৩ – মহানবীর ﷺ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য

Beautiful-Quran-1153x768

প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ কে আল্লাহ্‌ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছিলেন যা তিনি সৃষ্টিজগতের আর কোন মানুষকে এমনকি অন্য কোন নবী-রাসূলকেও দেননি। ইসলামী পরিভাষায় এগুলোকে আল্লাহর রাসূলের “খাসাইস” (অনন্য বৈশিষ্ট্য) বলে। কোন কোন স্কলার কুরআন-হাদিস ঘেঁটে প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ  এর প্রায় ৫০টি অনন্য বৈশিষ্ট্য বের করেছেন। এরকম কিছু বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:

১) প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ হলেন সর্বশেষ নবী।

আল্লাহ্‌ বলেন: “মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী। আল্লাহ্‌ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আহযাব ৩৩:৪০)

২) আল্লাহ্‌  আদি পিতা আদম (আ) এর দেহে রুহ ফুঁকে দেয়ারও আগে মুহাম্মাদ ﷺ এর নবুওয়তের বিষয়টি নির্ধারণ করেছিলেন।

এক সাহাবী একবার জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহর রাসূল? আপনি যে নবী হবেন সেটা আল্লাহ্‌ কবে নির্ধারণ করেছিলেন? রাসূলুল্লাহ ﷺ জবাবে বলেছিলেন – যখন আদম মাটি (ত্বীন) ও রুহ এর মধ্যবর্তী ছিলেন (অর্থাৎ, আদমের মাটির দেহে তখনও রুহ ঢুকানো হয়নি)।

৩) পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবীকে পাঠানো হয়েছিল তাঁর যুগের ও তাঁর জাতির মানুষের জন্য। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ।  তিনি একমাত্র নবী যাকে সমস্ত মহাবিশ্বের সকল জাতির জন্য, কেয়ামত অবধি সকল যুগের জন্য নবী হিসাবে পাঠানো হয়েছে। শুধু তাই না – তিনি একমাত্র নবী যাকে কেবল মানবজাতিরই নয়, বরং সমস্ত জ্বীন জাতির জন্যেও নবী করে পাঠানো হয়েছে।

৪) প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ কে আল্লাহ্‌ দিয়েছিলেন রু’উব। আল্লাহর রাসূল বলেন – “আল্লাহ্‌ আমাকে রু’উব দিয়ে সাহায্য করেছেন। রু’উব এমন এক রকম ভয় যার ফলে আমি আমার শত্রুদের কাছে পৌঁছানোর আগেই তারা আমার ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। এমনকি আমি তাদের থেকে এক মাস ভ্রমণ পরিমাণ দূরত্বে অবস্থান করলেও তারা আমার ভয়ে ভীত থাকে।”

৫) তাঁকে দেয়া হয়েছে সর্ববৃহৎ উম্মাহ। সাহিহ বুখারীতে বর্ণিত এক হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন – আল্লাহ্‌ আমাকে বিভিন্ন নবীর উম্মাতদেরকে দেখালেন। তার মধ্যে এক নবীর উম্মাহ বিশাল বড় ছিল। আমি বললাম – এরা বোধহয় আমার উম্মাহ। আমাকে বলা হল – না, এরা মুসা (আ) এর উম্মাহ। এরপর আমার চোখে পড়ল তার চাইতেও বড় এক উম্মাহ – যা কিনা দিগন্ত পর্যন্ত ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমাকে বলা হলো – এরাই আপনার উম্মাহ ।

আরেক হাদিসে বলা হয়েছে – একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের প্রশ্ন করলেন – “তোমরা কি চাও জান্নাতের এক-তৃতীয়াংশ তোমাদের মানুষেরা হবে?”

তারা খুশীতে বলে উঠল – “আল্লাহু আকবার!”

“তোমরা কি একথা শুনে খুশী হবে যে জান্নাতের অর্ধেকটা তোমাদের মানুষেরা হবে?”

“আল্লাহু আকবার!”

“আল্লাহর কসম – আমি আশা করি জান্নাতবাসীর দুই-তৃতীয়াংশ হবে আমার উম্মাহ”।

লক্ষণীয় যে, আজকে আমাদের কাছে এই হাদিসটাকে নিতান্ত সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু তৎকালীন সাহাবীদের জন্য এটা ছিল এক বিরাট ঈমান-উদ্দীপক বাণী। সে সময় দুনিয়ার মোট মুসলিমের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে দেড়-দু’হাজার ছিল, আর সেখানে খ্রিষ্টান ছিল কয়েক মিলিয়ন, ইহুদী ছিল কয়েক লক্ষ। মুসলিমদের সংখ্যা এক সময় সব জাতিকে ছাড়িয়ে যাবে, এটা চিন্তা করে সাহাবীরা তখন কতটা অনুপ্রানিত হয়েছিলেন তা এখন আমাদের কল্পনারও বাইরে।

৬) আল্লাহ ﷻ প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ কে দিয়েছেন সকল মু’জিযার (miracle) শ্রেষ্ঠ মু’জিযা – “আল-কুরআন”।  আমরা জানি – মুসা(আ) লাঠির আঘাতে লোহিত সাগর দ্বিখন্ডিত করেছিলেন, ঈসা(আ) মৃতকে পুনরজ্জিবীতে করেছিলেন, নূহ(আ) তাঁর বিশাল কিস্তিতে ভেসে তাঁর অনুসারীদের রক্ষা করেছিলেন – কিন্তু ভেবে দেখুন এই মু’জিযাগুলো সবই ঐতিহাসিক ব্যাপার। আমরা কেউই মুসা(আ) কে লোহিত সাগর দ্বিখন্ডিত করতে দেখিনি, কেউই ঈসা(আ) কে দেখিনি মৃতকে পুনরজ্জীবিত করতে বা নূহ(আ) কে তাঁর বিশাল কিস্তি পানিতে ভাসিয়ে দিতে; কিন্তু আমরা সবাই কুরআন দেখেছি, যার ইচ্ছা হয় পড়েছি। কুরআন এমন এক মু’জিযা যা নাজিলের ১৪শত বছর পরেও আমরা নিজের চোখে দেখতে পারি, হাত দিয়ে ছুঁতে পারি, নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারি এটা কত আশ্চর্য এক গ্রন্থ!

– আরবী ভাষার যে কোন পন্ডিত স্বীকার করবেন যে আরবী সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হলো কুরআন। এত উচ্চ মার্গীয় ব্যাকরণ ও কাব্যিকতা আরবী ভাষার আর কোন গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যায় না। আরবী ভাষার মূল ব্যাকরণই কুরআন থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

– কুরআন মানবজাতির ইতিহাসকে যেভাবে পরিবর্তিত করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোন একক গ্রন্থ এ কাজ করে দেখাতে পারেনি। কুরআনকে অনুসরণের কারণে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতায় পৃথিবীতে সবচেয়ে অন্ধকারে থাকা আরব জাতি আজ থেকে ১৪ শত বছর আগে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছিল। কুরআনের প্রভাব এমনকি ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন অনারব ভূখন্ডেও, আর এর প্রভাবে দলে দলে বিভিন্ন জাতি ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এক কুরআনের প্রভাবে নগ্ন-পদের বেদূঈনরা তৎকালীন সুপার-পাওয়ার রোমানদেরকে পরাজিত করেছিল, ছেড়া কাগজের মত টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল মহাপরাক্রমশালী ফার্সী বাদশা খসরুর সাম্রাজ্য। ইসলামের স্বর্ণযুগে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ ছিল মুসলিমদের শাসনে। পদার্থ বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, অর্থনীতি সহ জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিমরা সে সময় নেতৃত্ব দিয়েছে। আর এ সবই হয়েছিল একটি মাত্র গ্রন্থ – আল-কুরআনকে অনুসরণের কারণে। আর বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা মার খাচ্ছে ঠিক তার বিপরীত কারণে – কুরআনকে জীবন নির্দেশিকা হিসাবে গ্রহণ না করার কারণে।

– পৃথিবীতে কুরআন যত বইয়ের জন্ম দিয়েছে, যত স্কুলের জন্ম (মাদ্রাসা শব্দের ইংরেজী হলো স্কুল) দিয়েছে, আর কোন একক বই তা দেয়নি। আজ বিশ্ব জুড়ে যে লক্ষ লক্ষ হাদিস গ্রন্থ, তাফসির গ্রন্থ, সীরাহ গ্রন্থ, ফিকহী গ্রন্থ – আমরা দেখতে পাই, এই সমগ্র ইসলামী সাহিত্যের উৎস হলো একটি মাত্র বই – আল-কুরআন।

– কুরআন এমন এক গ্রন্থ যাতে আছে ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলনীতি (theology), ইবাদত করার পদ্ধতি, নৈতিকতা শিক্ষা ,অতীতের ইতিহাস, ভবিষ্যতে কি হবে তার বর্ণনা, পারিবারিক/সামাজিক/রাষ্ট্রীয় আইন, বিভিন্ন রকম বৈজ্ঞানিক নিদর্শনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, এমনকি একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবন কিভাবে পরিচালিত করবে, কিভাবে নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবে তা-ও। অবতীর্ণ হওয়ার ১৪শত বছর পরেও এই পৃথিবীর ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম এই গ্রন্থের প্রতিটা অক্ষরকে যেভাবে বিশ্বাস করে, যেভাবে সম্মান প্রদর্শন করে, এই বইয়ে যেভাবে লেখা আছে সেভাবে অযু করে নিজেকে পবিত্র করে, সালাত আদায় করে, রমজানে রোজা রাখে, যাকাত আদায় করে, হজ্জ্ব পালন করে – তা সত্যিই এই বিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা, কিন্তু প্রতিদিন আমরা এটা ঘটতে দেখি বলে এটা আমাদের চোখে পড়ে না।

– পৃথিবীতে যত বেশী মানুষ কুরআন পড়েছে, আর অন্য কোন গ্রন্থকে মানবজাতি সেভাবে পড়েনি। প্রতিবছর শুধু রমজান মাসে যে পরিমাণ কুরআন পড়া হয়, ৫০ বছরেও পৃথিবীর আর কোন গ্রন্থ এতবার পড়া হয় না। পৃথিবীতে কুরআনকে প্রথম থেকে শেষ অক্ষর পর্যন্ত যতবার, যত মানুষ মুখস্থ করেছে – আর কোন গ্রন্থকেই এভাবে করা হয়নি, করা হয় না।

সুতরাং, একথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে – যদিও প্রত্যেক নবীর প্রত্যেক মু’জিযাই আল্লাহর ﷻ অসামান্য ক্ষমতার বহি:প্রকাশ, কিন্তু কুরআনের সাথে অন্য মু’জিযাগুলোর কোন তুলনা হয় না।

৭) প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ কে সম্মানিত করা হয়েছে ইসরা ও মি’রাজ এর মাধ্যমে – যখন তাঁকে একেবারে আল্লাহর ﷻ আরশের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্য কোন মানুষ, এমনকি কোন ফেরেশতাকেও কখনো আল্লাহর ﷻ এত কাছে যেতে দেয়া হয়নি। এই যাত্রার একটা সময় জিব্রিল(আ) প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে  বলেছিলেন – “হে আল্লাহর রাসূল বাকী পথ আপনাকে একা যেতে হবে, কারণ এর উপরে যাওয়ার অনুমতি আমার নেই”।

৮) প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ হলেন সমগ্র মানবজাতির নেতা। এক হাদিসে তিনি বলেছেন – “আমি হলাম সমস্ত আদম-সন্তানের সাইয়েদ (নেতা, রোল-মডেল)”।

৯) শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুতকারের পর সর্বপ্রথম যিনি কবর থেকে পুনরুত্থিত হবেন তিনি আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ (বুখারী)। পুনরুত্থান দিবসে সব মানুষ নগ্ন অবস্থায় উত্থিত হবে। এদের মধ্যে সর্বপ্রথম কাপড় পড়ানো হবে প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে।

১০) পুনরুত্থান দিবসে প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে দেয়া হবে সর্ববৃহৎ হাউস “আল-কাউসার”, যা আমরা সূরা আল-কাউসার এর তাফসীর থেকে জানি। আল-কাউসার হলো বর্গাকৃতির একটি হাউস (Pool), যার একেকটি বাহুর দৈর্ঘ্য হবে মক্কা থেকে ইয়েমেনের সান’আ  পর্যন্ত – যা কিনা প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ। আবার, আল-কাউসার বলতে জান্নাতের মূল নদীটাকেও বুঝায়, জান্নাতের অন্য সকল নদী হলো এই আল-কাউসার নদীর শাখা-প্রশাখা। এর ব্যাখায় স্কলারেরা বলেছেন – প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ্‌ যে আল-কাউসার উপহার দিয়েছেন, তার বরকতে যেন সকল জান্নাতবাসীর তৃষ্ণা মিটবে।

১১) সর্বপ্রথম পুলসিরাত পার হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ । সর্বপ্রথম মানুষ হিসাবে জান্নাতে প্রবেশের সম্মানও দেয়া হবে প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে। যখন তিনি জান্নাতের দরজায় এসে কড়া নাড়বেন তখন ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করবে – “কে আপনি?” তিনি বলবেন – “আমি মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ”। সে উত্তর দিবে –“শুধু আপনি আসলেই আমাকে জান্নাতের দরজা খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে!”। একথার পর নিজের ডান পা রাখার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ রাসূল ﷺ সর্বপ্রথম মানুষ যিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাঁর পিছু পিছু প্রবেশ করবে তাঁর উম্মতেরা – যারা যুগের হিসাবে সর্বশেষ, কিন্তু জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম উম্মত হবে।

১২) প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ্‌ জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বশিখরে বসবাস করার একক সম্মান দিবেন। জান্নাতের লোকসংখ্যার বন্টন হলো পিরামিডের মত – লেভেল যত নিচের দিকে হবে, মানুষদের সংখ্যা তত বেশী হবে, আর লেভেল যত উপরে হবে মানুষের সংখ্যাও তত কম হবে। এই লেভেল উপরে উঠতে উঠতে সর্বোচ্চ যে লেভেলটা থাকবে – সেই লেভেলে যাওয়ার মত মর্যাদা কেবল একজন মানুষেরই থাকবে – আর তিনি হলেন আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ । এই লেভেলটি আল্লাহর ﷻ আরশের ঠিক নিচে অবস্থিত আর এর নাম হলো “আল-ফাদিলাহ”। প্রিয়নবী মুহাম্মদ ﷺ বলেছেন – “আল-ফাদিলাহ হলো জান্নাতের একটি লেভেল যা কিনা আল্লাহ্‌ কেবল তাঁর একজন মাত্র বান্দাকে দিবেন “, এরপর তিনি ﷺ স্বভাবসুলত বিনয়ের সাথে বলেছেন, “আর আমি আশা রাখি যে আমি-ই সেই বান্দাহ” – যদিও তিনি নিশ্চিত জানতেন যে তিনি নিজেই হলেন আল-ফাদিলাহ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত একমাত্র ব্যক্তি।

প্রত্যেকবার আযানের পর আমরা যে দু’আ করি তাতেও কিন্তু আমরা বলি – “আ-তি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলাহ” –  হে আল্লাহ আপনি মুহাম্মাদ ﷺ কে আল-ওয়াসিলাহ ও আল-ফাদিলাহ দিন।

(সিরাহ সংক্রান্ত ড. ইয়াসির কাযির লেকচার – পর্ব ১ অনুসারে)

২- মহানবীর ﷺ কিছু নাম

মহানবীর ﷺ বিশেষ বৈশিষ্ট্য – পর্ব ২: মহানবীর ﷺ  কিছু নাম

muhammad logo

আরবী ভাষায় কোন কিছুর গুরুত্ব বোঝাতে ও কোন কিছুর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করার অন্যতম একটা উপায় হচ্ছে তাকে বিভিন্ন নামে ডাকা। এই কারণেই, মহান আল্লাহ্‌ ﷻ কে আমরা বিভিন্ন নামে ডাকি – আর তার মধ্যে ৯৯টি নাম প্রসিদ্ধ। একইভাবে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এরও বহু নাম আছে – যার কিছু দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ্‌ ﷻ, কিছু দিয়েছেন সাহাবীরা, আর কিছু দিয়েছেন তাঁর প্রতি ভালবাসার প্রকাশ-স্বরূপ তাবে’ইরা ও পরবর্তী যুগের স্কলারেরা।  কোন কোন স্কলারের মতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ২৫০টিরও বেশী গুণবাচক নাম আছে। এখানে আমরা তাঁর এমন কিছু নাম নিয়ে আলোচনা করব যেগুলো স্বয়ং মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে দিয়েছেন।

কুরআন মাজিদে বর্ণিত রাসূলের ﷺ নাম: 

কুরআন মাজিদে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে অনেকগুলো বিশেষণে (Adjective) ভূষিত করা হয়ে থাকলেও তাঁর জন্য দুইটি মাত্র বিশেষ্য (Noun) ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুইটি হলো –মুহাম্মাদ ও আহমাদ। মুহাম্মাদ নামটা কুরআনে মোট চারবার আছে, আর আহমাদ নামটা আছে একবার।

মুহাম্মাদ ও আহমাদ দুইটি নামই এসেছে “হামিদা” শব্দমূল থেকে। “হামদ” শব্দের অর্থ হলো প্রশংসা করা – এ প্রশংসা যেন-তেন রকমের প্রশংসা নয়, সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশংসা, স্থান-কালের উর্দ্ধের প্রশংসা, যে প্রশংসা ধন্যবাদ জানানোর জন্য নয়, বরং গুণের কারণে করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামের মূলে “হামদ” ব্যবহারের অর্থ হলো – তিনি এমন একজন মানুষ যিনি সর্বসময়, সর্বাবস্থায় প্রশংসনীয়, তিনি যা তিনি তারই জন্য প্রশংসনীয়, তিনি তাঁর কর্মের কারণে প্রশংনীয়, আবার তিনি কিছু যদি না-ও করে থাকতেন তবুও শুধু সৃষ্টিগত কারণেই তিনি প্রশংসনীয়। তিনি বেঁচে থাকতে প্রশংসনীয়, মৃত্যুর পরেও প্রশংসনীয়, দুনিয়াতে প্রশংসনীয়, হাশরের মাঠে প্রশংসনীয়, এমনকি জান্নাতে প্রবেশের পরেও প্রশংসনীয় ।

এতো গেল সর্বসময়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর  প্রশংসিত হবার কথা। এবার আসুন দেখি কে কে তাঁর প্রশংসা করে? রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন একজন মানুষ যার প্রশংসা স্বয়ং আল্লাহ্‌ ﷻ করেছেন, নবীরা করেছে, ফেরেশতারা করেছে, সমস্ত মানবজাতি করেছে – মুসলিমরা করেছে এমনকি অমুসলিমরাও করেছে।  মুসলিমরা তাঁর প্রশংসা করে তাঁর বাণীকে অনুসরণ করে। আর অমুসলিমরাও তাঁর প্রশংসা করে, যদিও তা সরাসরি নয়। অমুসলিমরা কিভাবে তাঁর প্রশংসা করে? তাঁর যে মানবীয় গুনাবলী – সত্যবাদীতা, দানশীলতা, দয়া, মায়া, ভালোবাসা, স্নেহ, ন্যায়বিচার, কঠোর সংগ্রাম, মানব প্রেম, সেন্স অফ হিউমার – সেগুলো সকল যুগের সকল মানুষের কাছে গ্রহনীয়, প্রশংসনীয় – আর এই গুনগুলোর প্রশংসা করার মাধ্যমে অমুসলিমেরা ইনডাইরেক্ট ভাবে তাঁর প্রশংসা করে। মানব ইতিহাসে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর চেয়ে বেশী প্রশংসিত মানুষ আর একটিও আসে নাই, আর একটিও আসবে না।

মুহাম্মাদ আর আহমাদ নাম দুইটার পার্থক্য কি? মুহাম্মাদ শব্দের অর্থ হচ্ছে যাকে অনবরত, একের পর এক প্রশংসা করে যাওয়া হয়। কাজেই, মুহাম্মাদ নামের মাধ্যমে আমাদের প্রিয়নবীর প্রশংসার সংখ্যাধিক্য কে বুঝানো হয়েছে (Quantity of praise)। আর আহমাদ বলতে বুঝায় সবচেয়ে ভালো উপায়ে যাকে প্রশংসা করা হয় (Quality of praise)। কাজেই, আহমাদ নামের মাধ্যমে আমাদের প্রিয়নবীর প্রশংসার গুনগত মানকে বুঝানো হয়েছে।  সকল ভালো গুণের সমারোহ , আর সকল ভালো গুনের আধিক্য – এই দুইয়ের সমন্বয়ই হলেন আমাদের প্রিয়নবী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ মুহাম্মাদ ﷺ ইবনে আব্দুল্লাহ।

আমরা যদি কুরআনে  রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামগুলো কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে  সেদিকে তাকাই তাহলে দেখব – যখনই নবী মুসা (আ) এর মুখ দিয়ে রাসূলের ﷺ নাম উচ্চারিত হয়েছে তখনই ‘মুহাম্মাদ’ ব্যবহৃত হয়েছে; অন্যদিকে যখনই নবী ঈসা (আ) এর মুখ দিয়ে রাসূলের ﷺ নাম উচ্চারিত হয়েছে তখনই ‘আহমাদ’ ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনে রাসূলের ﷺ নামের ব্যবহারের এই পার্থক্য নিয়ে খুব চমৎকার একটা ব্যাখা দিয়েছেন ইবনুল কাইয়ূম (মৃত্যু ৭৫১ হিজরী)।

ইবনুল কাইয়ূম বলেন – আমরা জানি ‘মুহাম্মাদ’ নামের অর্থ হলো যাকে অনেক অনেক মানুষ প্রশংসা করে (Quantity of praise) আর ‘আহমাদ’ নামের অর্থ হলো যাকে সবচেয়ে ভালো গুণের মাধ্যমে প্রশংসা করা হয় (Quality of praise)। আমরা যদি নবী মুসা (আ) এর উম্মতের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব আমাদের নবী মুহাম্মাদের ﷺ পরে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক উম্মত ছিল মুসা (আ) এর। যেহেতু মুসা (আ) এর উম্মতেরা তাদের নিজেদের সংখ্যার কারণে গর্বিত, তাই মুসা (আ) তাঁর উম্মতদের জানিয়ে দিচ্ছেন যে, আমার পরে এমন এক নবী আসবে যে হবে কিনা ‘মুহাম্মাদ’ তথা তার উম্মতের সংখ্যা হবে তোমাদের চাইতেও বেশী। অন্যদিকে, নবী ঈসা (আ) এর হাওয়ারিদের (শিষ্য/Disciple) সংখ্যা ছিল কম, কিন্তু তাদের ইমান ছিলো খুবই মজবুত – শত অপবাদ, নিপীড়ন, অত্যাচারের মুখেও তারা নবী ঈসা (আ) কে দৃঢ়তার সাথে অনুসরণ করে গেছে। নবী ঈসা তার পরবর্তী নবীকে ‘আহমাদ’ নামে তাঁর উম্মতদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে – তিনি বলছেন – শোন, আমার পরে এমন এক নবী আসবে যে কিনা হবে আমার চেয়েও বেশী গুণে গুণান্বিত, ফলে তাঁর যারা হবে ছাত্র – সেই সাহাবা ও তাঁর উম্মতেরাও তোমরা হাওয়ারিদের চাইতেও বেশী গুণান্বিত হবে।

হাদিসে বর্ণিত রাসূলের ﷺ কিছু নাম:

“যুবাইর ইবনে মুত’ইম থেকে বর্ণিত। মহানবী ﷺ বলেছেন – আমার অনেকগুলো নাম আছে। আমি মুহাম্মাদ; আর আমি আহমাদ; আর আমি আল-মাহি, অর্থাৎ যার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ কুফরী কে দূরীভূত করবেন; আর আমি আল-হাশির, কারণ আমার পদ অনুসরণ করে (অর্থাৎ আমার পরে) মানুষকে হাশর (উত্থান) করা হবে; আর আমি আল-‘আকিব, অর্থাৎ যার পরে আর কোন নবী আসবে না, আর আমি রহমতের নবী, আমি তাওবার নবী (অর্থাৎ আমাকে অনুসরণ করলে মানুষ ক্ষমা পাবে), আর আমি আল-মুকাফফা (একটা বৃহৎ চেইন এর সর্বশেষে এসে যে কোন কিছুকে পূর্নতা দেয়); আর আমি মালাহিমের নবী” । – (সাহিহ মুসলিম ও অন্যান্য) 

মালাহিম শব্দের অর্থ হলো – যিনি অনেক ফিতনার (trials and tribulations) বার্তা নিয়ে আসেন। রাসূল ﷺ নিজেকে মালাহিমের নবী বলেছেন কারণ – মানুষ সৃষ্টির পর থেকে সবচেয়ে বড় ফিতনা হলো দাজ্জাল, আর এই দাজ্জাল আসবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উম্মাতের উপর। এছাড়া কেয়ামতের ছোট ও বড় যত আলামত আছে – সবই আসবে এই উম্মাতের উপর। নিজেকে মালাহিমের নবী বলার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে – তাঁর মৃত্যুর পর আমরা অনেক বেশী ফিতনা দেখতে পাব।

[ আগের পর্ব: মহানবীর ﷺ বিশেষ বৈশিষ্ট্য – পর্ব ১: অতুলনীয় মর্যাদা প্রাপ্ত একজন মানুষ ]

[মহানবীর ﷺ মহাজীবন সিরিজের লেখাগুলো মূলত: ১) শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার ও ২) ড. সাল্লাবীর সিরাহ বইকে ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।]

প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স:

৩) http://corpus.quran.com/

৪) Meaning of Muhammad and Ahmad – http://en.islamtoday.net/quesshow-14-738.htm

 

১- অতুলনীয় মর্যাদা প্রাপ্ত একজন মানুষ

mohanobir mohajibon cut

মহানবীর ﷺ বিশেষ বৈশিষ্ট্য – পর্ব ১: অতুলনীয় মর্যাদা প্রাপ্ত একজন মানুষ

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সলাতু ওয়াস সালামু ‘আলা রসুলিল্লাহ ওয়া ‘আলা আলিহি ওয়াসাহবিহি আজমা’ইন আম্মা বা’দ

মহানবীর মহাজীবন ﷺ আমাদের প্রিয় মানুষটির গল্প, তাঁর ভালবাসার গল্প, তাঁর জীবনের গল্প – সহজ ভাষায় – ড. ইয়াসির কাযির লেকচার ও ড. সাল্লাবির বই অনুসারে।   এই সিরিজে ইনশা আল্লাহ্‌ ধারাবাহিকভাবে আমরা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর জীবনি ধীরে-ধীরে, ছোট-ছোট পোষ্টের মাধ্যমে তুলে ধরব।

কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায় – কি বলব রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে? কিভাবে বলব রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে? আমাদের জ্ঞানই বা কতটুকু আর আমাদের সামর্থ্যই বা কতটুকু? সেই ব্যক্তি সম্পর্কে কতটুকুই বা বলা যায় যার খ্যাতিকে সমুন্নত করার মহান দায়িত্ব আল্লাহ্ ﷻ নিজেই নিয়েছেন –

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ (সূরা ইনশিরাহ ৯৪:৪)
উচ্চারণ: ওয়া রফা’না লাকা যিক্‌রক
অর্থ: আর আমি আপনার খ্যাতিকে সমুচ্চ করেছি

এই আয়াতের ব্যাখায় ইবনে আব্বাস(রা) বলেন – মহান আল্লাহ্ ﷻ তাঁর রাসূলের ﷺ খ্যাতিকে এমনই সমুন্নত করেছেন যে যখনই আমরা তাঁর ﷻ নাম উচ্চারণ করি, তার প্রায় সাথে সাথেই তাঁর ﷻ রাসূলের ﷺ নামও উচ্চারণ করি। আমাদের শাহাদায় আমরা বলি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, ঠিক তারপরেই পড়ি “মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ”; আযানে যেই পড়ি “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, ঠিক এর পরেই পড়ি “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ”, নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ﷻ প্রশংসা করি, আর বসে তাঁর রাসূলের ﷺ প্রশংসা করি; নামাজ শেষে আমরা যেমনি আল্লাহর ﷻ যিকর করি, ঠিক তেমনি তাঁর রাসূলের ﷺ উপর দরূদ পাঠ করি।

আল্লাহ্ ﷻ তাঁর নবীর ﷺ মর্যাদা এতটাই সমুচ্চ করেছেন এমন একটা সেকেন্ড নাই যেখানে পৃথিবীর কোন প্রান্তে কেউ না কেউ বলছে “সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম”; আল্লাহ্ ﷻ তাঁর নবীর মর্যাদা এতটাই সমুচ্চ করেছেন তাঁকে ব্যঙ্গ করে একটা কার্টুন ছাপালে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়; আল্লাহ্ ﷻ তাঁর নবীর ﷺ মর্যাদা এতটাই সমুচ্চ করেছেন যে তাঁর ﷺ মৃত্যুর প্রায় ১৫০০ বছর পরেও তাঁকে নিয়েই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী বক্তব্য দেয়া হয়, তাঁকে নিয়েই সবচেয়ে বেশী বই লেখা হয়।

আল্লাহ ﷻ তাঁর রাসূল ﷺ সম্পর্কে আরো বলেছেন –

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৭)
উচ্চারণ: ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রহমাতাল্লিল ‘আলামিন
অর্থ: আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি শুধু রহমত (দয়া) রূপেই পাঠিয়েছি

রাসূল ﷺ নিজে ছিলেন রাহমাহ, আল্লাহ্‌ ﷻ তাঁকে যে বাণী দিয়েছেন তা আমাদের জন্য রাহমাহ, তাঁর ﷺ শিক্ষা আমাদের জন্য রাহমাহ। কিভাবে বুঝব আমি তাঁকে ﷺ ঠিকভাবে অনুসরণ করছি? যখন আমি আমার চারপাশের মানুষের জন্য রাহমাহ হবো বুঝতে হবে শুধু তখনই আমি তাঁকে ﷺ ঠিকমতো অনুসরণ করছি।


(পোষ্ট তারিখ: ১ মে ২০১৬)

[পরের পর্ব: মহানবীর ﷺ বিশেষ বৈশিষ্ট্য – পর্ব ২: মহানবীর ﷺ কিছু নাম]

[মহানবীর ﷺ মহাজীবন সিরিজের লেখাগুলো মূলত: শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার ও ড. সাল্লাবীর সিরাহ বইকে ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।]

খালিফাহ আলীর(রা) বর্ম ও জনৈক ইহুদী

SONY DSC

ইসলামের চতুর্থ খালিফাহ আলী ইবনে আবি তালিব (রা) ও জনৈক ইহুদী লোকের গল্পটা হয়তো আমরা অনেকেই জানি। তারপরেও আবার বলছি। সাধারণত: গল্পটা যে কারণে বলা হয় আমি সে কারণে বলব না, অন্য একটা কারণ আছে – সেটা লেখার শেষের দিকে বলব।

 

আলী (রা) তখন আমিরুল মু’মিনীন। এক যুদ্ধে উনি তাঁর বর্মটা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এর কিছুদিন পরে একদিন বাজারে গিয়েছেন আলী। হঠাৎ চোখ আটকে গেল জনৈক ইহুদীর দোকানে – আরে! ওটা কি চক চক করছে ওখানে! এ যে আমার সেই হারানো বর্ম! খুশীতে আটখানা হয়ে আলী ছুটে গেলেন ইহুদী দোকানীর কাছে। বলে উঠলেন – ‘এই যে জনাব! ওটা আমার বর্ম, কিছুদিন আগে একটা যুদ্ধে হারিয়েছিলাম। তুমি কোত্থেকে পেলে এটা?’ আলী(রা) খালিফাহ হওয়া সত্ত্বেও মোটেও ঘাবড়ালো না ইহুদী – সে জানে এই রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমান। জোর গলায় সে প্রতিবাদ করে উঠল – ‘জ্বী না! এটা এখন আমার হাতে, কাজেই এটা আমার বর্ম’।

 

অবাক হলেন আলী(রা)। তিনি নিশ্চিত এটা তাঁর বর্ম। আর তার উপর তিনি হলেন পুরো রাষ্ট্রের খালিফাহ। চাইলে নিজের ক্ষমতাবলে সেটা ইহুদী থেকে নিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু, তা তিনি করলেন না – কেইসটা নিয়ে গেলেন কাজীর (বিচারক) কাছে। কাজী আলীর (রা) কাছে জানতে চাইলেন – ‘আপনার কাছে প্রমাণ কি যে এটা আপনার বর্ম?’ আলী বললেন – ‘আমার দুই ছেলে হাসান আর হুসাইন সাক্ষ্য দেবে যে এটা আমার বর্ম’। কাজী মাথা নেড়ে বললেন – ‘উঁহু। ছেলের সাক্ষ্য বাবার পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়’। এবার কাজী ফিরলেন ইহুদীর দিকে। জিজ্ঞেস করলেন – ‘তোমার কি কোন সাক্ষী আছে নাকি তুমি শপথ করে বলবে এটা তোমার?’ ইহুদী জবাব দিল – ‘আমি কসম করে বলছি এটা আমার’। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একটা হাদিস আছে – কেউ কোন অভিযোগ নিয়ে আসলে তাকে সাথে প্রমাণও আনতে হবে, আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে সে হয় প্রমাণ আনবে অথবা কসম করে বলবে। এই হাদিসের ভিত্তিতে কাজী রায় দিলেন – ‘দু:খিত আলী! আপনি কোন প্রমাণ আনতে পারেননি আর সে শপথ করে বলেছে এটা তার, কাজেই মামলার রায় আপনার বিপক্ষে যাচ্ছে এবং বর্মটা আপনি পাচ্ছেন না’।

 

আলী(রা) চুপচাপ রায় মেনে নিলেন। বললেন – ‘ঠিক আছে’। আর এদিকে মামলার রায়ে ইহুদী ব্যক্তি তো মহা হতম্ভব! সাথে সাথে সে বলে উঠল – ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু! যে ধর্ম এই রকম সততার সাথে তার খালিফার বিরুদ্ধে রায় দেয় সেটা নিশ্চয়ই সত্য ধর্ম! কাজী সাহেব! আসলে খালিফাই সত্য কথা বলছিলেন, এটা উনারই বর্ম। যুদ্ধের ময়দান থেকে এটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। এটা উনারই পাওয়া উচিত’। ইহুদীর কথা শুনে একগাল হাসলেন আলী। বললেন – ‘ভাই তুমি যেহেতু এখন আমার মুসলিম ভাই হয়েই গেছ কাজেই বর্মের আমার আর দরকার নেই, এটা আমি তোমাকে গিফট করলাম’!

 

উপরের ঘটনাটা সাধারণত বর্ণনা করা হয় আদর্শ ইসলামী শাসনব্যবস্থার সুবিচার এর উদাহরণ হিসাবে। কিন্ত, এখানে আরেকটা ব্যাপার কিন্তু ভীষণ রকমের লক্ষণীয়। আলী(রা) নিশ্চিত জানতেন বর্মটা তাঁর, এবং আলী(রা) তখন মুসলিম জাহানের খালিফাহ পর্যন্ত ছিলেন – চাইলেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারতেন তিনি, নিজের ক্ষমতাবলে বর্মটা নিয়ে নিতে পারতেন। সমস্ত মুসলিম জাহানের খালিফাহ হওয়া সত্ত্বেও তিনি আইন নিজের হাতে তুলে নেননি, ব্যাপারটা নিয়ে গেছেন বিচারকের কাছে। কারণ, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া ইসলাম সমর্থন করে না। যে ব্যক্তি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সে শক্তি দিয়ে অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করবে, যার ‘ইলম আছে সে কথা দিয়ে অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করবে, আর এই দুইয়ের কোনটাই যার সামর্থ্যে নেই সে মনে মনে অন্যায়কে ঘৃণা করবে।

 

আমিরুল মু’মিনীন হওয়া সত্ত্বেও সামান্য একটা বর্ম ফিরে পাওয়ার জন্য আলী(রা) আইন নিজের হাতে তুলে নেননি, অথচ আজ তারই পথের পথিকেরা মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতেও আইন নিজের হাতে তুলে নিতে কুন্ঠাবোধ করে না।

 

(পাদটীকা:

১) ঘটনাটা শেইখ শাদী সুলাইমান তার একটি লেকচারে খুব সুন্দরভাবে বলেছিলেন। গুগলে সার্চ করলেই পাবেন।

২) অন্যায়ের প্রতিবাদ কিভাবে করতে হবে তা জানতে পারবেন ইমাম আন-নাওয়াবির ৪০ হাদিসের ৩৪ নং হাদিস থেকে। হাদিসটা প্রায়ই মিস-ইউজ হয়। এর খুব সুন্দর ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখা পাবেন নিচের লিঙ্কে গেলে।

http://40hadithnawawi.com/index.php/the-hadiths/hadith-34 )

 

রাসূলুল্লাহ ﷺ এতগুলো বিয়ে করেছিলেন কেন?

bohubibaho2

সাধারণ মুসলিমের মনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরপাক খায়, তা হলো – রাসূলুল্লাহ ﷺ এতগুলো বিয়ে করতে গিয়েছিলেন কেন? সাধারণ মুসলিম পুরুষ না ৪টার বেশী বিয়ে করতে পারে না? উনি তাহলে ১১টা বিয়ে করলেন কেন? –বর্তমান সময় যখন অনলাইনে ও অফলাইনে নাস্তিকতা ও ইসলাম-বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে তখন সাধারণ মুসলিমের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে এবং এই লেখায় আমি সেই উত্তর দিব। কিন্তু সেই উত্তরে যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা ভূমিকার অবতারণা করতে হচ্ছে।

উত্তর বুঝার প্রি-রিকুইসিট জ্ঞান:

আমাদের উপমহাদেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে নিয়ে লেখা কিছু বইতে, এবং বিভিন্ন আলেমরা তাদের লেকচারে তাঁকে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি রকমের কথা বলে থাকেন। যেমন – রাসূলুল্লাহ ﷺ  নূরের তৈরী, তাঁকে সৃষ্টি না করা হলে কিছুই সৃষ্টি হত না, তিনি সকল প্রকার মানবিক ও জৈবিক চাহিদার উর্ধ্বে ছিলেন – ইত্যাদি। এই কথাগুলো ভুল। অবশ্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ  সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তিনি নিষ্পাপ, কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে তিনি আমাদের মতই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, যাকে তাঁর ঈমান ও আমলের কারণে আল্লাহ্‌ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।

বলুন, “আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ যার উপর প্রত্যাদেশ হয়েছে যে তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ্‌, তাই তাঁরই পথ অবলম্বন করো এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো (সূরা ফুসসিলাত ৪১:)

আমাদের মধ্যে যেমন আশা-আকাংক্ষা, দু:খ-কষ্ট, অস্থিরতা-রাগ আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মধ্যেও এর সবই উপস্থিত ছিল। তাঁর সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তিনি এগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণের রাখতে পারতেন, আমরা কখনো পারি, কখনো পারি না। আমাদের মধ্যে যেমন কামনা-বাসনা আছে, স্বাভাবিকভাবে মানুষ হিসাবে তাঁর মধ্যেও এগুলো ছিল। আমরা যেমন সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হই, তিনিও সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন। আমাদের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো – আমরা আমাদের বাসনা পূরণের জন্য আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমা লঙ্ঘন করে ফেলি, যার দিকে তাকানো উচিত নয় তার দিকে তাকাই, যার সাথে সম্পর্ক করা আল্লাহর  ﷻ বিধানের বাইরে তার সাথেও সম্পর্ক করি। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চাহিদা পূরণের জন্য কখনোই আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমাকে লঙ্ঘন করেননি, সর্বাবস্থায় আল্লাহর  ﷻ হুকুম মেনে চলেছেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ (বা যে কোন মানুষের) যে কোন কাজ সম্পর্কে আমাদের আপত্তি থাকবে না যদি তা নিচের দুইটা (both) বিষয়কে মেনে চলে –

এক যদি তা আল্লাহর  ﷻ  দেয়া সীমার মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ যদি কোন কিছুকে হালাল করে থাকেন তাহলে সেটা করলে দোষের কিছু নেই।

দুই যদি কাজটি ঐ সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। (নামাজ,রোজা তথা ইবাদতের ক্ষেত্রে এই ২য় শর্তটি পূরণ হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু পার্থিব কাজ যেমন বিয়ে, যুদ্ধ ইত্যাদির (worldly affairs) ক্ষেত্রে এই শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ)

উদাহরণস্বরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বহুবিবাহের কথা ধরা যাক। আমরা জানি – রাসূলুল্লাহ ﷺ বহু বিবাহ করেছেন – এটার অনুমতি আল্লাহর  ﷻ কাছ থেকেও আছে, আবার তৎকালীন সমাজেও এটা গ্রহণযোগ্য প্র্যাক্টিস ছিল – কাজেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বহুবিবাহ নিয়ে কোন মুসলিমের আপত্তি থাকবে না।  আবার বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় সাধারণভাবে বহু বিবাহ গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই কোন মুসলিম যদি সক্ষমতা থাকার পরেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনা করে বহুবিবাহ না করে – তাহলেও আমরা বলব সে ঠিক করেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে সমকামিতা একটি গ্রহণযোগ্য আচরণ, কিন্তু একজন মুসলিম হিসাবে আমরা এই আচরণের পক্ষে নই কারণ এটা আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমার বাইরে।

এখানে বলে রাখা ভাল যে, ইসলামিক আইন যদিও কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা’ (Consensus) ও কিয়াসের (Analogy) উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এর প্রয়োগ আরো কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে যার মধ্যে আছে –  মাসলাহা মুরসালা (Consideration of Public Welfare/জনতার বৃহত্তর স্বার্থ) ও উরফ (Social norm /সামাজিক রীতি)।

উপরের প্রি-রিকুইসিট জ্ঞানকে মাথায় রেখে এবার আসুন সরাসরি প্রশ্নে চলে যাওয়া যাক।

bohubibaho1

প্রশ্ন ইসলামের যেখানে ১জন পুরুষের জন্য ৪জন স্ত্রী রাখার অনুমতি আছে, সেখানে মুহাম্মাদ কিভাবে ১১টা বিয়ে করলেন? তাঁর বৈবাহিক জীবন কি অস্বাভাবিক নয়?

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর  ১১জন স্ত্রী ছিল, যার মধ্যে ৯ জন একসাথে স্ত্রী হিসাবে ছিল (বাকী ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল)।  তাঁর স্ত্রীদেরকে আমরা সম্মানের সাথে উম্মাহাতুল মু’মিনীন (ঈমানদারদের মাতা) বলে থাকি।

যদিও একজন মুসলিমের জন্য চারজনের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আল্লাহ্‌ চার এর বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এই অনুমতি দেয়া হয়েছে নিচের আয়াতের মাধ্যমে।

হে নবী, আমি আপনার জন্য বৈধ করেছি আপনার স্ত্রীদেরকে যাদের আপনি দেনমোহর দিয়েছেনআর কোন ঈমানদার নারী নবীর কাছে নিবেদন করলে আর নবী তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে বৈধ আর শুধু আপনারই জন্য, বাকী মুমিনদের জন্য নয় [সূরা আহযাব ৩৩:৫০]

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সুবিধা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেয়ার কারণ কি? আসুন এর কয়েকটা কারণ দেখা যাক –

রাসূলুল্লাহ এর শারিয়াহ কিছুটা ভিন্ন ছিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারিয়াহর কিছু অংশ সাধারণ মুসলিমদের থেকে ভিন্ন ছিল। এই ভিন্ন শারিয়াহ তাকে সুবিধা কিছু দিয়েছিল, কিন্তু দায়িত্ব দিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশী। যেমন – রাসূলুল্লাহ  ﷺ এর জন্য প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া ওয়াজিব ছিল, একবার যুদ্ধের সরঞ্জাম পড়ে ফেলার পর যুদ্ধে না যাওয়া তাঁর জন্য হারাম ছিল, দান গ্রহণ করা তাঁর জন্য হারাম ছিল, মৃত্যুর সময় পরিবারের জন্য একটা পয়সা সম্পদ রেখে যাওয়াও তাঁর জন্য হারাম ছিল, এমন কি আজ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বংশধরের কেউ যতই দরিদ্র হোক না কেন যাকাত নিতে পারবে না।  এত কঠিন কঠিন নিয়মের বিপরীতে আল্লাহ্‌ তাঁকে খুব অল্প কিছু বিধানে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হলো চারটির বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি।

রাসূলুল্লাহ চাইলে আরো বেশী বিয়ে করতে পারতেন

রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর যৌবনের প্রাইম টাইম একজন মাত্র স্ত্রীর সাথেই কাটিয়েছিলেন – ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর একজন মাত্র স্ত্রী ছিল। অথচ বহুবিবাহ করা আরব সমাজে একটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল এবং তিনি চাইলেই তখন একাধিক বিয়ে করতে পারতেন।  আমাদের সমাজে যেমন বিয়ের সময় ছেলেদের যোগ্যতা দেখা হয় – তার পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার দেখা হয়, তৎকালীন আরব সমাজে বিয়ের সময় একটা ছেলে বা মেয়ের একটা বৈশিষ্ট্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ছিল – তা হলো বংশমর্যাদা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন আরবের সবচাইতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের সবচাইতে সম্মানিত ও লিজেন্ডারি ব্যক্তিত্ব আব্দুল মুত্তালিব এর সবচেয়ে প্রিয় নাতি। তাই তিনি চাইলে যৌবনে ও নবুয়তির আগে ১০-১২টা বিয়ে করা তার জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তা তিনি করেন নি।

সেই সমাজে বিয়ে ছিল ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি অন্যতম উপায়

বর্তমানে আমরা যে সমাজে বাস করি তাতে বিয়ের উদ্দেশ্য একটাই থাকে – সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী একটা ছেলে / মেয়েকে তার জীবনসঙ্গীর সাথে মিলিয়ে দেয়া। কিন্তু, আরব সমাজে “রাষ্ট্র” বলে কিছু ছিল না এবং এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের ঝগড়া-যুদ্ধ লেগেই থাকত। সেকালে সামাজিকভাবে সুরক্ষিত থাকার একমাত্র উপায় ছিল গোত্রবদ্ধ হয়ে চলা, তাই সেই সমাজে বিয়ের আরেকটি অন্যতম কারণ ছিল অন্য পরিবার বা অন্য গোত্রের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করা।  আর রাসূলুল্লাহ ﷺ যেহেতু আরবদের ৩ হাজার বছরের পুরনো রীতি-নীতিকে পরিবর্তন করে মাত্র ২৩ বছরে সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ইসলামের প্রবর্তন করছিলেন, কাজেই এটা তার জন্য খুব জরুরী ছিল যে তিনি বিয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করবেন। এই দিক থেকে চিন্তা করলে, বহুবিবাহের অনুমতি রাসূল্ললাহর ﷺ জন্য কোন সুবিধা ছিল না, বরং ছিল এক মহা দায়িত্ব।

নিচে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীদের তালিকা ও বিয়ের মূল কারণ উল্লেখ করা হল।

 

 

  স্ত্রীর নাম বিয়ের মূল কারণ বিয়ের সাল মন্তব্য
খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা) সাধারণ সামাজিক বিয়ে নবুয়তের ১০ম বছর খাদিজার প্রস্তাবে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। এটা ছিল খাদিজার ৩য় বিয়ে।

খাদিজা জীবিত থাকতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আর কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি। খাদিজার মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ ﷺর বয়স ছিল ৫০ বছর।  তাঁরা দীর্ঘ ২৫ বছর সংসার করেছিলেন।

সাওদা বিনতে জাম’আ (রা) সাধারণ সামাজিক বিয়ে নবুয়তের ১০ম বছর রাসূলুল্লাহ ﷺর খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।
আইশা (রা) বিনতে আবু বকর (রা) সাধারণ সামাজিক বিয়ে ও বন্ধু আবু বকর (রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন।এছাড়াও এতে আল্লাহর  ﷻ  পরোক্ষ নির্দেশ ছিল। (বুখারি) বিয়ের প্রতিশ্রুতি: নবুয়তের ১১ তম বছর।

একসাথে বসবাস শুরু: ১ম হিজরী

 

রাসূলুল্লাহ ﷺর খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।

আইশা জিনিয়াস ছিলেন। তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, প্রাচীন কবিতা ও বংশ-জ্ঞান (Geneology) এ এক্সপার্ট ছিলেন। অন্যতম সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী।  তিনি রাসূলুল্লাহর ﷺ একমাত্র কুমারী স্ত্রী।

হাফসা (রা) বিনতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বন্ধু উমার(রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন ৩য় হিজরী এটা হাফসার দ্বিতীয় বিয়ে।  আগের বিয়ে তিনি ১১ বছর বয়সে করেছিলেন।
যাইনাব বিনতে খুযাইমা (রা) যাইনাবের দানশীলতার পুরষ্কার ও উত্তরের নাজদি অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ৪র্থ হিজরী এটা ছিল তাঁর তৃতীয় বিয়ে। যাইনাব তাঁর দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তাঁর স্বামী শহিদ হওয়ার পর এরকম মহান নারীর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺই ছিলেন একমাত্র যোগ্য স্বামী। বিয়ের ৮ মাস পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
উম্মে সালামা (রা)

অন্য নাম: হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া

উম্মে সালামার ঈমান ও আমলের পুরষ্কার ৫ম হিজরী এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। তাঁর স্বামী উহুদের যুদ্ধের আঘাতে শহীদ হন। মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামী দু’আ করেছিলেন তিনি যেন তার চাইতেও ভালো একজনকে স্বামী হিসাবে পান। আল্লাহ্‌ সেই দু’আ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাধ্যমে কবুল করেন। উম্মে সালামা বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন।
যাইনাব বিনতে জাহশ (রা) আল্লাহর  ﷻ নির্দেশ (সূরা আহযাব:৩৭) ও পালক পুত্র যে নিজের পুত্র নয় এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা ৫ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। যাইনাব কুরাইশি ছিলেন ও রাসূলুল্লাহর ﷺ ফুপাত বোন ছিলেন। আরব সমাজে, কাযিনদের মধ্যে বিয়ে হওয়া খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। আনাস(রা) বলেন – রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি কোরআনের কোন আয়াত লুকাতেন তাহলে যাইনাবের সাথে বিয়ের আয়াতটাকেই লুকাতে চাইতেন (বুখারী)। – শুধু আল্লাহর  ﷻ হুকুম পালনের জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বিয়েটা করেন।
যুয়াইরিয়াহ বিনতে আল-হারিস (রা) বানুল মুস্তালিকের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন ৫ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন বানুল মুস্তালিক গোত্রপ্রধানের মেয়ে। যুয়াইরিয়াকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে মুক্ত করেন এবং বিয়ে করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।  শত শত সাহাবী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি করে দেন।  এই বিয়ের ফলে সম্পূর্ন বানুল মুস্তালিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা)

অন্য নাম: রামলা

কুরাইশদের মধ্য থেকে শত্রুভাব অপসারণ ৭ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তৎকালীন মুশরিক কুরাইশদের অবিসংবাদিত নেতা আবু সুফিয়ানের মেয়ে। কুরাইশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে উম্মে হাবিবা আবিসিনিয়ায় চলে যান যেখানে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়, পরে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে অনেক মুশরিকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ইসলামের প্রতি ভালবাসা তৈরীতে সাহায্য করে।
১০ সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা) ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ৭ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন ইহুদীদের বনু নাদির গোত্রের নেতার মেয়ে। তিনি প্রথম থেকেই বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মকে পছন্দ করতেন। খন্দকের যুদ্ধে তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে মুক্তি দেন ও বিয়ে করেন। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দি মুক্তিতে উৎসাহ দেন ও এটাও প্রমাণ করেন – ইহুদীদের প্রতি মুসলিমদের কোন জাতিগত বিদ্বেষ নেই।
১১ মাইমুনাহ বিনতে আল-হারিস(রা)

ইসলাম-পূর্ব নাম: বাররাহ

চাচা আব্বাসের অনুরোধে ও কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ৮ম হিজরী এটা তাঁর ২য় বিয়ে। হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন উমরা করতে মক্কা আসেন তখন চাচা আব্বাস (রা) তাঁকে অনুরোধ করেন মাইমুনাকে বিয়ে করতে।  এই বিয়ের পর রাসূল্ললাহ মক্কার কুরাইশদেরকে (যারা তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি) তাঁর ওয়ালিমায়  দাওয়াত দেন ও এভাবে তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের চেষ্টা করেন।

 

উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর বিয়েগুলো যে সব কারণে করেছিলেন তার মধ্যে আছে – স্বাভাবিক সামাজিক কারণ, কোন বন্ধুর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করণ, কোন গোত্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, অথবা যে গুণবতী নারীর স্বামী শহীদ হয়েছে তাঁকে সম্মানিত করার জন্য।  আর এই বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে সেই নারীর সৌন্দর্যও যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আকর্ষণ করে থাকে তাতে দোষের কিছু নেই। একজন পুরুষ তো তাকেই বিয়ে করতে চাইবে যাকে তার সুন্দর লাগে – এটাই তো স্বাভাবিক বায়োলজিকাল ব্যাপার।

রাসূলুল্লাহ জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই

রাসূলুল্লাহ কখনোই জোর করে কাউকে বিয়ে করেননি। তিনি যাদেরকে বিয়ে করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ এর স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। যে তাঁর স্ত্রী হতে চায়নি, তাকে তিনি বিয়ে করেননি।

সাহিহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে আমরা একটি ঘটনা জানি যেখানে উমাইমাহ বিনতে শাহরিল নামক এক মহিলা প্রাথমিকভাবে রাসূলুল্লাহ এর  স্ত্রী হতে সম্মতি জানায়। কিন্তু, বিয়ের রাতে সেই মহিলা তার মত পরিবর্তন করে ও স্ত্রী হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ কে দেখে সে বলে উঠে – “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি”।  জবাবে রাসূলুল্লাহ বলেন – “তুমি সবচাইতে বড়র কাছেই আশ্রয় চেয়েছ। যাও, তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও।”   এভাবে করে বিয়ে কনসুমেট (স্বামী-স্ত্রী হিসাবে একসাথে থাকা) করার আগেই রাসূলুল্লাহ উমাইমাহকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন। অন্য কিছু বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ কে অপদস্থ করার জন্য কাফেররা মহিলাটাকে দিয়ে এরকম করিয়েছিল। ইতিহাসের বইগুলোতে এরকমও পাওয়া যায় যে এই মহিলা তার বাকী জীবন রাসূলুল্লার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আফসোস করতে করতে কাটিয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ জোর করে কোন স্ত্রীকে ধরে রাখেন নাই

রাসূলুল্লাহ ﷺ তো জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই, জোর করে কাউকে বিয়ের পরে ধরেও রাখেন নাই। বরং, তাঁর যে কোন স্ত্রী চাইলেই তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন।

হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, “তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ বিলাসিতা কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদেরকে ভোগবিলাসের ব্যবস্থা করে দেই আর তোমাদেরকে ভদ্রতার সাথে বিদায় দেই আর তোমরা যদি আল্লাহ্‌, তাঁর রাসূল পরকাল চাও, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎ কর্ম করে আল্লাহ্তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন (সূরা আহযাব ৩৩:২৮২৯)

হাদিস থেকে আমরা বরং দেখি, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীরা তাঁর কাছে ডিভোর্স তো চানই নি বরং প্রত্যেকেই যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন প্রশংসা করেছিলেন যে স্বামী হিসাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ কতটা মহৎ ছিলেন।

ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর তিনি আর বিয়ে করেন নাই

আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ৭টি বিয়েই হয়েছে ৩য় থেকে ৮ম হিজরীর সময়। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের সবচেয়ে আন্দোলিত সময়, যখন মুসলিমরা বিভিন্ন গোত্রের সাথে যুদ্ধে যাচ্ছে, আবার বিভিন্ন গোত্রের সাথে শান্তিচুক্তি করছে। কাজেই, এই সময় এই বিয়েগুলো ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের অংশ বিশেষ। তিনি যদি নারীলোভীই হয়ে থাকবেন তাহলে তো এর আগে-পরেও তাঁর অনেক বিয়ে করার কথা ছিল। শুধু তাই না, রাসূলুল্লাহ ﷺ বেঁচেছিলেন ১১ হিজরী পর্যন্ত। কিন্তু, ৭ম হিজরির হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হুনাইনের যুদ্ধে বিজয়ের পরে আরব ভূখন্ডে মুসলিমদের একচ্ছত্র আধিপত্য সময়ের ব্যাপারে হয়ে দাঁড়ায় – আল্লাহ্‌ নিজেই সূরা ফাতহ তে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে “পরিষ্কার বিজয়” হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই আমরা দেখতে পাই, ৯ম-১১তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ গোত্রভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়নে আর কোন বিয়েও করেননি। তিনি যদি আসলেই শুধু নিজের চাহিদায় বিয়ে করে থাকতেন তাহলে তিনি ঐ শেষের ২ বছরেও বিয়ে করা করা থামাতেন না।

তথ্য সূত্র:

১) শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার

২) ড. সাল্লাবির সীরাহ বই

৩) শেইখ সাফিউর রাহমান মুবারাকপুরীর সীরাহ বই

৪) দি কোড অফ স্কলারস – শেইখ ইয়াসির বিরজাস

সহজ ভাষায় ইসলামের উত্তরাধিকার আইন

inheritance-in-turkey

সম্পত্তির উত্তরাধিকার বন্টন সম্পর্কে ইসলামের নিয়ম কি – তা নিয়ে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে প্রায়ই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, আর কমন কিছু প্রশ্ন আছে যা প্রায় সবার মনেই ঘুরপাক খায়। উত্তরাধিকার সম্পর্কে একদম প্রাথমিক কিছু জ্ঞান এই লেখায় শেয়ার করলাম।

ইসলামে মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদকে “মিরাস” বা “তারেকা” বলে। যারা “মিরাস” এর মাধ্যমে সম্পদ পায় তারা “ওয়ারিস”। যে নিয়মের মাধ্যমে এই বন্টন করা হয় তাকে বলে “ফারায়েয”। সংজ্ঞা অনুসারে, শুধুমাত্র মৃত ব্যক্তিরই “মিরাস” হতে পারে, জীবিত ব্যক্তির “মিরাস” হয় না।

একজন ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার সম্পত্তি বন্টন করার আগে আরো কিছু খরচ দেখতে হয়। এই খরচগুলো মিটানোর পরেই কেবল ওয়ারিসদের মধ্যে সম্পত্তির বন্টন হয়। এই খরচগুলো হল:

  • কেউ যদি মৃত ব্যক্তিটির দাফন-কাফন এর খরচ দিতে রাজি না থাকে তাহলে ঐ মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকেই ঐ খরচ দিতে হবে
  • ঐ ব্যক্তির কাছ থেকে যদি কেউ টাকা পেয়ে থাকে তবে সেই দেনা আগে মেটাতে হবে
  • ঐ ব্যক্তির উপর যদি কোন শার’ই খরচ ফরজ হয়ে থাকে (যেমন – যাকাত, কাফফারা) যা সে দিয়ে যেতে পারেনি সেটা দিয়ে দিতে হবে
  • ঐ ব্যক্তি যদি ওসিয়ত করে যেয়ে থাকে তাহলে সেই ওসিয়তের পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে

একজন ব্যক্তি তার মিরাসের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ওসিয়ত (দান) করতে পারবে।  এই ওসিয়ত সে যে কাউকে করতে পারবে, তবে সাধারণত: মসজিদ, মাদ্রাসা বা অন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ওসিয়ত করা হয়। ওসিয়তের পর বাকী যে সম্পদ থাকবে তা ওয়ারিসদের মধ্যে বন্টন হবে।

ওয়ারিসরা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। ১ – রাহেম বা বংশের কারণে আত্মীয় ও, ২ – বৈবাহিক সম্পর্কীয় আত্মীয়।

আবার ২ শ্রেণির মানুষ আছে যারা সম্পর্কের কারণে ওয়ারিস হওয়া সত্ত্বেও সম্পদের ভাগ পাবে না। এরা হলো – ১) মৃত ব্যক্তির ধর্ম আর ওয়ারিসের ধর্ম যদি ভিন্ন হয়, ২) ওয়ারিস যে ব্যক্তির সম্পদ পাওয়ার কথা তাকে যদি সে হত্যা করে।

পুরুষদের মধ্যে যারা ওয়ারিস হতে পারবে তারা হলো – স্বামী, ছেলে, ছেলের ছেলে, বাবা, দাদা, আপন ভাই, সৎ ভাই, চাচা, চাচাত ভাই, মুক্তিকৃত দাস।

নারীদের মধ্যে যারা ওয়ারিস হতে পারবে তারা হলো – স্ত্রী, মেয়ে, ছেলের মেয়ে, মা, দাদী, আপন বোন, সৎ বোন, মুক্তিকৃত দাসী।

মিরাস বন্টনের বহু জটিল নিয়ম-কানুন আছে। কিন্তু, সুখের কথা হল বেশীরভাগ মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক নিয়ম মাত্র ৩টি। এগুলো হলো –

১) ছেলে সন্তান মেয়ে সন্তানের দ্বিগুণ পরিমাণ সম্পদ পাবে।

২) স্বামীর মৃত্যু: সন্তানহীন দম্পতির ক্ষেত্রে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী তার স্বামীর সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ পাবে। বাকী সম্পদ ভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে অন্য ওয়ারিসদের মধ্যে চলে যাবে। অন্যদিকে, সন্তানওয়ালা দম্পতির ক্ষেত্রে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী তার স্বামীর সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ পাবে। বাকি সম্পদ সন্তানদের মধ্যে ভাগ হবে।

৩) স্ত্রীর মৃত্যু: সন্তানহীন দম্পতির ক্ষেত্রে স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তার স্ত্রীর সম্পত্তির অর্ধেক পাবে। বাকী সম্পদ ভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে অন্য ওয়ারিসদের মধ্যে চলে যাবে। অন্যদিকে, সন্তানওয়ালা দম্পতির ক্ষেত্রে স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তার স্ত্রীর সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ পাবে। বাকি সম্পদ সন্তানদের মধ্যে ভাগ হবে।

ছেলেদের বেশী সম্পদ দেয়ার যুক্তি হলো – ইসলামি আইন অনুসারে একজন ছেলেকে তার পরিবারের ভরণ-পোষনের দায়িত্ব নিতে হয়, কিন্তু মেয়েদের সে দায়িত্ব নেয়ার কথা না। আবার, ছেলেকে বাবার সম্পত্তির দেখাশুনার দায়িত্বও পালন করতে হয়, যা মেয়েদের পালন করার কথা না । কিন্তু সত্য হলো যে বর্তমান সময়ের বাস্তবতা ভিন্ন। বর্তমানে বহু পরিবারেই মেয়েরা ছেলেদের সাথে সমান তালে আয়-রোজগার করে, মা-বাবার সম্পদের দেখ-ভাল করে। আবার, এমন পরিস্থিতিও হতে পারে যখন ছেলে সন্তান আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ায় তার যতটা না সম্পদের দরকার, মেয়ে সন্তান আর্থিক ভাবে অসচ্ছল হওয়ায় তার আরো বেশী সম্পদের দরকার। এরকম ক্ষেত্রে কি কিছু করার আছে? আল্লাহ্‌ ছেলে ও মেয়ে সন্তানের জন্য সম্পদের যে পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন তার বাইরে যেয়ে কি সম্পদ বন্টন করা যায়? উত্তর –  হ্যাঁ, করা যায়। তবে, এক্ষেত্রে যেটা বন্টন করা হবে সেটাকে “মিরাস” নয় “হেবা” (উপহার) বলা হয়।

“হেবা” হলো সেই সম্পদ যা একজন মানুষ জীবিত থাকতেই বন্টন এর হিসাব নির্ধারণ করে দেয় । মা/বাবা তার সম্পদ সন্তানদের মধ্যে “হেবা”-র মাধ্যমে তার ইচ্ছেমত বন্টন করতে পারবেন। কিন্তু, “হেবা” করার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে – কিছুতেই যেন কোন সন্তানের উপর যুলুম করার উদ্দেশ্যে বা তাকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে “হেবা” করা না হয়।  “হেবা”র উদ্দেশ্য হতে হবে ঐ পরিবারের বিশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পদের সুষম বন্টন – যাতে মা/বাবার মৃত্যুর পর ভাই-বোনদের মধ্যে ঝগড়া-ঝাঁটি না হয়।

ইসলামের বেশীরভাগ বিধানই কুরআনে শুধু হুকুম করা হয়েছে, আর কিভাবে তা পালন করতে হবে তার বিস্তারিত বলা আছে হাদিসে। এক্ষেত্রে, উত্তরাধিকার আইন অনেকটাই ব্যতিক্রম। সূরা নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ – মাত্র এই তিনটি আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ উত্তরাধিকার আইন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। এই তিনটি আয়াতের অর্থ পড়ুন, তাফসীর পড়ুন – ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাবেন ইনশা আল্লাহ্‌।

 

(লেখাটি আমি লিখেছি শেইখ আব্দুর রাকিবের “মীরাছ – উত্তরাধিকারের বিধান” লেকচার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। এখানে আমি মিরাস ও হেবা সম্পর্কে খুব সাধারণ একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছি, কোনভাবেই এগুলোকে “ফাইনাল ওয়ার্ডস” হিসাবে ধরে নিবেন না। আপনার স্পেইসিফিক কেইসে কি হবে তা জানার জন্য একজন অভিজ্ঞ মুফতি বা আইনজীবির পরামর্শ নিন।)

নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে

light_at_the_end_of_the_tunnel_by_juhan.jpg

আল্লাহ ﷻ সূরা ইনশিরাহ-তে বলেছেন:
“ফা ইন্না মা’আল ‘উসরি ইউসরান, ইন্না মা’আল ‘উসরি ইউসরা”
অর্থ: অবশ্যই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে, অবশ্যই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।
(আল-কুরআন ৯৪:৫-৬)

এখানে কয়েকটা ব্যাপার লক্ষণীয়:
১। আল্লাহ ﷻ কিন্তু বলেননি কষ্টের পরে স্বস্তি আছে, আল্লাহ ﷻ বলেছেন কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। প্রতিটা কষ্টই আসলে আমাদের জন্য স্বস্তি, কষ্টের মূহুর্তটা ইটসেলফ আমাদের জন্য স্বস্তি। কারণ, কষ্টের ঐ মুহুর্তগুলিতে যদি ধৈর্য্য ধরতে পারি, তাহলে সেই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ ﷻ আমাদের গুনাহ মাফ করে দিবেন।
২। কষ্টটাই স্বস্তি, কারণ আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভালো পরিবর্তনগুলো, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলি আমরা শিখি কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তাই, কষ্ট আর স্বস্তি যেন একে অপরের সমার্থক।
৩। কষ্টটা স্বস্তি হওয়া মানে এই না যে কষ্টের মূহুর্ত কখনো শেষ হবে না, বরং তা শেষ হবে এবং তখন আমরা রিলিভড্ (স্বস্তি) ফিল করব। ৫ নং আয়াতের স্বস্তি যদি হয় কষ্টের সময়কার স্বস্তি, ৬ নং আয়াতের স্বস্তি হলো কষ্ট মুক্তির পরের স্বস্তি।
৪। ৬ নং আয়াতে আল্লাহ কষ্টের পরে (বা’দ) স্বস্তি আছে না বলে কষ্টের সাথে (মা’আ) স্বস্তি আছে বললেন কেন? কারণ, পরকালের অনন্ত-অসীম জীবনের কাছে ইহকালের কষ্টের দিনগুলি এতই ক্ষণিকের যে, তখন চিন্তা করলে মনে হবে – পৃথিবীতে যতদিন ছিলাম, কষ্টের সাথে সাথেই তো স্বস্তি ছিল!