খালিফাহ আলীর(রা) বর্ম ও জনৈক ইহুদী

SONY DSC

ইসলামের চতুর্থ খালিফাহ আলী ইবনে আবি তালিব (রা) ও জনৈক ইহুদী লোকের গল্পটা হয়তো আমরা অনেকেই জানি। তারপরেও আবার বলছি। সাধারণত: গল্পটা যে কারণে বলা হয় আমি সে কারণে বলব না, অন্য একটা কারণ আছে – সেটা লেখার শেষের দিকে বলব।

 

আলী (রা) তখন আমিরুল মু’মিনীন। এক যুদ্ধে উনি তাঁর বর্মটা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এর কিছুদিন পরে একদিন বাজারে গিয়েছেন আলী। হঠাৎ চোখ আটকে গেল জনৈক ইহুদীর দোকানে – আরে! ওটা কি চক চক করছে ওখানে! এ যে আমার সেই হারানো বর্ম! খুশীতে আটখানা হয়ে আলী ছুটে গেলেন ইহুদী দোকানীর কাছে। বলে উঠলেন – ‘এই যে জনাব! ওটা আমার বর্ম, কিছুদিন আগে একটা যুদ্ধে হারিয়েছিলাম। তুমি কোত্থেকে পেলে এটা?’ আলী(রা) খালিফাহ হওয়া সত্ত্বেও মোটেও ঘাবড়ালো না ইহুদী – সে জানে এই রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমান। জোর গলায় সে প্রতিবাদ করে উঠল – ‘জ্বী না! এটা এখন আমার হাতে, কাজেই এটা আমার বর্ম’।

 

অবাক হলেন আলী(রা)। তিনি নিশ্চিত এটা তাঁর বর্ম। আর তার উপর তিনি হলেন পুরো রাষ্ট্রের খালিফাহ। চাইলে নিজের ক্ষমতাবলে সেটা ইহুদী থেকে নিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু, তা তিনি করলেন না – কেইসটা নিয়ে গেলেন কাজীর (বিচারক) কাছে। কাজী আলীর (রা) কাছে জানতে চাইলেন – ‘আপনার কাছে প্রমাণ কি যে এটা আপনার বর্ম?’ আলী বললেন – ‘আমার দুই ছেলে হাসান আর হুসাইন সাক্ষ্য দেবে যে এটা আমার বর্ম’। কাজী মাথা নেড়ে বললেন – ‘উঁহু। ছেলের সাক্ষ্য বাবার পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়’। এবার কাজী ফিরলেন ইহুদীর দিকে। জিজ্ঞেস করলেন – ‘তোমার কি কোন সাক্ষী আছে নাকি তুমি শপথ করে বলবে এটা তোমার?’ ইহুদী জবাব দিল – ‘আমি কসম করে বলছি এটা আমার’। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একটা হাদিস আছে – কেউ কোন অভিযোগ নিয়ে আসলে তাকে সাথে প্রমাণও আনতে হবে, আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে সে হয় প্রমাণ আনবে অথবা কসম করে বলবে। এই হাদিসের ভিত্তিতে কাজী রায় দিলেন – ‘দু:খিত আলী! আপনি কোন প্রমাণ আনতে পারেননি আর সে শপথ করে বলেছে এটা তার, কাজেই মামলার রায় আপনার বিপক্ষে যাচ্ছে এবং বর্মটা আপনি পাচ্ছেন না’।

 

আলী(রা) চুপচাপ রায় মেনে নিলেন। বললেন – ‘ঠিক আছে’। আর এদিকে মামলার রায়ে ইহুদী ব্যক্তি তো মহা হতম্ভব! সাথে সাথে সে বলে উঠল – ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু! যে ধর্ম এই রকম সততার সাথে তার খালিফার বিরুদ্ধে রায় দেয় সেটা নিশ্চয়ই সত্য ধর্ম! কাজী সাহেব! আসলে খালিফাই সত্য কথা বলছিলেন, এটা উনারই বর্ম। যুদ্ধের ময়দান থেকে এটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। এটা উনারই পাওয়া উচিত’। ইহুদীর কথা শুনে একগাল হাসলেন আলী। বললেন – ‘ভাই তুমি যেহেতু এখন আমার মুসলিম ভাই হয়েই গেছ কাজেই বর্মের আমার আর দরকার নেই, এটা আমি তোমাকে গিফট করলাম’!

 

উপরের ঘটনাটা সাধারণত বর্ণনা করা হয় আদর্শ ইসলামী শাসনব্যবস্থার সুবিচার এর উদাহরণ হিসাবে। কিন্ত, এখানে আরেকটা ব্যাপার কিন্তু ভীষণ রকমের লক্ষণীয়। আলী(রা) নিশ্চিত জানতেন বর্মটা তাঁর, এবং আলী(রা) তখন মুসলিম জাহানের খালিফাহ পর্যন্ত ছিলেন – চাইলেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারতেন তিনি, নিজের ক্ষমতাবলে বর্মটা নিয়ে নিতে পারতেন। সমস্ত মুসলিম জাহানের খালিফাহ হওয়া সত্ত্বেও তিনি আইন নিজের হাতে তুলে নেননি, ব্যাপারটা নিয়ে গেছেন বিচারকের কাছে। কারণ, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া ইসলাম সমর্থন করে না। যে ব্যক্তি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সে শক্তি দিয়ে অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করবে, যার ‘ইলম আছে সে কথা দিয়ে অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করবে, আর এই দুইয়ের কোনটাই যার সামর্থ্যে নেই সে মনে মনে অন্যায়কে ঘৃণা করবে।

 

আমিরুল মু’মিনীন হওয়া সত্ত্বেও সামান্য একটা বর্ম ফিরে পাওয়ার জন্য আলী(রা) আইন নিজের হাতে তুলে নেননি, অথচ আজ তারই পথের পথিকেরা মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতেও আইন নিজের হাতে তুলে নিতে কুন্ঠাবোধ করে না।

 

(পাদটীকা:

১) ঘটনাটা শেইখ শাদী সুলাইমান তার একটি লেকচারে খুব সুন্দরভাবে বলেছিলেন। গুগলে সার্চ করলেই পাবেন।

২) অন্যায়ের প্রতিবাদ কিভাবে করতে হবে তা জানতে পারবেন ইমাম আন-নাওয়াবির ৪০ হাদিসের ৩৪ নং হাদিস থেকে। হাদিসটা প্রায়ই মিস-ইউজ হয়। এর খুব সুন্দর ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখা পাবেন নিচের লিঙ্কে গেলে।

http://40hadithnawawi.com/index.php/the-hadiths/hadith-34 )

 

‘আলেকজান্ডার দি গ্রেট’ এর শেষ ইচ্ছা

Image

(নিচের কাহিনীটা সত্য হোক আর না হোক, কিন্তু এর শিক্ষাগুলো অবশ্যই সত্য)

‘আলেকজান্ডার দি গ্রেট’ বেঁচেছিলেন মাত্র ৩২ বছর। এই ছোট্ট জীবনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রাচীন যুগের অন্যতম বিশাল সাম্রাজ্য। এত বড় এই যোদ্ধা মারা গিয়েছিলেন সামান্য জ্বরে আক্রান্ত হয়ে, নিজের সাম্রাজ্যের বাইরে অন্য রাজ্যে। খুব ইচ্ছা ছিল তার নিজের প্রাসাদে ফিরে মরবেন, কিন্তু মৃত্যু তাকে সেই সময় দেয়নি।

মৃত্যুশয্যায় ‘আলেকজান্ডার দি গ্রেট’ তার জেনারেলদের ডেকে তিনটি শেষ ইচ্ছার কথা বলেছিলেন।

১। তার কফিন কবরস্থানে বহন করে নিয়ে যাবে তার সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ডাক্তারেরা

২। তাকে বহন করার রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে দেয়া হবে তার অগাধ সম্পদ – টাকা, স্বর্ণ, মনি-মুক্তা – যা কিছু তিনি তার ঈর্ষনীয় সাফল্যমন্ডিত জীবনে অর্জন করেছিলেন।

৩। তার হাত দুটো কফিন থেকে বাইরের দিকে ঝুলিয়ে দেয়া হবে।

আলেকজান্ডারের এই অদ্ভূত ইচ্ছাগুলো শুনে তার এক জেনারেল অবাক হয়ে তাকে প্রশ্ন করলে আলেকজান্ডার ব্যাখা করলেন।

তিনি বললেন:

  • আমি চাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডাক্তারেরা আমার কফিন বহন করুক, যাতে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে, মৃত্যু যখন আসবে তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডাক্তারেরা একসঙ্গে মিলেও সারিয়ে তুলতে পারবে না।
  • আমি চাই আমার কবরস্থানে যাওয়ার পথ সম্পদে ছড়িয়ে থাকুক, যাতে সবাই দেখতে পায় যে এই দুনিয়ায় অর্জিত সম্পদ দুনিয়াতেই থেকে যাবে।
  • আমি চাই আমার হাত দুইটা কফিন থেকে বাইরের দিকে ঝুলে থাকুক, যাতে মানুষ শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে যে আমরা এই দুনিয়ায় খালে হাতে এসেছিলাম, যখন সময় ফুরিয়ে যাবে তখন আবার খালি হাতেই চলে যাবো।

ঘটনা থেকে শিক্ষা:

আমরা কবরে কোনও সম্পদ নিয়ে যাবো না, রেখে যাওয়া ভালো কাজগুলোই শুধু আমাদের কাজে লাগবে। এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়, কারণ আমাদের প্রত্যেকের আয়ু নির্ধারিত করা আছে। আমরা পরিশ্রম করে টাকা-পয়সা অর্জন করতে পারবো, কিন্তু একটা সেকেন্ড সময়ও আমরা কিনতে পারবো না।

প্রতিটি আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে। আর নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে আর জান্নাতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, সেই চূড়ান্ত সফলতা লাভ করল। আর দুনিয়ার জীবনতো ধোঁকার উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়। – (সুরা আল-ই-ইমরান ৩:১৮৫)

কৃতজ্ঞতা: http://ronrosstoday.com/?p=581

সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ এর ব্যবসায়ীরা

Muslims hugging each other

ইসলামের স্বর্ণযুগের কাহিনী এটা, মুসলমানেরা একের পর এক দেশ দখল করে আল্লাহর শাসন কায়েম করে চলেছে। তখনকার মুসলিম সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে ছিল অটোমানেরা, আর অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ছিলেন মুহাম্মাদ আল ফাতিহ (English: Mehmed the Conqueror)। সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ প্ল্যান করলেন যে তিনি দখল করে নেবেন তৎকালীন পৃথিবীর সবচাইতে উন্নত নগরী – তুরস্কের কন্সট্যান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল), যা তখন ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দখলে। যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি চিন্তা করলেন যে, আগে আমি পরীক্ষা করে দেখি আমার সাম্রাজ্যের মুসলিমদের মধ্যে ঈমান ও সততা কেমন। তাঁর চিন্তা-ভাবনা আমাদের চিন্তা-ভাবনার থেকে অনেক আলাদা ছিল। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, বিজয় আল্লাহর তরফ থেকে আসে। কাজেই মুসলিমদের মধ্যে যদি ঈমান ও আল্লাহর ভয়ই না থাকে, তাহলে বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব হবে না ।

সাধারণ মানুষদের হাল-চাল পরীক্ষা করার জন্য সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ ছদ্মবেশে বাজারে গেলেন। বাজারে যেয়ে তিনি এক বিক্রেতাকে বললেন: আমি তোমার থেকে পনির, দুধ আর মধু কিনতে চাই। বিক্রেতা বলল: তুমি আমার থেকে পনির কিনো, কিন্তু আমি তোমার কাছে দুধ আর মধু বিক্রি করব না। কারণ, আমি আজকে আমার চলার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ বিক্রি করে ফেলেছি। কিন্তু, আমার অমুক বিক্রেতা ভাই আজ খুব বেশী বিক্রি করতে পারে নাই। তুমি তার কাছ থেকে দুধ আর মধু কিনে নাও। এই বলে সে অন্য এক বিক্রেতাকে দেখিয়ে দিলো।

সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ প্রথম বিক্রেতার থেকে পনির কিনে নিয়ে দ্বিতীয় বিক্রেতাকে গিয়ে বললেন: আমি তোমার থেকে দুধ আর মধু কিনতে চাই। দ্বিতীয় বিক্রেতা বলল: তুমি আমার থেকে দুধ কিনো, কিন্তু আমি তোমার কাছে মধু বিক্রি করব না। কারণ, আমি আজকে আমার চলার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ বিক্রি করে ফেলেছি। কিন্তু, আমার অমুক বিক্রেতা ভাই আজ খুব বেশী বিক্রি করতে পারে নাই। তুমি তার কাছ থেকে মধু কিনে নাও। এই বলে সে তৃতীয় আরেক বিক্রেতাকে দেখিয়ে দিলো।

সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ তৃতীয় বিক্রেতা থেকে মধু কিনলেন আর উচ্ছাসী কন্ঠে বলে উঠলেন: সুবহান আল্লাহ! আমার সাম্রাজ্যের মুসলিমদের সততা আর ভ্রাতৃত্ববোধ যদি এরকম দৃঢ় হয় তো শুধু কন্সট্যান্টিনোপল নয় বরং আমরা পুরো বিশ্বকে জয় করতে পারব!

সূত্র:  The Great Islamic Empire by Ustadh Musa Cerantonio