাদ দিয়েছে আপনি কি তাকে ক্ষমা করতে পারতেন? ইউসুফ তার ভাইদের শুধু ক্ষমাই করলেন না, তিনি ৪০ বছরের সব কষ্টের স্মৃতি এক নিমিষেই ভুলে গেলেন। এটা সম্ভব হয়েছে এই কারণে যে ইউসুফের জীবনের উদ্দেশ্য ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা। আর তাই ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে তিনি তার ভাইদেরকে পুরোপুরি ক্ষমা করে দিলেন, কারণ আল্লাহ ক্ষমাকারীকে ভালবাসেন।

সে বলল, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু’। (১২:৯২)

ইউসুফ তার ভাইদেরকে বললেন তাদের বাবা-মাকে মিশরে নিয়ে আসতে। মিশরে প্রবেশের সময় ইউসুফ তার বাবা-মাকে বিরাট সংবর্ধনা দিলেন। সিংহাসনে বসতে দিয়ে বাবা-মাকে উপযুক্ত সম্মান দিলেন। বলা হয়ে থাকে, ইউসুফের অসামান্য কর্মদক্ষতা ও সততার কারণে এই সময় মিশরে ইউসুফের ক্ষমতা ও মর্যাদা রাজার সমান বা বেশী ছিলো।

আর ইউসুফ তার পিতামাতাকে উচ্চাসনে বসালো আর সে বলল, ‘হে আমার পিতা! এই আমার আগের স্বপ্নের ব্যাখা। আমার প্রতিপালক তা সত্যে পরিণত করেছেন। আর তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন ও শয়তান আমার আর আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদের মরুভূমি থেকে এখানে এনে দিয়ে আমার উপর অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন তা সূক্ষ্মভাবে করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞানী, শ্রেষ্ঠ বিচারক। (১২:১০০)

ইউসুফের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের শেখালেন-

কিভাবে ক্ষমা করতে হয়:

  • ক্ষমা চাওয়ার সাথে সাথে ক্ষমা করে দেয়া
  • অপরাধটি মনে করিয়ে দিয়ে আর কখনোই কোনো কথা না বলা
  • ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করছি’ বললে ক্ষমাপ্রার্থিকে ছোট করা হয়, সেটা না বলে তাকে সম্মান করে এভাবে বলা – ‘আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন’
  • ক্ষমাপ্রার্থীর দোষকে গোপন করে শয়তানের উপর বা অন্তরের কুমন্ত্রণার উপর দোষ চাপানো
  • তার এই ভুলের মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে কি শিখাতে চেয়েছেন তা নিয়ে চিন্তা করা।

ইসলামের শিক্ষা কতই না সুন্দর, তাই না!

[পর্ব-৩ এখানেই শেষ। ইনশা আল্লাহ শেষ লেসনটি পর্ব-৪ এ প্রকাশ করা হবে]

রেফারেন্স:

1. Pearls from Surat Yusuf – Dr. Yasir Qadhi

2. Leadership Lessons from the Life of Rasoolullah (SAW) – Mirza Yawar Baig

3. তাফসীর ইবনে কাথির

4. আহসানুল বায়ান

5. Anger Management – Dr. Yasir Qadhi

6. Notes from a Friend  – Anthony Robbins

7. The Strangest Secret – Earl Nightingale

8. Focal Point – Brian Tracy

9. Description of Prophet Muhammad (Peace Be Upon Him) – Shaykh Hamza Yusuf

http://sheikhhamza.com/transcript/Description-of-the-Prophet(SAW)

10. 10 Rules of  #TwitterFiqh – Shaykh Yahya Ibrahim

http://muslimmatters.org/2014/01/06/10-rules-twitterfiqh/

11. Ties of Kinship, Al-Adab Al-Mufrad – Imam Bukhari

http://www.sunnipath.com/library/Hadith/H0003P0002.aspx

সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি লাইফ লেসন – পর্ব ২ – লক্ষ্য অর্জন

[সূরা ইউসুফ শুধু নবী ইউসুফ(আ) এর এক্সাইটিং লাইফ স্টোরিই নয়, অসংখ্য শিক্ষনীয় বিষয় আছে এই সূরাতে। চার পর্বের এই লেখায় আমি সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া অসংখ্য লাইফ লেসনের মধ্য থেকে ১২টা লাইফ লেসন শেয়ার করবো। আপনি ইসলাম প্র্যাকটিস করুন আর না-ই করুন, আশা করি লেখাটি আপনার কাজে আসবে।

পর্ব-১ এ আমি ৪টি লাইফ লেসন শেয়ার করেছিলাম। পর্ব-১ এর শেষে আমরা দেখেছিলাম যে মহা সুদর্শন ইউসুফকে ক্রমাগত কুপ্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছিলো মন্ত্রীর স্ত্রী। আর ইউসুফ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করে আল্লাহর কাছে এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দু’আ করেছিলেন।]

৫) গুরুত্বের ক্রমানুসারে কাজ করুন (Prioritize your tasks):

5. prioritize

মনে করুন আপনার কাছে একটা কাঁচের বয়াম আছে, আর আছে কিছু পাথর, নুড়ি আর বালু; আপনার লক্ষ্য হলো বয়ামে যত বেশী সংখ্যক সম্ভব পাথর ঢুকানো। এখন আপনি যদি প্রথমেই নুড়ি আর বালু দিয়ে আপনার বয়ামটি ভরে ফেলেন তাহলে কিন্তু আর খুব বেশী পাথর ঢুকানোর জায়গা পাবেন না। কিন্তু, আপনি যদি পাথরগুলিকে ঢুকিয়ে নেন তাহলেও নুড়ি আর বালুগুলি ঢুকানোর মত জায়গা ঠিকই অবশিষ্ট থাকবে।

একইভাবে আমাদের করণীয় কাজগুলোকে আমরা গুরুত্বের ক্রমানুসারে সম্পন্ন করবো। প্রতিদিন সকালে কাজের একটা লিষ্ট করে ফেলব, তারপর তাদেরকে গুরুত্বের ক্রম অনুসারে সাজাবো। প্রতিটা কাজ করতে কতক্ষণ সময় লাগতে পারে সেই অনুযায়ী পাশে বরাদ্দ সময় লিখবো। তারপর ১ নং কাজ শেষ না করে কিছুতেই ২ নং কাজে যাবো না। তবুও হয়তো দেখা যাবে যে দিন শেষে ফেইসবুক, টুইটার আর ইউটিউব করার মত সময় আমাদের হাতে ঠিকই আছে।

মন্ত্রীর স্ত্রীর কুপ্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় মিথ্যা অভিযোগে তাকে জেলে পাঠানো হলো। জেলে ইউসুফ(আ) এর আচার-ব্যবহারের উৎকর্ষতা দেখে তাঁর জেলসঙ্গীরা অভিভূত হলো। তারা বুঝতে পারলো ইউসুফ সাধারণ কোনো মানুষ নন, তাঁর মধ্যে বিশেষ কিছু একটা আছে। দুই জেলসঙ্গী তাদের সদ্য দেখা স্বপ্ন নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলো। তারা ইউসুফের কাছে তাদের স্বপ্নের ব্যাখা জানতে চাইলো। ইউসুফ কিন্তু সাথে সাথেই তাদের কাছে স্বপ্নের ব্যাখা দিয়ে দেননি। ইউসুফের কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ন ছিলো তাদেরকে এক আল্লাহর দিকে আহবান করা, তাদেরকে বুঝানো যে তাঁর এই চারিত্রিক উৎকর্ষতার কারণ হলো তিনি মানুষের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করেন। তিনি আরো বললেন যে স্বপ্নের ব্যাখা তিনি খাবার আসার কিছুক্ষণ আগে দিবেন। তার আগের সময়টুকু তিনি তাদেরকে বোঝালেন – আমাদের মেধা থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুই হলো আল্লাহর অনুগ্রহ, তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোনও কিছুই হয় না।

ইউসুফ বললো, তোমাদেরকে যে খাবার দেয়া হয় তা আসার আগে আমি তোমাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখা জানিয়ে দিব, এ জ্ঞান আমার রব যা শিক্ষা দিয়েছেন তারই অন্তর্ভুক্ত। যে সম্প্রদায় আল্লাহকে বিশ্বাস করে না ও পরলোক অবিশ্বাস করে আমি তাদের মতবাদ বর্জন করেছি। (১২:৩৭)

লাইফ স্কিল কোচেরা প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানোর জন্য ‘80 20 Principle’ এর কথা বলে থাকেন [৮]। ‘80 20 Principle’ বলে আমরা যে বিষয় নিয়ে কাজ করছি সেটার দিকে যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখব যে প্রজেক্টটার ৮০% কাজ ২০% মূল্য বহন করে আর ২০% কাজ ৮০% মূল্য বহন করে। আমরা যদি সেই মূল্যবান ২০% কাজগুলো শনাক্ত করে প্রথমেই সম্পন্ন করে ফেলতে পারি, তাহলে আমরা দেখব নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আমাদের পুরো প্রজেক্টটি প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানোর আরেকটি টিপস হলো আর্জেন্ট-ইম্পর্ট্যান্ট ফর্মূলা [৮]। আর্জেন্ট হলো সেই কাজগুলি যা সম্পন্ন করতে হলে এখুনি করতে হবে, ইম্পর্টেন্ট হলো সেই কাজ যা সম্পন্ন করতে না পারলে ক্ষতি হবে । আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলো চার ভাগে ভাগ করা যায়:

  1. আর্জেন্ট এবং ইম্পর্ট্যান্ট (যেমন – ১ দিনের মধ্যে যে প্রজেক্টের রিপোর্ট দিতে হবে),
  2. আর্জেন্ট কিন্তু ইম্পর্ট্যান্ট না (যেমন – টিভিতে লাইভ খেলা দেখা),
  3. ইম্পর্ট্যান্ট কিন্তু আর্জেন্ট না (যেমন – জগিং করা),
  4. ইম্পর্ট্যান্টও না এবং আর্জেন্টও না (যেমন – মানুষের বদনাম করে বেড়ানো)।

১নং গ্রুপের কাজগুলি আমাদের ভালো মতো সম্পন্ন করতেই হবে কারণ অন্য কোনো উপায় নাই; ২নং গ্রুপের কাজগুলি কমিয়ে আনতে হবে; ৩নং গ্রুপের কাজগুলিকে জোর করে হলেও করতে হবে (না হলে অচিরেই এটা ১নং গ্রুপের কাজে পরিণত হবে), মনে রাখবেন চরমভাবে সফল মানুষেরা ৩নং গ্রুপের কাজগুলো গুরুত্বের সাথে করে বলেই তারা সফল; আর ৪নং গ্রুপের কাজগুলি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।

৬) তাড়াহুড়া করবেন না (Do not rush):

6. slow down

আমরা অনেকে মনে করি যে তাড়াহুড়া করে কাজ করলে বুঝি অনেক বেশী কাজ করা যায়। কিন্তু, সত্য হলো ধীর-স্থিরতার সাথে কাজ করলে আমরা নির্ভুলভাবে কাজ সম্পন্ন করতে পারি, ফলে আমাদের সময় বাঁচে। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন, ‘ধীর-স্থিরতা আসে আল্লাহর তরফ থেকে আর তাড়াহুড়া আসে শয়তানের তরফ থেকে’ (বায়হাকী)।

মনে করুন আপনাকে বিনা দোষে ৭ বছর ধরে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। তারপর জানতে পারলেন রাষ্ট্রপতি তার বিশেষ ক্ষমতাবলে আপনাকে মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি তখন কি করবেন? নিশ্চয়ই লাফাতে লাফাতে আগে জেল থেকে বের হবেন, তাই না? কিন্তু, ইউসুফ এরকম তাড়াহুড়া করেননি। রাজার স্বপ্নের সঠিক ব্যাখা দিতে পারার পুরষ্কার স্বরুপ রাজা যখন ইউসুফকে মুক্ত করার নির্দেশ দিলেন তখনও ইউসুফ ধৈর্য ধরেছেন। কারন, এই রকম বিশেষ ক্ষমতাবলে মুক্তির প্রতি ইউসুফের কোনো মোহ ছিলো না। যে অপরাধে তাকে বন্দী করা হয়েছিলো তিনি রাজার কাছে তার পুনর্তদন্ত দাবী করলেন। ইউসুফ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এটা প্রমাণিত হবে যে তিনি মন্ত্রীর স্ত্রীর সাথে জোর-জবরদস্তি করে কিছু করতে চাননি। আর এর ফলে ইউসুফের মর্যাদা বাড়বে বৈ কমবে না।

রাজা বললো, ‘তোমরা ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এসো’। সুতরাং যখন দূত তার কাছে গেলো সে বললো, ‘তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো, যে মহিলারা তাদের হাত কেটে ফেলেছিলো তাদের অবস্থা কি? আমার রব তাদের ছলনা সম্পর্কে ভালো করেই জানেন’। (১২:৫০)

ইউসুফ নির্দোষ প্রমাণ হওয়ার পর রাজা যখন তাকে সহচর নিযুক্ত করতে চাইলেন তখনো ইউসুফ তাড়াহুড়া করে সেই পদ গ্রহণ করলেন না। বরং, তিনি কোষাধ্যক্ষ হতে চাইলেন। কারন, মিশর রাজ্য যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে তা ইউসুফের মত দূরদর্শী শাসক ছাড়া সামাল দেয়া দু:সাধ্য হয়ে পড়বে।

রাজা বললো, ‘ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এসো, আমি তাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করবো’। তারপর রাজা যখন তার সাথে কথা বললো তখন বললো, ‘আজ তুমি আমাদের কাছে মর্যাদাবান ও বিশ্বাসভাজন’। সে বললো, ‘আমাকে দেশের কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করুন। নিশ্চয়ই আমি সুসংরক্ষণকারী, সুবিজ্ঞ’। (১২:৫৪-৫৫)

৭) গাজর ও লাঠিকে মনে রাখুন (Remember the carrot and the stick):

7. carrot and stick

জন্মের মুহূর্ত থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ তার প্রতিটা কাজই করে হয় গাজর পাওয়ার জন্য অথবা লাঠির বাড়ি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। অন্যভাবে বলতে গেলে, মানুষ সব সময় সেই কাজটিই করে যেই কাজটি করলে তার বেদনার (pain) চেয়ে আনন্দের (pleasure) পরিমান বেশী হবে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় ভালো ছাত্র পড়াশুনার কষ্ট বেছে নেয়, কারণ তার কাছে এই কষ্টের চেয়ে ভালো চাকুরীর আনন্দ বেশী গুরুত্বপূর্ন। আবার, খারাপ ছাত্র পড়াশুনায় ফাঁকি মেরে সিনেমা দেখে সময় কাটায়, কারণ তার কাছে ভালো চাকুরী না পাওয়ার কষ্টের চেয়ে সিনেমা দেখার আনন্দের মূল্য বেশী। আনন্দ-বেদনার এই সহজাত প্রতিক্রিয়াকে আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজে লাগাতে পারি। যখন কোন গুরুত্বপূর্ন কাজ করতে আমাদের ভালো লাগবে না তখন আমরা এই কাজে ব্যর্থ হওয়ার কষ্ট এবং সফল হওয়ার আনন্দ নিজেকে মনে করিয়ে দিতে পারি। আবার, আগামী একঘন্টায় এই কাজটি শেষ করতে পারলে অমুক খাবারটি খাবো – এই জাতীয় আনন্দদায়ক টোপ দিয়েও নিজেকে কাজে মনোযোগী করে তুলতে পারি।

ইউসুফ(আ) মিশরের রাজার কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত হওয়ার প্রায় ৭ বছর পর মিশর ও কানআনে (বর্তমান ইসারাইল-ফিলিস্তিন) শুরু হয় চরম দুর্ভিক্ষ। ইউসুফ(আ) এর দূরদর্শীমূলক সিদ্ধান্তের কারণে মিশরে খাদ্যের কোনো অভাব দেখা দেয়নি। পাশের দেশ কানআন থেকে ইউসুফ(আ) এর বড় ১০ ভাইয়েরা খবর পেল যে মিশরের কোষাধ্যক্ষ নাকি খুবই দয়ালু মানুষ। তারা ভাবলো তার কাছে যেয়ে বিভিন্ন মালপত্রের বিনিময়ে যদি খাবার নিয়ে আসা যায় তাহলে কতই না ভালো হয়। সেই আমলে এক দেশের মানুষ অন্য দেশে আসলে তাদেরকে সবাই সন্দেহের চোখে দেখত। তবু তারা কোষাধ্যক্ষের সুনাম আর নিজেদের নিরুপায় খাদ্যহীন অবস্থা বিবেচনা করে মিশরে আসলো।

প্রায় ৪০ বছর পর দেখা, তবু বড় ভাইদের দেখেই ইউসুফ তাদের চিনতে পারলেন, যদিও তারা ইউসুফকে চিনতে পারলো না। ১০ সৎ ভাইকে চোখের সামনে দেখে ইউসুফের মনে পড়ে গেল তাঁর আপন ছোট ভাই বিনি ইয়ামিনের কথা – না জানি বড় ভাইদের কত অত্যাচার সহ্য করে থাকতে হচ্ছে ছোট ভাইটাকে! বাবা ইয়াকুব(আ) তো এতদিনে নিশ্চয়ই আরো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, বিনি ইয়ামিনের উপর কোনো অত্যাচার হলে তিনি তো আর বাধাও দিতে পারেন না। ইউসুফ প্ল্যান করলেন কিভাবে এই ১০ ভাইকে বলা যায় বিনি ইয়ামিনকে তারা যাতে পরের বার অবশ্যই নিয়ে আসে। আর, এই প্ল্যানে তিনি ব্যবহার করলেন গাজর এবং লাঠি। ইউসুফ তাদেরকে এই বলে লোভ দেখালেন, দেখো তোমরা যদি তোমাদের সৎ ভাইকেও নিয়ে আসো তাহলে কিন্তু আরো বেশী শস্য পাবে (কারণ, মাথা গুনে শস্যের হিসাব করা হচ্ছিল)। আর ভয় দেখালেন এই বলে – যদি ঐ ভাইকে তোমরা পরের বার নিয়ে আসতে না পারো তাহলে এটা প্রমাণিত হবে যে তোমরা বেশী শস্য আদায় করার জন্য ঐ ভাইয়ের কথা বানিয়ে বলছিলে, ফলে তোমাদেরকে আর শস্য দেয়া হবে না।

আর সে (ইউসুফ) যখন ওদের রসদের ব্যবস্থা করে দিল তখন সে বলল, ‘তোমরা আমার কাছে তোমাদের সৎ ভাইকে নিয়ে এসো। তোমরা কি দেখছ না যে আমি পুরো মাপ দেই? আর আমি অতিথির সেবা ভালোই করি? কিন্তু তোমরা যদি তাকে আমার কাছে না নিয়ে আস তবে আমার কাছে তোমাদের জন্য কোনো রসদ থাকবে না, আর তোমরাও আমার কাছে আসবে না। (১২:৫৯-৬০)

৮) এক ভুল দুই বার করবেন না (Don’t repeat your mistake):

8. Repentance

আমরা যদি আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম গুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে আমরা একই ভুল বার বার করতে থাকি। শুধু তাই না, একই ভুল বারবার করে আমরা ভিন্ন ফলাফলেরও আশা রাখি! চিন্তা করে দেখুন, আপনার বসের সাথে কথা বলতে গিয়ে একই ভুল এপ্রোচ একাধিক মিটিং-এ প্রয়োগ করেছেন কিনা, আপনি যে ডকুমেন্ট লিখেন তাতে একই বানানে বার বার কনফিউজড হয়ে যান কিনা? একই ভুল বার বার করলে আপনি খুব সম্ভবত: একই রেজাল্ট পাবেন, ভালো কিছু পাবেন না।

নিজের ভুল শুধরানোর জন্য সহজ এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করে দেখতে পারেন: প্রতিদিন কি ভুল করছেন তা এক জায়গায় লিখে রাখুন। তারপর গত সাত দিনে কি কি ভুল করেছেন সেগুলো পড়ুন। আপনি লক্ষ্য করবেন যে একই ভুল আপনি সপ্তাহে একাধিকবার রিপিট করেছেন। হাই-ফ্রিকোয়েন্সী ভুলগুলো থেকে নিজেকে শুধরানো শুরু করুন, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হউন যে ভুলগুলো রিপিট করবেন না।

ইউসুফ(আ) এর ভাইয়েরা মিশর থেকে ফিরে এসে তাদের বাবা ইয়াকুব (আ) কে বললো তারা বিনি ইয়ামিনকে মিশরে নিয়ে যেতে চায়। কারণ, বিনি ইয়ামিনকে নিয়ে না গেলে মিশরের কোষাধ্যক্ষ আর শস্য দিবেন না। ইয়াকুব জবাবে বললেন – তোমরা কি মনে করো ইউসুফকে তোমাদের সাথে দিয়ে আমি যে ভুল করেছিলাম সেই ভুল আমি বিনি ইয়ামিনের ক্ষেত্রেও করবো?

সে বললো, ‘আমি কি ওর ব্যাপারে তোমাদেরকে এমনই বিশ্বাস করবো যেমন ওর ভাইয়ের ব্যাপারে এর পূর্বে আমি তোমাদেরকে বিশ্বাস করেছিলাম’? (১২:৬৪)

ভুল থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ। ইসলামী পরিভাষায় একে বলে তাওবা (ফিরে আসা)। জীবনে সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি হলো তাওবা। কারণ, তাওবাকারী তার তাওবার মাধ্যমে প্রমাণ করে যে সে নিজের পরিবর্তন চায়, উন্নতি চায়। তাওবা পানি ঢেলে দেয় অহংকার আর গোয়ার্তুমির আগুনে। একটি পরিপূর্ন তাওবার বৈশিষ্ট্য হলো:

  • ভুল কাজটি দ্রুত ছেড়ে দেয়া
  • অনুশোচনা বোধ করা,
  • ভুলটির পুনরাবৃত্তি না করা এবং
  • এই ভুলে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়া।

আমরা যখন আমাদের ভুল থেকে শিক্ষাগ্রহণ করবো তখন আমাদের প্ল্যানগুলি ফ্লেক্সিবল হবে। যদি প্ল্যান ‘এ’ কাজ না করে তাহলে আমরা প্ল্যান ‘বি’ তে চলে যাবো।  যদিও খুব সহজে লক্ষ্যের পরিবর্তন করা ঠিক নয়, কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের যে প্ল্যান তা প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা পরিবর্তন করতে পারি।

[শেষ চারটি লেসন পর্ব-৩পর্ব-৪ এ প্রকাশিত হবে ইনশাআল্লাহ]

রেফারেন্স:

1. Pearls from Sura Yusuf – Dr. Yasir Qadhi

2. Leadership Lessons from the Life of Rasoolullah (SAW) – Mirza Yawar Baig

3. তাফসীর ইবনে কাথির

4. আহসানুল বায়ান

5. Anger Management – Dr. Yasir Qadhi

6. Notes from a Friend  – Anthony Robbins

7. The Strangest Secret – Earl Nightingale

8. Focal Point – Brian Tracy

সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া ১২টি লাইফ লেসন – পর্ব ১ – লক্ষ্য নির্ধারণ

আমরা সবাই আমাদের জীবনে ভালো কিছু করতে চাই, সফলতা অর্জন করতে চাই। কম-বেশী সবাই কখনো না কখনো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি – কি করলে জীবনে সফলতা আসবে? একেকজন একেকভাবে উত্তর খুঁজতে থাকি – কেউ পার্সোনাল এক্সপেরিয়েন্সের দিকে তাকাই, কেউ আশেপাশের সফল মানুষকে অনুকরণের চেষ্টা করি, কেউ বিভিন্ন লেখকের বই পড়ে সফলতার চাবিকাঠি খুঁজি। আমরা ভুলে যাই – এই পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছে তাদের মধ্যে সবচাইতে সফল মানুষ হলেন প্রিয় নবী মুহাম্মাদ(সা)। ভেবে দেখুন তো – তার সফলতার গাইড বুক কোন্‌টা ছিল? উত্তর আপনার জানা – তাঁর জীবনের গাইডবুক ছিলো কোরআন। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর অসীম করুণার অংশ হিসাবে আমাদেরকে কোরআন দান করেছেন যাতে আমরা দিশেহারা জীবনের দিকনির্দেশনা খুঁজে পাই। সুতরাং, অন্য যে কোন সোর্সের দিকে তাকানোর আগে, মুসলিম হিসাবে আমাদের দায়িত্ব হলো সর্ব প্রথম কোরআন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা।

সূরা ইউসুফ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মোটিভেশনাল স্পীচ – যার বক্তা স্বয়ং সর্বশক্তিমান আল্লাহ। এই সূরাটি এমন একটা সময়ে নাজিল হয়েছিলো যখন রাসূলুল্লাহ(সা) মানসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিলেন। প্রায় দশ বছর মক্কায় ইসলাম প্রচারের পরেও হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন কুরাইশী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো, অপমান আর লাঞ্ছনার পরিমাণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছিলো। এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ(সা) এর উপর তিনটি বড় বড় বিপদ নেমে আসে। এক – প্রভাবশালী কুরাইশ নেতা, চাচা আবু তালিবের মৃত্যু তাঁকে রাজনৈতিকভাবে অসহায় করে তোলে; দুই – প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা(রা) এর মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে; তিন – তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে তাঁর উপর চরম মানসিক ও শারিরীক লাঞ্ছনা নেমে আসে যা নবীজী(সা) এর জীবনের সর্বনিকৃষ্ট দিন। রাসূলুল্লাহ(সা) এর এই দুর্দশার সময়ে তাঁকে অনুপ্রেরণা দিতে আল্লাহ সূরা ইউসুফ নাজিল করলেন। সূরা ইউসুফ রাসূলুল্লাহ(সা) কে এতটাই মোটিভেট করিছেলো যে এই সূরা নাজিলের প্রায় ১০ বছর পর মক্কা বিজয়ের দিনেও রাসূলুল্লাহ(সা) এই সূরা থেকে আয়াত উদ্ধৃত করেছিলেন।

সূরা ইউসুফ শুধু নবী ইউসুফ(আ) এর এক্সাইটিং লাইফ স্টোরিই নয়, অসংখ্য শিক্ষনীয় বিষয় আছে এই সূরাতে। এই লেখায় আমি সূরা ইউসুফ থেকে পাওয়া অসংখ্য লাইফ লেসনের মধ্য থেকে মাত্র ১২টা  লাইফ লেসন শেয়ার করবো। আপনি ইসলাম প্র্যাকটিস করুন, আর না-ই করুন, আশা করি লেখাটি আপনার কাজে আসবে।

১) অসাধারণ লক্ষ্য স্থির করুন (Set extraordinary goal)

1 extra ordinary goal

সাধারণ নয়, অসাধারণ লক্ষ্য স্থির করতে হবে। অসাধারণ লক্ষ্য কাকে বলে? অসাধারণ লক্ষ্য হলো এমন একটি ভালো লক্ষ্য যা আমাদেরকে আমাদের সাধ্যের শেষ সীমায় নিয়ে যাবে, নিজের লিমিটেশনগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবে। প্রতিটা মানুষের অসাধারণ লক্ষ্য নির্ভর করে তার বর্তমান অবস্থার উপর। যেমন, আপনি যদি বেনামাজী হন তাহলে আপনার জন্য অসাধারণ লক্ষ্য হতে পারে নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। আবার, আপনি যদি ৫ ওয়াক্ত নামাজী হন আপনার জন্য অসাধারণ লক্ষ্য হতে পারে নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা। একটি অসাধারণ লক্ষ্য অর্জন করার পর সেটা সাধারণ হয়ে যায়, এরপর নতুন অসাধারণ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়।

অসাধারণ লক্ষ্য কেন স্থির করতে হবে? কারণ, একমাত্র অসাধারনই আমাদের মধ্যে প্যাশন সৃষ্টি করে, অসাধারণের বৈশিষ্ট্যই হলো মানুষকে অনুপ্রাণিত করা। আমাদের প্রিয় লেখক অসাধারণ লেখকেরা, আমাদের প্রিয় খেলোয়াড় অসাধারণ খেলোয়াড়েরা, আমাদের প্রিয় বেড়ানোর জায়গা অসাধারণ সুন্দর জায়গাগুলো।

সূরা ইউসুফের প্রথমেই আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন অসাধারণ এক কাহিনী পড়তে যাচ্ছো তুমি। শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ, হুমায়ূন আহমেদ – সবার গল্পগুলোই এই কাহিনীর কাছে নগণ্য। কারন, আমি যে কাহিনী বলতে যাচ্ছি তা সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী।

আমি তোমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী বর্ণনা করছি (১২:৩ আয়াতাংশ)

শুধুমাত্র জীবনের বড় বড় লক্ষ্যের ক্ষেত্রেই নয়, যখন যে ভালো কাজটিই আমরা করবো, আমরা সে কাজের জন্য সর্বোচ্চ লক্ষ্য স্থির করবো। যখন কথা বলব সবচেয়ে সুন্দর ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করব, যখন চিন্তা করবো গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করব, এমনকি যখন একটা ইমেইল লিখব – চেষ্টা করব অসাধারন সুন্দর ভাষায় তা লিখতে।  মহান আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ কিছু করার জন্য।

যদি আমরা নিজের দিকে লক্ষ্য করে কখনো দেখি কোনো ভাল কাজে আমরা মিডিয়াম বা গুড লেভেলের লক্ষ্য স্থির করেছি, বুঝে নিতে হবে আমরা শয়তানের ফাঁদে পড়ে গেছি! কারণ, আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন সবচাইতে ভালো (বেষ্ট) কাজগুলো করার জন্য (http://quran.com/67/2), আর শয়তান চায় আমরা যেন সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হই । আজ থেকেই আসুন শুরু করি শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই, প্রতি দশ মিনিট পর পর নিজেকে প্রশ্ন করি – আমি এখন যে কাজটি করছি তা কি আমি অসাধারণ সুন্দরভাবে করছি?

২) আপনার লক্ষ্যকে ভিজুয়ালাইজ করুন (Visualize your goal)

2 visualize

মনের চোখ দিয়ে আপনার লক্ষ্যকে এমনভাবে ভিজুয়ালাইজ করুন যেন আপনি ইতিমধ্যে তা অর্জন করে ফেলেছেন। আপনি আপনার লক্ষ্যকে যত স্পষ্ট ভিজুয়ালাইজ করতে পারবেন, তত বেশী আগ্রহ অনুভব করবেন লক্ষ্য অর্জনে কাজ করার জন্য। ভেবে দেখুন লক্ষ্যটি অর্জনের পর আপনার মধ্যে কেমন আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে, কতটা গর্বিত বোধ করছেন আপনি, নিজের জীবনটাকে কেমন ধন্য মনে হচ্ছে! শুধু বড় বড় লক্ষ্যের ক্ষেত্রেই নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন ছোট কাজ যেমন ক্লাসের সবার সামনে প্রেজেন্টেশন দেয়ার আগে, বা বসের সাথে জরুরী কোনো কথা বলার আগে ভিজুয়ালাইজ করে নিন আপনি কি বলতে চান, কিভাবে বলতে চান – এটা আপনার কনফিডেন্স বাড়াতে সাহায্য করবে।

ইউসুফ(আ) এর বাল্যকালেই আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখিয়ে দিলেন তাঁর ভবিষ্যত। জানিয়ে দিলেন, তাঁর অবস্থান হবে তাঁর বাবা নবী ইয়াকুব(আ), তাঁর মা এবং তাঁর বাকী ১১ ভাইয়ের চেয়ে উপরে। এই স্বপ্ন নি:সন্দেহে সারাজীবন ইউসুফকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

ইউসুফ তার পিতাকে বললো: হে আমার বাবা! আমি (স্বপ্নে) এগারটি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র দেখলাম; দেখলাম ওরা আমাকে সিজদা* করছে (১২:১৪) [*এই সিজদা ছিলো সম্মান প্রদর্শনের সিজদা, ইবাদতের সিজদা নয়। আগের নবীদের শরীআয় সম্মানের জন্য সিজদা করা বৈধ ছিলো]

আপনার লক্ষ্য যদি হয় এখন থেকে ৫ ওয়াক্ত সালাত সময় মতো পড়া, তাহলে ভিজুয়ালাইজ করুন কেয়ামতের দিনের কথা যখন আপনাকে কবর থেকে উঠানো হবে। সূর্য ঠিক মাথার উপরে, চারিদিকে কোটি কোটি মানুষের হুড়াহুড়ি-কান্নাকাটি। এখুনি আপনার বিচার শুরু হবে, ভেবে দেখুন তখন আপনার কেমন লাগবে যখন আপনি আল্লাহর সামনে নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের আমলনামা নিয়ে দাড়াবেন!

৩) অসাধারণ তাওয়াক্কুল রাখুন (Have extraordinary faith)

3 Faith

তাওয়াক্কুল শব্দের অর্থ হলো ‘এটা হবেই’ এই বিশ্বাস নিয়ে সেই অনুযায়ী কাজ করা। যেমন, আপনি বিশ্বাস রাখেন যে আজ রাতে আপনি মারা যাবেন না এবং আগামীকাল অফিসে যেতে পারবেন। কিন্তু আপনি কি শুধু এই বিশ্বাস নিয়ে বসে আছেন? না, আপনার এই বিশ্বাস এতই দৃঢ় যে আপনি রাতে এলার্ম দিয়ে বিছানায় যান যাতে কাল সকালে সময়  মতো ঘুম থেকে উঠতে পারেন – এটাই তাওয়াক্কুল। আমরা যদি আমাদের লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে চাই তাহলে আমাদেরকে তাওয়াক্কুল রাখতে হবে। নিজের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে এই ভেবে যে যদি আল্লাহ চান তো আমি এটা পারবোই পারবো।

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী তাওয়াক্কুলের অন্যতম উপদান হলো দু’আ করা। কারণ, ঈমানদার বিশ্বাস করে যে আমি যতই দৃঢ় বিশ্বাস রাখি আর পরিশ্রম করি না কেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমার লক্ষ্য অর্জিত হবে না। বড় থেকে ছোট প্রত্যেক কাজে আমাদের পূর্ন বিশ্বাস নিয়ে চেষ্টা করার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে প্রাণ ভরে দু’আ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের বলেছেন, এমন কি জুতার ফিতা ছিড়ে গেলেও যেন আমরা আল্লাহর কাছে দু’আ করি।

আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ইউসুফ(আ) এর বাবা ইয়াকুব(আ)। ইউসুফেরা ছিলো মোট ১২ ভাই, তার মধ্যে প্রথম ১০ ভাই ছিলো এক মায়ের সন্তান, আর ছোট দুই ভাই (ইউসুফ ও বিনি ইয়ামিন) ছিলো আরেক মায়ের সন্তান। বড় ১০ ভাইয়েরা ছোট ২ ভাইকে প্রচন্ড হিংসা করতো। ইয়াকুব ভালমতই জানতেন যে তার বড় ভাইয়েরা যে কোনো সুযোগ পেলেই ইউসুফের কোনো ক্ষতি করে ফেলবে। তাই তারা যখন ইয়াকুবের কাছে যেয়ে বললো তারা ইউসুফকে নিয়ে ‘খেলতে’ যাবে, বৃদ্ধ ইয়াকুব সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন ইউসুফকে তাদের সাথে না দিতে।

সে (ইয়াকুব) বলল, ‘তোমরা তাকে নিয়ে গেলে আমার কষ্ট হবে, আর আমার ভয় হয় তোমরা তার ওপর নজর না দিলে তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে’। (১২:১৩)

বড় ১০ ভাই তারপরেও অনবরত অনুরোধ করতে থাকলে অগত্যা ইয়াকুব রাজি হলেন ইউসুফকে তাদের সাথে যেতে দিতে। হিংসার আগুনে জ্বলে তারা ইউসুফকে খেলার নাম করে জংগলে নিয়ে এক পরিত্যক্ত কূপে ফেলে দিল, আর এসে ইয়াকুবকে বলল যে ছোট্ট ইউসুফকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে। ইউসুফের রক্তমাখা কাপড় দেখে ইয়াকুবের বুক কষ্টে ফেটে গিয়েছিলো ঠিকই, তবু তিনি কিন্তু হা-হুতাশ করেননি, চিল্লা-চাল্লি করে বাসা মাথায় তুলেননি। বরং, তিনি আল্লাহর উপর পূর্ন আস্থা রাখলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ইউসুফ একদিন নবী হবেই এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবেই। ইয়াকুব জানেন, আল্লাহ কখনো এমন কিছু করেন না যাতে বান্দার অমঙ্গল হয়। সাময়িক কষ্টগুলোতে ধৈর্য্যের পরীক্ষায় পাশ করলেই আল্লাহ বান্দাকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি দেন।

আর তারা জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে এনেছিলো। সে (ইয়াকুব) বলল, বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী গড়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্য্যই শ্রেয়। তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল। (১২:১৮)

আমরা প্রত্যেকটা মানুষই আমাদের নিজের জন্য একটা সীমাবদ্ধতার দেয়াল তৈরী করে রাখি, তারপর আমরা শুধু ঐ দেয়াল ঘেরা জগতের ভেতরেই ঘুরাফেরা করতে পছন্দ করি। মানুষের নিজের তৈরী সীমাবদ্ধতার এই জগতকে বলে ‘কমফোর্ট জোন’। মহান আল্লাহ অনেক সময় আমাদেরকে আমাদের কমফোর্ট জোনের বাইরে ঠেলে দেন, যেন আমরা সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙ্গে নিজের উন্নতি করতে পারি। ইয়াকুব(আ) এর জীবনে সবচেয়ে প্রিয়পাত্র ছিলেন তাঁর পুত্র ইউসুফ(আ)।  কিন্তু, আল্লাহ চাচ্ছিলেন ইয়াকুব(আ) যেন ধৈর্যশীলদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা অর্জন করেন, তাই তিনি প্রাণপ্রিয় পুত্র ইউসুফকে তাঁর থেকে আলাদা করে দিলেন। ইয়াকুব যত বেশী ধৈর্য ধরবেন, ততই তাঁর মর্যাদা বাড়তে থাকবে। একইভাবে মহান আল্লাহ অনেক সময় আমাদেরকেও আমাদের কমফোর্ট জোনের বাইরে ঠেলে দেন যাতে আমরা আমাদের মর্যাদা উন্নত করতে পারি। হঠাৎ করে চলে যাওয়া চাকরি আমাদের নতুন স্কিল শিখতে বাধ্য করে, অসুখগুলো আমাদেরকে বাধ্য করে দু’আ করতে, প্রিয় জনের মৃত্যু আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদেরও একদিন মরে যেতে হবে।

আমরা যদি অসাধারণ লক্ষ্য অর্জন করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে আমাদের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি এমন কিছু পেতে চাই যা কখনো পাইনি, তাহলে আমাদের এমন কিছু করতে হবে যা কখনো করিনি। এমন ভাবে পরিশ্রম করতে হবে যেভাবে আগে কখনো করিনি, এমনভাবে সালাতে মনোযোগ দিতে হবে যেভাবে আগে কখনো দেইনি, ফজরের নামাজের জন্য ঘুম থেকে উঠা যতই দু:সাধ্য মনে হোক কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে সেই অসাধ্য সাধনের পেছনেই ছুটতে হবে।

৪) সঠিক বিষয়ে ফোকাস করুন (Focus on the right thing)

4 focus

আপনি আপনার অফিসের টেবিলে কাজ করতে বসেছেন। এই মুহূর্তে আপনি কি নিয়ে চিন্তা করবেন তা সম্পূর্নই আপনার ব্যাপার। আপনি চাইলেই চিন্তা করতে পারেন – গতকাল রাতে ঘুমটা ভালো হয়নি, শরীরটা কেমন ম্যাজ-ম্যাজ করছে, সকালে আরেকটু ঘুমাতে পারলে ভালো হতো, ধুর এখন আবার ঐ বোরিং ফাইলটা নিয়ে বসতে হবে, এই ফালতু কাজগুলি করে আমার লাভ কি? অন্যদিকে আপনি চাইলেই চিন্তা করতে পারেন – ওয়াও! আজকে আমি ঐ প্রবলেমটা নিয়ে চিন্তা করবো? এখানে তো আমার এমন কিছু করার সুযোগ আছে যা আর কেউ কোনোদিন করেনি। আমি যদি আমার সময় নষ্ট না করে প্রোডাক্টিভ কিছুতে কাজে লাগাই আল্লাহ আমার উপর কতই না খুশী হবেন! আমার কাজ যদি মানুষের জীবনে ভালো কোন পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে তাহলে আল্লাহ অবশ্যই আমাকে অনেক রেওয়ার্ড দিবেন! লক্ষ্য করে দেখুন, প্রথম ধারার চিন্তাগুলি আপনার মধ্যে কেমন ম্যার-ম্যারা ভাব তৈরী করেছিলো, আর দ্বিতীয় ধারার এই চিন্তাগুলো আপনার মধ্যে কেমন প্যাশন তৈরী করছে! যে কোনো পরিস্থিতিতেই আমরা কি অর্জন করবো, ভালো না খারাপ বোধ করবো – তা নির্ভর করে আমরা কিসের উপর ফোকাস করছি তার উপর।

ভালো ফোকাস করতে হলে ভালো প্রশ্ন করতে হয়। হায় আল্লাহ আমার সাথে কেন এমন হয়, আমার এখন কি হবে, এরকম হওয়ার দরকার কি ছিলো – জাতীয় প্রশ্ন না করে এমন প্রশ্ন করুন যেটার উত্তর পেলে আপনার পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। প্রশ্ন করুন – এই পরিস্থিতিতে আমি সবচেয়ে ভালো কি করতে পারি? কিভাবে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারি?

যে সব প্রশ্নের উত্তর আমাদের কোনো কাজে আসবে না সেই সব প্রশ্ন করতে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে, কিন্তু যে সব প্রশ্নের উত্তর আমাদের মঙ্গল করবে সেই সব প্রশ্ন করতে ইসলাম আমাদের উৎসাহ দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, ‘আমার গভীর জ্ঞানের উৎস হচ্ছে আমি কখনো প্রশ্ন করতে লজ্জা বোধ করি না’। সূরা ইউসুফের প্রথম দিকে মহান আল্লাহ ভালো প্রশ্নকারীদের প্রশংসা করেছেন, কারণ শুধু এরাই সৎপথপ্রাপ্ত হয়।

ইউসুফ ও তার ভাইদের কাহিনীতে নিশ্চয়ই প্রশ্নকারীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (১২:৭)

লাইফ স্কিল কোচেরা বলেন যে ফোকাস করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময় হলো কাজ শুরুর প্রথম ১ ঘণ্টা। যদি প্রথম একঘণ্টায় ফেইসবুক, ই-মেইল, ইউটিউব বা অন্য কোন ধরনের ডিস্ট্র্যাকশন থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন, তাহলে বাকী সময় ফোকাস করা অনেক সহজ হয়। রাসূলুল্লাহ(সা)ও গুরুত্ব দিয়েছেন ভোরে উঠে কাজের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার প্রতি। দিনের শুরু থেকেই ফোকাস করুন এবং Extraordinary effort দিন।

চরম বিরূপ পরিবেশেও নিজের লক্ষ্যের দিকে কিভাবে ফোকাস করতে হয় তার শিক্ষা আমরা পাই নবী ইউসুফ(আ) এর কাছ থেকে।  কূপ থেকে পানি তুলতে গিয়ে  ছোট্ট ইউসুফ(আ) কে খুঁজে পেলো এক দল যাযাবর। কানআন (বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন) এলাকার ছেলে ইউসুফকে তারা নিয়ে বিক্রি করে দিল মিশরের বাজারে। ইউসুফকে কিনে নিল মিশরের অন্যতম প্রভাবশালী এক মন্ত্রী (আযীয)। [আমরা অনেকেই শুনেছি যে মন্ত্রীর স্ত্রীর নাম ‘জুলেখা’ – তথ্যটা ভিত্তিহীন]  মন্ত্রীর কোনো সন্তান ছিলো না, আর ইউসুফ ছিলেন অকল্পনীয় রকম সুন্দর এক ছেলে। মন্ত্রী তার স্ত্রীকে বললো ইউসুফকে নিজের ছেলের মতই বড় করতে। এভাবে করে ১০-১৫ বছর কেটে গেল, ইউসুফ হয়ে উঠলেন পৃথিবীর সর্বকালের সবচাইতে হ্যান্ডসাম যুবক।

মন্ত্রী কাজের চাপে সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে, মন্ত্রীর স্ত্রীর খুব একা একা লাগে। দিনে দিনে মন্ত্রীর স্ত্রী চরম আকর্ষণ বোধ করা শুরু করলো ইউসুফের প্রতি। খালি বাসা পেয়ে মন্ত্রীর স্ত্রী সিডিউস করা শুরু করলো ইউসুফকে,  দিনের পর দিন ইউসুফকে কাবু করার নিত্য নতুন অপচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলো সে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে কয়জন পুরুষ পারতো তার চিন্তা-চেতনা মন্ত্রীর স্ত্রীর দিকে না দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে দিতে? ইউসুফ(আ) তাই করেছিলেন। মন্ত্রীর স্ত্রী দরজা বন্ধ করে তাঁর সাথে চাপাচাপি করলে তিনি দৌড়ে পালিয়ে আসেন। এলাকার তাবত সুন্দরীরা একাট্টা হয়ে ইউসুফকে দেখতে এসে সবাই যখন তাঁর রূপে পাগল হয়ে যায় তখনও ইউসুফ ফোকাস হারাননি। নিজের সহজাত চাহিদা, এক ঝাঁক সুন্দরীর অনুরোধ, মন্ত্রীর স্ত্রীর আদর-আপ্যায়ন – এর কোনও কিছুতেই ইউসুফ লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন না। ইউসুফের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আর তাই তিনি একাগ্রতার সাথে আল্লাহর কাছে দু’আ করলেন:

ইউসুফ বললো, হে আমার রব! এই মহিলারা আমাকে যার প্রতি আহবান করছে তা অপেক্ষা কারাগার আমার অধিক প্রিয়। তুমি যদি তাদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না করো, তাহলে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো। (১২:৩৩)

[পর্ব ২  – লক্ষ্য অর্জন]

রেফারেন্স:

1. Pearls from Sura Yusuf – Dr. Yasir Qadhi

2. Leadership Lessons from the Life of Rasoolullah (SAW) – Mirza Yawar Baig

3. তাফসীর ইবনে কাথির

4. আহসানুল বায়ান

5. Anger Management – Dr. Yasir Qadhi

6. Notes from a Friend  – Anthony Robbins

7. The Strangest Secret – Earl Nightingale

8. Focal Point – Brian Tracy