নামাজে মনোযোগ বাড়ানোর ৭টি প্র্যাক্টিকাল টিপস

salat khushu

এই লেখায় আমি নামাজে মনোযোগ বৃদ্ধির কিছু টিপস শেয়ার করব যেগুলোর মাধ্যমে আমি আমার নামাজে মনোযোগ বাড়াতে সক্ষম হয়েছি । এই টিপসগুলো আমাকে একজন বেনামাজী থেকে কিছুটা হলেও মনোযোগী নামাজী হতে সাহায্য করেছে।

১। নামাজের গুরুত্ব জানুন: মহান আল্লাহ আলকোরআনে একটিমাত্র ইবাদতকে ঈমান এর সমার্থকরূপে ব্যবহার করেছেন, আর তা হলো নামাজ। ঘটনাটি ছিল এরকম – প্রিয়নবী মুহাম্মদ(সা) এর নবুয়তীর প্রথম দিকে সাহাবারা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ পড়তেন। হিজরতের পরেল্লাহ কিবলা পরিবর্তন করে যখন কা’বা শরীফের দিকে করে দিলেন তখন অনেক সাহাবা প্রশ্ন করতে লাগলেন যে তাদের আগের নামাজগুলির কি হবেসেগুলির জন্য কি সওয়াব পাওয়া যাবে না? উত্তরে আল্লাহ নিচের আয়াত নাজিল করেন:

আর আল্লাহ এরূপ নন যে তিনি তোমাদের ঈমানকে ব্যর্থ করবেন”। (সূরা বাকারাহ:১৪৩ এর অংশবিশেষ)

উপরের আয়াতে আল্লাহ নামাজকে ঈমানের সমার্থক হিসাবে ব্যবহার করেছেন। এই আয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যেনামাজ না পড়লে ঈমান থাকে না। এছাড়া রাসূলুল্লাহ(সা) তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ এর একাধিক হাদিসে বলেছেন, যে নামাজ না পড়ল সে কুফরী করল। ইমাম আহমাদ ইবনে হানবাল, শাইখ মুহাম্মাদ আল উসাইমিন সহ বহু আলেম মনে করেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত আদায় না করে সে কাফের এবং পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।

” ‘কিসে তোমাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছে‘? তারা বলবে, ‘আমরা নামাজীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না‘ ” (সূরা মুদ্দাসসির:৪২৪৩)

২। কোয়ান্টিটি নয়, কোয়ালিটিতে মনোযোগী হোন: তাড়াহুড়া করে পড়া নামাজ আল্লাহ কবুল করেন না। কাজেই, ফরজসুন্নাতনফল সব নামাজকে টার্গেট না করে আগে শুধু ফরজ নামাজটাকে ধীরে ধীরে খুশু‘ (বিনয় ও নম্রতা) এর সাথে আদায় করুন।

কাজেই দুর্ভোগ সেই নামাজীদের যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে অমনোযোগী”। (সূরা মাউন:)

সারাদিন মাত্র ১৭ রাকআত নামাজ আদায় করা ফরজ, এই নামাজগুলো আগে ধীরতার সাথে পড়া আয়ত্ব করুন। সুন্নাত সহ ১০ রাকআত যোহর নামাজ যে সময়ে পড়েন সেই সময়ে ধীরে ধীরে ৪ রাকআত ফরজ নামাজটুকু পড়ুন। যখন ফরজ নামাজে ধীরতা আয়ত্ব করে ফেলবেন তারপর সুন্নাত নামাজগুলো যদি আবার চালু করেন তাহলে অবচেতনভাবে সেগুলোও আপনি ধীর ভাবেই পড়বেন।

পৃথিবীর উপরে যা কিছু আছে তার সবকিছু আমি এর জন্য শোভা করেছি মানুষকে পরীক্ষার জন্য যে তাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম”। (সূরা কাহফ:)

লক্ষ্য করুন, এখানে আল্লাহ বলেননি তিনি পরীক্ষা করবেন কে সবচেয়ে বেশী আমল করে, বরং তিনি বলেছেন কে সবচেয়ে উত্তম আমল করে। কাজেই, আমাদের উচিত হবে নামাজসহ সকল ইবাদতের কোয়ান্টিটি নয়, কোয়ালিটির দিকে গুরুত্ব দেয়া।

অবশ্যই বিশ্বাসীগণ সফল হয়েছে, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়নম্র” (সূরা মুমিনুন:)

৩। সিজদায় নিজের ভাষায় দুআ করুন: আমরা অনেকেই জানি না, রুকুতে সিজদায় আরবীর ট্র্যাডিশনাল দুআ গুলোর বাইরে নিজের ভাষায় দুআ করা যায়। আমার এখনো মনে আছি, এই বিধানটা যেদিন জেনেছিলাম সেদিন থেকেই আমার নামাজ কেমন বদলে গিয়েছিল। আগে নামাজ পড়তাম এই ভেবে যে কখন নামাজ শেষ হবে আর মুনাজাতে যেয়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাইব, আর এখন জানতে পারলাম নামাজের মধ্যেই আল্লাহর কাছে চাওয়া যায় – দারুন ব্যাপার তো! সিজদায় নিজের ভাষায় দুআ করলে অনুভব করতে পারি আল্লাহর সাথে যেন কথা সরাসরি বলছি নামাজের অনুভূতিটা ঠিক যেরকম হওয়া উচিত।

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন: তোমরা তোমাদের রবের সবচেয়ে কাছে আসো যখন সিজদায় থাকো। কাজেই তোমরা সিজদারত অবস্থায় বেশী করে দুআ কর। [মুসলিম ও আহমাদ]

৪। কোরআনীয় আরবী শিখুন: পয়েন্টটা পড়ে মনে হতে পারে, ওরে বাবা! আরবী শিখব? এত অনেক কঠিন কাজ। আসলে ব্যাপারটা মোটেই তা নয়, কেন? কারণ, এটা আল্লাহর ওয়াদা।

অবশ্যই আমি কোরআনকে বুঝার ও মুখস্থ করার জন্য সহজ করে দিয়েছি। (সূরা ক্বমর:১৭ আয়াতাংশ)

আল্লাহর এই ওয়াদা কতটুকু সত্য – আসুন তলিয়ে দেখা যাক । কোরআনীয় আরবী আর স্পোকেন আরবী এক জিনিস নয়। কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা একই শব্দ বহুবার রিপিট করেছেন, ফলে খুব অল্প কিছু শব্দ আর বেসিক গ্রামার শিখে নিলেই আমরা নামাজে নিয়মিতভাবে সে সূরা ও দুআ গুলো পড়ি সেগুলোর অর্থ বোঝা সম্ভব হবে। আরো স্পেসিফিকভাবে বলতে গেলে, মাত্র ১২৫টি হাইফ্রিকোয়েন্সী আরবী শব্দ যদি আপনি শিখে নেন তাহলে ৬০০ পৃষ্ঠার এই বইয়ের ৫০% শব্দই আপনি বুঝতে পারবেন! পৃথিবীর ইতিহাসে শেখার জন্য এর চেয়ে সহজ বই বোধ করি আর দুইটা নাই।

নামাজে ব্যবহৃত সূরা ও দুআগুলির অর্থ যখন আপনি জানবেন এবং বুঝে বুঝে নামাজ পড়বেন, তখন আপনার নামাজ সম্পূর্ণরূপে বদলে যেতে বাধ্য। স্কলারেরা বলেন, নামাজ হলো আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথন। নামাজে যখন আমরা কোরআন তেলাওয়াত করি তখন আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন, আর যখন আমরা দুআ করি তখন আমরা আল্লাহর সাথে কথা বলি। আপনি যখন নামাজের সূরাগুলি, দুআ গুলি অর্থ বুঝে পড়বেন, তখনই কেবল অনুধাবন করতে পারবেন দিনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা একটি কন্টিনিউয়াল লাইফ ইম্প্রুভমেন্ট প্রোগ্রাম।

কোরআনের হাইফ্রিকোয়েন্সী শব্দগুলো নিয়ে গবেষনা করে অসাধারণ এক কোর্স তৈরী করেছেন Understand Quran Academy এর প্রতিষ্ঠাতা ড. আব্দুল আজিজ আব্দুর রহীম। “Understand Quran 50%” নামে মাত্র ৯ ঘণ্টার এক কোর্সে তিনি কোরআনের হাইফ্রিকোয়েন্সী ১২৫টি শব্দ শিখিয়েছেন। কোর্সটি খুবই সহজ কারণ তিনি সেইসব সূরার মাধ্যমে শব্দগুলি শিখিয়েছেন (যেমন – ফালাক, নাস, ইখলাস) যা আমরা বেশীরভাগ মুসলিমই জানি। একেকটি শব্দ ১ বা ২ বার নয়, ১০২০ করে তিনি রিপিট করেছেন ফলে সেগুলো আপনার মাথায় গেঁথে যাবে। হাইফ্রিকোয়েন্সী কোরআনীয় শব্দগুলির বুকলেট আপনি ডাউনলোড করতে পারবেন নিচের লিঙ্ক থেকে। আমি সাজেষ্ট করব Understand Quran Academy এর ওয়েবসাইট থেকে কিছু টাকা খরচ করে হলেও 50% Words এর কোর্সটি করে ফেলুন – আপনি জিতবেন, ঠকবেন না।

http://d1.islamhouse.com/data/en/ih_books/single/en_understand_Quran.pdf

আর একান্তই যদি টাকা খরচ করতে অপরাগ হন তাহলে Islamic Online University এর ডিপ্লোমা বিভাগে যেয়ে “Introduction to Qur’anic Arabic” নামক ফ্রি কোর্সটি করতে পারেন।

৫। নতুন সূরা ও দুআ মুখস্থ করুন: আমরা যখন আমাদের গৎবাঁধা একই সূরা আর দুআ দিয়ে নামাজ পড়তে থাকি তখন নামাজ একটা রোবাটিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, চিন্তা করার আগেই আমাদের ঠোঁটের আগায় একেকটা আয়াত চলে আসে, ফলে আমাদের মনোযোগ নামাজ থেকে অন্যত্র চলে যায়। প্রতি মাসে ১/২টা নতূন সূরা, কিছু নতুন আয়াত বা দুআ শিখুন, তারপর সেগুলো নামাজে ব্যবহার করুন। নতুন আয়াতগুলো যেহেতু আপনাকে সচেতনভাবে মনে করে করে পড়তে হবে, কাজেই আপনি বাধ্য হবেন নামাজে মনোযোগী হতে।

উদাহরণস্বরুপ বলা যায় রুকুথেকে উঠার পর আমরা সবাই জানি যে বলতে হয় “রাব্বানা লাকাল হামদ”। কিন্তু এর সাথে অতিরিক্ত আরেকটি দুআ আছে যেটি হলো – “হামদান কাসিরান তাইয়িবান মুবারাকান ফি”। ছোটবেলায় আমরা যখন নামাজ শিখেছি তখন আমাদের হুজুর এটা শিখাননি, কারণ তিনি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যেটুকু না পড়লেই নয় সেটুকু শিখিয়েছিলেন। আমরা আমাদের জ্ঞানের এই সীমাবদ্ধতাকে পজিটিভ দৃষ্টিতে দেখে নতুন নতুন সূরা ও দুআ মুখস্থ করে যদি নামাজে ব্যবহার করি তাহলে আল্লাহ চাইলে নামাজে আমাদের মনোযোগ বাড়বে।

৬। তাজউইদ শিখুন: দুই বন্ধুর মধ্যে কথা হচ্ছে। দুজনেই কোরআন আরবীতে পড়তে পারে, কিন্তু একজন তাজউইদ (উচ্চারণের বিধিবিধান) ভালমত জানে, আরেকজন জানে না।

১ম বন্ধু: এই তুই কোরআন পড়তে পারিস?

২য় বন্ধু: হ্যাঁ, পারি।

১ম বন্ধু: আচ্ছা এটা পড়ে দেখাতো, ঠিক করে উচ্চারণ করবি। বাংলা শব্দের মত করে পড়বি না, আরবীর মত করে উচ্চারণ করবি।

২য় বন্ধু: কোন্‌ শব্দটা পড়তে হবে এইটা? ফাজলামী করিস আমার সাথে? আমাদের প্রভুর নাম আরবীতে পড়তে পারে না এরকম কোন মুসলিম আছে নাকি? এটা হলো “আল্‌ লা হু”।

১ম বন্ধু: হয়নি। আরবীতে لَ এর উচ্চারণ সবখানে হাল্কা “লা” হয়, শুধু এই শব্দটাতেই এটা ভারী ও লম্বা “লঅ” হয়, ইংরেজী Law শব্দটার মত। কাজেই, এর সঠিক উচ্চারণ হবে “আল্‌ লঅ হু”।

২য় বন্ধু: তাই নাকি! জানতাম না তো!

১ম বন্ধু: আচ্ছা এই বাক্যটা এবার পড়ে শুনা।

২য় বন্ধু: দোস্ত এটা তো সবাই পারে, কোরআনের সূরা তাওবা বাদে প্রত্যেকটা সূরাই এই বাক্য দিয়ে শুরু হয়। এর উচ্চারণ হলো, দাঁড়া একটু চিন্তা করে নেই। ও আচ্ছা, لَ কে ভারী করে পড়তে হবে এই তো? কাজেই এটাকে পড়তে হবে “বিসমিল্‌ লআ হির রাহমাআ নির্‌ রাহিইম”

১ম বন্ধু: এটাও হয়নি রে। এখানে لَ হাল্কা হবে অর্থাৎ “লঅ” না হয়ে “লা” হবে। আর رَ এর উচ্চারণ সবসময়ই “র” হয় (ইংরেজী Raw এর মত), এর উচ্চারণ কখনো “রা” হয় না। এছাড়া حَ কেও ভারী করে পড়তে হবে। কাজেই বাক্যটার উচ্চারণ হলো “বিসমিল্‌ লাআ হির্‌ রহমাআনির্‌ রহিইম”

উপরের ঘটনার পর তাজউইদ শেখার গুরুত্ব নিয়ে নিশ্চয় আর কিছু বলার দরকার নেই। আপনি যখন সঠিক উচ্চারণ চিন্তা করে করে নামাজে কোরআন তেলাওয়াত করবেন তখন এমনিতেই আপনার মনোযোগ নামাজে চলে আসবে। তাজউইদ শেখার জন্য Understand Quran Academy এর পেইড কোর্স Read Quran করতে পারেন, আর ফ্রি কোর্স চাইলে শেইখ ইয়াসির কাদির “The Noble Emissaries” (ইউটিউবে পাবেন) কোর্সটি করতে পারেন।

৭। শাইখ হুসসারি এর তেলাওয়াত শুনুন: লক্ষ্য করুন আমি বলিনি যে কোন ক্বারীর কোরআন তেলাওয়াত শুনতে, আমি নির্দিষ্ট একজনের নাম বলেছি। কেন? কারণ, শাইখ খলিল আলহুসসারি (Khalil Al-Hussary) এর তেলাওয়াত একটা খুব বিশেষ কিছু। তিনি প্রতিটা হরফ, প্রতিটা হরকত অত্যন্ত ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে তাঁর দরাজ কন্ঠে তেলাওয়াত করে যান। তাঁর তেলাওয়াত শুনলে মনে হয় কোরআনের প্রত্যেকটা অক্ষরের প্রতি তাঁর সে কি মায়া, প্রত্যেকের উপরে তিনি কন্ঠ দিয়ে যেন পরশ বুলিয়ে যাচ্ছেন, প্রত্যেক অক্ষরকে তিনি প্রাপ্য এটেনশন দিবেন, এতটুকু কৃপণতা বা বাহুল্য করবেন না।

নামাজে যে সূরাগুলি আপনি পড়েন সেগুলি শাইখ হুসসারি এর কন্ঠে ডাউনলোড নিন (গুগল করলেই mp3 পাবেন), মোবাইলে বা গাড়ির সিডিতে কপি করে নিয়ে বার বার শুনুন। এর ফলে আপনি যখন নামাজে ঐ সূরা পড়তে যাবেন তখন নিজের অজান্তেই শাইখ হুসসারি এর ধীরগতির আবৃত্তি আপনার কানে বাজতে থাকবে। ফলে, আপনার মনে তাড়াহুড়া করে নামাজ পড়ার কুইচ্ছা থাকলেও শাইখ হুসসারি এর দরাজ কন্ঠ আপনাকে তা করতে দেবে না। আমরা অনেকেই বেঁচে থেকেও মরে আছি, আর শাইখ হুসসারি কবরে শুয়ে শুয়েও আমাদের শিখিয়ে যাচ্ছেন কিভাবে কোরআনকে মর্যাদা দিতে হয়!

কে ঐ শুনালো মোরে আযানের ধ্বনি

Adhan

ইসলামের প্রতিটা হুকুমের পেছনেই কোন না কোন সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। এই যেমন আযানের কথাই ধরা যাক। আমরা ছোটবেলা থেকে হাজার হাজারবার আযান শুনে এসেছি, কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছি কি আযানে যে কথাগুলো বলা হয় সেগুলো কেন বলা হয়? অথচ আযানের কথাগুলোর মর্ম অনুধাবন করতে পারলে আযান কানে আসামাত্রই আমরা নামাজ পড়ার জন্য  একটা অন্যরকম তাগাদা অনুভব করতাম! এই লেখায় আমি সংক্ষেপে আযানের কথাগুলোর মর্মার্থ আলোচনা করব।

 

১) আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার 

অর্থ: আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান

“আল্লাহু আকবার” কথাটির  মধ্যে চমৎকার একটা ভাষার খেলা আছে। আরবী “কাবির” শব্দের ইংরেজী হলো “গ্রেট”, “আকবার” এর ইংরেজী “গ্রেটার”, আর “আল-আকবার” এর ইংরেজী “গ্রেটেষ্ট”। আল্লাহ তো সবার চাইতে মহান বা গ্রেটেষ্ট, লক্ষ্য করুন তারপরেও এখানে “আল-আকবার” (গ্রেটেষ্ট) ব্যবহার না করে “আকবার” (গ্রেটার) ব্যবহার করা হয়েছে। কেন? কারণ, “গ্রেটেষ্ট” তখন ব্যবহার করা জরুরী হয়ে পড়ে যখন কমপক্ষে তিনজনের মধ্যে তুলনা করা হয় । দুইজনের মধ্যে  কে বেশী মহান তা বুঝানোর জন্য “গ্রেটার” শব্দটাই যথেষ্ট। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অন্য সব কিছুর তুলনায় এত বেশী মহান যে তাঁর সামনে সবকিছুই নগণ্য, সব কিছুই তুচ্ছ। ঠিক যেমন অসীম কোন কিছুর সাথে যদি ক্ষুদ্র সব কিছুর তুলনা করার জন্য “গ্রেটার” শব্দটাই যথেষ্ট, তেমনিভাবে মহান আল্লাহর মহানতা বর্ণনার জন্য “আকবর” ব্যবহার করলেও সেটা “গ্রেটেষ্ট” কেই বুঝায়।

আমি এখন যে কাজই করছি না কেন – পড়াশুনা করছি, চাকরি করছি বা সোফায় গা এলিয়ে টিভি দেখছি, “আল্লাহু আকবার” বলার মাধ্যমে মুয়াজ্জিন আমাকে মনে করিয়ে দিলেন – যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ, তিনি আমাকে ডাকছেন।

২) আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লালাহ

অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কোন উপাস্য নাই

ইবাদত শব্দের অর্থ হলো উপাসনা ও দাসত্ব করা। এখানে আমাকে মনি করিয়ে দেয়া হলো আমি আল্লাহর দাস। কাজেই, আমার ইচ্ছা হলো তাই নামাজ পড়লাম, আর ইচ্ছা হলো না তাই নামাজ পড়লাম না – এরকম করা যাবে না। দাসের কাজ হলো প্রভু যা বলে তা পালন করা।

) আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ

অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ(সা) আল্লাহর প্রেরিত বার্তাবাহক

কিভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে তা আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর বার্তাবাহক মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মাধ্যমে। আল্লাহর হুকুম মানতে চাইলে অনুসরণ করতে হবে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে। কাজেই জানতে হবে, আযান শুনলে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি করতে হবে শিখিয়ে গেছেন? মুহাম্মাদ(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলে গেছেন – ইসলাম আর কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ। তিনি আরো বলে গেছেন – তাঁর সাথে তাঁর উম্মতের কন্ট্রাক্ট হলো নামাজ, যে ইচ্ছা করে নামাজ ছেড়ে দিল, সে কন্ট্রাক্ট ভঙ্গ করলো। আমি আমার অফিসের কন্ট্রাক্ট এর বিরুদ্ধে কোন কাজ করলে যেমন আমার চাকরী থাকবে না, তেমনি মুহাম্মাদ(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে কন্ট্রাক্ট দিয়েছেন সেটা ভঙ্গ করে নিজেকে তাঁর উম্মত দাবি করা কতটা যুক্তিযুক্ত?

) হাইয়া ‘আলাস সলাহ

অর্থঃ নামাজের দিকে আসো

এই বাক্যে আহবান করা হলো সরাসরি নামাজের দিকে। তুলনা করে দেখুন, অফিসে আমাদের বস যখন আমাদের ডাকে তখন আমরা কেমন পড়িমড়ি করে তার কাছে ছুটে যাই।

) হাইয়া ‘আলাল ফালাহ

অর্থ: সফলতার দিকে আসো

আল্লাহ জানেন যখন আমাদের নামাজের দিকে ডাকা হয় তখন আমরা কি ভাবি, তাই একেবারে মোক্ষম পয়েন্টে আঘাত করা হলো! আমরা বেশীরভাগ মানুষই নামাজ পড়ি না এই বলে যে – “আরে নামাজ পড়লে আমার অফিসের কাজগুলি করবে কে?”, “আগামী কাল পরীক্ষা আছে এখন নামাজ পড়ার টাইম নাই”, “ফজরের নামাজ পড়তে উঠলে তো ঘুমের বারটা বাজবে” – এই সবগুলি অজুহাতেরই মূল কথা হলো নামাজ পড়তে গেলে আমার পার্থিব সফলতার ব্যাঘাত ঘটবে। “হাইয়া ‘আলাল ফালাহ” এর মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দেয়া হলো, সফলতায় ব্যাঘাত নয় বরং সফলতা অর্জনের জন্যই আল্লাহ নামাজের হুকুম দিয়েছেন! সত্যি কথা বলতে কি সারা দিনের একেক ওয়াক্তের ফরজ নামাজ আদায় করতে কিন্তু ৫-১০ মিনিটের বেশী সময় লাগে না, এর চেয়ে ঢের বেশী সময় আমরা  ইউনিভার্সিটিতে/অফিসে ব্যয় করি কফি খেয়ে, আড্ডা মেরে, পত্রিকা পড়ে, ফেইসবুকিং করে। অথচ চাইলেই সময় মতো কমপক্ষে শুধু ফরজ নামাজটুকু পড়ে নিয়ে আমরা কিন্তু অনায়াসে পুরো উদ্যমে পড়ালেখা/অফিসের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি।

৬ ও ৭) আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ

অর্থ: আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান; আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কোন উপাস্য নাই

শেষের এই অংশটা এক মহাসতর্ক বাণী। আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন – হে বান্দাহ। তুমি নামাজ পড়তে আসো আর নাই আসো, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার তাতে কিছুই যায় আসে না। তুমি নামাজ পড়লেও তিনি সবচেয়ে মহান, তুমি নামাজ না পড়লেও তিনি সবচেয়ে মহান; তুমি তাঁর ইবাদত করলেও তিনি তোমার মা’বুদ, তুমি তাঁর ইবাদত না করলেও তিনি তোমার তোমার মা’বুদ। যত লাফালাফি করার ইচ্ছা তুমি করে নাও, তোমাকে যে এসাইনমেন্ট দিয়ে পাঠানো হয়েছে তার ডেডলাইন ঠিক করা আছে, সময় ফুরোলেই কড়ায় গন্ডায় হিসেব নেয়া হবে।

আযানের জবাব:

আযানের জবাবে আযানে যা যা বলা হয় তার সবই বলা হয় শুধু ৪ আর ৫ নং বাক্য দুইটা আলাদা। এই দুই বাক্য শুনলে বলতে হয় – “লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”, অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোন কিছুরই কোন পরিবর্তন বা কোন শক্তি নেই”। কেন এরকম বলা হয়? কারণ, “হাইয়া ‘আলাস সালাহ” শুনে আমরা নামাজ পড়ার জন্য অজু করে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করব, আর তাই আল্লাহর কাছে দু’আ করা হচ্ছে ও শুকরিয়া আদায় করা হচ্ছে – হে আল্লাহ তুমি আমাকে শক্তি দিয়েছ বলেই আজ আমি নামাজের উদ্দেশ্যে উঠে দাড়াতে পারছি। কত মানুষ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে তারা শত চেষ্টা করেও নামাজ পড়তে পারছে না! আবার, কত মানুষ তাদের কর্মের মাধ্যমে তোমার রাগ অর্জন করেছে, ফলে তাদের হৃদয় তুমি সীলগালা করে দিয়েছ, তাই আযানের এই সুন্দর আহবান তাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র পরিবর্তনের সৃষ্টি করে না।

আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন যেন প্রতিটি ইবাদতের পেছনের সৌন্দর্যগুলি আমরা বুঝতে পারি এবং সেই অনুযায়ী তাঁর ইবাদত করতে পারি।

 

কৃতজ্ঞতা: Understand Qur’an Academy এর বিভিন্ন লেকচার।

আমরা রোজা রাখি কেন?

ramadan-pray

আচ্ছা বলুন তো – আমরা রোজা রাখি কেন? ছোটবেলায় আমরা অনেকেই শুনেছি যে – গরীব মানুষেরা না খেয়ে কত কষ্টে থাকে তা যেন আমরা বুঝতে পারি এর জন্যই রোজা রাখা। কিন্তু আমরা যদি কুরআনে বর্ণিত রমজান মাস ও রোজা বিষয়ক আয়াতগুলোর দিকে তাকাই তাহলে বুঝতে পারব – এটা কখনোই রোজার মূল উদ্দেশ্য না।  হ্যাঁ রোজা রাখার একটা সুফল হয়তো এটা যে আমরা না-খেয়ে থাকা মানুষের কষ্ট বুঝতে পারব, কিন্তু এটা মোটেও রোজার মূল উদ্দেশ্য নয়!

আমরা যখন গরীব মানুষের কষ্ট বুঝতে পারাকে রোজার মূল উদ্দেশ্য করে ফেলব তখন সমস্যা কি? এর সমস্যা হলো আমরা যদি কোন রকমে না খেয়ে দিন কাটিয়ে দিতে পারি, তাহলেই আমরা ধরে নিব যে আমরা সফল ভাবে রোজা রেখেছি। ‘আরে ভাই গরীবের কষ্ট বুঝে গেসি, রোজার উদ্দেশ্য সফল’! হয়তো আমাদের দিন শুরু হয়েছিল ফজর নামাজ না পড়ে, সকাল কেটেছে যাকে দেখতে পারি না তার গীবত করে, দুপুর কাটিয়েছি অফিসের কাজে ফাঁকি মেরে, বিকাল কাটিয়েছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইফতারী কিনে, আযান পড়তেই ধুমসে ইফতার খেয়ে ‘ফাটিয়ে ফেলেছি’ – রোজা তো অবশ্যই সফল! কারণ? ঐ যে, রোজার উদ্দেশ্য ছিলো গরীবের না খেয়ে থাকার কষ্ট বুঝা – ঐ বুঝ তো দিনের বেলা বুঝা হয়ে গেছে!

প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাহলে রোজার উদ্দেশ্য কি? রোজার উদ্দেশ্য আল্লাহ ‘আযযা ওয়াজাল স্পষ্টভাবে কুরআনুল কারিমে বলে দিয়েছেন:

হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হলো, যেভাবে ফরয করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীগনদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া  অর্জন করতে পারো। – (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৮৩)

সুতরাং আল্লাহ আমাদেরকে কেন রোজা রাখতে হুকুম করেছেন তা স্পষ্ট – যাতে আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি।

রমজানের উদ্দেশ্য ১: তাকওয়া অর্জন করা।

এখন তাহলে জানা দরকার তাকওয়া শব্দের অর্থ কি?

তাকওয়া অর্থ হলো আল্লাহ-সচেতনতা (God Consciousness), তাকয়া মানে ঢাল (Protection)। তাকওয়া আমাদের আর যাবতীয় পাপ কাজের মধ্যে ঢালস্বরূপ। যার তাকওয়া আছে, আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট; যার তাকওয়া নেই তার উপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট।

প্র্যাকটিকাল ভাবে বলতে গেলে – আমরা যা ভাবছি, যা করছি, যা বলছি, যা শুনছি – আল্লাহ তার সবকিছু দেখছেন, শুনছেন, রেকর্ড করে রাখছেন, বিচার দিবসে সবার সামনে আমাদের গোপন-প্রকাশ্য সমস্ত কাজ দেখানো হবে, ভাল-মন্দ সব কাজের প্রতিদান দেয়া হবে – এই চিন্তাগুলো মাথায় রেখে যে কোন কিছু করার নামই তাকওয়া।

ব্যাপারটা আসলে খুব ভয়ংকর। আমি আজ সকালে ফজরের নামাজ পড়েছিলাম কিনা তার জবাব আমাকে দিতে হবে, ঠিক মত হিসাব করে যাকাতের টাকা গরীব মানুষকে দিয়েছিলাম কিনা তার জবাব দিতে হবে, সুদের টাকায় বাড়ি-গাড়ি করলে তার জবাব দিতে হবে, কোন বন্ধুর সাথে অন্য কোন বন্ধুর বদনাম করলে তার জবাব দিতে হবে, রিকশাওয়ালাকে অকারণে ধমক দিলে তার জবাব দিতে হবে, অফিসে বসে কাজে ফাঁকি দিলে জবাব দিতে হবে, জবাব দিতে হবে আমাদের প্রতিটা কাজের, কথার, চাহনির!

আবু হুরায়রা(রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: যে মানুষ রোজা রেখে মিথ্যা কথা এবং খারাপ কাজ ছাড়তে পারে না, তার না খেয়ে থাকার প্রয়োজন আল্লাহর কাছে নাই (অর্থাৎ তার রোজা আল্লাহ্‌ কবুল করবেন না)। – (বুখারী)

স্কলারেরা বলেছেন – এই পৃথিবীটা হলো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলা একটা রাস্তার মতো যার প্রতি পদে পদে পাপের কাঁটা বিছানো। তাকওয়া মানে হলো এই কাঁটাগুলোকে সর্ন্তপণে এড়িয়ে সঠিক পথে চলা। সঠিক পথ কোন্‌টা? আল্লাহ্‌ যা করতে আমাদের নিষেধ করেছেন তা না করা, আর যা করতে আদেশ করেছেন সেটা করাই হলো সঠিক পথ। আল্লাহর এই আদেশ-নিষেধগুলো যে যত বেশী মেনে চলবে, আমরা বলব যে তার তাকওয়া তত বেশী, অর্থাৎ সে তত বেশী মুত্তাকী।

কিন্তু, রোজা রাখার সাথে তাকওয়া অর্জনের সম্পর্ক কি?

রোজাকে আরবীতে ‘সাওম’ বলে, যার অর্থ হলো বিরত থাকা। রোজা রাখলে আমরা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেই, এমনকি যখন একা ঘরে থাকি, বাথরুমে থাকি তখনও কিন্তু আমরা খাই না। আমরা খাই না কারণ কেউ না দেখলেও তো আল্লাহ্‌ দেখছে, অর্থাৎ আমরা তাকওয়ার কারণেই রোজার সময় খাই না। এখন দেখুন, এই খাবার খাওয়া কিন্তু আমাদের মৌলিক চাহিদা। কিন্তু, গীবত করা, গান-নাচ দেখা, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা, কাজের লোকের সাথে খারাপ ব্যবহার , মানুষের উপকার করে খোঁটা দেয়া – এগুলো একটাও কি আমাদের মৌলিক চাহিদা? না। রোজার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ ‘আযযা ওয়া জাল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন – হে মানুষ! তোমরা যদি তাকওয়ার কারনে তোমার মৌলিক চাহিদা থেকেই বিরত থাকতে পারো, তাহলে যেই কাজগুলো অপশনাল সেগুলো থেকে কেন বিরত থাকতে পারবে না?

আবু হুরায়রা(রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন: রোজা ঢালস্বরুপ। – (বুখারী)

আবার ভেবে দেখুন, রোজার সময় না খাওয়ার কারণে আমাদের শরীর দুর্বল থাকে। আর দুর্বল শরীরে আমাদের নফসের বা অন্তরের কু-চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। আর নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার নামই তো তাকওয়া।

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাকওয়া অর্জন করব কিভাবে?

যে কোন পরীক্ষায় পাশ করতে হলেই আগে জানা লাগে পরীক্ষার সিলেবাস কি। ঠিক তেমনি তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতি অর্জন করতে হলে আমাদের জানা লাগবে কোন্‌ কাজে আল্লাহ্‌ শাস্তি দিবেন আর কোন্‌ কাজে আল্লাহ্‌ পুরস্কার দিবেন।

আমরা যখন জানব নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ না পড়লে আমরা কাফের হয়ে যেতে পারি তখন ইসলামের প্রতি সত্যিই যদি আমাদের ভালোবাসা থাকে তো আমরা আর কোন উসিলাতেই নামাজ ছাড়ব না। যখন জানব কবরে লাশ রাখার পর তা দুইদিক থেকে এমনভাবে চাপ দেয় যে এক পাশের পাঁজরের হাড় আরেক পাশের পাঁজরের হাড়ের উপরে উঠে যায়, আর কবরে আজাবের একটা কারণ হলো দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করা, আমাদের ঈমান থাকলে সেদিন থেকে আমাদের পক্ষে আর দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা সম্ভব হবে না। যখন জানব মিথ্যা বললে আমাদের চোয়ালের চামড়া আংটা ঢুকিয়ে টেনে ছিড়ে ফেলা হবে তখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাসী হলে ঘূনাক্ষরেও মিথ্যা বলব না। যখন জানব গীবত করলে মৃত মানুষের মাংস হবে আমাদের জাহান্নামের খাবার তখন গীবত করতে গেলে আমাদের গলায় কাঁটা বিধবে। যখন শুনব ব্যভিচারী নারী-পুরুষকে উলংগ করে আগুনে পোড়ানো হবে তখন এই কাজের চিন্তা আমরা আর কিছুতেই করব না। যখন জানব সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা মানুষের বিপদে সাহায্যের জন্য এগিয়ে না যাই, তাহলে কেয়ামতের দিনে আমাদের দু’পা তার জায়গা থেকে নড়বে না, শক্ত হয়ে আটকে থাকবে, তখন আমরা নিজের সামর্থ্যের শেষবিন্দু দিব মানুষকে সাহায্য করার জন্য।

অন্যদিকে আমরা যখন জানব, প্রতিবার সুবহানআল্লাহ্‌ বললে জান্নাতে আমার জন্য একটা গাছ লাগানো হবে তখন বেশী করে আমরা সুবহানআল্লাহ্‌ বলব, যখন জানব মা-বাবার সেবা জান্নাতে যাওয়ার সবচেয়ে বড় উপায় তখন আমরা আমাদের পড়াশুনা, চাকরী, ব্যবসার চাইতে মা-বাবার সেবায় বেশী মন দিব, যখন জানব মানুষকে ক্ষমা করলে আল্লাহ্‌ আমাকে ক্ষমা করবেন তখন অনায়াসে অন্য মানুষের ভুল ক্ষমা করতে পারব।

মোদ্দা কথা হলো, তাকওয়া অর্জন করতে হলে আমাদের আগে লাগবে  কি করা উচিত, আর কি করা উচিত না তার জ্ঞান। এই জ্ঞান কোথায় পাব? এক আয়াত পরেই আল্লাহ্‌ এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন:

রমযান মাস, এতে মানবজাতির জন্য পথ-প্রদর্শক , সঠিক পথের স্পষ্ট প্রমাণ এবং সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ণয়কারী কুরআন নাজিল করা হয়েছে। অতএব তোমাদের তোমাদের মধ্যে যে কেউ এই মাস পাবে, সে যেন রোজা রাখে। – (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৮৫ আয়াতাংশ)

সুতরাং কোন্‌ কাজটা ভালো কোন্‌ কাজটা মন্দ, এইটা বুঝার জন্য মুসলমানের মানদন্ড হলো কুরআন। কুরআন শুধু আরবীতে পড়লেই চলবে না, যে ভাষায় আমরা এর অর্থ বুঝতে পারবো সেই ভাষাতে কুরআন অনুবাদ পড়তে হবে, ব্যাখা পড়তে হবে, স্কলারদের লেকচার শুনতে হবে, শুধুমাত্র তাহলেই আমরা জানতে পারবো আল্লাহর কাছে কোন্‌ কাজটা সঠিক, কোন্‌ কাজটা ভুল। আর আল্লাহর দেয়া মানদন্ড অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার মানেই হলো তাকওয়া অর্জন করা।

 

রমজানের উদ্দেশ্য ২: কোরআন থেকে সঠিক ও ভুল পথের নির্দেশনা নেয়া।

রমজান মাসে কুরআনের এই গুরুত্বের কারণেই আমরা তারাবীহ্‌ এর নামাজে কুরআন পড়ে শেষ করি। কিন্তু, আমরা যেটা করি না সেটা হলো কুরআন থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা, অথচ আল্লাহ্‌ এই উদ্দেশ্যে কুরআন নাজিল করেছেন।

প্রশ্ন দাঁড়ায় – এই পরামর্শ কি শুধু মুসলমানেরাই গ্রহন করবে? দেখুন তো আরেকবার আল্লাহ্‌ সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে কি বলেছেন? আল্লাহ্‌ বলেছেন – “কুরআন মানবজাতির পথ-প্রদর্শক”! অর্থাৎ, রমজানে এই কোরআন শুধু আমি নিজেই পড়লেই হবে না, আমার আশে পাশের নামাজী, বেনামাজী, হিন্দু, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ, নাস্তিক, সবাইকে কুরআন পড়ার জন্য বলতে হবে।

 

এখন প্রশ্ন হলো, আমি মুত্তাকী হলে আল্লাহর লাভ কি?

আল্লাহ্‌ হলেন আল-গণি বা প্রয়োজনমুক্ত, আবার তিনি আর-রাহমান বা পরম দয়ালু।  আল্লাহ্‌ আমাদেরকে ভালবাসেন আর তাই তিনি চান আমরা ইহজীবনে শান্তি এবং পরজীবনে জান্নাত পাই।  ইহজীবনে শান্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা, তাকওয়া অর্জন করা।

যার তাকওয়া নাই তার অন্তরে শান্তি নাই, সে যত পায় তত চায়, তাও তার মন ভরে না। আর যখন মৃত্যু তার কাছে চলে আসে তখন সে গভীর হতাশায় ডুবে যায়, ‘হায় আমি এতকাল কি করলাম!’ বলতে বলতে তার কলজে ফেটে পড়ে। নিজেকে বার বার প্রশ্ন করে, ‘যেই দুনিয়ার পিছনে সারা জীবন দৌড়েছি তাকে ছেড়ে এখন আমি কিভাবে যাবো?’ আল্লাহ্‌ মানুষকে অন্তরের এই ছটফটানি থেকে মুক্তি দিতে চান, এই মুক্তির একমাত্র পথ হলো তাকওয়া অর্জন করা।

আল্লাহ্‌ তো তোমাদের জন্য সহজটাই চান, তোমাদের জন্য যা কষ্টকর তিনি তা চান না। – (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৮৫ আয়াতাংশ)

হুমম, বোঝা গেল যে আল্লাহ্‌ আমাদের মংগলের জন্যই চান যে আমরা রোজা রাখি, তাকওয়া অর্জন করি। কিন্তু, আল্লাহ্‌ যদি আসলেই আমাদের জন্য জীবনকে সহজ করতে চান, তাহলে কি তিনি রমজান মাসে আমাদের জন্য এমন বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করেছেন, যা আমাদের তাকওয়া অর্জনে সাহায্য করবে?

রমজানের স্পেশাল প্যাকেজ!

রমজানে আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের জন্য আছে বিশেষ সুবিধা, স্পেশাল প্যাকেজ। যে শয়তান আমাদের জন্মলগ্ন থেকে আমাদের কানে কুমন্ত্রণা দিয়ে আসছে আল্লাহ্‌ সেই শয়তানকে রমজানে শেকল-বন্দি করে রাখেন। কাজেই, রোজার মাসে কোন পাপ করে ফেললে শয়তানকে দোষ দেয়ার কোন উপায় নাই! রোজার মাসে কোনও পাপ করলে সেটা আমরা করি আমাদের অন্তরের কু-চাহিদা থেকেই।

সুসংবাদ আরো আছে। রমজানের মাসে জাহান্নামের দরজাগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হয়, আর জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ মানুষের অন্তরে এমন অবস্থা তৈরী করেন যে খারাপ কাজ করা খুব কঠিন হয়ে যায়, আর ভালো কাজ করা সহজ হয়ে যায়।

আবু হুরায়রা(রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: যখন রমজান মাস শুরু হয়, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, আর শয়তানকে শেকল-বন্দি করা হয়। – (বুখারী)

আল্লাহ্‌ কেন এমন করেন? আল্লাহ্‌ এরকম করেন যাতে আমরা নিজেদের এই মাসে ট্রেইন-আপ করে নিতে পারি, বাকী ১১ মাস শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই এর জন্য। আমরা যখন ড্রাইভিং শিখি তখন যেমন আমাদের ইন্সট্রাক্টর আমাদের এমন রাস্তায় নিয়ে যান যে রাস্তায় গাড়ি, মানুষ নাই – যাতে আমরা ভালো মতো করে আগে চালানো শিখতে পারি, রমজানও তেমনি আমাদের ট্রেনিং টাইম। আল্লাহ্‌ এক মাস ধরে শয়তানকে আমাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে রাখেন যাতে আমরা নিজের তাকওয়াকে মজবুত করে নিতে পারি বাকী ১১ মাস শয়তানের সাথে লড়াই এর জন্য।

রমজানের উদ্দেশ্য ৩: সারা বছর শয়তানের সাথে লড়াই করার জন্য নিজেকে ট্রেইন-আপ করা।

ভেবে দেখুন, আমরা আমাদের ড্রাইভিং ট্রেনিং এর সময় প্যারালাল পার্কিং, ব্যাক-ইন, ড্রাইভ-ইন কোনও ধরনের পার্কিং প্র্যাকটিসই কিন্তু বাদ রাখতে চাই না, কারণ ট্রেনিং শেষে পরীক্ষায় কোন্‌ প্রশ্নটা আসবে আমাদের তো সেটা জানা নাই। ঠিক তেমনি রমজান মাসের এই ট্রেনিং টাইমে সব ধরনের ভালো কাজ বেশী বেশী করে করতে হবে, একদম ছোটখাটো খারাপ কাজ, যেমন খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ না বলা, ডানপায়ে বাথরুমে প্রবেশ করা – এগুলো থেকেও বিরত থাকতে হবে। বলা তো যায় না, ট্রেনিং টাইম শেষে শয়তান যখন আবার মুক্তি পাবে তখন সে কোন্‌ দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে!

আর তাই রাসূলুল্লাহ(সা) রমজান মাস এলেই ভালো কাজ করার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। ঝোড়ো বাতাস যেমনি সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যায়, তেমনি ভাবে তিনি তার বাসার সবকিছু ঝেড়ে-ঝুড়ে দান করে দিতেন!

রাসূলুল্লাহ(সা) এমনিতেই দানশীল ছিলেন, কিন্তু রমজান মাস আসলে তার দানশীলতা ঝোড়ো বাতাসকেও ছাড়িয়ে যেত (বুখারী)।  

রমজান মাসে জিব্রিল(আ) এসে রাসূলুল্লাহ(সা) কে কুরআন শিক্ষা দিতেন। রাসূলুল্লাহ(সা) নিজে রমজানে রাতে অনেক বেশী নামাজ পড়তেন, আর তাঁর পরিবারে সদস্য, সাহাবাদেরকেও পড়তে বলতেন। আর, এর জন্য আমরাও রমজানের রাতে তারাবীহ পড়ি। রমজানের এই তারাবীহ পড়া হলো সারা বছর তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার প্র্যাকটিস। রমজান মাসে যদি আমরা ৮ বা ২০ রাকআত তারাবীহ পড়তে পারি, তাহলে ট্রেনিং শেষে সারা বছর কেন কমপক্ষে দুই-চার রাকআত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে পারবো না?

রমজানের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে সুন্দর ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছেন, এর জন্য আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব। তাই আল্লাহ রমজান মাস সংক্রান্ত এই আয়াতটি শেষ করেছেন এভাবে:

এজন্য যে, তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করবে, এবং তোমাদের যে সুপথ দেখিয়েছেন  তার জন্য তোমরা তাঁর (আল্লাহর) তাকবীর পাঠ করবে, যাতে তোমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারো। –  (সূরা বাকারাহ্‌ ২:১৮৫ আয়াতাংশ)

আর তাই সারা রমজান মাস রোজার রাখার পর আমরা ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার’ (হে আল্লাহ্‌ তুমি সবচেয়ে মহান, হে আল্লাহ্‌ তুমি সবচেয়ে মহান) বলতে বলতে ঈদের নামাজ পড়তে যাই, এটা আল্লাহর প্রতি মুসলমানদের কৃতজ্ঞতার বহি:প্রকাশ। হে আল্লাহ্‌ আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ – তাকওয়া অর্জনের জন্য, শয়তানের সাথে লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়ার জন্য, নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য – তুমি আমাদেরকে ট্রেনিং নেয়ার জন্য এত চমৎকার ব্যবস্থা করে দিয়েছ, আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ, আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ!

আর কোনো বোনাস আছে কি?

আমরা রোজা রাখব আমাদের নিজেদেরই প্রয়োজনে। কিন্তু পরম করুনাময় আল্লাহ্‌ এই রোজার বিনিময়ে আমাদেরকে অনেক পুরষ্কার, আর পুরষ্কারের উপর পুরষ্কার দিবেন। যেমন, আমরা রমজানের এই গিফটকে কাজে লাগিয়ে অতীতের সব গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারি।

আবু হুরায়রা(রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে আল্লাহর কাছে পুরষ্কার পাওয়ার উদ্দেশ্যে রমজান মাসে রোজা রাখবে, আল্লাহ্‌ তাঁর আগের সব গুনাহ মাফ করে দিবেন। (বুখারী, মুসলিম)

তাহলে শর্ত হলো, রোজা রাখতে হবে শুধুই আল্লাহর কাছ থেকে পুরষ্কার পাওয়ার উদ্দেশ্যে। কেউ যদি রোজা রাখে তার বাবা খুশী হবে এই ভেবে, বা শ্বশুর বাড়ির লোকেরা কি বলবে এই ভেবে, অথবা বন্ধুরা বা প্রতিবেশীরা ‘রোজাদার’ বলবে ভেবে, বা বাসার সবাই রাখে তাই আমাকেও রাখতে হয় এই ভেবে – তাহলে গুনাহ মাফ হবে না। কারণ, একজনের বাবা/বন্ধুরা হয়তো রোজা রাখলে খুশী হয় আবার আরেকজনের বাবা/বন্ধুরা রোজা রাখলে অখুশী হয়। যার বাবা/বন্ধুরা রোজা রাখলে অখুশী হয় তার কখনো রোজাও রাখা হবে না, তাকওয়াও অর্জন করা হবে না।

রোজাদারেরা বিচার দিবসে ‘রাইয়ান’ নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে (বুখারী)।

রাইয়ান শব্দের একটা অর্থ হলো, পানির উৎস। যেহেতু, রোজাদারেরা দুনিয়াতে তৃষ্ণায় কষ্ট পেতে থাকার পরেও শুধু আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার জন্য পানি না খেয়ে ধৈর্য ধরত, তাই সেইদিন আল্লাহ্‌ তাদেরকে পুরষ্কারস্বরুপ নিয়ে যাবেন অনন্ত পানির উৎসের কাছে!  আল্লাহ আমাদের সব ভালো কাজের পুরষ্কার ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়ে থাকেন, কিন্তু রোজা রাখার পুরষ্কার আল্লাহ্‌ যত গুণ ইচ্ছা ততগুণ বাড়াবেন!

শেষ কথা:

আসুন আমরা সবাই এই রোজায় তাকওয়া অর্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, তারাবীহ নামাজ পড়ি, অর্থ বুঝে কোরআন পড়ার ও শুনার চেষ্টা করি। আর খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর কাছে তাওবাহ করি। মানুষ মাত্রই পাপী, এই পাপী মানুষদের মাঝে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা বেশী বেশী তাওবাহ করে।

 কা’ব ইবনে উজরাহ(রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) একবার তাঁর মিম্বরে আরোহন করার সময় প্রতি ধাপ পার হওয়ার সময় বললেন – ‘আমিন’। আমরা রাসূলুল্লাহ(সা) কে জিজ্ঞেস করলে উনি বললেন – আমি যখন মিম্বরে প্রথম ধাপ উঠলাম, জিব্রিল(আ) আমার কাছে আসলেন এবং বললেন – ‘ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি যে রহমতের মাস রমজান পেল কিন্তু তার পাপগুলো মাফ করিয়ে নিতে পারলো না’, আর আমি বললাম – ‘আমিন’।  – (হাকিম, বায়হাকী)

আল্লাহ্‌ যেন আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত না করেন যারা রমজান মাস পেল, অথচ এর উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব  অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলো, তাওবাহ করলো না এবং নিষ্পাপ হয়ে বেরিয়ে আসতে পারলো না।

 

পাদটীকা:

রমজানে কাজে লাগবে এইরকম কিছু বইয়ের লিঙ্ক নিচে দেয়া হলো।

১। শুধু আরবীতে নয়, বাংলা অর্থ ও ব্যাখা সহ কুরআন পড়ুন। কোরআনের সংক্ষিপ্ত টীকা ও বাংলা উচ্চারণসহ মীনা বুক হাউস প্রকাশিত সহীহ নূরানী অনুবাদটি আমার বেশ ভালো লাগে। আরো ভালোভাবে কোরআন বুঝতে চাইলে আহসানুল বায়ান পড়া যেতে পারে।

২। তাকওয়া অর্জন করতে চাইলে আমাদেরকে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে আর বেশী করে করতে হবে ভালো কাজ। কবিরা গুনাহগুলোর তালিকা আছে এই বইয়ে আর ভালো কাজের তালিকা তালিকা আছে এই বইয়ে।

৩। রমজান সংক্রান্ত বিভিন্ন বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন, কি করলে রোজা ভাঙ্গে, কি করলে ভাঙ্গে না পাবেন এই বইয়ে এবং এই ওয়েবসাইটে।

রেফারেন্স:

1. Ramadan, a gift for Muslims by Nouman Ali Khan

2. Virtues of Ramadan – Dr. Yasir Qadhi

আদনান ফায়সাল

২৫ জুন, ২০১৩

সম্পাদিত: ২৭ জুন ২০১৪, ৫ জুন ২০১৬

বিদ’আত পরিচয়

BID'AH

মহাগ্রন্থ কোরআনের শেষের দিকে অবতীর্ন  নিচের আয়াতটিতে আল্লাহ্‌ বলেছেনঃ আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ন করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম। – সূরা মায়িদাহ (৫:৩ আয়াতাংশ)

এই আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ(সা) ইসলামী শরীয়াকে পূর্ণরূপে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের যে জ্ঞান দিয়ে গেছেন আমরা তা বিশ্লেষণ করতে পারব, নতুন নতুন সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করতে পারব, কিন্তু নতুন ধরণের কোন ইবাদত বা নতুন কোন শরীয়া (ইসলামী আইন) আমরা তৈরী করতে পারব না।

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন যে, আমার আগে যত নবী এসেছে তাদের প্রত্যেকের জন্য ফরজ ছিল তাদের জাতিকে সকল রকম ভাল কাজের দিক নির্দেশ দেয়া এবং সকল রকম খারাপ কাজের ব্যাপারে সতর্ক করা। (মুসলিম)

যেহেতু, রাসূলুল্লাহ(সা) সকল নবীর শ্রেষ্ঠ নবী, কোন সন্দেহ নাই আগের সব নবীর মতই তিনিও আমাদেরকে সব ভালো কাজ সম্বন্ধেই বলে গেছেন, আর সব খারাপ কাজ সম্বন্ধেই সতর্ক করে গেছেন, কোন কিছুই বাদ রাখেন নাই।

 বিশিষ্ট সাহাবা আবু দার আল গিফারী(রা) বলেছেনঃ নবী(সা) তাঁর মৃত্যুর আগে আমাদের সকল কিছুর ব্যাপারে বলে গেছেন। এমনকি আকাশে যে পাখিরা ওড়ে তাদের সম্বন্ধেও। (আহমাদ)

এত কিছুর পরেও মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, ইসলামের সঠিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়। এর কারণ হলো, অনেক মানুষই অর্থ ও ব্যাখা বুঝে কোরআন পড়ে না, বুখারী, মুসলিম সহ বিশ্বস্ত হাদিসের গ্রন্থগুলো পড়ে না, পড়ে মনগড়া হাদিস দিয়ে লেখা বই, যেখানে কোন্‌ কথাটি কোন্‌ উৎস থেকে নেয়া হয়েছে তা লেখক নিজেও জানে না। এভাবে করেই সমাজে ছড়িয়ে পড়ে ধর্মপালনের বিভিন্ন মনগড়া প্রথা বা বিদা’আত।

বিদআত কি?

আসুন এবার খতিয়ে দেখা যাক, বিদ’আত কাকে বলে। ইসলামী শরীয়ায় বিদ’আত শব্দের অর্থ হল- ধর্মীয় কর্মকান্ডে এমন কিছু যুক্ত করা যেটা কোরআন মাজিদে বা হাদিসে নেই, এবং রাসূলুল্লাহ(সা) বা তাঁর অনুগত সাহাবারা যা পালন করেননি। বিদাআ’ত সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং নিকৃষ্ট কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মানুষের সকল কর্মকান্ডকে ২টি শ্রেনীতে ভাগ করা যায়। ১) ধর্মীয় কর্মকান্ড, ২) স্বাভাবিক কর্মকান্ড। কোন্‌ কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে কোন্‌ কাজটাকে হালাল বলব , আর কোন্‌ কাজটাকে হারাম বলব তা ভালোভাবে বুঝার জন্য এই দুই কর্মকান্ডের ব্যাপারে প্রযোজ্য ২টি সূত্র বলছি।

১) স্বাভাবিক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে – সকল কাজই হালাল যদি না কোরআন/হাদিসে কাজটিকে হারাম বলার জন্য কোন প্রমাণ থাকে। যেমনঃ রাসূলুল্লাহ(সা) কখনোই বিরিয়ানি খাননি। তাহলে, বিরিয়ানি খাওয়া কি হারাম? অবশ্যই না। কারণ, বিরিয়ানী খাওয়া একটি স্বাভাবিক কাজ এবং হাদিসে বা কোরআনে বলা নাই যে বিরিয়ানি বা এটা তৈরীর কোনও উপকরণ খাওয়া হারাম। কাজেই, রাসূলুল্লাহ(সা) বিরিয়ানী না খেলেও, বিরিয়ানী খাওয়া হারাম নয়, বিদ’আতও নয়। অন্যদিকে, মদ খাওয়া হারাম। কারণ, এ ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। লক্ষ্যনীয়, স্বাভাবিক কর্মকান্ড যদি হারামও হয়, তাকে বিদ’আত বলা যাবে না।  তাই, মদ খাওয়া হারাম, কিন্তু বিদ’আত নয়।

২) ধর্মীয় কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে – সকল কাজই হারাম যদি না কোরআন ও হাদিসে কাজটি করার জন্য স্পষ্ট দলীল থাকে। যেমনঃ কেউ যদি বলে আমি নেচে নেচে আল্লাহ্‌র ইবাদত করব, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, আল্লাহ্‌র ইবাদত করা একটি ধর্মীয় কাজ এবং কোরআন বা হাদিসে কোথাও বলা নাই যে নেচে নেচে আল্লাহ্‌র ইবাদত করা যাবে। হারাম ধর্মীয় কাজকে হালাল মনে করে করতে থাকলে সেটাকে বিদ’আত বলা হবে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কোন্‌টা স্বাভাবিক কাজ আর কোন্‌টা ধর্মীয় কাজ তা পার্থক্য বুঝব কিভাবে? যেমন, রাসূলুল্লাহ(সা) খুতবা দিতে মাইক ব্যবহার করতে বলেননি, তিনি ফেইসবুকের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করতে বলেননি। কাজেই, আমরা যদি এই কাজগুলি করি তাহলে কি বিদ’আত হবে না?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া যাবে যখন আমরা স্বাভাবিক কর্মকান্ড আর ধর্মীয় কর্মকান্ডের সংজ্ঞা জানব (সূত্রঃ ইবনে তাইমিয়াহ)।

স্বাভাবিক কর্মকান্ডঃ যে কাজগুলো সকল ধর্মের মানুষ সাধারণভাবে করে থাকে বা করতে পারে তা-ই স্বাভাবিক কাজ। এই কাজগুলো করার জন্য কোন নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যেমনঃ নিজেদের কথা প্রচার করার জন্য মাইক ব্যবহার জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যেই আছে – তাই এটা স্বাভাবিক কাজ, তাই মাইক ব্যবহার ধর্মীয় কর্মকান্ডের মধ্যে পড়ে না। কাজেই এটা বিদ’আত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নাই। উপরন্তু, এটাকে হারাম প্রমাণ করতে হলে কোরআন বা হাদিসের স্পষ্ট প্রমাণ লাগবে। একই কারণে, ফেইসবুকের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারও বিদ’আত নয়।

ধর্মীয় কর্মকান্ডঃ যে কাজগুলো শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের লোকেরা এই কারণে করে যে তারা মনে করে এই কাজের মাধ্যমে তারা তাদের প্রভুর নৈকট্য লাভ করতে পারবে, সেটাই ধর্মীয় কাজ। উদাহরন স্বরূপ বলা যায়, অনেক মুসলিম নামাজ শেষে সম্মিলিতভাবে ইমামের সাথে মুনাজাত করে, তারা মনে করে এটা করে তারা ইবাদত করছে, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন করছে, কিন্তু হাদিসে বা কোরআনে কোথাও সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করতে বলা নাই। কাজেই, সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা বিদ’আত। কারণ, এই ধর্মীয় কাজটি রাসূলুল্লাহ(সা) বা তাঁর অনুগত সাহাবারা পালন করেন নাই।

আমাদের সমাজে কয়েকটি প্রচলিত বিদ’আত হলঃ

১। ঈদ-ঈ-মিলাদুন্নবী

২। শব-ই-বরাত

৩। নামাজের আগে আরবীতে উচ্চারণ করে নিয়ত পড়া

৪। নামাজ শেষে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা

৫। চিল্লা দেয়া

৬। মনের কোন আশা পূরণের উদ্দেশ্যে বা আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মাজার জিয়ারত করা

৭। মৃত ব্যক্তির জন্য কুলখানী/চল্লিশা/চেহলাম করা

৮। মৃত ব্যক্তির জন্য ১ লক্ষ ৪০ হাজার বার কালিমা পড়া

৯। মৃত ব্যক্তির জন্য একত্রিত হয়ে মাদ্রাসার ছেলেদের দিয়ে কোরআন খতম দেয়া

১০। সুন্নাত নামাজকে বাধ্যতামূলক মনে করা

১১। কোন বিশেষ রাতের নফল ও সুন্নাত নামাজের গুরুত্ব ফরজ নামাজের সমান বা বেশী মনে করা এবং আরও অনেক।

অনেকেই বলে থাকেন, ঈদ-ঈ-মিলাদুন্নবী, বা শব-ই-বরাত উপলক্ষ্যে তো কিছু ভাল কাজ করা হয়, তাহলে এই বিদ’আতগুলো পালন করলে ক্ষতি কি? এই প্রশ্নের অনেকগুলো উত্তর রয়েছে।

প্রথম উত্তর হলো, আপনি এই কথার মাধ্যমে বলতে চাচ্ছেন যে, রাসূলুল্লাহ(সা) দ্বীন ইসলামকে পূর্নভাবে আমাদের কাছে পৌঁছে দেন নাই (আ’উযুবিল্লাহ), আর তাই আপনি দ্বীনে নতুন ইবাদত সংযোজন করছেন। এই কাজগুলো যদি ভালই হত তাহলে আবু বকর (রা), উমর ফারুক(রা), ইমাম বুখারী, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল উনারা এই কাজগুলো কেন করেন নাই? আপনার ঈমান কি উনাদের চেয়ে বেশী? অবশ্যই না।

দ্বিতীয় উত্তর হলো, বেশী করে নামাজ পড়াও তো ভাল কাজ। তাহলে, আপনি মাগরিবের নামাজ ৩ রাকা’আত না পড়ে ৪ রাকা’আত পড়েন না কেন? পড়েন না, কারণ রাসূলুল্লাহ(সা) আপনাকে এভাবে করে নামাজ পড়তে শিখিয়ে যাননি।

আয়েশা(রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেনঃ আমাদের ধর্মে আমরা (আমি ও আমার অনুগত সাহাবারা) যা বলি নাই, কেউ যদি তা শুরু করে তবে তা প্রত্যাখিত হবে। (বুখারী, মুসলিম)

 জাবের (রা) হতে বর্ণিত। রাসূল(সা) তাঁর খুতবায় বলতেনঃ আম্মা বা’দ (আল্লাহর প্রশংসা ও সাক্ষ্যদানের পর) নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম কথা আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম রীতি মুহাম্মদ (সা) এর রীতি। সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হল দ্বীনের ব্যাপারে নতুন কাজ উদ্ভাবন করা তথা বিদা’আত। আর প্রত্যেকটি বিদ’আতই ভ্রষ্টতা।  – (তাহকীক রিয়াযুস সালেহীন ১৭৪, মুসলিম, নাসায়ী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ)

পরিশেষে সবাইকে আহবান করব, আসুন আমরা ফিরে যাই কোরআন ও সুন্নাহ্‌তে – ধর্মে নতুন কিছু আবিষ্কার হতে বিরত থাকি। কোনো মৌলভী কোনও বিশেষ আমল করতে বললে তাকে জিজ্ঞেস করি, কোরআনের কোন্‌ আয়াত বা কোন্‌ হাদিসের ভিত্তিতে তিনি এই আমলটি করতে বলছেন। ইসলামকে সেইভাবে পালন করি যেভাবে পালন করেছেন রাসূলুল্লাহ(সা) এবং তাঁর অনুগত সাহাবারা। রাসূলুল্লাহ(সা) আল্লাহ্‌র নির্দেশে আমাদেরকে পরিপূর্ন ইসলাম দিয়ে গেছেন, নতুন কিছু সংযোজন করলে তা ইসলামকে নষ্ট করবে, কঠিন করবে, বিকৃত করবে, পরিবারে ও সমাজে অশান্তির সৃষ্টি করবে,  আল্লাহ্‌ ও মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করবে, ইসলামকে সুন্দর করবে না।

সূত্রঃ

  1. Yasir Qadhi’s interview on Deen Show: Culture vs. Islam 
  2. Yasir Qadhi’s answer to the question: What can we do for our deceased ones? 

বেশী বেশী করে দু’আ করব কেন?

dua

আমাদের অনেকেরই ধারণা আল্লাহর কাছে খুব বেশী চাওয়া যাবে না, কম কম চাইতে হবে, যাতে আল্লাহ্‌ অল্প চাওয়ার সবগুলোই দেয়। ধারণাটি সম্পূর্নই ভুল। বরং, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন, দু’আ হলো ইবাদতের মেরুদন্ড (তিরমিযী)। তিনি বেশী বেশী করে দু’আ করতে বলেছেন। আল্লাহ্‌ তাকে অধিক ভালবাসেন, যে তাঁর কাছে অধিক দু’আ করে। রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেছেন, তোমাদের জুতার ফিতা ছিড়ে গেলে তার জন্যও দু’আ কর (তিরমিযী)। অর্থাৎ, যত ছোট বিষয়ই হোক না কেন, সব কিছু নিয়েই দু’আ করা যাবে।

আল্লাহ্‌ কেন দু’আকারীকে ভালবাসেন? কারন, আল্লাহ্‌ ও বান্দার প্রকৃত সম্পর্ক দু’আর মাধ্যমেই প্রমানিত হয়। আল্লাহ্‌ আর-রাহমান, আর-রাহীম, পরম করুনাময়, অসীম দয়ালু, আল্লাহ্‌ আস-সামি’, আল-ক্বাদির, তিনি শ্রোতা, তিনিই কর্তা,  আল্লাহ্‌ আস-সামাদ, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, তার কোন চাহিদা নেই। অন্যদিকে, আমরা মানুষেরা আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর দাস, আমরা আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী, তিনি না দিলে আমরা অসহায়। দু’আর মাধ্যমে একজন বান্দা আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর প্রতি তার বিশ্বাসই প্রমান করে। যখন কোন বান্দা আল্লাহর কাছে দু’আ করতে হাত তুলে, তখন আল্লাহ্‌ তা খালি হাতে ফেরত দিতে লজ্জাবোধ করেন (আবু দাউদ), ঠিক যেভাবে কোন ভিক্ষুক হাত পাতলে আমরা তাকে খালি হাতে ফেরাতে লজ্জা পাই।

তিরমিযী শরীফের হাদিসে আছে যে, বান্দার কোন দু’আই ব্যর্থ হয় না। আল্লাহ্‌ যদি তার দু’আ না-ও কবুল করেন তবুও বান্দা লাভবান হয়, কারণ দু’আ করার জন্য সে সাওয়াব পায়। এই কথা শুনে সাহাবীরা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ(সা) আমরা এখন থেকে বেশী বেশী দু’আ করব। রাসূলুল্লাহ(সা) উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ্‌ (দিতে পারেন) তার চেয়েও বেশী।

হাদিসে কুদসীতে আছে – “সমগ্র মানবজাতি এবং জ্বীনজাতি, মুসলমান ও কাফিরেরা, যদি একত্রে আল্লাহর কাছে দু’আ করা শুরু করে এবং তাদের যত চাহিদা আছে সব একত্রে চাইতে থাকে, তা-ও তা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে সমুদ্রের বুকে এক ফোঁটা পানি তুল্য”। কারণ হল, আমাদের চাওয়ার ক্ষমা সীমিত, কিন্তু আল্লাহর দেওয়ার ক্ষমতা অসীম।

আমরা অনেকেই আরেকটা ভুল করি, যেটা হল যে আমরা শুধু বিপদে পড়লেই আল্লাহর কাছে দু’আ করি। কিন্তু, এটা ফাসেক, মুনাফিক ও কাফিরের লক্ষন। মানুষের এই আচরণটি যে আল্লাহ্‌ অপছন্দ করেন, তা তিনি মহাগ্রন্থ কোরআনে বহুবার উল্লেখ করেছেন। মু’মিন বান্দা ভাল-মন্দ সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে দু’আ করেন। আল্লাহ্‌ ‘আযযাওয়াজাল মহাগ্রন্থ কোরআনে বলেনঃ

আর মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। তারপর যখন আমি তার দুঃখ-দৈন্য দূর করি সে তার আগের পথ ধরে, তাকে যে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করেছিল তার জন্য যেন সে আমাকে ডাকেইনি। সীমালংঘনকারীদের কার্যকলাপ তাদের কাছে এভাবেই শোভনীয় মনে হয়। – সূরা ইউনুস (১০:১২)

কোন সন্দেহ নেই যে শ্রেষ্ঠ দু’আ হলো কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দু’আ সমূহ। আমরা যখন আল্লাহর কাছে চাইব, তখন দুনিয়ার জন্য যেমন চাইব, আখিরাতের জন্য তার চেয়েও বেশী করে চাইব। কারণ, দুনিয়ার জীবন ক্ষনস্থায়ী ও পরীক্ষামূলক, কিন্তু আখিরাতের জীবন অনন্ত, অসীম। রাসূলুল্লাহ (সা) অধিকাংশ সময় এই বলে দু’আ করতেন যেঃ আল্লাহুম্মা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়াক্বিনা ‘আযাবান্নার। অর্থাৎ, হে আল্লাহ্‌! আমাকে পৃথিবীতে কল্যাণ ও পরকালের কল্যাণ দান কর এবং দোযখের শাস্তি হতে আমাকে বাঁচিয়ে রাখো। (বুখারী ও মুসলিম)

দু’আ কবুল হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো দু’আকারীর মনোযোগ ও সততা। অমনোযোগীর দু’আ আল্লাহর গ্রহণ করেন না (তিরমিযী)। এই মনোযোগ বৃদ্ধির অন্যতম উপায় হলো, অর্থ বুঝে অথবা নিজের ভাষায় দু’আ করা। কারণ, নিজের ভাষায় দু’আ করলে যে একাগ্রতা ও সততা থাকবে, অর্থ না বুঝে দু’আ করলে তা থাকবে না। একবার হাসান আল বসরী (রহ) এর কাছে এক ব্যক্তি এসে দু’আ চাইলে তিনি বললেন, তুমি নিজের জন্য নিজেই দু’আ কর। কারণ, তুমি নিজের জন্য যতটা একাগ্রতা ও সততার সাথে দু’আ করবে, অন্য কেউ তা করবে না। তবে, এর মানে এই না যে অন্য কাউকে দু’আ করতে বলা যাবে না। রাসূলুল্লাহ(সা) হযরত উমর(রা) কে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন, যে কেউ উয়াইজ আল ক্বারনী(রা) এর সাথে সাক্ষাৎ পাবে সে যেন উয়াইজ আল ক্বারনী(রা)-কে আল্লাহ্‌র কাছে তার জন্য ক্ষমা চেয়ে দু’আ করতে বলে। (মুসলিম)

বান্দা আল্লাহর সবচাইতে কাছে থাকে সিজদারত অবস্থায়, তাই রাসূলুল্লাহ(সা) সিজদারত অবস্থায় বেশী করে দু’আ করতে বলেছেন (মুসলিম)। আমাদের অধিকাংশেরই জানা নাই যে, সিজদারত অবস্থায় নামাজের মধ্যে তিনবার সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা বলার পর, তথা সিজদার আরকান আদায় হয়ে যাওয়ার পর নিজের মাতৃভাষায় আল্লাহর কাছে দু’আ করা যায়। এটা শুধু জায়েযই নয়, বরং শেখ ইয়াসির কাদিসহ স্বনামধন্য অনেক আলেমের মতে এটা করলে রাসূলুল্লাহ(সা) এর সুন্নাতকে প্রান দান করা হবে।

আসুন আমরা সবাই নিজের জন্য যেমন দু’আ করি, তেমনি করি অন্যদের জন্য। মুসলিম শরীফের হাদিসে রয়েছে, যখন কোন মুসলমান বান্দা তার ভাইয়ের জন্য তার অগোচরে দু’আ করে, তখন ফিরিশতারা বলেঃ “তোমার জন্যও অনুরূপ রয়েছে”। আল্লাহ্‌ আমাদের সকলকে দু’আর গুরুত্ব বোঝার তৌফিক দিন। জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চাওয়া থেকে বড় চাওয়া, সব কিছুর জন্য আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার মুখাপেক্ষী, এই সত্য অনুধাবন করে আমরা যেন সর্বদা সবকিছু তার কাছে চাই। দুনিয়ার মঙ্গল যতটুকু চাই, আখিরাতের মঙ্গল যেন তার চাইতেও বেশী চাই।

কৃতজ্ঞতাঃ

শেখ ইয়াসির কাদির ইউটিউব লেকচারঃ Du’a in the last 10 nights of Ramadan