দুইটি স্বর্ণালী সূত্র

wrapping-up

গতকাল আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে (Carleton University) একটা পেডাগগিকাল সেমিনারে এটেন্ড করেছিলাম। এই সেমিনারগুলোতে এটেন্ড করলে বাড়তি কিছু টাকা পাওয়া যায় বিধায় টিচিং এসিস্টেন্টরা সাধারনত এগুলোতে এটেন্ড করে থাকে। বেশীরভাগ পেডাগগিকাল সেমিনারগুলোই খুবই বোরিং কিসিমের হয়। লম্বা, লম্বা হাই তুলতে তুলতে দেড়-দুই ঘণ্টা কাটাতে হয়। কিন্তু, গতকালের সেমিনারটা দুইটি কারণে দারুণ ছিল। এক – ফ্রি কফি ও ডোনাট ছিল, আর দুই – দারুণ প্রেসেন্টেশন ছিল। সেমিনারের স্পিকার ম্যাট একজন হিউমেন রাইটস এক্টিভিস্ট এবং সেমিনার পরিচালনার ক্ষেত্রে সে খুবই দক্ষ। যদিও সেমিনারের টপিক ছিল – ওয়ার্কপ্লেসে কিভাবে বৈষম্য দূর করা যায় তার উপর, কিন্তু, মূল বিষয়কে ছাপিয়ে হিউমান রাইটস, হিউমান বিহেভিয়ার, লিডারশিপ স্কিল – সব কিছু নিয়েই ম্যাট খুব প্রানবন্ত ভাবে সবার সাথে আলোচনা করে গেল। সেমিনারের শেষে – সে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল – এবার আপনারা এক এক করে, যদি আপনার ইচ্ছা করে, তাহলে বলুন এই সেমিনার থেকে কোন জিস্ট মেসেজ নিয়ে আপনি বাড়ি ফিরবেন? যদি আপনি চান এই সেমিনার থেকে একটা জিনিস আপনার মাথায় থাকুক – তাহলে সেটা কি?

সবাই তাদের বক্তব্য বলল, আর আমিও বললাম, সেমিনার শেষ হল। সেমিনার শেষে ম্যাট আমার কাছে এসে ব্যক্তিগত ভাবে বলল – এত জোরে বলল যে সবাই শুনতে পেল – “তোমাকে স্পেশালি থ্যাঙ্কস জানাচ্ছি, তুমি এত সুন্দর করে মাত্র দুই পয়েন্টে পুরো সেমিনারটির বক্তব্য তুলে ধরেছ যা অসাধারণ। তুমি যা বলেছ – তা সবাইকেই অনেক সাহায্য করেছে”।
সেমিনার থেকে আসার পর থেকেই আমার মাথার মধ্যে এর কথাগুলি ঘুরছিল, ভাবলাম চট করে বসে লিখে ফেলি – The two golden rules to deal with humans.

Rule 1: It is OK to be different.

আরেকজন আমার মত না-ই হতে পারে, আবার আমিও আরেকজনের মত না-ও হতে পারি – এতে কোন সমস্যা নেই। আমাদের সবাইকে যে ঠিক একটা জিনিসকেই সঠিক বলে মেনে নিতে হবে – তারও কোন কারণ নেই। অমুক মনে করে কাজই জীবন, আমার হার্ড ওয়ার্ক করতে ভালো লাগে না – কোন সমস্যা নাই; অমুক মনে করে ইসলাম সন্ত্রাসী ধর্ম, আমি মনে করি ইসলাম শান্তির ধর্ম – মানুষের মধ্যে ভিন্ন বিশ্বাস থাকতেই পারে; কেউ মনে করে মনের ভিতর তুফান চললেও প্রকাশ করা ছেলেমানুষী, আর কেউ নিজের কষ্টের কথা শেয়ার না করে থাকতে পারে না – থাকতেই পারে আবেগ প্রকাশের ভিন্নতা। হ্যাঁ, আমি যদি মনে করি অমুকে যা বিশ্বাস করে তার চেয়ে ভালো কিছু আমি জানি, আমি তার সাথে আলোচনা করতে পারি, নিজের মতামত তুলে ধরতে পারি – কিন্তু ‘লোল’ (LOL) দিতে পারি না, তাকে কটাক্ষ করতে পারি না, তাকে ছোট দৃষ্টিতে দেখতে পারি না, ‘ওকে বুঝিয়েই ছাড়ব আমি রাইট’ – না এটা হবে না। একইভাবে, আমাকেও বাকী সবার মত হতে হবে এমন কোন কথা নেই। এক বন্ধুর বাসায় ১০ জন মিলে এক হলাম, মাগরিবের সময় হলো, কেউ নামাজ পড়তে উঠে দাড়ালো না, কিন্তু আমি নামাজে দাড়াতেই পারি, আমাকে তাদের মত হতে হবে না। It is OK to be different. Have the courage to be different. Have the maturity to accept the differents.

Rule 2: Stand up against injustice.

নিজে কারো উপর অবিচার করব না, নিজের উপর অবিচার হতে দিব না, অন্য কারো উপর অবিচার হতে দেখলে তার প্রতিবাদ জানাব। ম্যাট খুব সুন্দর একটা উদাহরণ দিল। সে বলল – বাসের ভিতর হ্যারাসমেন্টের স্বীকার হয়েছে এরকম বহু যাত্রীর সাথে সে কাউন্সেলিং করেছে। এদের কেউ হিজাব বা পাগড়ি পড়ার কারণে বাজে কথা শুনেছে, কেউ আপত্তিকর স্পর্শের স্বীকার হয়েছে, কেউ তার গায়ের বর্ণের জন্য বর্ণবাদের স্বীকার হয়েছে। ম্যাট বলল – হ্যারাসমেন্টের স্বীকার এই মানুষগুলোর মধ্যে একটা বিষয় কমন ছিল, তারা হ্যারাসমেন্টের মূল কাজটায় যতটা না আঘাত পেয়েছিল, তার চেয়েও বেশী আঘাত পেয়েছিল তাদের আশের-পাশের মানুষের নীরবতায়। আমাদের একটু ভালো কথা, একটু সাপোর্ট একজন আহত মানুষের মনে অনেক বড় আশার, অনেক বেশী আত্মবিশ্বাসের যোগান দেয়। কোন ভাল কাজ, তা সে যত ছোটই হোক না আমরা যেন ছোট মনে না করি। আমার জন্য যা কয়েক ফোঁটা, আরেকজনের জন্য সেটাই তৃষ্ণা নিবারক।

‘সেন্স অফ হিউমার’ চাঙ্গা রাখবে হবে। ‘কুল’ (cool) থেকে মানুষের ভুল ধরিয়ে দেয়ার স্কিল আয়ত্ত করতে হবে। না শুনলে না শুনুক, we can still get along together. মানুষে-মানুষে পার্থক্য থাকবেই আর এই পার্থক্যের জন্য পৃথিবীটা বোরিং না, এক্সাইটিং!

শেষ কথা: উপরে বর্ণিত রুল দুইটার সাথে ইসলামের কি কোন মিল পাওয়া যায়? লক্ষ্য করলে দেখবেন, রাসূলুল্লাহ (সা) এর পুরো জীবনের সারমর্ম হচ্ছে উপরের দুইটি রুল। তাঁর মাক্কী জীবন হলো ১ নং রুল, আর তাঁর মাদানী জীবন হলো ২  নং রুল। মাক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা) সবার থেকে ভিন্ন ছিলেন, আর তাঁর মাদানী জীবনের যুদ্ধগুলো ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস।

কুরআন থেকে পাওয়া কিছু ম্যারেজ টিপস

cute-mustlime-couple39

[ ডিসক্লেইমার:

১) লেখাটি লিখেছি মূলত উস্তাদ নুমান আলি খানের “Responsibilities of Husbands & Responsibilities of Wives” খুতবাটি অনুসরণ করে। কিছু ব্যাখা নেয়া হয়েছে শেইখ ইয়াসির কাযীর “Like a Garment” লেকচার সিরিজ থেকে।

২) আমি ম্যারেজ বা রিলেশনশীপ এক্সপার্ট নই, আমি একজন অনুবাদক মাত্র।

৩) আমি এই লেখাটি লিখেছি বলে এমন মনে করার কোন কারণ নেই যে আমি বুঝি খুব আদর্শ স্বামী। তবে, হ্যাঁ আপনাদের সবার মত আমিও একজন আদর্শ স্পাউস হবার স্বপ্ন দেখি 🙂 ]

 

“আর তাঁর আশ্চর্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি নিদর্শন এই যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের মধ্যে শান্তি পাও আর তিনি তোমাদের মধ্যে দিয়েছেন প্রেম আর মায়া যারা চিন্তা করে তাদের জন্য নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শন আছে (সূরা রুম:২১) 

একটা সুন্দর সংসার এর জন্য স্বামী-স্ত্রীর কি  করা উচিত, কি না করা উচিত এগুলো নিয়ে আমরা তো কত লেখাই পড়ি, কত মানুষের কত উপদেশই শুনি – তার কতটা সত্য কতটা মিথ্যা কে জানে? কিন্তু, একটি সুখী বিবাহিত জীবন পাওয়ার জন্য কি করতে হবে – সেই শর্তগুলি যদি সরাসরি আল্লাহর তরফ থেকে আসলে তাহলে কেমন নয়? যিনি স্রষ্টা তার চাইতে বেশী কে জানবে তার সৃষ্টি সম্পর্কে? ভেবে দেখুন, যেখানে মহান আল্লাহ্‌ আমাদের সরাসরি বলে দিচ্ছেন – এই যে মানুষ! শোনো! তুমি যদি সুখী সংসার চাও তোমাকে এই এই কাজগুলো করতে হবে – তাহলে আমাদের কি আর অন্য কোনো দিকে তাকানো ঠিক হবে?

একটা আনন্দময় সংসারের জন্য স্বামী/স্ত্রীর পারষ্পরিক করণীয় কি হবে – এই লেখায় তা আমরা কুরআন মাজিদের সূরা নিসা’র ৩৪ নং আয়াতের প্রথম অংশের আলোকে আলোচনা করব। আল্লাহ্‌ এই আয়াতে প্রথমে ছেলেদের কি করণীয় তা বলেছেন, এরপর মেয়েদের কি করণীয় তা নিয়ে বলেছেন। আমি আয়াতটির বাংলা অনুবাদে ইচ্ছে করে গুরুত্বপূর্ন শব্দগুলোকে আরবীতে রাখব। তারপর সেই আরবী শব্দগুলোর অর্থ ধরে ধরে স্বামী/স্ত্রীর পারষ্পরিক করণীয় কাজগুলির তালিকা বের করব। আসুন তাহলে শুরু করা যাক —

 

মহান আল্লাহ্‌ বলেন:

 4-34

অর্থ:

ছেলেরা মেয়েদের ব্যাপারে “ক্বাওয়াম” হবে; কারণ, আল্লাহ্‌ তাদের কাউকে কারো উপর সুবিধা দিয়েছেন, এবং কারণ তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করবে

কাজেই, “সালিহা” মেয়েরা হবে “কানিতা” ও “হাফিযা” – হেফাযত করবে যা দেখা যায় না এবং যা আল্লাহ্‌ তাদেরকে হেফাযত করতে বলেছেন     

 

আয়াতাংশটা যে জটিল সন্দেহ নেই। লক্ষ্য করলে দেখবেন, এখানে আসলে দুইটা বাক্য আছে (উল্লেখ্য, বাক্য আর আয়াত এক জিনিস নয়। অনেক বাক্য মিলে এক আয়াত হতে পারে, আবার একাধিক আয়াত মিলেও একটা বাক্য হতে পারে)। প্রথম বাক্যে আল্লাহ্‌ ছেলেদের করণীয়গুলি নিয়ে বলেছেন, আর দ্বিতীয় বাক্যে বলেছেন মেয়েদের করণীয়গুলি নিয়ে।

ছেলেদের করণীয় কাজগুলি দিয়ে শুরু করা যাক।

ছেলেদের করণীয়:

ছেলেদের করণীয় বুঝতে হলে আমাদেরকে “কাওয়াম” শব্দের অর্থ বুঝতে হবে। আরবী ভাষায় একটা ক্রিয়া (verb) কে বুঝা যায় তার বিপরীত ক্রিয়ার সাথে তুলনা করে। কাওয়াম বা উঠে দাঁড়ানো হলো বসে থাকার উল্টো। কাওয়াম বুঝায় সক্রিয়তা, যা নিষ্ক্রিয়তার উল্টো।

 

ছেলেদের করণীয় ১# সম্পর্কের সকল ক্ষেত্রে উদ্যোগী (active) হবে

আল্লাহ্‌ যখন বলছে ছেলেদের “কাওয়াম” হতে হবে, তখন তিনি বলছেন সম্পর্ক রক্ষায় ছেলেদের এক্টিভ হতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে, শুরু করতে হবে। একটা ছেলে যখন তার স্ত্রীকে দেখবে সে রান্নাঘরের কাজ নিয়ে, বাচ্চা নিয়ে পেরেশান হয়ে যাচ্ছে – তখন নিজের উদ্যোগে এগিয়ে যেয়ে সাহায্য করতে হবে। ছুটিতে কোথায় বেড়াতে যেতে মন চায় – সেটা ছেলেকেই আগে জিজ্ঞেস করতে হবে। বিবাহ বার্ষিকীতে স্ত্রী কি করছে তার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেকেই আগে শুভেচ্ছা জানাতে হবে।

ভুল বুঝা-বুঝি, ঝগড়া হলে ছেলের যতই ইচ্ছে করুক ম্যান-কেইভ (পুরুষ-গুহা) এ যেয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে, যতই মনে আসুক ‘ও ভুল করেছে ওকে ক্ষমা চাইতে হবে’, নিজের মনের এই সব ইচ্ছাকে জলাঞ্জলী দিয়ে উদ্যোগী হতে হবে, ঝগড়াঝাটির জন্য অনুতপ্ত হতে হবে, এগিয়ে যেয়ে ক্ষমা চাইতে হবে, মন থেকে ক্ষমা করে দিতে হবে। মেয়েরা সৃষ্টিগত ভাবে লাজুক প্রকৃতির, তাই এমনকি অন্তরঙ্গ হওয়ার ক্ষেত্রেও ছেলেকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

 

ছেলেদের করণীয় ২# সম্পর্ক নবায়নে ক্রমাগত চেষ্টা চালাবে/ Showing continuous commitment

কাওয়াম শব্দের আরেক অর্থ হলো – কোন কিছু দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা, কিছুতেই ছেড়ে না দেয়া। আরবী ভাষার একটা বৈশিষ্ট্য হলো কোন শব্দের মধ্যে যদি কোন অক্ষর পরপর দুইবার আসে তাহলে তা পুনরাবৃত্তি ও আধিক্য বুঝায়। যেহেতু কাওয়াম শব্দের মাঝখানে ‘ওয়াও’ অক্ষরটি দুইবার আছে, তাই এখানে কাওয়াম শব্দের মাধ্যমে বলা হচ্ছে – ছেলেদের বার বার চিন্তা করে দেখতে হবে, প্ল্যান করতে হবে, কি করলে আমাদের সম্পর্কটা দিনে দিনে আরো চুম্বকীয় হবে।

‘আরে ও তো আমারই, ও কি আর আমাকে ছেড়ে যাবে’ – এই জাতীয় চিন্তা বাদ দিতে হবে। কাজের মধ্যে থাকুন, অফিসে থাকুন আর যেখানেই থাকুন, মাঝে-মধ্যে ফোন করে খবর নিতে হবে। শত ব্যস্ততার ভিড়েও প্রায়োরিরিটি দিয়ে স্ত্রীর জন্য সময় বের করতে হবে। স্ত্রী সুন্দর করে সাজলে তার প্রশংসা করতে হবে। কারণ ছাড়াই মাঝে মধ্যে স্ত্রীকে স্পর্শ করতে হবে, জড়িয়ে ধরতে হবে। আয়েশা(রা) এর হাদিস থেকে আমরা জানি রাসূলুল্লাহ(সা) বাসা থেকে বের হওয়ার সময় প্রায়ই তাঁকে চুমু দিয়ে বের হতেন।

 

ছেলেদের করণীয় ৩# ছেলেরা মেয়েদের শারিরীক ও মানসিকভাবে প্রতিরক্ষা (to protect her) করবে

কাওয়াম শব্দের তৃতীয় অর্থ হলো – physically কোন কিছুর সাথে থাকা ও তাকে protect করা। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ বলছেন ছেলেরা মেয়েদের কাছাকাছি থেকে তাদেরকে নিরাপত্তা দিবে, কখনো একাকিত্ব বোধ করতে দিবে না। এই প্রোটেকশন কিন্তু শুধু শারিরীক নয়, মানসিকও। মেয়েরা ছেলেদের চাইতে বেশী আবেগপ্রবণ হওয়ায় লোকে কি বললো তা নিয়ে খুব বেশী চিন্তা করে, কেউ বাজে ভাবে কথা বললে অনেক বেশী ভেঙ্গে পড়ে। কোনো মেয়ে যখন তার মানসিক অশান্তি নিয়ে কথা বলবে – একজন ছেলে সেটাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে না, কটাক্ষ করবে না, উপদেশ না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুধু শুনবে। ছেলেরা মেয়েদের প্রোটেকশন দিবে – শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে।

 

ছেলেদের করণীয় ৪# ছেলেরা মেয়েদের প্রয়োজন (to fulfill her needs) পূরণ করবে

কাওয়াম শব্দের চতুর্থ অর্থ হলো – যত্ন নেয়া, পরিচর্যা করা, Take-care করা, চাহিদা পূরণ করা। মহান আল্লাহর একটা নাম হলো – আল-কাইয়ূম যা একই শব্দমূল “কা-মা” থেকে এসেছে। কাইয়ূম শব্দের অর্থ হলো – যে শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেয়নি, সবসময় তার যত্ন নিচ্ছে, দেখ-ভাল করছে। আল্লাহ্‌ এই আয়াতে কাওয়াম শব্দের মাধ্যমে আমাদের বলছেন – ছেলেরা মেয়েদের যত্ন নিবে, দেখ-ভাল করবে, তাদের কি প্রয়োজন তা জিজ্ঞেস করবে, জানতে চাইবে।

 

ছেলেদের করণীয় ৫# ছেলেরা মেয়েদের সাথে ন্যায্য (fair) আচরণ করবে

কাওয়াম শব্দের পঞ্চম অর্থ হলো –  কাউকে বা কোন কিছুকে তার ন্যায্য পাওনা দেয়া। আমরা প্রায়ই শুনে থাকি – “আল্লাহ্‌ নামাজ কায়েম করতে বলেছেন”। আমরা কিন্তু বলি না আল্লাহ্‌ নামাজ পড়তে বলেছেন। কারণ “কায়েম” শব্দটা আরো উঁচু স্তরের শব্দ – যার অর্থ যতটুকু মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে নামাজ পড়া দরকার ঠিক সেভাবে নামাজ পড়া। অন্যভাবে বলতে গেলে – আমাদের উপর নামাজের যে দাবী তা ন্যায্যভাবে আদায় করা।

একইভাবে –ছেলেদেরকে মেয়েদের ব্যাপারে খুব সতর্কতার সাথে তার ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। আল্লাহ্‌ একজন ছেলেকে তার পরিবারের মেয়েদের উপর জিম্মাদার করে পাঠিয়েছেন। তাই একজন ছেলে নিজেকে সবসময় জিজ্ঞেস করবে – আমি কি ওর সাথে ন্যায্য আচরণ করছি? আমার শক্তি বেশী, গলার জোর বেশী, মনের দৃঢ়তা বেশী – এগুলো ব্যবহার করে আমি ওর উপর কোন জুলুম করছি না তো?

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন – তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর/পরিবারের প্রতি শ্রেষ্ঠ (মুসলিম)। 

 

ছেলেদের করণীয় ৬# ছেলেরা মেয়েদের খরচ চালাবে

“ছেলেরা মেয়েদের ব্যাপারে “ক্বাওয়াম” হবে; কারণ, আল্লাহ্‌ তাদের কাউকে কারো উপর সুবিধা দিয়েছেন, এবং কারণ তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করবে”। (সূরা নিসা ৪:৩৪ আয়াতাংশ)

নারীর জন্য খরচ করার ব্যাপারে কিপটামি করা যাবে না। ইসলামে এমনকি ডিভোর্স দেয়ার সময়েও গিফট দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কাজেই, স্ত্রী থাকাকালীন সময় যে গিফট দিতে হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন – কেউ তার পরিবারের জন্য যা ব্যয় করে তা সাদাকাহ বলে গণ্য হয়।

উপরের কথাগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারছি আল্লাহ্‌ ছেলেদেরকে মেয়েদের ব্যাপারে অনেক দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। আর লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো – আল্লাহ্‌ কিন্তু বলেননি “স্বামীরা স্ত্রীর ব্যাপারে কাওয়াম হবে”, বরং বলেছেন “ছেলেরা মেয়েদের ব্যাপারে কাওয়াম হবে”। অর্থাৎ, একজন ছেলেকে শুধু তার স্ত্রীর সাথেই নয়, শরীয়ত তাকে যে সব নারীদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের সবার সাথেই তাকে কাওয়াম হতে হবে। একজন ছেলেকে তার মা, বোন, মেয়ে, খালা, ফুপু সহ সবার ব্যাপারে কাওয়াম হতে হবে। তাদের সবার সাথে সম্পর্ক রক্ষায় উদ্যোগী হতে হবে, যোগাযোগ রাখতে হবে, মানসিক-শারিরীক প্রতিরক্ষা দিতে হবে, কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতে হবে, তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে।

দায়িত্বের এই লিস্ট পাওয়ার পর কোন ছেলে চার বিয়ে করা তো দূরে থাক, প্রথম বিয়ে করার আগেই একশ’ বার চিন্তা করবে – ওরে বাবা! এত দায়িত্ব আমি পালন করতে পারবো তো? কেন যে পুরুষ হয়ে জন্মেছিলাম!

অধৈর্য হবেন না। এবার আসতে যাচ্ছে মেয়েদের দায়িত্বের তালিকা …

মেয়েদের করণীয়:

সূরা নিসার ৩৪ নং আয়াতে ছেলেদের করণীয় কাজগুলি বর্ণনা করার পর আল্লাহ্‌ মেয়েদের সম্পর্কে বলছেন –

কাজেই, “সালিহা” মেয়েরা হবে “কানিতা” ও “হাফিযা” – হেফাযত করবে যা দেখা যায় না এবং যা আল্লাহ্‌ তাদেরকে হেফাযত করতে বলেছেন     

আল্লাহ্‌ বাক্যটি শুরু করলেন ‘ফা’ বা ‘কাজেই/সুতরাং’ দিয়ে। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ বললেন যেহেতু ছেলেদেরকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে, মেয়েদেরকেও স্বাভাবিকভাবেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এরপর লক্ষ্য করুন বাক্যটির ব্যতক্রমী গঠন। আল্লাহ্‌ কিন্তু বলেননি – “মেয়েরা হবে সালিহা, কানিতা, হাফিযা …”। বরং তিনি বলেছেন – “সালিহা মেয়েরা হবে কানিতা ও হাফিযা – …”। তার মানে আল্লাহ্‌ বলছেন না যে সব মেয়েরা কানিতা, হাফিযা হতে পারবে। বরং, মেয়েদের প্রবণতা হলো কানিতা ও হাফিযা না হওয়া। শুধু সেই সব মেয়েই এই গুণ অর্জন করতে পারবে যারা সালিহা। অর্থাৎ, অন্য সব গুণ অর্জনের পূর্বশর্ত হলো “সালিহা” হওয়া। আসুন তাহলে “সালিহা” শব্দের অর্থ সম্পর্কে জানা যাক।

“সালিহা” এসেছে “সালাহা” থেকে যার অর্থ একটি অর্থ হলো “ভালো”। কোন কিছু নষ্ট বা খারাপ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে সেটাকে ঠিক করে ফেলাকে আরবীতে বলে “সালাহা”। স্কলারেরা বলেন, এখানে আল্লাহ্‌ মেয়েদের ব্যাপারে “সালাহা” শব্দটি ব্যবহার করেছেন কারণ মেয়েদের মধ্যে আল্লাহ্‌ এমন বিশ্লেষণী ক্ষমতা দিয়েছেন যে তারা চাইলে যে কোনো কিছুরই খুঁত ধরতে পারে। একজন মেয়ের স্বামী যতই তার সাথে ভালো করুক না কেন, সে চাইলেই তার দোষ ধরতে পারবে – এই গুণ তার আছে। কিন্তু, আল্লাহ্‌ সবচেয়ে প্রথমে এই কাজটিই করতে নিষেধ করছেন।

 

মেয়েদের করণীয় ১# স্বামীর দোষ উপেক্ষা করবে

আল্লাহ্‌ বলছেন একজন স্ত্রীর সবচাইতে বড় গুণ হলো স্বামীর দোষ এড়িয়ে যাওয়া, দেখেও না দেখার ভান করা, ভুলে যাওয়া। প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে তার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ না করা।  রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে –  কেউ যদি তার স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে কোনও দোষ  দেখে বিরক্ত বোধ করে, তখন সে তার এমন গুণের কথা স্মরণ করুক যার জন্য সে তাকে ভালবাসে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন – কোন মেয়ে যখন তার স্বামীর দোষ ধরে তখন স্বামীটি এটাকে তার Manliness এ আঘাত বলে মনে করে। ফলে, আরো বেশী চটে উঠে। স্বামীর  কোন দোষ চোখে পড়লে যথাসম্ভব চেষ্টা করুন তা না দেখার ভান করতে, আর একদমই সহ্য না করতে পারলে তাকে কটাক্ষ না করে বুঝিয়ে বলুন, অনুরোধ করুন। এ বিষয়ে SheKnows Blog[৪]  এর এই লেখাটি পড়তে পারেন।

 

মেয়েদের করণীয় ২# সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করবে

মানুষের দোষ উপেক্ষা করা সহজ না, খুব কঠিন একটা কাজ, আর স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য করা তো আরো কঠিন। আর তাই মহান আল্লাহ্‌ মনে করিয়ে দিলেন – না, না। তুমি দোষ উপেক্ষা করে ভালো আচরণ করবে, কারণ তুমি “কানিতা”। “কানিতা” শব্দের অর্থ হচ্ছে “যে খুশী মনে নিজের ইচ্ছার পরিবর্তে অন্যের ইচ্ছাকে মেনে দেয়”। কিন্তু, “কুনুত” শব্দটি ইসলামে ব্যবহৃত হয় নিজের ইচ্ছার উপর আল্লাহর ইচ্ছাকে মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ – এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন – মেয়েরা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে স্বামীর সাথে ভালো আচরণ করবে, তার কথা শুনবে। স্বামীর সাথে একটা মেয়ের সম্পর্ক কতটা ভালো না মন্দ – তা দেখে বুঝা যায় আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক কতটা ভালো না মন্দ। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন – আমি যদি তোমাদেরকে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করার হুকুম দিতাম তাহলে স্ত্রীদেরকে হুকুম করতাম স্বামীকে সিজদা করার জন্য (ইবনে মাজাহ)।

 

মেয়েদের করণীয় ৩# স্বামীর অবর্তমানে তার দোষের কথা বলবে না

এরপর আল্লাহ্‌ মেয়েদেরকে বলেছেন “হাফিযা” বা প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে – আল্লাহ্‌ তাদের রক্ষা করতে বলেছেন “যা দেখা যায় না”। এর প্রথম অর্থ হলো – স্বামীর অবর্তমানে মেয়েরা তার সম্মান রক্ষা করবে, তার দোষের কথা মানুষকে বলবে না, তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করবে না। স্বামী-স্ত্রী হচ্ছে একে অপরের অংশ। একজন স্বামী/স্ত্রী যখন নিজের তার সঙ্গীর অবর্তমানে দোষের কথা বলে, তখন সে তার নিজের একটা অংশেরই অপমান করে।

 

মেয়েদের করণীয় ৪#  বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না

“হাফিযা” হওয়ার দ্বিতীর অর্থ হলো –  স্বামী যখন তাদের দেখছে না তখনও মেয়েরা তার বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না। অন্য পুরুষেরা হয়তো মেয়েটার সাথে বেশী বেশী কথা বলতে চাইবে, কাছে আসতে চাইবে, চান্স নিতে চাইবে। কিন্তু, মেয়েরা স্বামীর অবর্তমানে এমন কিছু করবে না, যা তার স্বামী সামনে থাকলে সে করতো না। স্বামী যেখানে যেতে নিষেধ করবে সেখানে যাবে না, যার সাথে কথা বলতে নিষেধ করতে তার সাথে কথা বলবে না, যে কাপড় পড়তে মানা করেছে তার পড়বে না। “হাফিয” হচ্ছে আল্লাহর একটি নাম। এর থেকেই বুঝা যায় মেয়েদের প্রতি অর্পিত এই দায়িত্ব কতটা পবিত্র।

 

মেয়েদের করণীয় ৫# স্বামীর আকাঙ্ক্ষা পূরনে নিজেকে প্রস্তুত (beautify herself) করবে

“হাফিযা” হওয়ার তৃতীয় অর্থ হলো মেয়েরা তার স্বামীর আকাংক্ষাকে রক্ষা (to protect his desire) করবে। স্ত্রীর অবর্তমানে স্বামী কোথায় যাচ্ছে সে কিন্তু জানে না। স্ত্রীর দায়িত্ব হল – যাদেরকে সে দেখতে পাচ্ছে না তাদের থেকেও স্বামীকে রক্ষা করা।  রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন – শয়তান পরনারীকে ছেলেদের চোখে সুন্দর করে দেখায়। কাজেই, একজন মেয়ের দায়িত্ব হলো তার স্বামী যাতে শয়তানের সাথে লড়াইয়ে বিজয়ী হয় তাতে সাহায্য করা। স্বামী যখনই তার স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চাইবে – অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী তাকে না করবে না, কারণ এতে একজন স্বামী খুব কষ্ট পায়, তার মন ভেঙ্গে যায়। আর এই সুযোগে শয়তান এসে মনের মধ্যে ফিস ফিস করতে থাকে – আমি বলেছিলাম না সে তোমাকে ভালবাসে না!

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন – ছেলেরা সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ বোধ করে চোখের দেখায় [৬]।  স্বামী ঘরের ফেরার আগে মাত্র ৫ মিনিট ব্যয় করেই কিন্তু একটা মেয়ে নিজেকে সুন্দর করে প্রস্তুত করতে পারে। মেয়েদের সহজাত প্রবণতা হলো – স্বামী ছাড়া পৃথিবীর সবার জন্য সে সাজবে। অথচ, একটা মেয়েকে সুন্দর দেখার সবচেয়ে বেশী অধিকার হলো তার স্বামীর। এখানে বলা হচ্ছে না যে সব মেয়েদের সুপারমডেল হয়ে যেতে হবে। স্বামীরা জানে সংসারের দায়িত্ব পালন করতে একটা মেয়েকে কতটা পরিশ্রম করতে হয়। এখানে খুব সাধারণ সাজগোজের কথা বলা হচ্ছে যা ৫/১০ মিনিটেই করা যায়।

সাহাবাদের স্ত্রীরা স্বামীর ঘরের ফেরার সংবাদ পেলে নিজেকে সুন্দর করে প্রস্তুত করে রাখতেন। স্বামীর সামনে নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করাও একটা ইবাদত। যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ(সা) এমনকি মদীনায় দূত পর্যন্ত পাঠাতেন – অনেক সময় নির্দেশ দিতেন যাতে স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের স্বাগত জানানোর জন্য সেজেগুজে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এতে সবচেয়ে বেশী লাভ কার? সবচেয়ে বেশী লাভ মেয়েদেরই। কারণ, যখন স্বামী বুঝতে পারবে তার স্ত্রী তাকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছে, তখন সে তার প্রতি আরো বেশী ভালাবাসা ও আকর্ষণ বোধ করবে। আর যখন স্বামী দেখবে স্ত্রী তার জন্য নিজেকে সুন্দর করে রাখে না – সেই স্ত্রী ক্রমেই তার স্বামীর ভালোবাসা হারাবে।

শেষ কথা:

স্কলারেরা [২,৩] বলেন – দুইটি মাত্র হাদিস আছে – যার একটা স্বামীর জন্য আর আরেকটা স্ত্রীর জন্য – এই একটা করে হাদিস যদি একজন স্বামী ও স্ত্রী মনে রেখে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে সেটাই তাদের সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য যথেষ্ট হবে।

পুরুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটি হচ্ছে:

রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন – “মেয়েদের সাথে কোমল আচরণ করো, কারণ তাদেরকে বাঁকা পাঁজর থেকে তৈরী করা হয়েছে আর সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরের উপরের অংশ যদি তুমি একে সোজা করতে চাও এটা ভেঙ্গে যাবে, আর যদি ছেড়ে দাও তো বাঁকাই থেকে যাবে কাজেই, মেয়েদের সাথে নমনীয় আচরণ করো ” [বুখারী ও মুসলিম, আবু হুরাইরা(রা) হতে বর্ণিত]

 

হাদিসটির ব্যাখায় স্কলারেরা বলেন  –

১) পাঁজর যেমন হৃদপিন্ডকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে, একজন ভালো স্ত্রীও তার স্বামীকে বাইরের কলুষতা থেকে রক্ষা করে।

২) একজন স্বামীর দৃষ্টিতে অনেক সময় তার স্ত্রীকে গোঁয়ার ও হৃদয়হীনা বলে মনে হতে পারে। স্ত্রীর আচরণ ভুল মনে হলে স্বামী তার সাথে চীৎকার চেঁচামেচি করবে না, জোর করে নিজের মত চাপিয়ে দিবে না। বরং, কোমল আচরণের মাধ্যমে, শান্ত ভাষায় তাকে বুঝাতে চেষ্টা করবে।

৩) স্ত্রীর সাথে জোরজবরদস্তির ফল কখনোই ভালো হবে না। বেশী জোড়াজুড়ি করলে সম্পর্কটি ভেঙ্গে পর্যন্ত যেতে পারে।

৪) স্ত্রীর সাথে ঝগড়া-ঝাঁটি হয়ে গেলে তাকে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সময় দিতে হবে। ঠিক যেমনি – ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগার জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়, মেয়েরা মন ভাঙলেও তা সারতে সময় লাগে। সুতরাং, একজন স্বামীকে তার স্ত্রীর দোষগুলি উপেক্ষা করে, গুণের কথা মনে রেখে, ধৈর্য ধরে, ভালো ব্যবহার করে যেতে হবে। আর, মহান আল্লাহ্‌র কাছে সুন্দর সম্পর্কের জন্য দু’আ করতে হবে।

 

আর স্কলারদের মতে মেয়েদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটি হচ্ছে:

রাসূলুল্লাহ   বলেন – “আমি যদি আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা করার অনুমতি দিতাম, আমি স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য” 

(ইবনে মাযাহ, আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আউফা থেকে বর্ণিত)

 

এই হাদিসের ব্যাখায় স্কলারেরা বলেন – একজন স্ত্রী তার স্বামীকে ভালবাসবে, সম্মান করবে ও তার মতামত অনুসারে কাজ করবে (হারাম কাজ ছাড়া) এবং তার সামনে নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করবে। তবে, স্বামীকে সম্মান করার অর্থ এই নয় যে স্বামী অন্যায়-অত্যাচার করলেও তাকে মুখ বুঁজে মেনে নিতে হবে। সম্মান করার অর্থ এটাও নয় যে স্ত্রী স্বামীর সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করতে পারবে না। বরং, স্ত্রী স্বামীর সাথে ভিন্নমত পোষন করতে পারবে, পরামর্শ দিবে, প্রয়োজনে যুক্তি সহকারে নিজের মতকে তুলে ধরবে – কিন্তু এই সবই সে করবে সম্মানের সাথে, কটাক্ষের ছলে নয়। রাসূলুল্লাহ(সা) এর সাথে তাঁর স্ত্রীরা অনেক সময় ভিন্নমত পোষন করেছেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় স্ত্রীর পরামর্শেই রাসূলুল্লাহ(সা) সর্বপ্রথম তাঁর মাথার চুল চেঁছে ফেলেছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, যদি এমন হয় যে – একজন মেয়ের স্বামী তাকে কিছু করতে বলে, আর মেয়েটির পিতা-মাতা ও ভাই-বোন তাকে অন্য কোন কিছু করতে বলে,  এক্ষেত্রেও মেয়েটিকে তার স্বামীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে হবে [৫]। এ বিষয়ে পাশ্চাত্যের বহু রিলেশনশিপ এক্সপার্টও এখন বলেন – “দ্য হ্যাপিয়েস্ট ওয়াইফ ইয দা সারেন্ডারড ওয়াইফ” (এ বিষয়ে লরা ডয়েল এর বেস্ট-সেলিং বই “দা সারেন্ডারড ওয়াইফ” [৭] পড়ে দেখতে পারেন)।

কোনো কিছুই এমনি এমনি হয় না। যে কোনো কিছু পাওয়ার জন্যই চেষ্টা করতে হয়। একটা সুন্দর সুখী সংসার গড়ার জন্যও চেষ্টা করতে হয়। একটি সুন্দর-সুখী পরিবার গড়ার জন্য স্বামী ও স্ত্রী দুইজনকেই চেষ্টা করতে হবে। এর মধ্যে ভুল হবে, মান-অভিমান হবে, কিন্তু সেটাকে ধরে রাখলে চলবে না। একে অপরের ভুলকে উপেক্ষা করে সুন্দর সংসারের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

[এই লেখাটি স্বামী-স্ত্রীর পারষ্পরিক দায়িত্বের কোন  পরিপূর্ণ/কম্প্রিহেনসিভ লিষ্ট নয়। ছেলে-মেয়ের সুন্দর, ভালাবাসাময়, শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য যে প্র্যাক্টিকাল স্টেপ গুলো নিতে হবে শুধু সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই লেখায়। এগুলোর বাইরেও স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি অনেক ধর্মীয় দায়িত্ব (যেমন – পরষ্পরকে ইসলাম পালন করতে সাহায্য করা, উৎসাহ দেয়া, ইসলাম শিক্ষা করা ইত্যাদি) আছে। ]

রেফারেন্স:

  1. Responsibilities of husband and wife (Khutbah) – Nouman Ali Khan
  2. Like a Garment – Yasir Qadhi
  3. Making marriage work (Khutbah) – Yasir Qadhi
  4. Marriage without criticism – SheKnows blog
  5. Hadith on prostrating husband https://islamqa.info/en/43123
  6. Sex and the power of the visual – PragerU
  7. The surrendered wife – Laura Doyle

 

সুস্বাস্থ্য অর্জনের সহজ কিছু টিপস

images

কাতার এয়ারওয়েজে এবার কানাডা থেকে বাংলাদেশ যাওয়ার পথে মাইকেল মোসলের কিছু ডকুমেন্টারী দেখলাম। ডকুমেন্টারীগুলির মূল প্রতিপাদ্য ছিল – ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাস।  ভদ্রলোক বললেন – আমরা যদি প্রচলিত ডায়েট ও এক্সারসাইজ প্ল্যানগুলির দিকে তাকাই তাহলে দেখব এগুলোতে যা বলা হয়েছে তা একজন অফিসগামী সাধারণ মানুষের লাইফস্টাইলে বসানো খুব কঠিন। ডায়েট প্ল্যানগুলিতে অনেক মজার খাবার খেতে নিষেধ করা হয়, আর এক্সারসাইজ প্ল্যানগুলিতে যে পরিমাণ ব্যায়াম করতে বলা হয় তার জন্য সময় বের করা দু:সাধ্য। এই পরিস্থিতিতে ভদ্রলোক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্য-গবেষকদের সাথে আলোচনা করে ডায়েটিং ও এক্সারসাইজিংয়ের কিছু ‘হ্যাক’ (শর্টকাট) বের করেছেন। আমি সেগুলির আলোকে কিছু পয়েন্ট তুলে ধরছি:

১) বিভিন্ন রকম ডায়েটিং নিজের উপর এক্সপেরিমেন্ট করে মাইকেল মোসলে দেখেছেন যে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী ডায়েটিং হলো সপ্তাহের ৫ দিন যা ইচ্ছা তাই খাওয়া আর বাকী দুইদিন রোজা রাখা (5:2 diet)। কিন্তু, এই রোজা রাখার দিনগুলিতে ইফতারীর পরে নিজেকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে খেয়ে গেলে চলবে না। ইফতারীর পরেও সংযমের সাথে খাওয়া দাওয়া করতে হবে – প্রচুর পরিমানে ফল, সবজি ও পানি খাওয়া যেতে পারে।

২) রোজা রাখলে কোলেস্টেরল, ব্লাগ সুগার ও বডি ফ্যাট নিয়ন্ত্রনে আসে, এন্টি-বডি তৈরী হয় ফলে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, শরীরের বুড়িয়ে যাওয়ার গতি মন্থর হয়।  মাত্র ৫ সপ্তাহ এই ডায়েটিং রুটিন ফলো করে মাইকেল মোসলে সাড়ে ছয় কেজি ওজন কমিয়েছেন, বডি ফ্যাট ২৭% থেকে ১৯% এ নিয়ে এসেছেন। তার আই,জি,এফ-১ (যা ক্যান্সারের জন্য অন্যতম দায়ী উপাদান) কমে অর্ধেক হয়ে আসে, কোলেস্টেরল ও ব্লাগ সুগার লেভেল স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে।

৩) মাইকেল মোসলে সপ্তাহে দুইদিন রোজা রাখার কথা বললেন। আর আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো – হাদিসেও বলা আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ সপ্তাহে দুইদিন রোজা রাখতেন – সোমবার ও বৃহস্পতিবার। আরেক হাদিসে – মাসের মাঝের তিন দিন রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে। আমার ধারণা – যদি গবেষনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে প্রতি মাসে টানা তিনদিন রোজা রাখাও স্বাস্থ্যের জন্য সমান কার্যকরী।

৪) ব্যায়ামের ক্ষেত্রে – প্রতিদিন জিমে যেয়ে এক ঘন্টা ঘাম ঝরানোর পর মাত্র এক গ্লাস জুস পান করলেই সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয় – বেশীরভাগ মানুষের জন্য দিনে ১ ঘন্টা জিমের জন্য সময় বের করাও কষ্টসাধ্য। মাইকেল মোসলে দেখিয়েছেন – ১ ঘণ্টা জিমে যেয়ে ব্যায়াম করার চেয়েও বেশী উপকারী হলো চলতি-ফিরতি পথে ব্যায়াম করে নেয়া  যাকে NEAT (Non-exercise activity thermogenesis) বলে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হলো – ঘন্টায় কমপক্ষে পাঁচ মিনিট চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা, আর তা না পারলে অন্তত দাঁড়িয়ে থাকা। এর সাথে – যত বেশী সম্ভব বসে না থেকে হাঁটা, সুযোগ পেলেই এলেভেটর ব্যবহার না করে সিঁড়ি ব্যবহার করা, বাসের সিটে না বসে দাঁড়িয়ে থাকা, টয়লেটে যাওয়ার সময় একটু ঘুরে যাওয়া – এভাবে করে বিভিন্ন কাজের মধ্যেই ব্যায়ামকে জড়িয়ে নেয়া। খুব সহজ এই কাজগুলি করে মাইকেল মোসলে দিনে ৫০০ ক্যালরী বার্ন করতে সক্ষম হয়েছেন, যা কিনা এক ঘন্টা ট্রেডমিলে  কষ্টসাধ্য দৌড়ানোর সমান।

৫) আর দরকার ঘাম ঝরানো ব্যায়াম (High intensity training)। কতক্ষণের? সারপ্রাইজিংলি – সপ্তাহে মাত্র ৩ মিনিটের ঘাম ঝরানো ব্যায়ামই যথেষ্ট। এই ৩ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে ৩ দিনে, অর্থাৎ যেদিন ব্যায়াম করা হবে সেদিন করতে হবে মাত্র ১ মিনিট।  এই ১ মিনিট ব্যায়াম আবার করতে হবে ২০ সেকেন্ডের তিনটি স্লটে কিছুক্ষণ জিরিয়ে জিরিয়ে। সবচেয়ে ভালো হয় এই ২০ সেকেন্ডে যদি প্রচন্ড জোরে সাইক্লিং করা যায়। সেটা সম্ভব না হলে প্রচন্ড জোরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দৌড়ানো যেতে পারে। যে ব্যায়ামই করা হোক না কেন, এই ২০ সেকেন্ডে ঘাম ঝরাতে হবে। চার সপ্তাহে মাত্র ১২ মিনিট ঘাম ঝরানো ব্যায়ামের পর মাইকেল মোসলে তার শরীরের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি ২৩% বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন – যার ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তিনি প্রবলভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছেন।

৬) গবেষণায় দ্রুত হাঁটার অস্বাভাবিক রকমের উপকারীতা পাওয়া গেছে। তাই আমাদের উচিত হবে হাঁটার সময় এটা-ওটার দিকে না তাকিয়ে থেকে, মোবাইল টেপাটেপি না করে যতটুকু সম্ভব দ্রুত গতিতে হাঁটা। এই উপদেশটার সাথেও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহর আশ্চর্য রকম মিল পাওয়া যায়। শামায়েল তিরমিযীর হাদিস থেকে আমরা জানি – রাসূলুল্লাহ ﷺ হাঁটার সময় দ্রুত হাঁটতেন। তিনি এত দ্রুত হাঁটতেন যে তাঁর হাঁটা দেখে মনে হতো তিনি বুঝি কোনো ঢালু জায়গা দিয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছেন।

মাইকেল মোসলের শেষ কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ন।  তিনি বলেছেন –  একই ডায়েট ও এক্সারসাইজ প্ল্যান সবার জন্য সমানভাবে কাজ না-ও করতে পারে। একেকজনের শরীর ডায়েট ও এক্সারসাইজ এর পর একেকভাবে রিয়্যাক্ট করতে পারে। তাই সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একজন এক্সপার্ট এর সাথে আলোচনা করে নিজের জন্য স্যুটেবল প্ল্যান বের করে নেয়া।

সূত্র:

১) Eat, fast and live longer – Michael Mosley

২) The truth about exercise – Michael Mosley

আয়েশার (রা) গুজব – যেভাবে অপবাদকে মোকাবিলা করতে হয়

caravan (5)

দীর্ঘ ১ মাস ধরে জ্বরে ভুগেছেন আয়েশা(রা)। মুরাইসি থেকে ফেরার পর থেকেই গা গরম, সেই গা গরম ভয়াবহ জ্বরে রূপ নিল। এমন জ্বর যে বিছানা ছেড়ে উঠার জো নেই। ১ মাস পর একটু সুস্থ বোধ করছেন, তাই বাইরে বেরিয়েছেন তার ফুপু মিসতার মা’র সাথে। আয়েশার এদিকে জানাই নেই যে তাকে আর তরুণ সাহাবী সাফওয়ানকে ঘিরে এর মধ্যেই পুরো মদীনায় গুজব ছড়িয়েছে মুনাফিকেরা, গুজবের প্রধান ভূমিকায় ছিল প্রভাবশালী নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। মুনাফিকদের গুজব-প্রচারণা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিলো যে ৩ জন সাহাবা পর্যন্ত পরোক্ষভাবে এই গুজবে অংশ নিয়েছিলো, আর মিসতাহ ছিলো তাদের একজন।

১.

চলার পথে মিসতার মাকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল। আয়েশা(রা)ও তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। এ সময় অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে পথের মধ্যে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেলেন মিসতার মা। আর তার মনের কথা মুখ ফসকে বেরিয়ে আসলো। বলে উঠলেন – “চুলোয় যাক মিসতাহ!”। সাথে সাথে আয়েশা প্রতিবাদ জানালেন – “একি বলছেন ফুপু! যে ছেলে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে আপনি তাকে অভিশাপ দিচ্ছেন?”

“ভাগ্নী, তুমি কি জানো না মিসতা কি বলেছে?”

আয়েশা গুজবের কথা বিন্দুমাত্র জানতেন না। মিসতার মা’র মুখে ঘটনার বিস্তারিত শুনে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল – ছি! মানুষের চিন্তা-ভাবনা এত খারাপ হতে পারে!

>> লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো – মিসতার মা যেই মাত্র মিসতাহ সম্বন্ধে খারাপ কিছু বলেছেন সেই মাত্র আয়েশা(রা) তার প্রতিবাদ জানিয়ে উলটো মিসতা’র প্রশংসা করেছেন। আমাদের সামনে কেউ যখন অন্য কারো গীবত করে তখন আমরা খুশীতে গদগদ হয়ে আরো দ্বিগুণ গীবত করি। আর এই হলেন আয়েশা(রা), এমন কি মায়ের মুখে পুত্রের গীবতকেও বরদাস্ত করলেন না, সাথে সাথে সেই পুত্রের গুণ মায়ের সামনে তুলে ধরলেন।

২.

কথার বিষ মারাত্মক জিনিস। এই বিষ রাসূলুল্লাহ(সা) কে পর্যন্ত বিমর্ষ করে দিল। আমরা যখন মানসিকভাবে দুর্বল বোধ করি, তখন কাছের মানুষের সাথে পরামর্শ করি, তাদের মুখে পজিটিভ কথা শুনলে আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই। রাসূলুল্লাহ(সা) আলী(রা) কে ডাকলেন আয়েশা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন বলে। আলী(রা) বললেন – আয়েশার কাজের মেয়ে বারিরা আয়েশা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে, কাজেই বারিরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন।

বারিরাকে ডাকা হলো। রাসূলুল্লাহ(সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন – “বারিরা, তুমি কি আয়েশার মধ্যে খারাপ কিছু কখনো দেখেছ?”

স্বয়ং রাসূলুল্লাহ(সা) জিজ্ঞেস করছেন তার মনীব সম্পর্কে! এক বিন্দু তো মিথ্যা বলা যাবে না – সরাসরি আল্লাহর তরফ থেকে শাস্তি চলে আসবে। আয়েশার মধ্যে কি খারাপ দেখেছে বারিরা? অনেক বড় কিছু? বারিরা বললো –“আটা মথতে যেয়ে আয়েশা অনেক সময় দুর্বল হয়ে ঘুমিয়েই পড়ে, আর ছাগল এসে তখন আটা খেয়ে ফেলে। এটাই আয়েশার সবচেয়ে খারাপ দিক”!

>> কি? এটা সবচেয়ে খারাপ দিক? আমাদের কাজের লোক তো দূরে থাক – স্বামী / স্ত্রী, বস, কলিগ, বন্ধুদের কে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে – বলো তো ওর মধ্যে কখনো খারাপ কিছু দেখেছ কিনা – আমাদের খারাপ কাজের লিস্ট মনে হয় সারাদিন বললেও শেষ করা যাবে না। আর এই হলেন আয়েশা(রা) – যার সম্পর্কে তার কাজের মেয়ে পর্যন্ত একটা খারাপ কিছু বলতে পারলো না, খারাপ বলতে যেয়ে বরং বুঝিয়ে দিল আয়েশা(রা) কতটা পরিশ্রমী ছিলেন!

৩.

এত অভিযোগের মুখে আয়েশা(রা) কি করেছিলেন? প্রতিবাদে মুখর হয়ে গিয়েছিলেন? চীৎকার-চেঁচামেচি করেছিলেন? মুনাফিকদের বদনাম শুরু করেছিলেন? মুনাফিকদের ঘাড় ধরে মদীনা থেকে বের করে দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ(সা) এর উপর চাপ দিয়েছিলেন? না, এগুলোর কিছুই তিনি করেননি, কিছুই না, শুধুই ধৈর্য্য ধরে ছিলেন। মানুষের কাছে তিনি কোন বিচার চাননি, তিনি পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন আর সূরা ইউসুফের নিচের আয়াতটি উচ্চারণ করেছিলেন:

আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে এনেছিল ইয়াকুব বললেন, “না, বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে কাজেই আমিসাবরুন জামিলগ্রহণ করবো আর তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল””(সূরা ইউসুফ ১২:১৮)

>>‘সাবরুন জামিল’ বা ‘অপরূপ ধৈর্য্য’ এর অর্থ হলো যে ধৈর্য্যে মানুষের কাছে অভিযোগ না করে শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া হয়। আমাদের জীবনে আমাদের উপর অনেক অন্যায় হয়, অত্যাচার হয়, অনেকে আমাদের বদনাম করে – তখন সবসময় তার প্রতিবাদ জানাতে নেই, অনেক সময় প্রতিবাদ জানিয়ে লাভও হয় না। তার চাইতে ‘অপরূপ ধৈর্য্য’ ধারণ করে নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করলে, একটা সময় আসে যখন সেই ক্ষত ঠিকই সেরে যায় – আমাদের সবার জীবনেই এরকম অভিজ্ঞতা আছে।

‘‘অপরূপ ধৈর্য্য’ এর কারণে আয়েশা (রা) আল্লাহর তরফ থেকে কি পুরষ্কার পেয়েছিলেন? আয়েশার সম্মানে আল্লাহ্‌ সূরা নূর নাজিল করেছিলেন যা আমরা আজ পর্যন্ত তেলাওয়াত করি। এই সূরার ১১ থেকে ২০ নং আয়াতে আল্লাহ্‌ সরাসরি জানিয়ে দেন যে আয়েশা(রা) নিষ্পাপ। এর চাইতে বড় পুরষ্কার আর কি হতে পারে?

যারা মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছে তারা তো তোমাদেরই একটা দল এই অপবাদকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে কোরো না, বরং এতো তোমাদের জন্য কল্যাণকর ওদের প্রত্যেকের জন্য নিজ নিজ পাপকাজের প্রতিফল আছে আর ওদের মধ্যে যে ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য আছে মহাশাস্তি (সূরা নূর ২৪:১১)

 

(আয়েশা(রা) এর অপবাদের ঘটনাটি বুখারী ও মুসলিম দুই গ্রন্থেই আছে। একে ইফকের ঘটনা বলে।)

পর্ণগ্রাফি আসক্তি: ভয়াবহতা ও মুক্তির উপায়

porn1

(আমি অনেক সময় তরুনদের থেকে মেসেজ / ই-মেইল পাই। তারা বলে, ভাইয়া আমি কিছুতেই পর্ণগ্রাফি দেখা ছাড়তে পারছি না, আপনার ইসলাম-বিষয়ক লেখাগুলো পড়তে খুব ভালো লাগে, দয়া করে এই বিষয়ে কিছু লিখেন। এই লেখাটি তাদের জন্য উৎসর্গ করা হলো।)

মানুষকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত করার জন্য শয়তানের অন্যতম অস্ত্র হলো নগ্নতা। আমাদের আদি পিতা-মাতা আদম(আ) ও হাওয়া(আ) শয়তান জান্নাত থেকে বের করার আগে নগ্ন করে ছেড়েছিল। আল্লাহ্‌ বলেন:

হে আদমসন্তান। শয়তান যেন তোমাদের কিছুতেই প্রলুব্ধ না করে – যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল – সে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখাবার জন্য বিবস্ত্র করেছিল … (সূরা আ’রাফ ৭:২৭)

মানুষকে নগ্ন করে বিপথে নেয়ার শয়তানের সেই চক্রান্ত শেষ হয়নি, বরং যুগের পর যুগ ধরে বেড়েই গেছে। আর বর্তমানযুগে শয়তানের এই শয়তানি চরম মাত্রা লাভ করেছে ইন্টারনেট পর্ণগ্রাফির কারণে।

যে কারণে পর্ণ আপনার দেখা উচিত নয়

পর্ণগ্রাফি মানুষকে মানষিক ও শারিরীকভাবে ভারসাম্যহীণ করে দেয়। নিচে পর্ণগ্রাফির  ৬টি ভয়াবহ ক্ষতিকর পরিণতি তুলে ধরা হলো। নেক্সট টাইম যখন আপনার পর্ণ ফিল্ম দেখতে ইচ্ছে করবে, এই কথাগুলো নিজেকে মনে করিয়ে দিবেন।

) পর্ণগ্রাফি আপনাকে ভালবাসার বিকৃত সংজ্ঞা শেখায়: আপনি যখন পর্ণ মুভি দেখেন তখন আপনি নিজের অজান্তেই অনুভূতিহীন, নিষ্ঠুর, স্বার্থপর মানুষে পরিণত হন। কারণ, পর্ণ মুভিগুলোতে মানুষের ভালো-লাগা, ভালোবাসা, দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ কোন অনুভূতিকেই দেখানো হয় না, শুধু দেখানো হয় “পেনেট্রেশন”। অথচ বাস্তব জীবনে আপনি আপনার সঙ্গীকে আদর-সোহাগ করবেন, গল্প-গুজব করবেন, আড্ডা মারবেন, ঘুরতে যাবেন – এগুলো সবই একটা সুস্থ ভালবাসাময় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পর্ন মুভি আপনার হৃদয় থেকে ভালোবাসার সেই অনুভূতিকে কেড়ে নেয়, নষ্ট করে দেয়। পর্ণ মুভি আপনাকে এভাবে প্রোগ্রাম করে ফেলে যে আপনি বিশ্বাস করা শুরু করেন যে ভালবাসার অপর নাম পেনেট্রেশন। আমেরিকায় এক জরিপে দেখা গেছে ডিভোর্স হওয়া দম্পতিদের ৫৬% ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর একজন পর্ণ আসক্ত।

অনেক তরুণ মনে করে – “এখন তো আমার বয়স কম, এখনো বিয়ে করিনি, এখন পর্ণ দেখি, বিয়ের পর আমি এগুলো দেখা ছেড়ে দিব”। কিন্তু, পরিসংখ্যান বলে ভিন্ন কথা – দেখা গেছে তরুন বয়সে পর্ণ দেখা যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়, বিয়ের পরেও তাদের বেশীরভাগই পর্ণ দেখা ছাড়তে পারে না। কাজেই – আমি এখনো বিয়ে করিনি, তাই পর্ণ দেখব – এটা পর্ণ দেখার জন্য কোনও অজুহাত হতে পারে না।

)পর্ণ আপনার মানবিক অনুভূতিকে নষ্ট করে ফেলে: পর্ণ আপনাকে শেখায় মেয়েরা মানুষ নয়, শুধুই উপভোগের বস্তু। পর্ণ দেখার ফলে আপনি রাস্তা-ঘাটে, অফিসে-বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনই কোন মেয়েকে দেখেন তখন চিন্তা করেন না তারও একটা জীবন আছে, আশা-আকাংক্ষা আছে, দু:খ-কষ্ট-আনন্দ-ভালোবাসার অনুভূতি আছে, আপনি শুধু চিন্তা করতে থাকেন এই মেয়েটার মধ্যে উপভোগ করার মত কি আছে। একটা মেয়ে রাস্তায় পা পিছলে পড়ে গেলে আপনি চিন্তা করেন না মেয়েটা ব্যাথা পেয়েছে কি না, তাকে উদ্ধার করা যায় কি না, বরং আপনি চিন্তা করেন তার শরীরের কোনও অংশ উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে দেখা যায় কি না।একটি মেয়েকে তার সততা, মেধা ও মানবিক গুণাবলী দিয়ে বিচার না করে আপনি তাকে বিচার করেন তার শরীরের বিশেষ কিছু স্থানের আকার-আকৃতি দিয়ে। পর্ণ মুভি আপনাকে শেখায় যে ক্লাসের বন্ধু, অফিসের কলিগ থেকে শুরু করে সবার সাথেই শারিরীক সম্পর্ক গড়া যায় – এভাবে পর্ণ আপনাকে অবৈধ সম্পর্ক গড়তে উৎসাহিত করে। আমেরিকায় এক জরিপে দেখা গেছে যে গড়ে ৬৮% বিবাহ বিচ্ছেদ হয় অনলাইন পরকিয়ার কারণে।

৩) পর্ণ আপনার স্মরনশক্তি কমায়, আপনার মধ্যে ডিপ্রেশন তৈরী করে: ইসলামের স্কলারেরা সেই প্রথম থেকেই বলে আসছেন – আল্লাহ্‌ যা দেখতে নিষেধ করেছেন তার দিকে তাকালে স্মরনশক্তি, চিন্তাশক্তি কমে যায়। একবার ইমাম শাফেঈ কোরআনের কিছু আয়াত ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি তার উস্তাদ ইমাম মালিককে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন – “তুমি হয়তো হারাম কিছু দেখেছ। তাই আল্লাহ তোমার থেকে জ্ঞান তুলে নিয়েছেন”। ইমাম শাফেঈ প্রথমে কিছুতেই মনে করতে পারছিলেন না তিনি কার দিকে হারাম দৃষ্টি দিয়েছিলেন। পরে বুঝতে পারলেন – আজকে যখন বাজারে গিয়েছিলেন তখন এক মহিলাকে তার বাহন থেকে নামতে দেখেছিলেন। যখন সে নামছিলো তখন তার পায়ের গোড়ালির উপরে একটু কাপড় উঠেছিল, আর সেটার দিকে ইমাম শাফেঈর চোখ পড়ে গিয়েছিল। সাথে সাথে ইমাম শাফেঈ আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন, নিজের পাপের জন্য আকুতি-মিনতি করলেন। আর এর পরেই আল্লাহ্‌ তাকে ভুলে যাওয়া কোরআনের আয়াতগুলো ফিরিয়ে দিলেন।

মনোবিজ্ঞানীরাও গবেষনায় দেখেছেন যে পর্ণ মানুষের স্মরনশক্তি কমিয়ে দেয়, চিন্তাশক্তি হ্রাস করে, অমনোযোগী করে, ডিপ্রেসড করে দেয় এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। জার্মানির ডুইবার্গ-এসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডক্টর ক্রিস্টিয়ান লেয়ের ২৬ বছর বয়সী ২৮জন মানুষের উপর পর্ণ ছবি দেখার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন [১৩]। তিনি গবেষনায় পেয়েছেন – পর্ণ দেখার শর্ট-টার্ম ইফেক্ট হিসাবে এদের স্মৃতিশক্তি কমেছে এবং মনোযোগী হবার ক্ষমতা কমেছে। এছাড়া অন্য গবেষনায় পর্ণ দেখার লং-টার্ম ইফেক্ট হিসাবে ডিপ্রেশন, সামাজিকভাবে ব্যর্থতা ও একাকিত্ব থাকার প্রবণতা পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

৪) পর্ণ আপনাকে অক্ষম করে দিতে পারে: গবেষনায় দেখা গেছে যে অতিরিক্ত পর্ন ভিডিও দেখলে আপনার উত্তেজিত হওয়ার ক্ষমতা লোপ পেতে পারে। এর কারণ হলো – আজকালকার পর্ণ গুলো ধারণ করা হয় হাই ডেফিনিশন ক্যামেরায়, এইসব ক্যামেরায় মেয়েদের শরীরকে এত নিঁখুতভাবে ও জুম করে দেখানো হয় যে বাস্তবে আপনার সংগীকে আপনি এভাবে দেখতে পারবেন না, ফলে সহজে উত্তেজিত হবেন না। শুধু তাই নয়, প্রত্যেকটা পর্ণ মুভি আপনার সামনে নিয়ে আসে নতুন নতুন পর্ণ মডেল, নতুন নতুন লোকেশন আর নতুন নতুন কাহিনী। আপনার ব্রেইন ক্রমেই এই নতুনত্বে অভ্যস্ত হয়ে যায়, পুরনো কিছু তখন আর আপনাকে সহজে উত্তেজিত করতে পারে না। এর ফলে, এরকম ঘটতে পারে যে আপনি কিছুতেই আর আপনার স্ত্রীকে দেখে উত্তেজিত হবেন না। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই অক্ষমতা এমন আকার ধারণ করে যে তারা শুধু পর্ণ মুভি দেখেই উত্তেজিত হতে পারে, এমন কি ভায়াগ্রার মতো শক্তিশালী ওষুধেও তাদের কোন কাজ হয় না। এই সমস্যাকে ইরেক্টাইল ডিস্ফাংশন বলে এবং গবেষনায় দেখা গেছে যারা কিশোর বয়সে পর্ণ দেখা শুরু করে (বিশেষ করে ১২ বছর বয়সের পূর্বে) তাদের মধ্যে এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট।

তবে আশার কথা এই যে, ইরেক্টাইল ডিসফাংশনে আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে আবার সক্ষম হওয়া সম্ভব। গবেষনায় দেখা গেছে কোনও ব্যক্তি টানা তিন মাস পর্ণ মুভি না দেখলে ও স্বমেহন না করলে তার ব্রেইন আবার আগের প্যাটার্নে ফিরে আসে, ফলে সে ডিজিটাল মিডিয়ার বাইরে মেয়েদেরকে দেখেও উত্তেজিত হতে পারে। ভেবে দেখুন – ব্রেইনের এই নিজে নিজে সেরে উঠার ক্ষমতা আল্লাহর তরফ থেকে কত বড় রহমত! আপনি বছরের পর বছর তাঁর অবাধ্যতা করার পরেও মাত্র তিন মাস নিজেকে সংযত রাখলে আল্লাহ্‌ আবার আপনাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিবেন।

) আপনি যখন পর্ণ দেখেন, আপনি প্রস্টিটিউট তৈরী করেন: আপনি কি মনে করেন যারা পর্ণ মডেল হয়েছে তারা সবাই নিজের ইচ্ছাতেই পর্ণ মুভিতে এসেছে? মোটেই না। এদের অনেককেই লোভনীয় চাকুরী, ফ্রি-ট্যুর সহ বিভিন্ন মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে শুটিং স্পটে নিয়ে আসা হয়। তারপর অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে, রঙ্গিন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে পর্ণ মুভিতে অভিনয় করানো হয়। আমেরিকাতে সাধারণ কাজে ঘণ্টায় যত টাকা পাওয়া যায়, পর্ণ মুভির জন্য প্রতি ঘন্টায় তার ২০গুণ টাকা দেয়া হয়। টাকার লোভে পড়ে কলেজ-ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েরা পর্ণ মুভিতে নাম লেখায়, আর এভাবে করেই প্রস্টিটিউট হয়ে যায়।

মানুষ নতুন নতুন পর্ণ মডেল দেখতে পছন্দ করে। আর তাই পর্ণ মুভির প্রডিউসাররাও নিত্য-নতুন প্রলোভন দেখিয়ে নতুন নতুন মেয়েদেরকে প্রস্টিটিউশনের জগতে নিয়ে আসে। আপনি যে মেয়েটাকে পর্ণ-মুভিতে  হাসতে দেখছেন, আনন্দে-উচ্ছ্বাসে ডুবে যেতে দেখছেন – কম্পিউটার বন্ধ করে দিলেই আপনার তাকে দেখতে হয় না, কিন্তু আপনার সামনে সে যাতে পরের মুভিতেও আসতে পারে তার জন্য কিন্তু তাকে প্রস্টিটিউট হিসাবেই থেকে যেতে হয়। আপনি আপনার কম্পিউটারের সামনে বসে নিত্য-নতুন পর্ণ মডেল দেখার জন্য যে ক্লিক করছেন, সে ক্লিকের ডিমান্ড মেটানোর জন্য পর্ণ মুভির প্রডিউসারকে ক্রমাগত নতুন নতুন মেয়ে জোগাড় করে সাপ্লাই দিয়ে যেতে হচ্ছে। এভাবে করে, আপাত:দৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হওয়া এই ক্লিকের কারণেই বিশ্বজুড়ে পর্ণ ব্যবসার পালে হাওয়া লাগছে, আর এর সূত্র ধরে নতুন নতুন মেয়ে প্রতিদিন প্রস্টিটিউট হয়ে উঠছে।

আর যে সব পর্ণ মুভি গোপনে ধারণ করা হয়, এগুলো যে কত মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে, কত মেয়ে এগুলোর জন্য আত্মহত্যা করেছে – তার ইয়ত্তা নেই। ভেবে দেখুন – কেউ যদি গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও না দেখত, তাহলে কেউ এগুলো বানাতোও না, ফলে এই ভিডিওগুলোর জন্য কোনও মেয়ের জীবনও নষ্ট হতো না।

) সব কিছু আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে: মনে রাখবেন, আপনি একা ঘরে কম্পিউটারের সামনে বসে যা করছেন তা আর কেউ না দেখলেও আল্লাহ্‌ দেখছেন, আর ফেরেশতারা তা লিখে রাখছে এক পরিষ্কার গ্রন্থে। আল্লাহ্‌ যদি এখনো আপনার কুকর্ম মানুষের সামনে প্রকাশ না করে দিয়ে থাকেন – তাহলে বুঝবেন আপনাকে আল্লাহ্‌ তাওবাহ করার জন্য সুযোগ দিচ্ছেন। আপনি যদি তাওবাহ না করে মারা যান, তাহলে এই গ্রন্থের সবকিছু একদিন আপনার সামনে তুলে ধরা হবে, আপনার মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান, বন্ধু সবাই আপনার আমলনামা দেখতে পাবে। নিজেকে প্রশ্ন করুন – সেদিনের সেই লজ্জার সম্মুখীন কি আপনি হতে পারবেন?

lower your gaze

পর্ণ-আসক্তি থেকে মুক্তির উপায়

এতক্ষণ বললাম পর্ণগ্রাফির খারাপ পরিণতি সম্পর্কে। আর এবার পর্ণ আসক্তি ছাড়ানোর জন্য ৪টি মাত্র টিপস দিচ্ছি:

ডিজিটাল মিডিয়ার কোনো মেয়ের দিকে তাকাবেন না: আপনি কম্পিউটারে যে পর্ণস্টারদের দেখেন, বা টিভিতে যে মডেল আর ফিল্মস্টারদের দেখেন – এরা সবাই হাজার হাজার ডলার এর সার্জারী করে, মেকাপ করে, স্পেশালিষ্ট এর অধীনে ব্যায়াম করে, মেকআপ করে তাদের শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিকে চকচকে করে তোলে মানুষের চোখে নিজেকে আকর্ষণীয়, আবেদনময়ী করে তুলতে। তার উপর আছে হাই-ডেফিনেশন ক্যামেরা, ফটোশপ আর অত্যাধুনিক ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার এর কারসাজী। এর ফলে আপনি কম্পিউটারে, টিভিতে, ফ্যাশন ম্যাগাজিনে যে মেয়েদেরকে দেখেন তারা নিঁখুত, পার্ফেক্ট। এমনকি আপনি চাইলে মিনিটির পর মিনিট, ঘন্টার পর ঘণ্টা ধরে এই পার্ফেক্ট ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন – বাধা দেয়ারও কেউ নেই। কিন্তু, বাস্তব জীবনের কোন মানুষই এরকম পার্ফেক্ট হয় না আর এরকম পিক্সেল বাই পিক্সেল জুম করে দেখাও যায় না। তাই, ডিজিটাল মিডিয়া আর বাস্তবতা এক নয়।

আপনি যতই আবেদনময়ী মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, ততই আপনার শরীরে ডোপেমিন নামক হরমন নিঃসৃত হয়। এই হরমন একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে নি:সৃত হলে আপনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। আপনি যখন নিত্য-নতুন সুন্দর মেয়ে দেখতে থাকেন তখন আপনার আপনার শরীর নিজেকে এমনভাবে এডজাস্ট করে নেয় যাতে পরেরবার উত্তেজিত হতে আপনার আরো বেশী ডোপেমিন এর প্রয়োজন হয়, কারণ না হলে তো আপনি খুব সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়বেন। এমনকি আপনি যখন টিভিতে কোন আবেদনময়ী মডেলের এড দেখেন, বা ফেইসবুকে আপনার সুন্দরী বান্ধবীর ছবি দেখেন – তখনো আপনার ডোপেমিন নিঃসৃত হয়। ডিজিটাল মিডিয়ার মেয়েদেরকে আপনি যতই দেখবেন – বাস্তব জগতের একটি মেয়েকে বা আপনার স্ত্রীকে দেখে আপনার উত্তেজিত হওয়ার ক্ষমতা ততই নষ্ট হতে থাকবে। আর তাই – ডিজিটাল মিডিয়ার মেয়েদের দিকে যত কম সম্ভব তাকান।

) যদি তাকাতেই হয় তো চেহারার দিকে তাকান: মেয়েদের দিকে যদি একেবারেই না তাকানো যায় তো সবচেয়ে ভালো। কিন্তু, বাস্তবতা হলো আমরা এখন যে জগতে বাস করি তাতে মেয়েদের দিকে না তাকিয়ে, তাদের সাথে মেলা-মেশা না করে চলা যায় না। বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে আপনাকে খবর দেখতে হবে – খবর উপস্থাপন করে মেয়েরা,  আবার কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে পড়াশুনা করতে হয়, অফিসেও মেয়ে কলিগ থাকে, অনেক সময় নতুন ভালো মুভিও দেখতে ইচ্ছা করে, তাতেও নারী আছে – এমন অবস্থায় করণীয় কি? সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যেতে হবে? না, এভাবে জীবন চলবে না। যেটা করবেন সেটা হলো – যখনই কোন মেয়ের দিকে তাকানোর প্রয়োজন পড়বে তখন সরাসরি তার চেহারার দিকে তাকাবেন, শরীরের অন্য কোনো বিশেষ অংশের দিকে নয়। আর তাকানোর সময় নিজের নিয়তের দিকে লক্ষ্য রাখবেন, কিছুতেই যেন কোন শারিরীক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তার দিকে না তাকান, দুঃখ-কষ্ট-রাগ-ভালোবাসার অনুভূতিসম্পন্ন একজন মানুষের সাথে কথা বলছেন এভাবে তাকান।

আপনার মায়ের সাথে, স্ত্রীর সাথে, বোনের সাথে বা মেয়ের সাথে একজন বাইরের মানুষ যখন কথা বলে তখন আপনি তার থেকে যেরকম সুন্দর-শোভন-সাবলীল-সম্মানজনক আচরণ প্রত্যাশা করেন, তার চোখ যেখানে থাকবে বলে আপনি আশা রাখেন, অন্য একটা মেয়ের ক্ষেত্রে নিজের চোখটিও সেইভাবে নিয়ন্ত্রন করুন। মনে রাখবেন, আপনি যখন একটা মেয়ের দিকে তার অজান্তে কামনার দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছেন, আপনি তার অধিকার লঙ্ঘন করছেন।

) কিছুতেই নামাজ ছাড়বেন না:  সবচাইতে গুরুত্বপূর্ন উপদেশ – কিছুতেই ১টি ওয়াক্তেরও নামাজ ছাড়বেন না। আর আপনি যদি নামাজী না হয়ে থাকেন – তো আজ থেকেই ৫ ওয়াক্ত নামাজ শুরু করে দিন। কারণ, আল্লাহ্‌ বলেছেন – “নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অশ্লীল কাজ ও পাপাচার থেকে দূরে রাখে” (সূরা আনকাবুত ২৯:৪৫)। এক ঘরে যেমন একইভাবে আলো আর অন্ধকার থাকে না, তেমনি একই হৃদয়ে একইসাথে নামাজ আর পর্ণগ্রাফি থাকতে পারবে না। একবার সাহাবারা রাসূলুল্লাহ(সা) কে বললো – অমুক সাহাবী বিভিন্ন ধরনের খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ(সা) জিজ্ঞেস করলেন – সে কি এখনো নামাজ পড়ে? সবাই বললো – হ্যাঁ, পড়ে। রাসূলুল্লাহ(সা) বললেন – সে যদি নামাজ পড়তে থাকে তাহলে নামাজ তাকে অবশ্যই একদিন খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।

৪) নিয়মিতভাবে নফল রোজা রাখুন: রোজা হচ্ছে ঢালস্বরুপ, যা কিনা আমাদেরকে পাপ কাজ থেকে দূরে সরে থাকতে সাহায্য করে। আমরা যখন রোজা রাখি তখন আমাদের পাকস্থলী ক্ষুধার্ত থাকে, ক্ষুধার্ত পাকস্থলি শরীরকে দুর্বল করে দেয়, এর ফলে আমাদের কামনা-বাসনাগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তাই, কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন রামাদানের রোজার বাইরেও বেশী বেশী করে নফল রোজা রাখতে।

রোজা রাখার রুটিন কেমন হবে? এর জন্যও সুন্নাহতে বিভিন্ন গাইডলাইন দেয়া আছে [১৪]। সবচেয়ে সহজ হলো – প্রতি আরবী মাসের মাঝের তিন দিন (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রোজা রাখা, এর চেয়ে আরেকটু কঠিন হলো – প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বৃহষ্পতিবার রোজা রাখা, আর সবচেয়ে ভালো হলো দাউদ(আ) এর মতো রোজা রাখা – একদিন পর একদিন। এছাড়াও বছরের নিচের দিনগুলি রোজা রাখার জন্য বিশেষ বরকতময় –

  • রমজানের পরের মাস শাওয়াল মাসের ছয় রোজা। রমজানের পর এই রোজাগুলি রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সাওয়াব পাওয়া যায়।
  • আরাফাতের দিন বা যিলহজ্জ্ব মাসের ৯ তারিখের (অর্থাৎ ঈদুল আযহার আগের দিনের) রোজা – যা কিনা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।
  • যিলহজ্জ্ব মাসের প্রথম ১০ দিনের রোজা – যা কিনা আল্লাহর কাছে সবচাইতে প্রিয় নফল ইবাদত।
  • আশুরা বা মহররম মাসের ১০ তারিখের রোজা – যা কিনা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়। এর সাথে মহররমের ৯ তারিখে রোজা রাখতে পারলে আরো ভালো।     

শেষ কথা: মনে রাখবেন – আপনি যত পাপ করতে পারেন, আল্লাহ্‌ তার চেয়েও বেশী ক্ষমা করতে পারেন, আপনি যতবার পাপ করতে পারেন, আল্লাহ্‌ তার চাইতেও বেশী বার আপনাকে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু শর্ত হলো আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হোন – আর কোনোদিন পর্ণ দেখবেন না। যদি শয়তানের ফাঁদে পড়ে কখনো দেখে ফেলেন তো সাথে সাথে গোসল করে দুই রাকআত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে তাওবাহ করে নিন, দেরী করবেন না। তারপর দ্বিগুন দৃঢ়তা নিয়ে প্রতিজ্ঞা করুন – আর কোনদিন পর্ণ দেখবেন না, আপনি আর শয়তানের দাস হবেন না, শয়তান বরং আপনার দাস হবে। কিছুতেই হাল ছাড়বেন না, কিছুতেই না, শয়তান তার শয়তানীতে হাল ছাড়েনি, আপনিও আপনার ঈমানদারীতে হাল ছাড়বেন না। শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোই সফলতা নয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর যাত্রাটাও সফলতা।

মহান আল্লাহ্‌ বলেন:

(জান্নাত প্রস্তুত রাখা হয়েছে তাদের জন্য) যারা কোনও অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবে? (সূরা আলে-ইমরান ৩:১৩৫)

তথ্যসুত্র ও প্রাসঙ্গিক পাঠ্য:

  1. NoFap.com – An online community to fight against porn addiction
  2. GuyStuffCounseling.com
  3. Statistics about porn: http://www.covenanteyes.com/pornstats/
  4. Why I stopped watching porn – Ran Gavrieli
  5. Basics of Rebooting
  6. Growing up in a pornified culture – Gail Dines
  7. The Connection Between Human Trafficking & Porn
  8. Advise to pornography addicts – Shaykh Yasir Qadhi
  9. Islam on pornography – Abdul Malik Mujahid
  10. Advice for those who watch porn videos – Sheikh Muhammad Mukhtar Ash-Shinqitee
  11. What is the Islamic ruling on masturbation? – Shaykh Salman al Aoudah
  12. What is the Islamic ruling on masturbation? – OnIslam.net
  13. Why online porn make you forget – LiveScience
  14. Voluntary fasting and its merits – islamway.net

রাগ নিয়ন্ত্রণ

angry-kids

এক মূহুর্তের রাগ, সারা জীবনের কান্না। আল্লাহ্ ﷻ বলেছেন – “তোমরা রাগকে গিলে ফেলো” (সূরা আলে ইমরান:১৩৪)। রাগ যদি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় তাহলে রাগের মাথায় আমরা এমন কিছু করে বসতে পারি, বা বলে বসতে পারি যার জন্য আজীবন অনুশোচনা করতে হবে। রাগ-নিয়ন্ত্রণ তাই অতীব গুরুত্বপূর্ন একটি স্কিল।

এই লেখায় আমি রাগ-সংক্রান্ত ৪টি হাদিস শেয়ার করব, এই চারটি হাদিস থেকে দেখব কেউ যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে রাগিয়ে দেয়ার মতো আচরণ করতেন, তখন তিনি ﷺ কিভাবে তা হ্যান্ডল করতেন।

১) আনাস(রা) ছিলেন ৭-৮ বছরের ছোট্ট একটা ছেলে। আনাস(রা) এর মা, আনাস(রা)কে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে গিফট করেছিলেন তাঁর সেবা করার জন্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিভিন্ন ছোট-খাটো কাজ করে দিতেন আনাস(রা); যতটা না কাজ করতেন তারচেয়ে বেশী দুষ্টামীই করতেন! একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আনাসকে (রা) একটা কাজে বাইরে পাঠালেন। যাওয়ার পথে রাস্তার মধ্যে আনাস(রা) কিছু ছেলেকে দেখলেন তারা খেলা করছে। তাদেরকে দেখে কাজের কথা ভুলে ছোট্ট আনাসও (রা) খেলায় মজে গেলেন। খেলার ঘোরে কতক্ষণ কেটে গেছে আনাসেরও আর খেয়াল নাই, এমনি এক সময় আনাস(রা) হঠাৎ ফিল করলেন বিশাল সাইজের কোন এক খেলোয়াড় তাকে পেছন থেকে ঘাড় চেপে ধরেছে! আনাস(রা) মাথা ঘুরিয়ে দেখেন – একি! এ যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ এক মুখ হাসি নিয়ে উপস্থিত!

রাসূলুল্লাহ ﷺ আনাস(রা)কে জরুরী কোন কাজেই কিন্তু পাঠিয়েছিলেন। অনেক সময় পার হওয়ার পরেও আনাস(রা) যখন ফিরলেন না, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্য রেগে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তিনি আনাস(রা) এর উপর তো রাগলেনই না, বরং প্র্যাক্টিকাল জোক করলেন!

আমাদের সাথে যখন রেগে যাওয়ার মতো কিছু ঘটে, তখন লক্ষ্য করলে আমরা দেখব ঘটনাটার একটা হিউমেরাস দিকও আছে। আমাদের উচিত হবে ঘটনার রাগের অংশটি উপেক্ষা করে হিউমেরাস অংশটির দিকে মনযোগ দেয়া।

টিপস#১: রাগকে হিউমার দিয়ে পরিবর্তন করুন।

২) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীদের মধ্যে আয়েশা(রা) খুব ভালো রান্না করতে পারতেন না। রান্নার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন সাফিয়াহ(রা) ও উম্মে সালামাহ(রা)। একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন অন্য সাহাবাদের নিয়ে আয়েশার(রা) ঘরে বসে আলাপ করছিলেন, তখন উম্মে সালামাহ(রা) তাঁর রান্না করা খাবার নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। এতে আয়েশা (রা) ভীষণ জেলাস ফিল করলেন! ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে – আমার রান্না কি এতই খারাপ যে অন্য ঘর থেকে খাবার আনতে হবে? আয়েশা(রা) রেগে গিয়ে এক বাড়িতে খাবারের প্লেটটাই ভেঙ্গে ফেললেন!

ভেবে দেখুন, অতিথির সামনে আপনার স্ত্রী যদি এমন আচরণ করে বসে তো আপনি কি করবেন? একটু হলেও হয়তো “উফ” বলে উঠবেন। অন্তত এটুকু হয়তো বলে উঠবেন – “একি! এটা কি করলে তুমি?” রাসূলুল্লাহ ﷺ সেরকম কিছু বললেন না। ভেঙে যাওয়া প্লেট এর টুকরোগুলো কুড়াতে কুড়াতে বাকী সাহাবাদেরকে বললেন – “তোমরা তোমাদের খাবার খেয়ে নাও”। তারপর তিনি ﷺ বাকী সাহাবাদের সামনে আয়েশা(রা) কে প্রোটেক্ট করার সুরে বললেন “তোমাদের মা জেলাস ফিল করেছেন।” রাসূলুল্লাহ ﷺ এমনভাবে কথাটা বললেন যে – এটাতো কোন ব্যাপারই না, সব মানুষই তো কম-বেশী জেলাস ফিল করে। শুধু তাই না – তিনি সাহাবাদের মনে করিয়ে দিতে চাইলেন আয়েশা(রা) এর মর্যাদা, তাই তিনি আয়েশা(রা) কে নাম ধরে না ডেকে “তোমাদের মা” বলে সম্বোধন করেছেন ।

টিপস#২: কেউ রেগে গেলে তার প্রতি পাল্টা রাগ না করে তাকে প্রোটেক্ট করুন।

৩) একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখলেন এক মহিলা কবরের সামনে বেজায় কান্নাকাটি করছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন – “আল্লাহকে ﷻ ভয় করো এবং ধৈর্য্য ধরো।” মহিলা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে চিনতে না পেরে রেগে-মেগে বলে উঠলো – “যান এখান থেকে! আমার মত বিপদ তো আর আপনার হয়নি!” জবাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ রেগে গেলেন না, তাকে আরেকবার বুঝানোর চেষ্টাও করলেন না, বললেন না – “আমি হলাম আল্লাহ্র ﷻ রাসূল, আর আমার মুখে মুখে কথা!”, অথবা বললেন না- “আমি বললাম ভালো কথা আর তুমি কি না আমার সাথে এমন ব্যবহার করলে!” না, তিনি এরকম কিছুই করলেন না। তিনি চুপচাপ কিছু না বলে সেই স্থান থেকে চলে গেলেন।

টিপস#৩: রেগে থাকা মানুষকে বুঝাতে যাবেন না, সে বুঝবে না। তাকে শান্ত হওয়ার জন্য সময় দিন।

৪) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি তর্ক করা ছেড়ে দিবে, সে যদি ভুলের পক্ষেও হয় তবুও সে জান্নাতের প্রান্তে বাড়ী পাবে। আর যে ব্যক্তি সঠিক হওয়ার পরেও তর্ক ছেড়ে দিবে, সে জান্নাতের মাঝখানে বাড়ী পাবে। আর যে ব্যক্তি নিজের চরিত্রের উন্নয়ন করবে সে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে বাড়ী পাবে।”

ভেবে দেখুন – কি লাভ আরেকজনের সাথে তর্কাতর্কি করে, রাগারাগি করে, নিজের মেজাজ খারাপ করে, যুক্তির উপর যুক্তি তৈরী করে শুধুই এটা প্রমাণ করা যে “আমি সঠিক, তুমি ভুল”? এর মাধ্যমে না পাওয়ার যায় নিজের মনে শান্তি, না করা যায় অন্যের মন জয়। তারচেয়ে চুপ করে থেকে অন্যের ভুল উপেক্ষা করে নিজের জন্য জান্নাতে একটা বাড়ী নির্মান করা কি বুদ্ধিমানের কাজ না?

টিপস#৪: রাগ করার মত কারণ থাকা সত্ত্বেও তা ছেড়ে দিন, আর আল্লাহর ﷻ কাছে প্রতিদানের আশা রাখুন।

পাদটীকা:
১) ইসলামে ব্যক্তিগত কারণে রাগ করার অনুমতি নেই। তবে যেসব কারণে আল্লাহ্ ﷻ ও তাঁর রাসূল ﷺ রাগ করেছেন (যেমন – কাউকে শিরক করতে দেখলে) সে সব কারণে রাগ করা বৈধ। তবে, এই রাগের বহিঃপ্রকাশও নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।
২) লেখাটি পড়ে মনে করবেন না আমি রাগ-নিয়ন্ত্রনে মাষ্টার, বরং উল্টোটা সত্য। লেখাটি আমি লিখেছি সবচেয়ে বেশী নিজেকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য। এটা যদি অন্য কারো উপকারে আসে তো আলহামদুলিল্লাহ!

(রেফারেন্স: হাদিস১: মুসলিম ২৩১০ , হাদিস২: সুনান আন-নাসাঈ ৩৯৭৩, হাদিস৩: বুখারী ১২২৩, হাদিস৪: তিরমিযী)

সফল কে?

sucess

সাধারনভাবে যার অনেক টাকা-পয়সা আছে বা যে কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে খুব ভালো কিছু করে থাকে তাকে আমরা সফল বলি। কিন্তু, এমন হতে পারে আমরা যাকে সফল বলে মনে করি আল্লাহর কাছে সে চরমভাবে ব্যর্থ, আবার আমরা যাকে অসফল মনে করে থাকি সে আল্লাহর কাছে সফল। একজন বড় গায়ক, নায়ক বা খেলোয়াড় মানুষের বিচারে সফল হলেও আল্লাহর বিচারে অসফল হতে পারেন। আমাদের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বিচারে সফলতা অর্জন করা।

তাহলে আসুন দেখি কোরআনের আলোকে ‘সফল’ কে –

১) যে নিজের উপর শুদ্ধি অভিযান চালায় সে সফল:

“অত:পর (আল্লাহ) তাকে তার অসৎ কর্ম ও সৎ কর্মের জ্ঞান দান করেছেন। যে নিজেকে শুদ্ধ করে সেই সফল, যে নিজেকে কলুষিত করে সে ব্যর্থ”। – (৯১ সূরা আশ-শামস: ৮-১০)

যে সব রকম কাজে নিজেকে সব সময় ইমপ্রুভ করার চেষ্টা করে, ব্যবহারে ও সততায় প্রতিনিয়ত নিজের উন্নয়নের চেষ্টা করে, অন্যের ভুলের চেয়ে নিজের ভুল নিয়ে বেশী চিন্তা করে – সে সফল।

২) যে কৃপণতা করে না সে সফল:

“তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর, শুন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত তারাই সফলকাম”। (৬৪ সূরা তাগাবুন:১৬)

এই কৃপণতা আত্মিক ও পার্থিব দুই-ই হতে পারে। আত্মিক কৃপণতা হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের কৃপণতা, আর পার্থিব কৃপণতা হলো আল্লাহ যে নিয়ামত দিয়েছেন তা অন্যের সাথে শেয়ার না করা।

৩) যে ভালো কাজে সহায়তা করে, খারাপ কাজে বাধা দেয় সে সফল:

“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা দরকার যারা মানুষকে ভালোর দিকে আহবান করে এবং সৎ কাজের আদেশ করতে থাকে ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে থাকে, আর এরাই হবে সফলকাম”। (৩ সূরা আলে-ইমরান:১০৪)

৪) যারা জান্নাতী হবে তারা চূড়ান্তভাবে সফল:

“প্রত্যেক প্রাণকেই মরণের স্বাদ নিতে হবে। কিয়ামতের দিন তোমাদের কর্মফল পুরো করে দেয়া হবে। যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে যেতে দেওয়া হবে সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন তো ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। – আল কোরআন (৩ সুরা আলে-ইমরান:১৮৫)

কোরআন ও সুন্নাহর আদেশ-নিষেধ যে ব্যক্তি মেনে চলবে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে পরকালে জান্নাত দিয়ে বিশেষ অনুগ্রহ করবেন। এটা তার ত্যাগ, ধৈর্য্য ও আনুগত্যের পুরষ্কার।

পার্থিব সকল আনন্দ, সকল সফলতাই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জান্নাত হবে চিরস্থায়ী। আমাদের মা-বাবা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান তখন আমাদের মনে হয় ইশ! আম্মু-আব্বু যদি চিরদিন বেঁচে থাকতো! একইভাবে আমাদের নিজেদেরও কিন্তু পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে না। জান্নাতে যেয়ে মানুষ চিরকাল বসবাস করতে পারবে তার মা-বাবা, স্বামী/স্ত্রী, আর সন্তান-সন্তুতি নিয়ে (যদি তারাও জান্নাতী হয়)। জান্নাতীদের মনে কোনো কষ্ট থাকবে না, থাকবে না অপরিচ্ছন্ন কোনো কিছু। মানুষের অমরত্বের স্বভাবজাত ইচ্ছাসহ সকল ইচ্ছা যেখানে পূরণ হবে সেই জায়গাটিই হলো জান্নাত। আল্লাহ যাদেরকে চিরস্থায়ী সুখের সেই বাগান গিফট করবেন, তারাই চূড়ান্তভাবে সফল।